নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম | শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত - সহজ গাইড
নামাজ পড়ার সম্পূর্ণ নিয়ম (শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) – সহজ গাইড
ভূমিকা
নামাজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি সংযোগের মাধ্যম এবং প্রতিটি মুসলমানের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। তবে অনেক নতুন মুসলমান এবং যারা নামাজ শিখতে চান তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিয়ম জানা কঠিন মনে হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন যে নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত দাও (সূরা বাকারা: ৪৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে নামাজ দ্বীনের খুঁটি এবং যে এটি ছেড়ে দিল সে যেন ইসলামের ঘর ভেঙে ফেলল। এই লেখায় আমরা নামাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব যাতে যে কেউ সহজেই শিখতে এবং আমল করতে পারেন। ধাপে ধাপে অনুসরণ করলে নামাজ শেখা কঠিন নয় এবং নিয়মিত পড়লে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় বলে আশা করা যায়।
নামাজের প্রস্তুতি: ওজু ও পবিত্রতা
নামাজ শুরু করার আগে সঠিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি এবং এর মধ্যে ওজু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওজুর পদ্ধতি: প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধুতে হবে। তারপর তিনবার কুলি করতে হবে এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়তে হবে। এরপর সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল তিনবার ধুতে হবে। ডান হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুতে হবে এবং একইভাবে বাম হাত। তারপর ভেজা হাত দিয়ে মাথা মাসেহ করতে হবে একবার এবং কান মাসেহ করতে হবে। সবশেষে ডান পা গোড়ালি পর্যন্ত তিনবার ধুতে হবে এবং বাম পা। পোশাক ও স্থান: শরীর এবং পোশাক পবিত্র হতে হবে। নামাজের স্থান পরিষ্কার হতে হবে এবং নাপাক থেকে মুক্ত। পুরুষদের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের হাত, পা ও মুখ ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর ঢাকতে হবে। কিবলামুখী: নামাজ পড়ার সময় কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। সময়: প্রতিটি ওয়াক্তের নির্দিষ্ট সময় আছে এবং সেই সময়ে নামাজ পড়া আবশ্যক। নিয়ত: নামাজের নিয়ত মনে মনে করতে হবে যে কোন ওয়াক্তের নামাজ পড়ছেন এবং কত রাকাত।
সঠিক প্রস্তুতি নামাজ কবুল হওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ওজু ছাড়া নামাজ হয় না।
তাকবীরে তাহরীমা ও দাঁড়ানো (কিয়াম)
নামাজ শুরু হয় তাকবীরে তাহরীমা দিয়ে যা নামাজের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। তাকবীরে তাহরীমা: কিবলামুখী হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে উভয় হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠিয়ে "আল্লাহু আকবর" বলতে হবে। এই তাকবির বলার সাথে সাথে নামাজ শুরু হয়ে যায় এবং দুনিয়ার সব কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। হাত বাঁধা: পুরুষরা ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নিচে বাঁধবে এবং মহিলারা বুকের উপর। সানা পড়া: হাত বাঁধার পর সানা পড়া সুন্নত। সানা হলো "সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তায়ালা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুক।" এর অর্থ হলো হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র এবং আপনার প্রশংসা। আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ: তারপর "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" এবং "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" পড়তে হবে। কিয়াম: দাঁড়ানোর সময় সোজা থাকতে হবে এবং দৃষ্টি সেজদার জায়গায় রাখতে হবে। মনোযোগ: নামাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে এবং অন্য কিছু চিন্তা করা যাবে না।
তাকবীরে তাহরীমা নামাজের শুরু এবং এর পর থেকে নামাজ শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মনোযোগ বজায় রাখা উচিত।
সূরা ফাতিহা ও অতিরিক্ত সূরা পাঠ
কিয়ামে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা পড়া ফরজ এবং এটি প্রতি রাকাতে পড়তে হয়। সূরা ফাতিহা: সূরা ফাতিহা হলো "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আর রাহমানির রাহিম, মালিকি ইয়াওমিদ্দিন, ইয়্যাকা নায়বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতায়িন, ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম, সিরাতাল্লাজিনা আনয়ামতা আলাইহিম গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লিন।" এটি ধীরে ধীরে এবং তাজবিদ মেনে পড়া উচিত। আমিন: সূরা ফাতিহা শেষে "আমিন" বলতে হবে যার অর্থ হে আল্লাহ কবুল করুন। ইমামের পিছনে জোরে বলা উচিত। অতিরিক্ত সূরা: সূরা ফাতিহার পর আরেকটি সূরা বা কিছু আয়াত পড়া ওয়াজিব। প্রথম দুই রাকাতে সূরা মিলাতে হবে। ছোট সূরা যেমন সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা কাউসার ইত্যাদি পড়া সহজ। তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাত: তৃতীয় এবং চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়লেই হয়, অতিরিক্ত সূরা না পড়লেও চলে। নীরবে পড়া: যোহর ও আসর নামাজ নীরবে পড়তে হবে এবং ফজর, মাগরিব ও এশা জোরে পড়তে হবে। যদি একা পড়েন তাহলে যেকোনো ভাবে পড়া যায়।
সূরা ফাতিহা ছাড়া নামাজ হয় না তাই এটি সঠিকভাবে শিখে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রুকু করার নিয়ম ও রুকুর তাসবিহ
সূরা পাঠ শেষ করে রুকুতে যেতে হয় যা নামাজের একটি ফরজ অংশ। তাকবির বলে রুকু: "আল্লাহু আকবর" বলে রুকুতে যেতে হবে এবং হাত তুলে বলা সুন্নত। রুকুর পদ্ধতি: কোমর থেকে সামনে ঝুঁকে উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখতে হবে। পিঠ সোজা রাখতে হবে এবং মাথা পিঠ বরাবর থাকবে। হাঁটু সোজা রাখতে হবে এবং আঙ্গুল ফাঁক করে হাঁটু ধরতে হবে। তাসবিহ: রুকুতে কমপক্ষে তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম" পড়তে হবে। এর অর্থ আমার মহান রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি। পাঁচবার বা সাতবার পড়া উত্তম। স্থিরতা: রুকুতে স্থির থাকতে হবে এবং তাড়াহুড়া করা যাবে না। প্রতিটি তাসবিহ আদবের সাথে পড়তে হবে। রুকু থেকে ওঠা: "সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ" বলে রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। দাঁড়িয়ে বলা: সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলতে হবে। এর অর্থ হে আল্লাহ আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা।
রুকু সঠিকভাবে এবং স্থিরতার সাথে করা ফরজ এবং তাড়াহুড়া করলে নামাজ মাকরুহ হতে পারে।
সেজদা করার সঠিক নিয়ম ও সেজদার তাসবিহ।
রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর সেজদায় যেতে হয় যা নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকবির বলে সেজদা: "আল্লাহু আকবর" বলে মাটিতে সেজদায় যেতে হবে। প্রথমে হাঁটু, তারপর হাত, তারপর নাক এবং শেষে কপাল মাটিতে রাখতে হবে। সাতটি অঙ্গ: সেজদায় সাতটি অঙ্গ মাটিতে লাগাতে হবে - দুই হাত, দুই হাঁটু, দুই পায়ের আঙ্গুল এবং কপাল (নাকসহ)। সেজদার পদ্ধতি: হাত কাঁধ বরাবর রাখতে হবে এবং আঙ্গুল কিবলামুখী থাকবে। কনুই মাটিতে লাগানো যাবে না এবং উপরে তুলে রাখতে হবে। পেট ও পা আলাদা রাখতে হবে এবং পা খাড়া রাখতে হবে। তাসবিহ: সেজদায় কমপক্ষে তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আলা" পড়তে হবে। এর অর্থ আমার সর্বোচ্চ রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি। দুই সেজদা: প্রতি রাকাতে দুইটি সেজদা আছে। প্রথম সেজদা থেকে "আল্লাহু আকবর" বলে উঠে বসতে হবে এবং একটু স্থির হয়ে আবার "আল্লাহু আকবর" বলে দ্বিতীয় সেজদা করতে হবে। বৈঠক: দুই সেজদার মাঝে সোজা হয়ে বসতে হবে এবং "রাব্বিগফিরলি" বলতে হবে।
সেজদা হলো বান্দার আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে যাওয়ার মুহূর্ত এবং এতে বিনয় ও একাগ্রতা থাকা উচিত।
শেষ বৈঠক, তাশাহহুদ ও দরুদ শরীফ পড়া।
প্রতি দুই রাকাত পর এবং নামাজের শেষে বসতে হয় এবং নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। বসার নিয়ম: দ্বিতীয় সেজদার পর বসতে হবে। পুরুষরা বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে। মহিলারা উভয় পা ডান দিকে বের করে বসবে। তাশাহহুদ: তাশাহহুদ পড়া ফরজ। এটি হলো "আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়্যিবাতু, আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।" আঙ্গুল উঠানো: "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলার সময় ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল উঠাতে হবে। দরুদ শরীফ: শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ শরীফ পড়তে হবে। "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।" দোয়া মাসুরা: দরুদের পর দোয়া মাসুরা বা অন্য কোনো দোয়া পড়া সুন্নত।
তাশাহহুদ ও দরুদ শরীফ নামাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সঠিকভাবে পড়া জরুরি।
সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা।
নামাজ শেষ করতে হয় সালাম ফিরিয়ে যা নামাজ থেকে বের হওয়ার মাধ্যম। প্রথম সালাম: মাথা ডান দিকে ঘুরিয়ে "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ" বলতে হবে। ডান কাঁধের দিকে দেখতে হবে এবং ফেরেশতা ও ডান দিকের মুসল্লিদের সালাম দেওয়া হয়। দ্বিতীয় সালাম: তারপর মাথা বাম দিকে ঘুরিয়ে একইভাবে "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ" বলতে হবে। বাম কাঁধের দিকে দেখতে হবে। সালামের সাথে নামাজ শেষ: দ্বিতীয় সালামের সাথে সাথে নামাজ শেষ হয়ে যায় এবং এরপর স্বাভাবিক কাজ করা যায়। ইমামের পিছনে: যদি জামাতে পড়েন তাহলে ইমামের সালামের জবাব দিতে হবে। নিয়ত: সালাম ফেরানোর সময় নিয়ত করতে হবে যে আল্লাহর ফেরেশতা এবং ডান-বামের মুসল্লিদের সালাম দিচ্ছি। তাসবিহ: সালামের পর তাসবিহ পড়া সুন্নত - ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবর এবং একবার কালিমা তাইয়্যিবা।
সালাম ফিরানো নামাজ শেষ করার সঠিক পদ্ধতি এবং এর মাধ্যমে নামাজ থেকে বের হওয়া হয়।
উপসংহার
নামাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এটি সঠিকভাবে শেখা ও পড়া প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। ধাপে ধাপে অনুসরণ করলে নামাজ শেখা কঠিন নয় এবং নিয়মিত আমল করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় বলে আশা করা যায়।
আসুন, আমরা সবাই নামাজ সঠিকভাবে শিখি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত পড়ি। প্রথমে ওজু করি সঠিক নিয়মে এবং শরীর ও পোশাক পবিত্র রাখি। কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াই এবং তাকবীরে তাহরীমা বলে নামাজ শুরু করি। হাত বেঁধে সানা, আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ি। সূরা ফাতিহা এবং অতিরিক্ত সূরা মনোযোগ সহকারে পড়ি। রুকুতে গিয়ে তিনবার তাসবিহ পড়ি এবং স্থির থাকি। সেজদায় গিয়ে বিনয়ের সাথে তাসবিহ পড়ি এবং সাতটি অঙ্গ মাটিতে রাখি। দুই সেজদার মাঝে বসি এবং দোয়া পড়ি। বৈঠকে তাশাহহুদ ও দরুদ শরীফ পড়ি। ডান ও বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করি। নামাজের পর তাসবিহ ও দোয়া পড়ি। শিশুদের ছোট থেকে নামাজ শেখাই যাতে তারা অভ্যস্ত হয়। পরিবারকে নামাজে উৎসাহিত করি এবং একসাথে জামাতে পড়ি। মনে রাখি যে নামাজ আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলার মাধ্যম। মোবাইল ও দুনিয়ার চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ি। ভুল হলে আবার শিখি এবং উন্নতির চেষ্টা করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজ সঠিকভাবে পড়ার তৌফিক দান করুন এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করার সামর্থ্য দিন। আমাদের নামাজ কবুল করুন এবং জান্নাত দান করুন। আমীন।
নামাজ পড়ার নিয়ম নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. নামাজ শুরু করার আগে কী কী প্রস্তুতি নিতে হয়?
নামাজ শুরু করার আগে সঠিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি এবং এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওজু করা। ওজু ছাড়া নামাজ হয় না এবং এটি পবিত্রতার প্রতীক। ওজুর পদ্ধতি হলো বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে হাত ধোয়া, কুলি করা, নাক ঝাড়া, মুখ ধোয়া, হাত ধোয়া, মাথা ও কান মাসেহ করা এবং পা ধোয়া। এছাড়াও শরীর ও পোশাক পবিত্র থাকতে হবে এবং নাপাকি থেকে মুক্ত হতে হবে। নামাজের স্থান পরিষ্কার হতে হবে এবং কোনো নাপাক জিনিস থাকা যাবে না। পুরুষদের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের হাত, পা ও মুখ ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর ঢাকতে হবে। কিবলা নির্ণয় করতে হবে এবং কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি ওয়াক্তের নির্দিষ্ট সময় আছে এবং সেই সময়ের মধ্যে পড়তে হবে। নামাজের নিয়ত মনে মনে করতে হবে যে কোন ওয়াক্তের নামাজ পড়ছেন এবং কত রাকাত। এই প্রস্তুতিগুলো সম্পন্ন করলে নামাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত হওয়া যায় এবং নামাজ সঠিকভাবে আদায় হয় বলে আশা করা যায়।
২. সূরা ফাতিহা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কখন পড়তে হয়?
সূরা ফাতিহা নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি ছাড়া নামাজ সহিহ হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ে না তার নামাজ হয় না। সূরা ফাতিহা কুরআনের প্রথম সূরা এবং এতে আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর রহমত, বিচার দিবসের মালিক হওয়া এবং সঠিক পথের আবেদন রয়েছে। এটি প্রতি রাকাতে পড়তে হয় অর্থাৎ দুই রাকাত নামাজে দুইবার, তিন রাকাতে তিনবার এবং চার রাকাতে চারবার। সূরা ফাতিহা কিয়ামে দাঁড়িয়ে পড়তে হয় এবং সানা, আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ার পর পড়তে হয়। সূরা ফাতিহা শেষ হলে "আমিন" বলতে হবে এবং তারপর অতিরিক্ত সূরা পড়তে হবে। প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হবে কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা ফাতিহা পড়লেই হয়। সূরা ফাতিহা ধীরে ধীরে এবং তাজবিদ মেনে পড়া উচিত এবং প্রতিটি আয়াতের অর্থ বুঝে পড়া উত্তম। যারা নতুন শিখছেন তাদের সূরা ফাতিহা মুখস্থ করতে হবে এবং সঠিক উচ্চারণ শিখতে হবে।
৩. রুকু ও সেজদা সঠিকভাবে কীভাবে করতে হয়?
রুকু এবং সেজদা নামাজের ফরজ অংশ এবং সঠিকভাবে করা অত্যন্ত জরুরি। রুকু করার জন্য "আল্লাহু আকবর" বলে কোমর থেকে সামনে ঝুঁকতে হবে এবং উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখতে হবে। পিঠ সোজা থাকবে এবং মাথা পিঠ বরাবর থাকবে। হাঁটু সোজা রাখতে হবে এবং আঙ্গুল ফাঁক করে হাঁটু ধরতে হবে। রুকুতে কমপক্ষে তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম" পড়তে হবে এবং স্থির থাকতে হবে। রুকু থেকে "সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ" বলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলতে হবে। তারপর "আল্লাহু আকবর" বলে সেজদায় যেতে হবে। সেজদায় সাতটি অঙ্গ মাটিতে লাগাতে হবে - দুই হাত, দুই হাঁটু, দুই পায়ের আঙ্গুল এবং কপাল (নাকসহ)। হাত কাঁধ বরাবর রাখতে হবে এবং কনুই উপরে তুলে রাখতে হবে। সেজদায় কমপক্ষে তিনবার "সুবহানা রাব্বিয়াল আলা" পড়তে হবে। প্রথম সেজদা থেকে উঠে বসতে হবে এবং "রাব্বিগফিরলি" বলে আবার দ্বিতীয় সেজদা করতে হবে। রুকু ও সেজদায় তাড়াহুড়া না করে স্থির থাকা এবং তাসবিহ ঠিকমতো পড়া জরুরি।
৪. তাশাহহুদ ও দরুদ শরীফ কখন এবং কীভাবে পড়তে হয়?
তাশাহহুদ ও দরুদ শরীফ নামাজের বৈঠকে পড়তে হয় এবং এগুলো নামাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি দুই রাকাত পর বসতে হয় এবং তাশাহহুদ পড়তে হয়। যেমন চার রাকাত নামাজে দুই রাকাত পর এবং চার রাকাত শেষে মোট দুইবার বসতে হয়। তিন রাকাত নামাজে দুই রাকাত পর এবং তিন রাকাত শেষে বসতে হয়। বসার নিয়ম হলো পুরুষরা বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে। মহিলারা উভয় পা ডান দিকে বের করে বসবে। তাশাহহুদ পড়া ফরজ এবং এটি "আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি..." দিয়ে শুরু হয়। "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলার সময় ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল উঠাতে হবে। শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ শরীফ পড়তে হবে যা "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ..." এবং "আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ..." দুই অংশে বিভক্ত। দরুদের পর দোয়া মাসুরা বা অন্য কোনো দোয়া পড়া সুন্নত। প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ পড়ে উঠে দাঁড়াতে হবে কিন্তু শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরুদ এবং দোয়া পড়ে সালাম ফিরাতে হবে। সঠিকভাবে তাশাহহুদ ও দরুদ শেখা এবং পড়া নামাজের জন্য জরুরি।
৫. নামাজ শেষ করার সঠিক পদ্ধতি কী?
নামাজ শেষ করার সঠিক পদ্ধতি হলো সালাম ফিরানো এবং এর মাধ্যমে নামাজ থেকে বের হওয়া হয়। তাশাহহুদ, দরুদ শরীফ এবং দোয়া পড়ার পর সালাম ফিরাতে হয়। প্রথমে মাথা ডান দিকে ঘুরিয়ে "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ" বলতে হবে এবং ডান কাঁধের দিকে দেখতে হবে। এটি ডান দিকের ফেরেশতা এবং মুসল্লিদের সালাম। তারপর মাথা বাম দিকে ঘুরিয়ে একইভাবে "আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ" বলতে হবে এবং বাম কাঁধের দিকে দেখতে হবে। দ্বিতীয় সালামের সাথে সাথে নামাজ শেষ হয়ে যায় এবং এরপর থেকে স্বাভাবিক কাজ করা যায়। যদি জামাতে নামাজ পড়েন তাহলে ইমামের সালামের জবাব দিতে হবে। সালাম ফেরানোর সময় নিয়ত করতে হবে যে আল্লাহর ফেরেশতা এবং ডান-বামের মুসল্লিদের সালাম দিচ্ছি। সালামের পর তাসবিহ পড়া সুন্নত - ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৩ বার আল্লাহু আকবর এবং একবার "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু..." বলতে হবে। এরপর আয়াতুল কুরসি এবং অন্যান্য দোয়া পড়া উত্তম। সালাম ফিরানো নামাজের শেষ ফরজ কাজ এবং সঠিকভাবে করা জরুরি।





.jpeg)
