ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নামাজ কী: পার্থক্য ও গুরুত্ব
ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নামাজ কী: পার্থক্য ও গুরুত্ব
ভূমিকা
নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য ইবাদত। তবে অনেকে জানেন না যে নামাজ বিভিন্ন প্রকারের হয় এবং প্রতিটির গুরুত্ব ও বিধান আলাদা। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা, সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা এবং নফল - এই শ্রেণীবিভাগ বুঝলে নামাজ আদায় করা সহজ হয় এবং কোন নামাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জানা যায়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন যে নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত দাও (সূরা বাকারা: ৪৩)। এই নির্দেশ পালন করতে গেলে আমাদের জানতে হবে কোন নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক এবং কোনটি ঐচ্ছিক কিন্তু ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন ধরনের নামাজ পড়ে আমাদের শিখিয়ে গেছেন এবং তাঁর অনুসরণ করা আমাদের দায়িত্ব। এই লেখায় আমরা ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নামাজের সংজ্ঞা, পার্থক্য এবং প্রতিটির গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান সঠিক জ্ঞান নিয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন।
ফরজ নামাজ: সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
ফরজ নামাজ হলো সেই নামাজ যা পড়া প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক। সংজ্ঞা: ফরজ শব্দের অর্থ আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক যা আল্লাহ তায়ালা কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন। ফরজ নামাজ না পড়লে গুনাহ হয় এবং আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ - ফজর (২ রাকাত), যোহর (৪ রাকাত), আসর (৪ রাকাত), মাগরিব (৩ রাকাত) এবং এশা (৪ রাকাত)। মোট ১৭ রাকাত ফরজ নামাজ প্রতিদিন পড়তে হয়। জুমার নামাজ: শুক্রবার পুরুষদের জন্য জুমার ২ রাকাত ফরজ নামাজ যোহরের পরিবর্তে পড়তে হয়। ঈদের নামাজ: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজ ওয়াজিব তবে কেউ কেউ একে ফরজে কিফায়া বলেন। কাযা: ফরজ নামাজ যদি কোনো কারণে ছুটে যায় তাহলে তা পরে কাযা করা ফরজ। পরিত্যাগের শাস্তি: ফরজ নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে ঈমান দুর্বল হয় এবং কেউ কেউ বলেন এটি কুফরির কাছাকাছি। অগ্রাধিকার: ফরজ নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি সবার আগে পড়তে হবে।
ফরজ নামাজ ইসলামের ভিত্তি এবং এটি ছাড়া কোনো মুসলমানের ইবাদত পূর্ণ হয় না বলে আশা করা যায়।
ওয়াজিব নামাজ: সংজ্ঞা ও বিধান
ওয়াজিব নামাজ ফরজের পরেই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি পড়া অত্যন্ত জরুরি। সংজ্ঞা: ওয়াজিব অর্থ আবশ্যক যা ফরজের চেয়ে সামান্য কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তবুও পড়া প্রয়োজন। ওয়াজিব না পড়লে গুনাহ হয় তবে ফরজ না পড়ার মতো ততটা কঠিন নয়। বিতর নামাজ: এশার নামাজের পর ৩ রাকাত বিতর নামাজ ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে আল্লাহ বেজোড় এবং বেজোড় পছন্দ করেন তাই তোমরা বিতর পড়ো (সহিহ বুখারি: ৬৪১০, সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭)। ঈদের নামাজ: কেউ কেউ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজকে ওয়াজিব বলেন এবং এটি পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জানাজা নামাজ: মৃত মুসলমানের জানাজা নামাজ ফরজে কিফায়া অর্থাৎ কিছু মানুষ পড়লে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়। কাযা: বিতর নামাজ যদি ছুটে যায় তাহলে পরে কাযা করা উচিত। পার্থক্য: হানাফি মাজহাবে বিতর ওয়াজিব কিন্তু অন্য মাজহাবে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে সবাই একমত যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াজিব নামাজ অবহেলা করা উচিত নয় এবং নিয়মিত পড়া প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
সুন্নতে মুয়াক্কাদা: সংজ্ঞা ও ফজিলত
সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত পড়তেন এবং খুব কমই ছাড়তেন। সংজ্ঞা: মুয়াক্কাদা অর্থ গুরুত্বপূর্ণ বা তাকিদপ্রাপ্ত। এই নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরেও পড়তেন এবং ছাড়লে তিরস্কার করা হয়েছে। কোন নামাজগুলো: ফজরের ২ রাকাত সুন্নত, যোহরের আগে ৪ রাকাত ও পরে ২ রাকাত সুন্নত, মাগরিবের পর ২ রাকাত সুন্নত এবং এশার পর ২ রাকাত সুন্নত। ফজরের সুন্নতের ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ফজরের দুই রাকাত সুন্নত দুনিয়া ও তার মধ্যে যা আছে তার চেয়ে উত্তম (সহিহ মুসলিম: ৭২৫)। কাযা: সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছুটে গেলে কাযা করা মুস্তাহাব অর্থাৎ উত্তম। পরিত্যাগ: সুন্নতে মুয়াক্কাদা না পড়লে গুনাহ হয় না কিন্তু তিরস্কার হয় এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। নিয়মিততা: এই নামাজ নিয়মিত পড়া উচিত এবং ছাড়া উচিত নয়।
সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ ফরজের সাথে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।
সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা: সংজ্ঞা ও বিধান
সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝে মাঝে পড়তেন এবং মাঝে মাঝে ছাড়তেন। সংজ্ঞা: গায়রে মুয়াক্কাদা অর্থ গুরুত্বহীন নয় কিন্তু মুয়াক্কাদার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। এই নামাজ পড়লে সওয়াব পাওয়া যায় কিন্তু না পড়লে তিরস্কার নেই। কোন নামাজগুলো: যোহরের আগে বা পরে অতিরিক্ত ২ রাকাত, আসরের আগে ৪ রাকাত সুন্নত, এশার আগে ৪ রাকাত সুন্নত এবং মাগরিবের আগে ২ রাকাত সুন্নত। আসরের সুন্নত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহ তাকে রহমত করুন যে আসরের আগে চার রাকাত পড়ে (সুনানে আবু দাউদ: ১২৭১, সুনানে তিরমিজি: ৪৩০)। ঐচ্ছিক: এই নামাজ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এবং সামর্থ্য ও সময় অনুযায়ী পড়া যায়। কাযা: সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা ছুটে গেলে কাযা করার প্রয়োজন নেই। ফজিলত: এই নামাজ পড়লে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যায় এবং আল্লাহর নৈকট্য বাড়ে।
সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা নামাজ পড়া উত্তম এবং যথাসম্ভব পড়ার চেষ্টা করা উচিত।
নফল নামাজ: সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
নফল নামাজ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এবং অতিরিক্ত সওয়াবের জন্য পড়া হয়। সংজ্ঞা: নফল অর্থ অতিরিক্ত যা ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নতের বাইরে স্বেচ্ছায় পড়া হয়। নফল না পড়লে কোনো তিরস্কার নেই কিন্তু পড়লে অসীম সওয়াব। প্রকারভেদ: তাহাজ্জুদ (রাতের নফল), দুহা বা চাশত (সকালের নফল), ইশরাক (সূর্যোদয়ের পর), আওয়াবিন (মাগরিব ও এশার মাঝে), তাহিয়্যাতুল ওজু (ওজুর পর), তাহিয়্যাতুল মসজিদ (মসজিদে প্রবেশের পর) এবং সাধারণ নফল। তাহাজ্জুদের ফজিলত: রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদ নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং আল্লাহ এই সময় দোয়া কবুল করেন (সহিহ বুখারি: ১১৪৫)। দুহার ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রতিদিন সকালে তোমাদের প্রতিটি জোড়ার জন্য সদকা দিতে হয় এবং দুই রাকাত দুহা নামাজ তা পূর্ণ করে (সহিহ মুসলিম: ৭২০)। সীমাহীন: নফল নামাজের কোনো সীমা নেই এবং যত ইচ্ছা তত পড়া যায়।
নফল নামাজ আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম এবং ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ করে বলে আশা করা যায়।
ফরজ ও সুন্নতের পার্থক্য: একনজরে
ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বুঝলে নামাজ আদায় করা সহজ হয়। বাধ্যবাধকতা: ফরজ পড়া বাধ্যতামূলক এবং না পড়লে গুনাহ। ওয়াজিব পড়া জরুরি এবং না পড়লে গুনাহ তবে ফরজের চেয়ে কম। সুন্নতে মুয়াক্কাদা না পড়লে তিরস্কার কিন্তু গুনাহ নয়। সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা ও নফল সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। কাযা: ফরজ ও ওয়াজিব ছুটে গেলে কাযা করা আবশ্যক। সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছুটে গেলে কাযা মুস্তাহাব। সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা ও নফলের কাযা নেই। সওয়াব: সব নামাজেই সওয়াব আছে তবে ফরজের সওয়াব সবচেয়ে বেশি। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন ফরজের মাধ্যমে বান্দা আমার নৈকট্য লাভ করে এবং নফলের মাধ্যমে আরও নৈকট্য পায় (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)। অগ্রাধিকার: ফরজ সবার আগে, তারপর ওয়াজিব, তারপর সুন্নত এবং সবশেষে নফল। ঈমান: ফরজ না পড়লে ঈমান দুর্বল হয় কিন্তু সুন্নত-নফল না পড়লে ঈমানে প্রভাব পড়ে না তবে সওয়াব কম হয়।
প্রতিটি নামাজের গুরুত্ব ও বিধান জানলে আমরা সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে পারব এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারব।
উপসংহার
ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল নামাজের পার্থক্য জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। ফরজ নামাজ বাধ্যতামূলক এবং এটি ছাড়া ইসলাম পূর্ণ হয় না। ওয়াজিব নামাজ অবহেলা করা উচিত নয়। সুন্নত নামাজ পড়া ফজিলতপূর্ণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।
আসুন, আমরা সবাই পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ নিয়মিত পড়ি এবং কোনো অবস্থাতেই ছাড়ি না। বিতর নামাজ ওয়াজিব হিসেবে এশার পর নিয়মিত পড়ি। ফজরের ২ রাকাত, যোহরের ৪+২ রাকাত, মাগরিবের ২ রাকাত এবং এশার ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা ফরজের সাথে পড়ার চেষ্টা করি। সময় ও সামর্থ্য থাকলে সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা পড়ি যেমন আসরের আগে ৪ রাকাত। নফল নামাজের মধ্যে তাহাজ্জুদ, দুহা ও ইশরাক পড়ার চেষ্টা করি। মনে রাখি যে ফরজ নামাজ সবার আগে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ছোট থেকে ফরজ ও সুন্নত নামাজের পার্থক্য শেখাই এবং নিয়মিত পড়তে উৎসাহিত করি। পরিবারকে সবাই মিলে ফরজ ও সুন্নত নামাজ পড়তে উদ্বুদ্ধ করি। জামাতে নামাজ পড়ার চেষ্টা করি কারণ এতে সওয়াব ২৭ গুণ বেশি। ওয়াক্ত মতো নামাজ পড়ি এবং বিলম্ব করি না। নফল নামাজ যথাসম্ভব পড়ি কিন্তু ফরজকে অবহেলা করি না। মনে রাখি যে নামাজ আল্লাহর সাথে সংযোগের মাধ্যম এবং দুনিয়া-আখেরাতের সফলতার চাবিকাঠি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ফরজ নামাজ নিয়মিত পড়ার তৌফিক দান করুন এবং সুন্নত ও নফল নামাজ পড়ার সামর্থ্য দিন। আমাদের নামাজ কবুল করুন এবং জান্নাত দান করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ফরজ নামাজ কোনগুলো এবং কেন এগুলো বাধ্যতামূলক?
ফরজ নামাজ হলো সেই নামাজ যা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক এবং আল্লাহ তায়ালা কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে এটি নির্ধারণ করেছেন। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ - ফজর (২ রাকাত), যোহর (৪ রাকাত), আসর (৪ রাকাত), মাগরিব (৩ রাকাত) এবং এশা (৪ রাকাত)। মোট ১৭ রাকাত ফরজ নামাজ প্রতিদিন পড়তে হয়। এছাড়াও শুক্রবার পুরুষদের জন্য জুমার ২ রাকাত ফরজ নামাজ যোহরের পরিবর্তে পড়তে হয়। ফরজ নামাজ বাধ্যতামূলক কারণ এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং কালেমার পরেই এর স্থান। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারবার নামাজ কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন নামাজ দ্বীনের খুঁটি। ফরজ নামাজ না পড়লে গুনাহ হয় এবং আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ ছেড়ে দিলে ঈমান দুর্বল হয় এবং কেউ কেউ বলেন এটি কুফরির কাছাকাছি। ফরজ নামাজ যদি কোনো কারণে ছুটে যায় তাহলে তা পরে কাযা করা ফরজ এবং এতে অবহেলা করা যাবে না। ফরজ নামাজ ইসলামের ভিত্তি এবং এটি ছাড়া কোনো মুসলমানের ইবাদত পূর্ণ হয় না।
২. ওয়াজিব নামাজ কী এবং এটি ফরজ থেকে কীভাবে আলাদা?
ওয়াজিব নামাজ ফরজের পরেই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি পড়া অত্যন্ত জরুরি। ওয়াজিব অর্থ আবশ্যক যা ফরজের চেয়ে সামান্য কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তবুও পড়া প্রয়োজন। ওয়াজিব না পড়লে গুনাহ হয় তবে ফরজ না পড়ার মতো ততটা কঠিন নয়। এশার নামাজের পর ৩ রাকাত বিতর নামাজ ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহ বেজোড় এবং বেজোড় পছন্দ করেন তাই তোমরা বিতর পড়ো (সহিহ বুখারি: ৬৪১০, সহিহ মুসলিম: ২৬৭৭)। কেউ কেউ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাজকেও ওয়াজিব বলেন। ফরজ ও ওয়াজিবের মধ্যে পার্থক্য হলো ফরজ কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত এবং অস্বীকার করলে কাফের হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু ওয়াজিব হাদিস বা ইজমা থেকে প্রমাণিত এবং অস্বীকার করলে গুমরাহ হয়। ফরজ না পড়লে ঈমান হারানোর ভয় আছে কিন্তু ওয়াজিব না পড়লে শুধু গুনাহ হয়। হানাফি মাজহাবে বিতর ওয়াজিব কিন্তু অন্য মাজহাবে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে সবাই একমত যে বিতর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মিত পড়া উচিত। বিতর নামাজ যদি ছুটে যায় তাহলে পরে কাযা করা উচিত।
৩. সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও গায়রে মুয়াক্কাদার পার্থক্য কী?
সুন্নত নামাজ দুই প্রকার - সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা। সুন্নতে মুয়াক্কাদা হলো সেই নামাজ যা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত পড়তেন এবং খুব কমই ছাড়তেন এমনকি সফরেও পড়তেন। মুয়াক্কাদা অর্থ গুরুত্বপূর্ণ বা তাকিদপ্রাপ্ত। ফজরের ২ রাকাত সুন্নত, যোহরের আগে ৪ রাকাত ও পরে ২ রাকাত সুন্নত, মাগরিবের পর ২ রাকাত সুন্নত এবং এশার পর ২ রাকাত সুন্নত মুয়াক্কাদা। এই নামাজ না পড়লে গুনাহ হয় না কিন্তু তিরস্কার হয় এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা হলো সেই নামাজ যা রাসুলুল্লাহ (সা.) মাঝে মাঝে পড়তেন এবং মাঝে মাঝে ছাড়তেন। গায়রে মুয়াক্কাদা অর্থ কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু মুয়াক্কাদার চেয়ে কম জোরদার। যোহরের অতিরিক্ত ২ রাকাত, আসরের আগে ৪ রাকাত এবং এশার আগে ৪ রাকাত সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা। এই নামাজ পড়লে সওয়াব পাওয়া যায় কিন্তু না পড়লে কোনো তিরস্কার নেই। সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছুটে গেলে কাযা করা মুস্তাহাব কিন্তু গায়রে মুয়াক্কাদা ছুটে গেলে কাযা করার প্রয়োজন নেই।
৪. নফল নামাজ কী এবং এর কোন কোন প্রকার আছে?
নফল নামাজ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক এবং অতিরিক্ত সওয়াবের জন্য পড়া হয়। নফল অর্থ অতিরিক্ত যা ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নতের বাইরে স্বেচ্ছায় পড়া হয়। নফল না পড়লে কোনো তিরস্কার বা গুনাহ নেই কিন্তু পড়লে অসীম সওয়াব পাওয়া যায়। নফল নামাজের অনেক প্রকার আছে। তাহাজ্জুদ বা রাতের নফল নামাজ যা রাতের শেষভাগে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং আল্লাহ এই সময় দোয়া কবুল করেন। দুহা বা চাশতের নামাজ যা সূর্য উপরে উঠার পর সকালে পড়া হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন এটি প্রতিদিনের সদকার সমান (সহিহ মুসলিম: ৭২০)। ইশরাক নামাজ যা সূর্যোদয়ের পর পড়া হয়। আওয়াবিন নামাজ যা মাগরিব ও এশার মাঝে পড়া হয়। তাহিয়্যাতুল ওজু যা ওজুর পর পড়া হয়। তাহিয়্যাতুল মসজিদ যা মসজিদে প্রবেশের পর পড়া হয়। এছাড়াও সাধারণ নফল নামাজ যেকোনো সময় পড়া যায়। নফল নামাজের কোনো সীমা নেই এবং যত ইচ্ছা তত পড়া যায়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন ফরজের মাধ্যমে বান্দা আমার নৈকট্য লাভ করে এবং নফলের মাধ্যমে আরও নৈকট্য পায় (সহিহ বুখারি: ৬৫০২)।
৫. ফরজ ও সুন্নত নামাজের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন?
ফরজ নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি বাধ্যতামূলক। ফরজ না পড়লে গুনাহ হয় এবং আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। ফরজ নামাজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং এটি ছাড়া কোনো মুসলমানের ইবাদত পূর্ণ হয় না। ফরজ নামাজ পড়া প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের দায়িত্ব এবং এতে অবহেলা করা মারাত্মক গুনাহ। সুন্নত নামাজ ফরজের পরে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। সুন্নত না পড়লে গুনাহ হয় না তবে তিরস্কার হতে পারে এবং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। তবে সুন্নত নামাজও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত পড়তেন। সুন্নত নামাজ ফরজ নামাজের ঘাটতি পূরণ করে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। কিয়ামতের দিন প্রথমে ফরজ নামাজ দেখা হবে এবং যদি কোনো ঘাটতি থাকে তাহলে সুন্নত ও নফল দিয়ে পূরণ করা হবে। তাই ফরজ নামাজ সবার আগে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে। ফরজ নামাজ পড়ার পর সময় ও সামর্থ্য থাকলে সুন্নত পড়া উচিত। কখনোই সুন্নত পড়ার জন্য ফরজ ছাড়া যাবে না। অগ্রাধিকার হলো ফরজ প্রথম, তারপর ওয়াজিব, তারপর সুন্নতে মুয়াক্কাদা, তারপর সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা এবং সবশেষে নফল।
.jpeg)
