ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব | অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করা
ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব: অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করার মাধ্যম
ভূমিকা
বিবাহ ইসলামের একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত যা মানুষের জীবনকে পূর্ণতা দেয় এবং সমাজে শান্তি স্থাপন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি বিবাহ করল সে যেন তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করল, বাকি অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৫)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে বিবাহ শুধু সামাজিক প্রথা নয় বরং এটি ধর্মীয় দায়িত্ব এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। বিবাহ মানুষকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে রক্ষা করে, পরিবার গঠনে সাহায্য করে এবং নতুন প্রজন্মকে ইসলামি শিক্ষায় গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। কুরআন ও হাদিসে বিবাহের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে যা প্রতিটি মুসলমানের জানা উচিত। এই লেখায় আমরা ইসলামে বিবাহের গুরুত্ব, ফজিলত এবং এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বিবাহ: অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করার মাধ্যম
ইসলামে বিবাহকে অর্ধেক দ্বীন বলা হয়েছে এবং এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। হাদিসের বর্ণনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে ফেলে, বাকি অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে চলে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৫, সহিহ আল-জামি: ৬১৮)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে বিবাহ ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধির একটি মাধ্যম। কেন অর্ধেক দ্বীন: বিবাহ মানুষকে অসংখ্য পাপ থেকে রক্ষা করে যেমন ব্যভিচার, অবৈধ দৃষ্টি, নৈতিক অধঃপতন। বিবাহিত জীবনে মানুষ দায়িত্বশীল হয়, পরিবারের প্রতি যত্নবান হয় এবং সন্তান লালনপালনে ইসলামি মূল্যবোধ শেখায়। আত্মনিয়ন্ত্রণ: বিবাহ মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায় এবং প্রবৃত্তির বৈধ পথ দেখায়। যারা বিবাহ করে তারা হালাল পথে নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে পারে। আধ্যাত্মিক উন্নতি: বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সৎকাজে উৎসাহিত করে, নামাজ-রোজার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে। বাকি অর্ধেক: বাকি অর্ধেক দ্বীন হলো তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে চলা, ইবাদত করা এবং সৎকাজে লেগে থাকা।
বিবাহকে অর্ধেক দ্বীন বলা হয়েছে কারণ এটি জীবনের অনেক বড় অংশকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে।
কুরআনে বিবাহের নির্দেশনা
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বিবাহের গুরুত্ব এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। জোড়া সৃষ্টি: আল্লাহ বলেন যে তিনি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা চিন্তা করো (সূরা যারিয়াত: ৪৯)। মানুষও জোড়ায় সৃষ্ট অর্থাৎ নারী ও পুরুষ একে অপরের সঙ্গী। শান্তি ও স্বস্তি: আল্লাহ বলেন তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন (সূরা রূম: ২১)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো শান্তি, ভালোবাসা এবং দয়া। পোশাকের উপমা: আল্লাহ বলেন স্ত্রীরা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক (সূরা বাকারা: ১৮৭)। পোশাক যেমন মানুষকে আবৃত করে এবং সুন্দর করে তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ ঢেকে রাখে এবং জীবনকে সুন্দর করে। বিবাহের প্রচলন: আল্লাহ বলেন তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দাও (সূরা নূর: ৩২)। এটি বিবাহের প্রতি উৎসাহ এবং নির্দেশ। সন্তান লাভ: বিবাহের মাধ্যমে বৈধভাবে সন্তান লাভ করা যায় যা পরিবার ও সমাজের ভিত্তি।
কুরআনে বিবাহকে আল্লাহর নিদর্শন এবং মানুষের জন্য শান্তি ও ভালোবাসার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যা এর গুরুত্ব প্রমাণ করে।
হাদিসে বিবাহের ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) অসংখ্য হাদিসে বিবাহের ফজিলত এবং উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। সুন্নত আমল: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন বিবাহ আমার সুন্নত এবং যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয় (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০২৮)। এটি প্রমাণ করে যে বিবাহ করা নবীজির সুন্নত। চক্ষু অবনত রাখা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন হে যুবকেরা, তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে কারণ এটি দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)। বিবাহ মানুষকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে রক্ষা করে। সদকা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন স্বামী-স্ত্রীর মিলনও সদকা। সাহাবিরা বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ, কেউ তার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাবে? তিনি বললেন হ্যাঁ, যদি হারাম পথে করত তাহলে গুনাহ হতো তাই হালাল পথে করলে সওয়াব (সহিহ মুসলিম: ১০০৬)। রিজিকে বরকত: হাদিসে এসেছে যে বিবাহ করলে আল্লাহ রিজিকে বরকত দেন এবং প্রশস্ততা দান করেন।
হাদিসে বিবাহকে সুন্নত, পবিত্রতার মাধ্যম এবং সওয়াবের কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যা মুসলমানদের বিবাহে উৎসাহিত করে।
বিবাহ: পবিত্রতা ও চরিত্র রক্ষার মাধ্যম
বিবাহ মানুষকে নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করে এবং পবিত্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দৃষ্টি সংযত: বিবাহ মানুষকে অবৈধ দৃষ্টি থেকে বিরত রাখে কারণ হালাল সঙ্গী পাওয়া যায়। হাদিসে বলা হয়েছে বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)। ব্যভিচার থেকে রক্ষা: বিবাহ মানুষকে ব্যভিচার ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে রক্ষা করে। বৈধ পথে চাহিদা পূরণ হলে মানুষ পাপের দিকে যায় না। শয়তান থেকে বাঁচা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন বিবাহ শয়তানের প্রভাব কমায় এবং মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে। মানসিক শান্তি: বিবাহিত জীবনে মানুষ মানসিক শান্তি পায় এবং একাকীত্ব দূর হয়। সঙ্গী পাশে থাকলে জীবন সহজ হয়। পরিবার গঠন: বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় যা সমাজের ক্ষুদ্রতম ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। সুস্থ পরিবার মানে সুস্থ সমাজ। দায়িত্বশীলতা: বিবাহিত ব্যক্তি পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হয় এবং হালাল উপার্জনে উৎসাহিত হয়।
বিবাহ মানুষকে পবিত্র রাখে, চরিত্র রক্ষা করে এবং নৈতিক জীবনযাপনে সাহায্য করে যা ইসলামের মূল লক্ষ্য।
বিবাহ: সন্তান লালনপালন ও নতুন প্রজন্ম গঠন
বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বৈধভাবে সন্তান লাভ এবং তাদের ইসলামি শিক্ষা দেওয়া। বৈধ সন্তান: বিবাহের মাধ্যমে বৈধ সন্তান জন্ম নেয় যাদের পরিচয় স্পষ্ট এবং উত্তরাধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত। ইসলামি শিক্ষা: বিবাহিত দম্পতি সন্তানদের কুরআন-হাদিস শেখায় এবং ইসলামি মূল্যবোধে গড়ে তোলে। পরিবার হলো প্রথম মাদ্রাসা। নেক সন্তান: নেক সন্তান মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে এবং সদকায়ে জারিয়া হয় (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। উম্মাহর বৃদ্ধি: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা বিবাহ করো এবং সন্তান জন্ম দাও কারণ আমি কিয়ামতের দিন অন্য নবীদের উপর তোমাদের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করব (সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০)। সমাজের ভিত্তি: শিশুরা ভবিষ্যত সমাজ তাই তাদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি বিবাহিত পরিবারেই সম্ভব। মা-বাবার দায়িত্ব: ইসলামে মা-বাবার দায়িত্ব সন্তানদের দ্বীন শেখানো এবং সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
বিবাহের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তৈরি হয় এবং ইসলামি সমাজ শক্তিশালী হয় যা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য।
বিবাহে বিলম্ব না করা এবং সহজ করা
ইসলাম বিবাহে বিলম্ব না করতে এবং এটিকে সহজ করতে উৎসাহিত করে। যুবকদের উৎসাহ: রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন যাতে তারা পাপ থেকে বাঁচতে পারে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)। সহজীকরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সর্বোত্তম বিবাহ হলো যা সবচেয়ে সহজ (সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭, সহিহ আল-জামি: ৩৩০০)। অতিরিক্ত খরচ এবং জটিলতা পরিহার করা উচিত। যৌতুক নিষেধ: ইসলামে যৌতুক সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি সামাজিক ব্যাধি। বিবাহ সহজ করতে যৌতুক বন্ধ করা জরুরি। কম মোহরানা: অতিরিক্ত মোহরানা চাপ সৃষ্টি করে তাই সামর্থ্য অনুযায়ী কম মোহরানা ভালো। অপেক্ষা না করা: উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পেলে বিলম্ব না করে বিবাহ সম্পন্ন করা উচিত। দীর্ঘ এনগেজমেন্ট ইসলামসম্মত নয়। পরিবারের সহযোগিতা: পরিবারের উচিত সন্তানদের বিবাহে সহায়তা করা এবং অযথা বাধা না দেওয়া।
বিবাহ সহজ এবং দ্রুত সম্পন্ন করা ইসলামের শিক্ষা এবং এতে সমাজের কল্যাণ নিহিত।
উপসংহার
বিবাহ ইসলামের একটি পবিত্র সুন্নত এবং অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করার মাধ্যম। কুরআন ও হাদিসে বিবাহের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে এবং এটি মানুষের জীবনে শান্তি, পবিত্রতা এবং আল্লাহর নৈকট্য এনে দেয়।
আসুন, আমরা সবাই বিবাহের গুরুত্ব বুঝি এবং এই সুন্নত পালন করি। যুবকদের উপযুক্ত বয়সে বিবাহ করতে উৎসাহিত করি যাতে তারা পাপ থেকে বাঁচে এবং পবিত্র জীবনযাপন করে। বিবাহকে সহজ করি - অতিরিক্ত খরচ, জাঁকজমক এবং যৌতুক পরিহার করি। সামর্থ্য অনুযায়ী কম মোহরানা নির্ধারণ করি এবং সাদাসিধে অনুষ্ঠানে বিবাহ সম্পন্ন করি। উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পেলে বিলম্ব না করে বিবাহ দিই। মনে রাখি যে বিবাহ অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে এবং বাকি অর্ধেক তাকওয়া ও সৎকাজ। বিবাহিত জীবনে একে অপরের প্রতি দয়া, ভালোবাসা এবং সম্মান দেখাই। স্বামী-স্ত্রী মিলে নেক সন্তান লালনপালন করি এবং তাদের ইসলামি শিক্ষা দিই। বিবাহিত জীবনকে ইবাদতের ক্ষেত্র মনে করি এবং একে অপরকে সৎকাজে উৎসাহিত করি। পরিবারের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখি এবং আত্মীয়তা রক্ষা করি। অবিবাহিতদের বিবাহের ফজিলত জানাই এবং সহায়তা করি। মনে রাখি যে বিবাহ শুধু দুজনের মিলন নয় বরং দুটি পরিবারের বন্ধন এবং সমাজের শক্তি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুন্নত অনুযায়ী বিবাহ করার এবং সুখী দাম্পত্য জীবন যাপনের তৌফিক দান করুন। আমাদের সন্তানদের নেক বানান এবং পরিবারে বরকত দিন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. বিবাহকে অর্ধেক দ্বীন বলা হয় কেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে ফেলে, বাকি অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে চলে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৫, সহিহ আল-জামি: ৬১৮)। বিবাহকে অর্ধেক দ্বীন বলার কারণ হলো এটি মানুষকে অসংখ্য পাপ থেকে রক্ষা করে যেমন ব্যভিচার, অবৈধ দৃষ্টি, নৈতিক অধঃপতন এবং অবৈধ সম্পর্ক। বিবাহিত জীবনে মানুষ দায়িত্বশীল হয়, পরিবারের প্রতি যত্নবান হয় এবং সন্তান লালনপালনে ইসলামি মূল্যবোধ শেখায়। বিবাহ মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায় এবং প্রবৃত্তির বৈধ পথ দেখায়। যারা বিবাহ করে তারা হালাল পথে নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকে। বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সৎকাজে উৎসাহিত করে, নামাজ-রোজার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে। বাকি অর্ধেক দ্বীন হলো তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে চলা, ইবাদত করা এবং সৎকাজে লেগে থাকা। তাই বিবাহকে অর্ধেক দ্বীন বলা হয়েছে কারণ এটি জীবনের অনেক বড় অংশকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে।
২. কুরআন ও হাদিসে বিবাহের কী কী ফজিলত বর্ণিত আছে?
কুরআন ও হাদিসে বিবাহের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন (সূরা রূম: ২১)। এটি প্রমাণ করে যে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো শান্তি, ভালোবাসা এবং দয়া লাভ করা। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন বিবাহ আমার সুন্নত এবং যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয় (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৪০২৮)। বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)। স্বামী-স্ত্রীর মিলনও সদকা এবং এতে সওয়াব হয় (সহিহ মুসলিম: ১০০৬)। বিবাহ করলে আল্লাহ রিজিকে বরকত দেন এবং প্রশস্ততা দান করেন। বিবাহ মানুষকে পবিত্র রাখে এবং ব্যভিচার থেকে রক্ষা করে। নেক সন্তান লাভ হয় যারা মৃত্যুর পরও দোয়া করে (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। এই ফজিলতগুলো প্রমাণ করে যে বিবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।
৩. বিবাহ কীভাবে মানুষকে পাপ থেকে রক্ষা করে?
বিবাহ মানুষকে অনেক ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করে এবং পবিত্র জীবনযাপনে সাহায্য করে। প্রথমত, বিবাহ অবৈধ দৃষ্টি থেকে বিরত রাখে কারণ হালাল সঙ্গী পাওয়া যায় এবং হাদিসে বলা হয়েছে বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)। দ্বিতীয়ত, বিবাহ ব্যভিচার ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে রক্ষা করে কারণ বৈধ পথে চাহিদা পূরণ হলে মানুষ পাপের দিকে যায় না। তৃতীয়ত, বিবাহ শয়তানের প্রভাব কমায় এবং মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে। চতুর্থত, বিবাহিত জীবনে মানুষ মানসিক শান্তি পায় এবং একাকীত্ব দূর হয় যা অনেক সময় পাপের কারণ হয়। পঞ্চমত, বিবাহিত ব্যক্তি পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হয় এবং হালাল উপার্জনে উৎসাহিত হয় যা তাকে হারাম পথ থেকে দূরে রাখে। ষষ্ঠত, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সৎকাজে উৎসাহিত করে এবং পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। সপ্তমত, বিবাহের মাধ্যমে প্রবৃত্তির বৈধ পথ পাওয়া যায় এবং হারাম পথে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এভাবে বিবাহ মানুষকে পবিত্র রাখে এবং নৈতিক জীবনযাপনে সাহায্য করে যা ইসলামের মূল লক্ষ্য।
৪. ইসলামে বিবাহ সহজ করার গুরুত্ব কী এবং কীভাবে সহজ করা যায়?
ইসলাম বিবাহকে সহজ করতে উৎসাহিত করে এবং জটিলতা পরিহার করতে বলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সর্বোত্তম বিবাহ হলো যা সবচেয়ে সহজ (সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭, সহিহ আল-জামি: ৩৩০০)। বিবাহ সহজ করার কারণ হলো যাতে বেশি মানুষ বিবাহ করতে পারে এবং সমাজে অবৈধ সম্পর্ক কমে। বিবাহ সহজ করার উপায় হলো প্রথমত, অতিরিক্ত খরচ এবং জাঁকজমক পরিহার করা এবং সাদাসিধে অনুষ্ঠান করা। দ্বিতীয়ত, যৌতুক সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা কারণ এটি ইসলামে হারাম এবং সামাজিক ব্যাধি যা বিবাহে বাধা সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, সামর্থ্য অনুযায়ী কম মোহরানা নির্ধারণ করা যাতে ছেলের পরিবারে চাপ না পড়ে। চতুর্থত, উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পেলে বিলম্ব না করে দ্রুত বিবাহ সম্পন্ন করা এবং দীর্ঘ এনগেজমেন্ট পরিহার করা। পঞ্চমত, পরিবারের উচিত সন্তানদের বিবাহে সহায়তা করা এবং অযথা বাধা না দেওয়া। ষষ্ঠত, সমাজে বিবাহ সহজীকরণের সচেতনতা তৈরি করা এবং প্রথা ভাঙা। এভাবে বিবাহ সহজ করলে বেশি মানুষ বিবাহ করতে পারবে এবং সমাজে নৈতিকতা বৃদ্ধি পাবে।
৫. বিবাহের মাধ্যমে কীভাবে নতুন প্রজন্ম গঠন এবং ইসলামি সমাজ শক্তিশালী হয়?
বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বৈধভাবে সন্তান লাভ এবং তাদের ইসলামি শিক্ষায় গড়ে তোলা। প্রথমত, বিবাহের মাধ্যমে বৈধ সন্তান জন্ম নেয় যাদের পরিচয় স্পষ্ট এবং উত্তরাধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত হয় যা ইসলামি আইনে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, বিবাহিত দম্পতি সন্তানদের কুরআন-হাদিস শেখায় এবং ইসলামি মূল্যবোধে গড়ে তোলে কারণ পরিবার হলো প্রথম মাদ্রাসা যেখানে শিশুরা ইসলাম শেখে। তৃতীয়ত, নেক সন্তান মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে এবং সদকায়ে জারিয়া হয় (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। চতুর্থত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমরা বিবাহ করো এবং সন্তান জন্ম দাও কারণ আমি কিয়ামতের দিন অন্য নবীদের উপর তোমাদের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করব (সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০) যা উম্মাহর বৃদ্ধির গুরুত্ব প্রমাণ করে। পঞ্চমত, শিশুরা ভবিষ্যত সমাজ তাই তাদের সঠিক ইসলামি শিক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি বিবাহিত পরিবারেই সম্ভব যেখানে মা-বাবা উভয়ে মিলে দায়িত্ব নেয়। এভাবে বিবাহের মাধ্যমে নতুন মুসলিম প্রজন্ম তৈরি হয় এবং ইসলামি সমাজ শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয় যা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এবং উম্মাহর কল্যাণ।
