আরাফার দিনের রোজা: ফজিলত ও নিয়ত পূর্ণ গাইড
আরাফার দিনের রোজা: ফজিলত ও নিয়তের সম্পূর্ণ গাইড
ভূমিকা
জিলহজ মাসের নবম দিন অর্থাৎ আরাফার দিন ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ দিন। হাজীদের জন্য এই দিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আর যারা হজে যাননি তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা অসাধারণ সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে আরাফার দিনের রোজা বিগত এক বছর এবং আগত এক বছরের পাপ মোচনের কারণ হয় বলে আশা করা যায় (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)। এই একটি দিনের রোজায় দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা হওয়ার সম্ভাবনা ইসলামের অপার দয়া ও করুণার প্রমাণ। তবে এই রোজার সঠিক নিয়ত এবং ফজিলত সম্পর্কে জানা জরুরি। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আরাফার দিনের রোজার ফজিলত, নিয়তের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করব।
আরাফার দিন কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
আরাফার দিন ইসলামি ক্যালেন্ডারের অন্যতম পবিত্র দিন এবং এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সময়: আরাফার দিন হলো জিলহজ মাসের নবম দিন যা হজের প্রধান দিন। এই দিনে হাজীরা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। হজের রুকন: আরাফাতে অবস্থান (উকুফ) হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন হজ হলো আরাফা অর্থাৎ আরাফাতে অবস্থান করাই মূল হজ (সুনানে তিরমিজি: ৮৮৯)। দোয়া কবুলের দিন: এই দিনে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আরাফার দিনের দোয়ার চেয়ে উত্তম দোয়া আর নেই (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৮৫)। ঈদের আগের দিন: পরের দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ ঈদুল আযহা পালিত হয় যা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান উৎসব। ক্ষমা ও মুক্তির দিন: এই দিনে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং তাদের পাপ ক্ষমা করেন (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮)। ইসলামের পূর্ণতা: এই দিনেই কুরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল যেখানে আল্লাহ বলেন আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণ করলাম (সূরা মায়িদা: ৩)।
আরাফার দিনের এই বিশেষ মর্যাদা এবং ফজিলত প্রতিটি মুসলমানের জানা উচিত এবং এই দিনকে ইবাদতে কাজে লাগানো উচিত।
আরাফার দিনে রোজা রাখার ফজিলত
আরাফার দিনে রোজা রাখার ফজিলত অসাধারণ এবং হাদিসে এর বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। দুই বছরের পাপ মোচন: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে তিনি বিগত এক বছর এবং আগত এক বছরের (সগীরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)। এর অর্থ একটি রোজায় দুই বছরের ছোট পাপগুলো ক্ষমা হওয়ার সম্ভাবনা। সর্বোত্তম দিনের রোজা: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বছরের সর্বোত্তম দিন এবং আরাফার দিন এর মধ্যে অন্যতম। এই দিনে রোজা রাখা বিশেষ সওয়াবের কাজ। নফল রোজার মধ্যে শ্রেষ্ঠ: বছরের অন্যান্য নফল রোজার তুলনায় আরাফার দিনের রোজার ফজিলত বেশি বলে আশা করা যায়। আল্লাহর নৈকট্য: এই রোজা আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বিশেষ মাধ্যম এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। হাজীদের জন্য নয়: তবে মনে রাখতে হবে যে যারা হজে আরাফাতের ময়দানে আছেন তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা সুন্নত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি এবং হাজীদের জন্য না রাখাই উত্তম যাতে দোয়া ও ইবাদতে শক্তি থাকে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য: যারা হজে যাননি তাদের সবার জন্য এই রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে।
এই অসাধারণ ফজিলত দেখে প্রতিটি মুসলমানের চেষ্টা করা উচিত আরাফার দিনে রোজা রাখার এবং এই সুযোগ হাতছাড়া না করার।
আরাফার রোজার নিয়ত: কীভাবে করবেন
আরাফার দিনের রোজার নিয়ত করা সহজ এবং জটিল কোনো পদ্ধতি নেই। নিয়তের স্থান: নিয়ত হৃদয়ে করতে হয় এবং মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে মুখে বললে কোনো সমস্যা নেই এবং অনেকে এভাবেই করেন। নিয়তের সময়: রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগে অর্থাৎ সেহরির সময় করা উত্তম। রাতে ঘুমানোর আগেও নিয়ত করা যায়। বাংলায় নিয়ত: "আমি আগামীকাল জিলহজ মাসের নবম তারিখে আরাফার দিনের নফল রোজা রাখার নিয়ত করছি" - এভাবে মনে মনে বা মুখে বললেই যথেষ্ট। আরবিতে নিয়ত: "নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি জিলহিজ্জাহ সুন্নাতান লিল্লাহি তায়ালা" - তবে এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং বাংলায় বললেও হয়। সহজ পদ্ধতি: আসলে নিয়ত হলো রোজা রাখার ইচ্ছা করা এবং মনে মনে ঠিক করা। জটিল কোনো আরবি বাক্য মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। সেহরি খাওয়া: সেহরি খেয়ে রোজা রাখাই নিয়তের প্রমাণ। সেহরি খাওয়া নিজেই একটি নিয়ত বলে বিবেচিত হয়। আন্তরিকতা: নিয়তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখা।
নিয়ত করার ক্ষেত্রে সহজ এবং সরল পদ্ধতি অনুসরণ করলেই যথেষ্ট এবং জটিলতায় না যাওয়া উচিত।
আরাফার দিনে যা করা উচিত
আরাফার দিনে রোজা ছাড়াও আরও কিছু ইবাদত এবং আমল করা উচিত যা ফজিলতপূর্ণ। তাকবির পড়া: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বিশেষভাবে তাকবির (আল্লাহু আকবর), তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পড়া উৎসাহিত করা হয়েছে। কুরআন তিলাওয়াত: বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে পড়া। দোয়া করা: আরাফার দিনে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয় তাই প্রচুর দোয়া করা উচিত। নিজের, পরিবারের এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। তওবা-ইস্তিগফার: এই দিনে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ক্ষমা চাওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। সকল পাপ থেকে তওবা করুন এবং আল্লাহর রহমত চান। নফল নামাজ: যথাসম্ভব নফল নামাজ পড়া বিশেষত সালাতুত তাসবিহ। সদকা করা: এই দিনে সদকা করা বিশেষ সওয়াবের কাজ। গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করুন। পরিবার নিয়ে ইবাদত: পরিবারের সবাই একসাথে ইবাদত করলে উৎসাহ বাড়ে এবং বরকত বেশি হয়।
আরাফার দিন শুধু রোজা নয় বরং বিভিন্ন ইবাদতে কাটানো উচিত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।
কাদের জন্য আরাফার রোজা এবং কারা রাখবে না
আরাফার রোজা সবার জন্য নয় এবং কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যারা রাখবে: যারা হজে যাননি এবং ঘরে আছেন তাদের সবার জন্য এই রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য এই সুযোগ। হাজীরা রাখবে না: যারা হজে আরাফাতের ময়দানে আছেন তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা সুন্নত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি (সহিহ বুখারি: ১৬৫৮, ১৯৮৮)। হাজীদের জন্য না রাখাই উত্তম যাতে দোয়া ও ইবাদতে শক্তি থাকে। অসুস্থ ব্যক্তি: যদি কেউ অসুস্থ হন এবং রোজা রাখলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় তাহলে না রাখাই উত্তম। ইসলাম কষ্ট চায় না। মুসাফির: সফররত ব্যক্তি চাইলে না রাখতে পারেন তবে এটি নফল রোজা তাই চেষ্টা করা উচিত। মহিলাদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক বা প্রসবকালীন অবস্থায় মহিলারা রোজা রাখতে পারবেন না। এটি শরীয়তের বিধান। শিশুরা: ছোট শিশুদের উপর রোজা ফরজ নয় তবে অভ্যাস করানোর জন্য উৎসাহিত করা যায়।
আরাফার রোজা নফল তাই কারো উপর বাধ্যতামূলক নয় কিন্তু যারা পারবেন তাদের অবশ্যই রাখা উচিত এই মহান ফজিলত লাভ করার জন্য।
আরাফার রোজা ভেঙে গেলে কী করবেন
নফল রোজা হওয়ায় আরাফার রোজা ভেঙে গেলে কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে। ভুলে খেলে: যদি কেউ ভুলে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলে তাহলে রোজা ভাঙবে না। হাদিস অনুযায়ী ভুলে খাওয়া-পান করলে আল্লাহ খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন তাই রোজা চালিয়ে যেতে হবে (সহিহ বুখারি: ১৯৩৩)। ইচ্ছাকৃতভাবে: যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেলা হয় তাহলে সেই দিনের রোজা বাতিল হবে এবং ফজিলত পাওয়া যাবে না। কাজা করা: নফল রোজা ভেঙে গেলে কাজা করা ওয়াজিব নয় তবে মুস্তাহাব। যদি সম্ভব হয় তাহলে অন্য কোনো দিন একটি নফল রোজা রেখে নেওয়া উত্তম। তওবা: ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙলে আল্লাহর কাছে তওবা করা উচিত এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা উচিত। পরের বছর: যদি এই বছর রোজা ভেঙে যায় বা রাখতে না পারেন তাহলে হতাশ না হয়ে পরের বছর রাখার সংকল্প করুন। অন্য আমল: রোজা ভেঙে গেলে অন্যান্য ইবাদতে মনোযোগ দিন যেমন দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, সদকা।
নফল রোজা হওয়ায় এতে কোনো কঠিন কাফফারা নেই তবে সতর্ক থাকা এবং রোজা পূর্ণ করার চেষ্টা করা উচিত।
উপসংহার
আরাফার দিনের রোজা আল্লাহর এক বিশেষ রহমত এবং দুই বছরের পাপ মোচনের সুযোগ। এই একটি দিনের রোজায় যে ফজিলত পাওয়া যায় তা অসাধারণ এবং প্রতিটি মুসলমানের এই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
আসুন, আমরা সবাই আরাফার দিনে রোজা রাখার প্রস্তুতি নিই। জিলহজ মাসের ৯ তারিখে এই বিশেষ রোজা রাখি যা বিগত এবং আগত এক বছরের পাপ মোচনের কারণ হয় বলে আশা করা যায়। সঠিক নিয়ত করি - হৃদয়ে বা মুখে বাংলায় বললেই যথেষ্ট। সেহরি খেয়ে রোজা রাখি এবং সারাদিন ইবাদতে কাটাই। বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ এবং তাহলিল পড়ি। কুরআন তিলাওয়াত করি এবং অর্থ বুঝে পড়ি। প্রচুর দোয়া করি নিজের, পরিবারের এবং উম্মাহর জন্য। তওবা-ইস্তিগফার করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। নফল নামাজ পড়ি এবং সদকা করি। পরিবারকে একসাথে ইবাদতে উৎসাহিত করি। মনে রাখি যে হাজীরা এই দিনে রোজা রাখবেন না কিন্তু যারা ঘরে আছি আমরা রাখব। অসুস্থ হলে বা বিশেষ অবস্থায় না রাখাই উত্তম - ইসলাম কষ্ট চায় না। ভুলে খেলে রোজা চালিয়ে যাই এবং ইচ্ছাকৃত ভাঙলে তওবা করি। রোজা ভেঙে গেলে হতাশ না হয়ে অন্য ইবাদতে মনোযোগ দিই। পরিবার ও বন্ধুদের আরাফার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জানাই যাতে সবাই এই সুযোগ পায়। এই দিনে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয় তাই হাত তুলে আল্লাহর কাছে চাই যা চাই। মনে রাখি এই একটি রোজায় দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা হওয়ার সম্ভাবনা - এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আরাফার দিনে রোজা রাখার তৌফিক দান করুন এবং এর পূর্ণ ফজিলত দান করুন। আমাদের পাপ ক্ষমা করুন এবং জান্নাত দান করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. আরাফার দিনের রোজার ফজিলত কী এবং কত বছরের পাপ মাফ হয়?
আরাফার দিনের রোজার ফজিলত অসাধারণ এবং হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে তিনি বিগত এক বছর এবং আগত এক বছরের (সগীরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)। এর অর্থ একটি রোজায় মোট দুই বছরের ছোট পাপগুলো ক্ষমা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা করা যায়। জিলহজ মাসের নবম দিন অর্থাৎ আরাফার দিন বছরের সর্বোত্তম দিনগুলোর একটি এবং এই দিনে রোজা রাখা বিশেষ সওয়াবের কাজ। তবে এই ফজিলত শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা হজে যাননি এবং ঘরে আছেন। হাজীদের জন্য আরাফার দিনে রোজা রাখা সুন্নত নয় কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি। নফল রোজার মধ্যে আরাফার রোজা অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি বিশেষ মাধ্যম। এই দিনে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং তাদের পাপ ক্ষমা করেন। তাই প্রতিটি মুসলমানের চেষ্টা করা উচিত এই দিনে রোজা রাখার এবং এই মহান ফজিলত লাভ করার।
২. আরাফার রোজার নিয়ত কীভাবে করতে হয় এবং কখন করতে হয়?
আরাফার দিনের রোজার নিয়ত করা অত্যন্ত সহজ এবং জটিল কোনো পদ্ধতি নেই। নিয়ত হৃদয়ে করতে হয় এবং মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয় তবে মুখে বললে কোনো সমস্যা নেই। রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগে অর্থাৎ সেহরির সময় করা উত্তম এবং রাতে ঘুমানোর আগেও করা যায়। বাংলায় নিয়ত: "আমি আগামীকাল জিলহজ মাসের নবম তারিখে আরাফার দিনের নফল রোজা রাখার নিয়ত করছি" - এভাবে মনে মনে বা মুখে বললেই যথেষ্ট। আরবিতে: "নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি জিলহিজ্জাহ সুন্নাতান লিল্লাহি তায়ালা" তবে এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং বাংলায় বললেও সম্পূর্ণ বৈধ। আসলে নিয়ত হলো রোজা রাখার ইচ্ছা করা এবং মনে মনে ঠিক করা। জটিল কোনো আরবি বাক্য মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। সেহরি খেয়ে রোজা রাখাই নিয়তের প্রমাণ এবং সেহরি খাওয়া নিজেই একটি নিয়ত বলে বিবেচিত হয়। নিয়তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তরিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখা। সহজ এবং সরল পদ্ধতি অনুসরণ করলেই যথেষ্ট এবং জটিলতায় না যাওয়াই উত্তম।
৩. হাজীরা কি আরাফার দিনে রোজা রাখবে এবং কেন?
যারা হজে আরাফাতের ময়দানে আছেন তাদের জন্য আরাফার দিনে রোজা রাখা সুন্নত নয় এবং না রাখাই উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার দিনে রোজা রাখেননি যখন তিনি হজে ছিলেন (সহিহ বুখারি: ১৬৫৮, ১৯৮৮)। হাজীদের জন্য না রাখার কারণ হলো যাতে তারা দোয়া ও ইবাদতে পূর্ণ শক্তি পান এবং আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে সক্ষম হন। আরাফার দিন হাজীদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনার দিন এবং রোজা রাখলে দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে যারা হজে যাননি এবং সারা বিশ্বে ঘরে আছেন তাদের সবার জন্য এই দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে যে দুই বছরের পাপ মোচনের কথা বলা হয়েছে তা মূলত অ-হাজীদের জন্য যারা ঘরে এই রোজা রাখবেন। হাজীরা আরাফাতে উকুফ এবং দোয়ায় মনোনিবেশ করবেন এবং তাদের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় ইবাদত। তাই হাজীদের জন্য রোজা না রাখা এবং অন্যদের জন্য রাখা - এই হলো সহিহ বিধান।
৪. আরাফার দিনে রোজা ছাড়া আর কী কী আমল করা উচিত?
আরাফার দিনে রোজা ছাড়াও আরও অনেক ফজিলতপূর্ণ আমল রয়েছে যা করা উচিত। প্রথমত, তাকবির (আল্লাহু আকবর), তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বেশি বেশি পড়া কারণ জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন এই জিকিরের বিশেষ সময়। দ্বিতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে পড়া যাতে হৃদয়ে প্রভাব পড়ে। তৃতীয়ত, প্রচুর দোয়া করা কারণ আরাফার দিনে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয় (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৮৫) - নিজের, পরিবারের এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। চতুর্থত, তওবা-ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহর কাছে সকল পাপ থেকে ক্ষমা চাওয়া। পঞ্চমত, নফল নামাজ পড়া বিশেষত সালাতুত তাসবিহ যদি সম্ভব হয়। ষষ্ঠত, সদকা করা এবং গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা। সপ্তমত, পরিবারের সবাই একসাথে ইবাদত করা যাতে উৎসাহ বাড়ে এবং বরকত বেশি হয়। আরাফার দিন শুধু রোজা নয় বরং বিভিন্ন ইবাদতে কাটানো উচিত এবং এই বিশেষ দিনকে পূর্ণভাবে কাজে লাগানো উচিত।
৫. আরাফার রোজা ভুলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে গেলে কী করতে হবে?
নফল রোজা হওয়ায় আরাফার রোজা ভেঙে গেলে কিছু বিশেষ বিধান রয়েছে। যদি কেউ ভুলে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলে তাহলে রোজা ভাঙবে না এবং হাদিস অনুযায়ী ভুলে খাওয়া-পান করলে আল্লাহ খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন তাই রোজা চালিয়ে যেতে হবে (সহিহ বুখারি: ১৯৩৩)। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেলা হয় তাহলে সেই দিনের রোজা বাতিল হবে এবং ফজিলত পাওয়া যাবে না তবে নফল রোজা ভেঙে গেলে কাজা করা ওয়াজিব নয় শুধু মুস্তাহাব। যদি সম্ভব হয় তাহলে অন্য কোনো দিন একটি নফল রোজা রেখে নেওয়া উত্তম। ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙলে আল্লাহর কাছে তওবা করা উচিত এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা উচিত। যদি এই বছর রোজা ভেঙে যায় বা রাখতে না পারেন তাহলে হতাশ না হয়ে পরের বছর রাখার দৃঢ় সংকল্প করুন। রোজা ভেঙে গেলে অন্যান্য ইবাদতে মনোযোগ দিন যেমন দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত, সদকা এবং তাকবির পাঠ। নফল রোজা হওয়ায় এতে কোনো কঠিন কাফফারা নেই তবে সতর্ক থাকা এবং রোজা পূর্ণ করার চেষ্টা করা উচিত।
