হালাল ভাবে পশু জবাই করার পদ্ধতি | শরীয়তসম্মত নিয়ম
হালাল জবাই পদ্ধতি: শরীয়তসম্মত নিয়ম ও বিধান
ভূমিকা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যেখানে খাদ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। হালাল মাংস খাওয়ার জন্য শুধু প্রাণী হালাল হলেই চলে না বরং সঠিক শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে জবাই করা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন যে তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি এমন কিছু খেয়ো না (সূরা আনআম: ১২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি শিখিয়েছেন এবং প্রাণীর প্রতি দয়া ও করুণা দেখাতে উৎসাহিত করেছেন। জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ পড়া, ধারালো ছুরি ব্যবহার করা এবং রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করে দেওয়া - এই তিনটি মূল শর্ত রয়েছে যা মেনে চললে মাংস হালাল হয় বলে আশা করা যায়। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে হালাল জবাইয়ের সম্পূর্ণ পদ্ধতি, শর্তাবলী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান সঠিকভাবে এই বিধান পালন করতে পারেন।
জবাইয়ের শরয়ী সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
ইসলামি শরিয়তে জবাই হলো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রাণী হত্যা করার একটি বৈধ উপায়। সংজ্ঞা: জবাই অর্থ হলো আল্লাহর নাম নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রাণীর গলার নির্দিষ্ট স্থান কেটে রক্ত প্রবাহিত করা যাতে প্রাণী মারা যায় এবং মাংস হালাল হয়। কুরআনের বিধান: আল্লাহ তায়ালা বলেন যে তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী এবং যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি (সূরা মায়িদা: ৩)। এর অর্থ সঠিকভাবে জবাই করা প্রাণীই হালাল। গুরুত্ব: হালাল মাংস খাওয়া আমাদের ইবাদত কবুল হওয়ার একটি শর্ত। হাদিসে এসেছে যে হারাম খাদ্য গ্রহণকারীর দোয়া কবুল হয় না (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)। দয়া ও করুণা: ইসলাম জবাইয়ের মাধ্যমে প্রাণীর প্রতি দয়া প্রকাশ করতে শেখায়। দ্রুত এবং কম কষ্টে প্রাণী মারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পবিত্রতা: সঠিক জবাই মাংসকে পবিত্র করে এবং রক্ত বের করে দেয় যা স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। সামাজিক দায়িত্ব: জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি জানা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব কারণ এটি আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের সাথে সম্পর্কিত।
জবাইয়ের শরয়ী পদ্ধতি মেনে চলা আমাদের ঈমানের দাবি এবং এটি নিশ্চিত করে যে আমরা হালাল খাবার গ্রহণ করছি।
বিসমিল্লাহ পড়া: জবাইয়ের প্রথম শর্ত
জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া অপরিহার্য এবং এটি ছাড়া জবাই বৈধ হয় না। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন যে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে এমন খাবার খাও (সূরা আনআম: ১১৮) এবং যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি তা খেয়ো না (সূরা আনআম: ১২১)। উচ্চারণ: জবাইয়ের সময় "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর" বলা সুন্নত। শুধু "বিসমিল্লাহ" বললেও যথেষ্ট তবে আল্লাহু আকবর যোগ করা উত্তম। ভুলে গেলে: যদি কেউ ভুলে বিসমিল্লাহ না পড়ে তাহলে সেই মাংস হালাল কারণ ভুল ক্ষমাযোগ্য। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লে হারাম (সুনানে আবু দাউদ: ২৮১৪)। জোরে পড়া: বিসমিল্লাহ এমনভাবে পড়তে হবে যাতে নিজে শুনতে পাই। খুব জোরে বলার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি প্রাণীর জন্য: একসাথে অনেক প্রাণী জবাই করলেও প্রতিটির জন্য আলাদা বিসমিল্লাহ পড়া উচিত। মুসলমানের দায়িত্ব: শুধু মুসলমানই বিসমিল্লাহ বলে জবাই করতে পারে। অমুসলিমের জবাই সাধারণত হালাল নয় তবে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জবাই নিয়ে বিশেষ বিধান আছে (সূরা মায়িদা: ৫)।
বিসমিল্লাহ না পড়ে জবাই করলে মাংস হালাল হয় না এবং এটি জবাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যা কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যায় না।
ধারালো ছুরি ব্যবহার: প্রাণীর প্রতি দয়া
জবাইয়ের সময় ধারালো ছুরি বা অস্ত্র ব্যবহার করা শরীয়তের নির্দেশ এবং প্রাণীর প্রতি দয়ার অংশ। হাদিসের নির্দেশ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা ফরজ করেছেন। যখন তোমরা জবাই করো তখন উত্তম পন্থায় জবাই করো এবং ছুরি ধার করে নাও যাতে প্রাণী আরাম পায় (সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫)। ধারালো হওয়ার কারণ: ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবাই হয় এবং প্রাণী কম কষ্ট পায়। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করলে প্রাণী বেশি যন্ত্রণা পায় যা নিষিদ্ধ। ছুরির প্রকার: লোহা, ইস্পাত বা ধাতব যেকোনো ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা যায়। বাঁশ বা পাথরের ধারালো অংশও ব্যবহার করা যেতে পারে তবে হাড় বা দাঁত দিয়ে জবাই করা নিষেধ (সহিহ বুখারি: ৫৫০৩)। প্রস্তুতি: জবাইয়ের আগেই ছুরি ভালোভাবে ধার করে নিতে হবে। প্রাণীর সামনে ছুরি ধার করা নিষেধ কারণ এতে প্রাণী ভয় পায়। প্রাণীকে আরাম দেওয়া: জবাইয়ের আগে প্রাণীকে পানি পান করানো এবং সান্ত্বনা দেওয়া সুন্নত। একবারে কাটা: একবারে দ্রুত কেটে ফেলা উচিত যাতে কষ্ট কম হয়। বারবার চেষ্টা করা অনুচিত।
ধারালো ছুরি ব্যবহার করা শুধু শরীয়তের নির্দেশ নয় বরং প্রাণীর প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম।
জবাইয়ের স্থান: গলার নির্দিষ্ট অংশ
জবাইয়ের সময় গলার নির্দিষ্ট স্থানে কাটতে হবে এবং নির্দিষ্ট অংশ কাটা আবশ্যক। কাটার স্থান: গলার সামনের দিকে অর্থাৎ গলনালি ও খাদ্যনালীর মাঝামাঝি জায়গায় কাটতে হবে। মাথা এবং শরীরের মাঝখানে যেখানে নরম অংশ সেখানে কাটা উচিত। চারটি রগ: ইসলামি পদ্ধতিতে চারটি প্রধান রগ কাটতে হয় - দুটি খাদ্যনালী (হুলকুম), দুটি রক্তনালী (ওয়াদাজান)। এই চারটি কাটা হলে জবাই সহিহ হয়। ন্যূনতম শর্ত: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ন্যূনতম তিনটি রগ কাটলেও জবাই হয়ে যায় তবে চারটিই কাটা উত্তম। অন্য মাজহাবে দুটি রক্তনালী এবং খাদ্যনালী বা গলনালী যেকোনো একটি কাটলে যথেষ্ট। মাথা আলাদা না করা: জবাইয়ের সময় মাথা সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা মাকরুহ। শুধু রগগুলো কেটে রক্ত বের হতে দেওয়া উচিত। মাথা রেখে জবাই করা সুন্নত। মেরুদণ্ড কাটা: মেরুদণ্ড কাটা নিষেধ কারণ এতে প্রাণী অতিরিক্ত কষ্ট পায়। শুধু গলার নরম অংশ কাটতে হবে।
সঠিক স্থানে সঠিকভাবে কাটা জবাই হালাল হওয়ার জন্য অপরিহার্য এবং এই নিয়ম মেনে চললে প্রাণীও কম কষ্ট পায়।
রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করে দেওয়া
জবাইয়ের পর রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ রক্ত হারাম। রক্ত হারাম: কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে প্রবাহিত রক্ত হারাম (সূরা আনআম: ১৪৫)। তাই জবাই করা প্রাণীর রক্ত যতটা সম্ভব বের করে ফেলতে হবে। রক্ত বের হওয়া: সঠিকভাবে জবাই করলে রক্তনালী কাটা হয় এবং হৃদপিণ্ড থাকা পর্যন্ত রক্ত পাম্প হয়ে বের হতে থাকে। এজন্য প্রাণী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। প্রাণী উল্টানো: জবাইয়ের পর প্রাণীকে একপাশে শুইয়ে রাখলে রক্ত ভালোভাবে বের হয়। কিছু সময় অপেক্ষা করা উচিত যাতে সম্পূর্ণ রক্ত বের হয়ে যায়। চামড়া ছাড়ানো: প্রাণী সম্পূর্ণ মারা যাওয়ার এবং নড়াচড়া বন্ধ হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা কাটাকাটি শুরু করা নিষেধ। এতে প্রাণী কষ্ট পায়। স্বাস্থ্যগত কারণ: রক্তে বিষাক্ত পদার্থ এবং জীবাণু থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রক্ত বের করলে মাংস পরিষ্কার এবং স্বাস্থ্যসম্মত হয়। অবশিষ্ট রক্ত: জবাই করা মাংসে যে সামান্য রক্ত থেকে যায় তা প্রবাহিত রক্ত নয় তাই হালাল। তবে রান্নার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত।
রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করা জবাইয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য এবং এটি মাংসকে পবিত্র ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলে।
জবাইকারীর শর্ত এবং প্রাণীর অবস্থা
জবাই করার জন্য জবাইকারীর কিছু শর্ত আছে এবং প্রাণীর অবস্থাও বিবেচনা করতে হয়। জবাইকারীর শর্ত: জবাইকারী অবশ্যই মুসলমান হতে হবে এবং বিসমিল্লাহ বলে জবাই করবে। আহলে কিতাব (ইহুদি ও খ্রিস্টান) এর জবাই নিয়ে মতভেদ আছে তবে সাধারণভাবে মুসলমানের জবাই করা উত্তম। বয়স ও জ্ঞান: জবাইকারীর বয়স এবং জ্ঞান থাকতে হবে। ছোট শিশু যে বুঝে না সে জবাই করতে পারবে না। বালেগ বা বুঝমান হওয়া জরুরি। পুরুষ বা নারী: পুরুষ এবং নারী উভয়েই জবাই করতে পারে। এতে কোনো সমস্যা নেই। প্রাণীর অবস্থা: যে প্রাণী জবাই করা হবে তাকে জীবিত থাকতে হবে। মৃত বা মুমূর্ষু প্রাণী জবাই করলে হালাল হবে না। সুস্থ প্রাণী: অসুস্থ বা ক্ষতবিক্ষত প্রাণী জবাই করা মাকরুহ তবে জবাই হয়ে যায়। সুস্থ প্রাণী জবাই করা উত্তম। গর্ভবতী প্রাণী: গর্ভবতী প্রাণী জবাই করা জায়েজ তবে অপছন্দনীয়। যদি জবাই করা হয় এবং পেটের বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে তাকেও জবাই করতে হবে। প্রাণীকে সম্মান: জবাইয়ের আগে প্রাণীকে ভালো খাবার দেওয়া, পানি পান করানো এবং আরামদায়ক রাখা সুন্নত।
জবাইকারী এবং প্রাণী উভয়ের শর্ত মেনে চললে জবাই সহিহ হয় এবং মাংস হালাল হয় বলে আশা করা যায়।
উপসংহার
হালাল জবাই পদ্ধতি মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব কারণ এটি আমাদের খাদ্যকে হালাল করে এবং ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত পূরণ করে। শরীয়তসম্মত জবাই প্রাণীর প্রতি দয়া এবং আল্লাহর নির্দেশ পালনের একটি সুন্দর সমন্বয়।
আসুন, আমরা সবাই হালাল জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি জানি এবং মেনে চলি। মনে রাখি যে জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ পড়া আবশ্যক - "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর" বলা সুন্নত এবং শুধু বিসমিল্লাহ বললেও যথেষ্ট। ভুলে গেলে ক্ষমাযোগ্য কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লে হারাম। ধারালো ছুরি ব্যবহার করি যাতে প্রাণী কম কষ্ট পায় এবং দ্রুত জবাই হয়। প্রাণীর সামনে ছুরি ধার করি না এবং জবাইয়ের আগেই প্রস্তুত রাখি। গলার সঠিক স্থানে কাটি - খাদ্যনালী, গলনালী এবং রক্তনালী যাতে কাটা হয়। মাথা সম্পূর্ণ আলাদা করি না এবং মেরুদণ্ড কাটি না। রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের হতে দিই এবং প্রাণী মারা যাওয়ার আগে চামড়া ছাড়াই না বা কাটাকাটি শুরু করি না। মুসলমান জবাইকারী নিয়োগ করি এবং নিশ্চিত করি যে সে শরীয়তের নিয়ম জানে। জীবিত সুস্থ প্রাণী জবাই করি এবং মৃত বা মুমূর্ষু প্রাণী এড়িয়ে চলি। প্রাণীর প্রতি দয়া দেখাই - জবাইয়ের আগে পানি পান করাই এবং আরামদায়ক রাখি। একপাশে অন্য প্রাণীকে জবাই দেখতে দিই না যাতে ভয় না পায়। সম্ভব হলে কিবলামুখী করে জবাই করি যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয়। জবাইকৃত মাংস ভালোভাবে ধুয়ে রক্তমুক্ত করি এবং পরিষ্কার রাখি। পরিবারকে হালাল জবাই সম্পর্কে শিক্ষা দিই এবং সঠিক পদ্ধতি মেনে চলতে উৎসাহিত করি। মনে রাখি যে হালাল মাংস খাওয়া আমাদের দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত এবং হারাম থেকে বিরত থাকা ঈমানের দাবি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হালাল জবাই পদ্ধতি মেনে চলার তৌফিক দান করুন এবং হালাল খাবার খাওয়ার সামর্থ্য দিন। আমাদের উপার্জন ও খাদ্য পবিত্র করুন এবং আমাদের ইবাদত কবুল করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ পড়া কি আবশ্যক এবং না পড়লে কী হবে?
জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া অপরিহার্য এবং এটি ছাড়া জবাই বৈধ হয় না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন যে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে এমন খাবার খাও (সূরা আনআম: ১১৮) এবং যার উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি তা খেয়ো না (সূরা আনআম: ১২১)। জবাইয়ের সময় "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবর" বলা সুন্নত এবং এটি সবচেয়ে উত্তম। শুধু "বিসমিল্লাহ" বললেও যথেষ্ট এবং জবাই হয়ে যায়। তবে যদি কেউ ভুলে বিসমিল্লাহ না পড়ে তাহলে সেই মাংস হালাল কারণ ভুল ক্ষমাযোগ্য এবং ইসলামে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য শাস্তি নেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ বিসমিল্লাহ না পড়ে তাহলে সেই মাংস হারাম হয়ে যায় এবং খাওয়া যাবে না (সুনানে আবু দাউদ: ২৮১৪)। বিসমিল্লাহ এমনভাবে পড়তে হবে যাতে নিজে শুনতে পাই তবে খুব জোরে বলার প্রয়োজন নেই। একসাথে অনেক প্রাণী জবাই করলেও প্রতিটির জন্য আলাদা বিসমিল্লাহ পড়া উচিত। শুধু মুসলমানই বিসমিল্লাহ বলে জবাই করতে পারে এবং এটি জবাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যা কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া যায় না।
২. জবাইয়ের জন্য কেমন ছুরি ব্যবহার করা উচিত এবং কেন?
জবাইয়ের সময় ধারালো ছুরি বা অস্ত্র ব্যবহার করা শরীয়তের নির্দেশ এবং প্রাণীর প্রতি দয়ার অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা ফরজ করেছেন। যখন তোমরা জবাই করো তখন উত্তম পন্থায় জবাই করো এবং ছুরি ধার করে নাও যাতে প্রাণী আরাম পায় (সহিহ মুসলিম: ১৯৫৫)। ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবাই হয় এবং প্রাণী কম কষ্ট পায়। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করলে প্রাণী বেশি যন্ত্রণা পায় এবং এটি নিষিদ্ধ ও অমানবিক। লোহা, ইস্পাত বা ধাতব যেকোনো ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা যায়। এমনকি বাঁশ বা পাথরের ধারালো অংশও ব্যবহার করা যেতে পারে যদি তা দ্রুত কাটতে সক্ষম হয়। তবে হাড় বা দাঁত দিয়ে জবাই করা নিষেধ (সহিহ বুখারি: ৫৫০৩)। জবাইয়ের আগেই ছুরি ভালোভাবে ধার করে নিতে হবে এবং প্রাণীর সামনে ছুরি ধার করা নিষেধ কারণ এতে প্রাণী ভয় পায় এবং মানসিক কষ্ট পায়। একবারে দ্রুত কেটে ফেলা উচিত যাতে কষ্ট কম হয় এবং বারবার চেষ্টা করা অনুচিত। ধারালো ছুরি ব্যবহার করা শুধু শরীয়তের নির্দেশই নয় বরং প্রাণীর প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শনের একটি সুন্দর মাধ্যম।
৩. জবাইয়ের সময় গলার কোন অংশ কাটতে হয় এবং কতটুকু কাটা জরুরি?
জবাইয়ের সময় গলার নির্দিষ্ট স্থানে সঠিকভাবে কাটতে হবে। গলার সামনের দিকে অর্থাৎ গলনালি ও খাদ্যনালীর মাঝামাঝি জায়গায় কাটতে হবে যেখানে নরম অংশ আছে। ইসলামি পদ্ধতিতে চারটি প্রধান রগ কাটতে হয় - দুটি খাদ্যনালী (হুলকুম), এবং দুটি রক্তনালী (ওয়াদাজান)। এই চারটি কাটা হলে জবাই সম্পূর্ণ ও সহিহ হয়। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ন্যূনতম তিনটি রগ কাটলেও জবাই হয়ে যায় তবে চারটিই কাটা উত্তম এবং সুন্নত। অন্য মাজহাব (শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি) অনুযায়ী দুটি রক্তনালী এবং খাদ্যনালী বা গলনালী যেকোনো একটি কাটলে যথেষ্ট হয় এবং জবাই বৈধ। জবাইয়ের সময় মাথা সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা মাকরুহ এবং অপছন্দনীয়। শুধু রগগুলো কেটে রক্ত বের হতে দেওয়া উচিত এবং মাথা রেখে জবাই করা সুন্নত। মেরুদণ্ড কাটা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ কারণ এতে প্রাণী অতিরিক্ত কষ্ট পায় এবং এটি শরীয়তসম্মত নয়। শুধু গলার নরম অংশ কেটে রক্তনালী ও গলনালী বিচ্ছিন্ন করতে হবে। সঠিক স্থানে সঠিকভাবে কাটা জবাই হালাল হওয়ার জন্য অপরিহার্য এবং এই নিয়ম মেনে চললে প্রাণীও কম কষ্ট পায় ও দ্রুত মারা যায়।
৪. জবাইয়ের পর রক্ত কেন বের করতে হয় এবং এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
জবাইয়ের পর রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ইসলামে রক্ত হারাম। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে প্রবাহিত রক্ত হারাম (সূরা আনআম: ১৪৫, সূরা মায়িদা: ৩)। তাই জবাই করা প্রাণীর রক্ত যতটা সম্ভব বের করে ফেলতে হবে এবং মাংসকে রক্তমুক্ত করতে হবে। সঠিকভাবে জবাই করলে রক্তনালী কাটা হয় এবং হৃদপিণ্ড সক্রিয় থাকা পর্যন্ত রক্ত পাম্প হয়ে বের হতে থাকে। এজন্য প্রাণী সম্পূর্ণ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং রক্ত বের হতে দিতে হবে। জবাইয়ের পর প্রাণীকে একপাশে শুইয়ে রাখলে রক্ত ভালোভাবে ঝরে এবং কিছু সময় অপেক্ষা করা উচিত। প্রাণী সম্পূর্ণ মারা যাওয়ার এবং নড়াচড়া বন্ধ হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা মাংস কাটাকাটি শুরু করা নিষেধ কারণ এতে প্রাণী কষ্ট পায়। স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্ত বের করা গুরুত্বপূর্ণ কারণ রক্তে বিষাক্ত পদার্থ, জীবাণু এবং ব্যাকটেরিয়া থাকে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। রক্ত বের করলে মাংস পরিষ্কার, পবিত্র এবং স্বাস্থ্যসম্মত হয়। জবাই করা মাংসে যে সামান্য রক্ত থেকে যায় তা প্রবাহিত রক্ত নয় তাই হালাল তবে রান্নার আগে মাংস ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। রক্ত সম্পূর্ণভাবে বের করা জবাইয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য এবং এটি মাংসকে পবিত্র ও নিরাপদ করে তোলে।
৫. কে জবাই করতে পারে এবং কোন প্রাণী জবাই করা যায়?
জবাই করার জন্য জবাইকারীর কিছু শর্ত আছে। জবাইকারী অবশ্যই মুসলমান হতে হবে এবং বিসমিল্লাহ বলে জবাই করবে। আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জবাই নিয়ে মতভেদ আছে এবং কুরআনে তাদের খাবার হালাল বলা হলেও (সূরা মায়িদা: ৫) সাধারণভাবে মুসলমানের জবাই করা মাংস খাওয়া উত্তম ও নিরাপদ। জবাইকারীর বয়স এবং জ্ঞান থাকতে হবে - ছোট শিশু যে বুঝে না সে জবাই করতে পারবে না। বালেগ বা বুঝমান হওয়া জরুরি এবং জবাইয়ের নিয়ম জানা থাকতে হবে। পুরুষ এবং নারী উভয়েই জবাই করতে পারে এবং এতে কোনো সমস্যা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। যে প্রাণী জবাই করা হবে তাকে অবশ্যই জীবিত থাকতে হবে। মৃত বা মুমূর্ষু প্রাণী জবাই করলে হালাল হবে না এবং তা মৃত প্রাণীর হুকুমে পড়বে। প্রাণীটি হালাল হতে হবে যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া, মুরগি ইত্যাদি। অসুস্থ বা ক্ষতবিক্ষত প্রাণী জবাই করা মাকরুহ তবে জবাই হয়ে যায় এবং সুস্থ প্রাণী জবাই করা উত্তম। গর্ভবতী প্রাণী জবাই করা জায়েজ তবে অপছন্দনীয় এবং যদি করা হয় তাহলে পেটের বাচ্চাও জবাই করতে হবে যদি জীবিত পাওয়া যায়। জবাইকারী এবং প্রাণী উভয়ের শর্ত মেনে চললে জবাই সহিহ হয় এবং মাংস হালাল হয় বলে আশা করা যায়।
