ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম: গুরুত্ব ও ফজিলত | সম্পূর্ণ গাইড

 

ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম ও ফজিলত - গুনাহ মাফ ও রিজিক বৃদ্ধির উপায়

ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম: গুরুত্ব ও ফজিলত | সম্পূর্ণ গাইড

ভূমিকা

ইস্তেগফার মানে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং এটি প্রতিটি মুসলমানের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। মানুষ ভুল করে এটাই স্বাভাবিক এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পথ খোলা রেখেছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন যে তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে আসো (সূরা হুদ: ৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন যদিও তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। ইস্তেগফার শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয় বরং এটি রিজিক বৃদ্ধি, বিপদ থেকে মুক্তি এবং মানসিক শান্তির কারণ। তবে অনেকে জানেন না কীভাবে সঠিকভাবে ইস্তেগফার করতে হয় এবং কোন দোয়াগুলো পড়া উত্তম। এই লেখায় আমরা ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম, সঠিক পদ্ধতি, ফজিলত এবং বিভিন্ন ইস্তেগফারের দোয়া বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রত্যেক মুমিন মুসলমান নিয়মিত ইস্তেগফার করে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত লাভ করতে পারেন।

ইস্তেগফার কী এবং কেন করতে হয়

ইস্তেগফার আরবি শব্দ যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা বা গুনাহ মাফ চাওয়া। সংজ্ঞা: ইস্তেগফার হলো আল্লাহর কাছে নিজের ভুল ও পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে আর না করার সংকল্প করা। মানুষ ভুল করে: আল্লাহ তায়ালা জানেন যে মানুষ ভুল করবে এবং তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রতিটি আদম সন্তান ভুল করে এবং ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা যারা তওবা করে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫১)। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারবার ইস্তেগফারের কথা বলেছেন এবং মুমিনদের ক্ষমা চাইতে বলেছেন (সূরা হুদ: ৩, সূরা নুহ: ১০-১২)। প্রিয় আমল: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন (সহিহ মুসলিম: ২৭০২)। নবী-রাসুলদের আমল: সকল নবী-রাসুল ইস্তেগফার করতেন এবং আদম (আ.), মুসা (আ.), ইউনুস (আ.) সহ সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। আশার বার্তা: ইস্তেগফার আশার বার্তা দেয় যে যত বড় গুনাহই হোক না কেন আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন।

ইস্তেগফার করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হয় বলে আশা করা যায়।

ইস্তেগফারের গুরুত্ব ও ফজিলত

ইস্তেগফার শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয় বরং এর অসংখ্য ফজিলত ও উপকারিতা রয়েছে। 

গুনাহ মাফ: ইস্তেগফারের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং গুনাহ মুছে ফেলা। আল্লাহ বলেন যে কেউ মন্দ কাজ করে অথবা নিজের উপর জুলুম করে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে (সূরা নিসা: ১১০)। 

রিজিক বৃদ্ধি: ইস্তেগফার করলে রিজিক বৃদ্ধি পায়। হুদ (আ.) তাঁর কওমকে বলেছিলেন তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তি ও সম্পদ বাড়িয়ে দেবেন (সূরা হুদ: ৫২)।

 বিপদ থেকে মুক্তি: নিয়মিত ইস্তেগফার করলে বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে রিজিক দেন (সূরা তালাক: ২-৩)। 

সন্তান লাভ: ইস্তেগফার সন্তান ও সম্পদ লাভের মাধ্যম (সূরা নুহ: ১০-১২)। 

মানসিক শান্তি: ইস্তেগফার অন্তরে শান্তি আনে এবং দুশ্চিন্তা দূর করে। 

আজাব থেকে রক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উম্মতের উপর আজাব আসবে না যতক্ষণ তারা ইস্তেগফার করতে থাকবে (সূরা আনফাল: ৩৩)।

ইস্তেগফার একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় উপকারী।

সহজ ইস্তেগফারের দোয়া

ইস্তেগফার করার জন্য অনেক দোয়া আছে এবং সবচেয়ে সহজ হলো সংক্ষিপ্ত দোয়া। আস্তাগফিরুল্লাহ: সবচেয়ে সহজ এবং সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার হলো "আস্তাগফিরুল্লাহ" যার অর্থ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। এটি যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় পড়া যায়। পূর্ণ ইস্তেগফার: "আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি" অর্থাৎ আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই যিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী এবং আমি তাঁর কাছে তওবা করছি। এই দোয়া পড়লে গুনাহ মাফ হয় যদিও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা হয় (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৭, সুনানে তিরমিজি: ৩৫৭৭)। সংক্ষিপ্ত তিনবার: তিনবার "আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি" বলা সুন্নত। যেকোনো ভাষায়: যদি আরবি না জানা থাকে তাহলে বাংলায়ও বলা যায় "হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন"। নিয়মিততা: দিনে কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার করা উত্তম।

সহজ ইস্তেগফার নিয়মিত করলে অভ্যাস হয়ে যায় এবং সব সময় আল্লাহর স্মরণে থাকা যায়।

ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম | সাইয়্যিদুল ইস্তেগফারের লেখা ছবি | ইস্তেগফারের ফজিলত

সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার: সর্বোত্তম ইস্তেগফার

সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার অর্থ ইস্তেগফারের সরদার এবং এটি সবচেয়ে উত্তম ইস্তেগফার। দোয়াটি: "আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাসতাতা'তু আউজু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু আবুউ লাকা বিনি'মাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুউ বিজানবি ফাগফিরলি ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।" অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিতে অবিচল আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আমার উপর আপনার নেয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ দিনের বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এই দোয়া পড়ে এবং সন্ধ্যার আগে মারা যায় সে জান্নাতি এবং যে রাতে পড়ে সকালের আগে মারা যায় সেও জান্নাতি (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)। পড়ার সময়: ফজরের পর এবং মাগরিবের পর পড়া উত্তম। মুখস্থ করা: এই দোয়া মুখস্থ করা উচিত এবং নিয়মিত পড়া উচিত।

সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার অত্যন্ত শক্তিশালী দোয়া এবং এর ফজিলত অপরিসীম।

ইস্তেগফার পাঠের সঠিক নিয়ম ও সময়

ইস্তেগফার পড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই তবে কিছু সময় বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেকোনো সময়: ইস্তেগফার দিন-রাত যেকোনো সময় পড়া যায় এবং কোনো নিষিদ্ধ সময় নেই। ফজরের পর: সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার ফজরের পর পড়া উত্তম। মাগরিবের পর: সন্ধ্যায় সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার পড়া সুন্নত। রাতের শেষভাগ: তাহাজ্জুদের সময় এবং রাতের শেষ তৃতীয়াংশে ইস্তেগফার করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। আল্লাহ বলেন যে মুত্তাকিরা রাতের শেষভাগে ইস্তেগফার করে (সূরা জারিয়াত: ১৮)। নামাজের পর: প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তিনবার "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলা সুন্নত। বিপদের সময়: যেকোনো সমস্যা বা বিপদে পড়লে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা উচিত। দৈনিক সংখ্যা: রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন তাই আমাদেরও কমপক্ষে ১০০ বার করা উচিত। অজু অবস্থায়: অজু করে পবিত্র অবস্থায় ইস্তেগফার করা উত্তম তবে বাধ্যতামূলক নয়।

ইস্তেগফার যেকোনো সময় করা যায় তবে নিয়মিততা এবং আন্তরিকতা গুরুত্বপূর্ণ।


ইস্তেগফার পাঠের নিয়ম ও ফজিলত - গুনাহ মাফ ও রিজিক বৃদ্ধির উপায়

ইস্তেগফারের শর্ত ও আদব

ইস্তেগফার কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত ও আদব রয়েছে যা মেনে চলা জরুরি। অন্তরের অনুতাপ: ইস্তেগফার শুধু মুখে না বলে অন্তর থেকে করতে হবে। নিজের ভুলের জন্য সত্যিকার অনুতপ্ত হতে হবে। গুনাহ ছেড়ে দেওয়া: যে গুনাহের জন্য ইস্তেগফার করছেন তা তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিতে হবে। গুনাহ করতে থাকা অবস্থায় ইস্তেগফার করলে তা কবুল হয় না। ভবিষ্যতে না করার সংকল্প: মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে যে ভবিষ্যতে এই গুনাহ আর করবেন না। মানুষের হক আদায়: যদি কারো হক নষ্ট করে থাকেন তাহলে তা ফেরত দিতে হবে বা ক্ষমা চাইতে হবে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা: ইস্তেগফার আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয় থেকে করতে হবে। বিনয় ও নম্রতা: অহংকার না করে বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। নিয়মিততা: মাঝে মাঝে নয় বরং নিয়মিত ইস্তেগফার করা উচিত। আশা রাখা: আল্লাহ ক্ষমা করবেন এই আশা রাখতে হবে এবং হতাশ হওয়া যাবে না।

সঠিক নিয়মে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায় এবং জীবন পরিবর্তন হবে।

উপসংহার

ইস্তেগফার আল্লাহর অসীম রহমত ও ক্ষমা লাভের মাধ্যম এবং প্রতিটি মুসলমানের নিয়মিত আমল করা উচিত। সঠিক নিয়মে ইস্তেগফার করলে গুনাহ মাফ, রিজিক বৃদ্ধি এবং বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।

আসুন, আমরা সবাই নিয়মিত ইস্তেগফার করি এবং আল্লাহর ক্ষমা চাই। প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলি। সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার মুখস্থ করি এবং ফজর ও মাগরিবের পর নিয়মিত পড়ি। প্রতিটি নামাজের পর তিনবার ইস্তেগফার করি। রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদের সময় বেশি বেশি ইস্তেগফার করি। যখনই কোনো ভুল করি তৎক্ষণাৎ ইস্তেগফার করি এবং গুনাহ ছেড়ে দেই। অন্তর থেকে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং ভবিষ্যতে আর না করার সংকল্প করি। মানুষের হক থাকলে তা ফেরত দিই এবং ক্ষমা চাই। শুধু মুখে নয় বরং বাস্তবে জীবন পরিবর্তন করি। বিনয় ও নম্রতার সাথে আল্লাহর কাছে ফিরে আসি। পরিবার ও সন্তানদের ইস্তেগফার শেখাই এবং নিয়মিত করতে উৎসাহিত করি। মনে রাখি যে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু এবং তিনি তওবাকারীকে ভালোবাসেন। যত বড় গুনাহই হোক না কেন হতাশ হই না এবং আল্লাহর রহমতে আশা রাখি। ইস্তেগফারকে জীবনের অংশ বানাই এবং সব সময় আল্লাহর স্মরণে থাকি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নিয়মিত ইস্তেগফার করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করুন। আমাদের রিজিক বাড়িয়ে দিন এবং সকল বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।


FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ইস্তেগফার কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইস্তেগফার আরবি শব্দ যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা বা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাওয়া। এটি হলো আল্লাহর কাছে নিজের ভুল ও পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে আর না করার সংকল্প করা। ইস্তেগফার গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রতিটি মানুষ ভুল করে এবং আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন প্রতিটি আদম সন্তান ভুল করে এবং ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা যারা তওবা করে (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫১)। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার ইস্তেগফারের কথা বলেছেন এবং মুমিনদের ক্ষমা চাইতে বলেছেন (সূরা হুদ: ৩, সূরা নুহ: ১০-১২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন (সহিহ মুসলিম: ২৭০২)। সকল নবী-রাসুল ইস্তেগফার করতেন এবং আদম (আ.), মুসা (আ.), ইউনুস (আ.) সহ সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ইস্তেগফার আশার বার্তা দেয় যে যত বড় গুনাহই হোক না কেন আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত হয় বলে আশা করা যায়।

২. ইস্তেগফারের ফজিলত ও উপকারিতা কী কী?

ইস্তেগফারের অসংখ্য ফজিলত ও উপকারিতা রয়েছে যা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় কাজে আসে। প্রথমত গুনাহ মাফ হয় যা ইস্তেগফারের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন কেউ মন্দ কাজ করে বা নিজের উপর জুলুম করে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে (সূরা নিসা: ১১০)। দ্বিতীয়ত রিজিক বৃদ্ধি পায়। হুদ (আ.) তাঁর কওমকে বলেছিলেন রবের কাছে ক্ষমা চাও তিনি প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং শক্তি ও সম্পদ বাড়িয়ে দেবেন (সূরা হুদ: ৫২)। তৃতীয়ত বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। নিয়মিত ইস্তেগফার করলে সমস্যা সমাধানের পথ পাওয়া যায় (সূরা তালাক: ২-৩)। চতুর্থত সন্তান ও সম্পদ লাভ হয় (সূরা নুহ: ১০-১২)। পঞ্চমত মানসিক শান্তি আসে এবং দুশ্চিন্তা দূর হয়। ষষ্ঠত আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উম্মতের উপর আজাব আসবে না যতক্ষণ তারা ইস্তেগফার করতে থাকবে (সূরা আনফাল: ৩৩)। এই সব কারণে ইস্তেগফার একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।

৩. সহজ ইস্তেগফারের দোয়া কোনগুলো এবং কীভাবে পড়তে হয়?

ইস্তেগফার করার জন্য অনেক দোয়া আছে এবং সবচেয়ে সহজ হলো সংক্ষিপ্ত দোয়া। "আস্তাগফিরুল্লাহ" যার অর্থ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই - এটি সবচেয়ে সহজ এবং সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার যা যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় পড়া যায়। পূর্ণ ইস্তেগফার হলো "আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি" অর্থাৎ আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই যিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী এবং আমি তাঁর কাছে তওবা করছি। এই দোয়া পড়লে গুনাহ মাফ হয় যদিও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা হয় (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৭, সুনানে তিরমিজি: ৩৫৭৭)। সংক্ষিপ্ত আরেকটি দোয়া হলো তিনবার "আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি" বলা যা সুন্নত। যদি আরবি না জানা থাকে তাহলে বাংলায়ও বলা যায় "হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন"। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত অনুযায়ী দিনে কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার করা উত্তম। সহজ ইস্তেগফার নিয়মিত করলে অভ্যাস হয়ে যায় এবং সব সময় আল্লাহর স্মরণে থাকা যায়।

৪. সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার কী এবং এর ফজিলত কী?

সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার অর্থ ইস্তেগফারের সরদার এবং এটি সবচেয়ে উত্তম ও শক্তিশালী ইস্তেগফার। দোয়াটি হলো "আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাসতাতা'তু আউজু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু আবুউ লাকা বিনি'মাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুউ বিজানবি ফাগফিরলি ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।" এর অর্থ: হে আল্লাহ আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকারে অবিচল আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আমার উপর আপনার নেয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। আমাকে ক্ষমা করুন কারণ আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। এর ফজিলত অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ দিনে দৃঢ় বিশ্বাসে এটি পড়ে সন্ধ্যার আগে মারা যায় সে জান্নাতি এবং যে রাতে পড়ে সকালের আগে মারা যায় সেও জান্নাতি (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)। এটি ফজরের পর এবং মাগরিবের পর পড়া উত্তম এবং মুখস্থ করে নিয়মিত পড়া উচিত।

৫. ইস্তেগফার কবুল হওয়ার শর্ত কী কী?

ইস্তেগফার কবুল হওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। প্রথমত অন্তরের অনুতাপ থাকতে হবে - শুধু মুখে না বলে অন্তর থেকে সত্যিকার অনুতপ্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত যে গুনাহের জন্য ইস্তেগফার করছেন তা তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিতে হবে কারণ গুনাহ করতে থাকা অবস্থায় ইস্তেগফার করলে তা কবুল হয় না। তৃতীয়ত ভবিষ্যতে এই গুনাহ আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। চতুর্থত যদি কারো হক নষ্ট করে থাকেন তাহলে তা ফেরত দিতে হবে বা ক্ষমা চাইতে হবে। পঞ্চমত ইস্তেগফার আল্লাহর ভালোবাসা ও ভয় থেকে করতে হবে। ষষ্ঠত অহংকার না করে বিনীতভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। সপ্তমত মাঝে মাঝে নয় বরং নিয়মিত ইস্তেগফার করা উচিত। অষ্টমত আল্লাহ ক্ষমা করবেন এই আশা রাখতে হবে এবং হতাশ হওয়া যাবে না। এই শর্তগুলো মেনে সঠিক নিয়মে ইস্তেগফার করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায় এবং জীবন পরিবর্তন হবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url