তাকওয়াবান বান্দারা কেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়?
পর্ব: ২
তাকওয়াবান বান্দারা কেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়: কুরআন ও হাদীসের আলোকে
ভূমিকা
তাকওয়া ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক ধারণাগুলোর একটি। এটি শুধু একটি গুণ নয় বরং সম্পূর্ণ জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি যা মুমিনকে আল্লাহর সবচেয়ে কাছে নিয়ে যায়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার তাকওয়াবান বান্দাদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন যে তাঁর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (সূরা হুজরাত: ১৩)। তবে প্রশ্ন আসে - তাকওয়া আসলে কী? কেন তাকওয়াবান বান্দারা আল্লাহর এত প্রিয়? কীভাবে তাকওয়া অর্জন করা যায় এবং এর বাস্তব প্রয়োগ কী? এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ, তাকওয়াবান বান্দাদের বৈশিষ্ট্য এবং কীভাবে তাকওয়া জীবনে প্রয়োগ করা যায় তা বিস্তারিত আলোচনা করব। তাকওয়ার মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহর নৈকট্য ও সফলতা অর্জন করা যায় তাও জানব।
তাকওয়া কী এবং এর প্রকৃত অর্থ
তাকওয়া আরবি শব্দ যার মূল অর্থ হলো আত্মরক্ষা করা, সতর্ক থাকা এবং ভয় করা। তাকওয়ার সংজ্ঞা: ইসলামি পরিভাষায় তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এটি হলো এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষ সবসময় সচেতন থাকে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং এই সচেতনতা থেকে সে ভালো কাজ করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। সাহাবিদের ব্যাখ্যা: হযরত উমর (রা.) কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন তুমি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথ দিয়ে গিয়েছ? জবাবে বলা হলো হ্যাঁ। তিনি বললেন সেখানে তুমি কীভাবে চলেছ? উত্তর দেওয়া হলো সাবধানে এবং কাঁটা এড়িয়ে। হযরত উমর (রা.) বললেন এটাই তাকওয়া - জীবনে পাপ এড়িয়ে সাবধানে চলা। তাকওয়ার স্তর: তাকওয়ার তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে। প্রথমত, শিরক ও কুফর থেকে বিরত থাকা যা সবচেয়ে মৌলিক স্তর। দ্বিতীয়ত, কবিরা গুনাহ এবং হারাম থেকে বিরত থাকা। তৃতীয়ত, সন্দেহজনক এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকেও বিরত থাকা যা সর্বোচ্চ স্তর। হৃদয়ের অবস্থা: তাকওয়া শুধু বাহ্যিক কাজ নয় বরং এটি হৃদয়ের একটি অবস্থা। রাসুল (সা.) বুকে হাত রেখে বলেছেন তাকওয়া এখানে অর্থাৎ হৃদয়ে (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)।
তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয় বরং এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত। তাকওয়াবান ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে পাপ করে না এবং তাঁর ভালোবাসায় ভালো কাজ করে।
কুরআনে তাকওয়াবানদের মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে অসংখ্য জায়গায় তাকওয়াবান বান্দাদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের বিশেষ মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত: আল্লাহ বলেন তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান সে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত (সূরা হুজরাত: ১৩)। বংশ, সম্পদ বা রূপ নয় বরং তাকওয়াই আসল মানদণ্ড। মুত্তাকিদের পরিচয়: সূরা বাকারার শুরুতে মুত্তাকিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যে তারা গায়েবে ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে (সূরা বাকারা: ২-৫)। জান্নাত তাকওয়াবানদের জন্য: আল্লাহ বলেন যে জান্নাত মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩)। তাকওয়া জান্নাত লাভের মূল চাবি। আল্লাহর সাহায্য: আল্লাহ বলেন নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন (সূরা নাহল: ১২৮)। তাকওয়াবানরা আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ও সহযোগিতা পায়। দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা: কুরআনে বলা হয়েছে যে তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ বের করে দেন এবং অকল্পনীয় জায়গা থেকে রিজিক দেন (সূরা তালাক: ২-৩)। আমল কবুল হওয়া: আল্লাহ বলেন তিনি মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন (সূরা মায়েদা: ২৭)। তাকওয়া ছাড়া আমল কবুল হয় না।
কুরআনের এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে যে তাকওয়াবানরা আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় এবং তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। তাকওয়া ছাড়া প্রকৃত সফলতা সম্ভব নয়।
হাদিসে তাকওয়ার ফজিলত
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবন ও শিক্ষায় তাকওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং এর অসাধারণ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তাকওয়া হৃদয়ে: রাসুল (সা.) বুকে হাত রেখে তিনবার বলেছেন তাকওয়া এখানে (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)। এটি দেখায় যে তাকওয়া হৃদয়ের বিষয় এবং বাহ্যিক প্রদর্শনী নয়। সর্বোত্তম সম্পদ: রাসুল (সা.) বলেছেন তাকওয়া হলো সর্বোত্তম সম্পদ এবং পাথেয় যা মানুষ সংগ্রহ করতে পারে (মুসনাদে আহমাদ)। দুনিয়ার সম্পদ সাময়িক কিন্তু তাকওয়া চিরস্থায়ী। তাকওয়া ও সুন্দর চরিত্র: রাসুল (সা.) বলেছেন যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করো, খারাপ কাজের পর ভালো কাজ করো এবং মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার করো (সুনানে তিরমিজি: ১৯৮৭)। এটি তাকওয়ার ব্যবহারিক রূপ। সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশকারী: যখন রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হলো কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়? তিনি বললেন আল্লাহভীতি (তাকওয়া) এবং সুন্দর চরিত্র (সুনানে তিরমিজি: ২০০৪)। রাসুল (সা.) এর নসিহত: বিদায় হজ্জে রাসুল (সা.) বলেছেন তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। আরবের উপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ছাড়া (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৮৯)।
হাদিসগুলো থেকে আমরা শিখি যে তাকওয়া সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং এটি জান্নাত লাভের প্রধান মাধ্যম। রাসুল (সা.) তাকওয়াকে জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য করেছেন।
তাকওয়াবান বান্দাদের বৈশিষ্ট্য
তাকওয়াবান বান্দাদের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে। আল্লাহর স্মরণে সচেতন: তাকওয়াবান ব্যক্তি সবসময় মনে রাখে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার সব কাজ জানেন। এই সচেতনতা তাকে পাপ থেকে বিরত রাখে এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করে। ফরজ আদায়ে যত্নশীল: তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, যাকাত এবং অন্যান্য ফরজ নিষ্ঠার সাথে আদায় করে। কোনো ফরজ ছাড়ে না এবং সময়মত পালন করে। হারাম থেকে দূরে: তাকওয়াবান ব্যক্তি হারাম খাবার, পানীয়, কথা, কাজ এবং সম্পর্ক থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকে। হারামের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয় না। সন্দেহজনক বিষয় এড়ানো: হাদিসে এসেছে যে হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট কিন্তু এর মাঝে কিছু সন্দেহজনক বিষয় আছে। তাকওয়াবান ব্যক্তি এই সন্দেহজনক বিষয় থেকেও দূরে থাকে (সহিহ বুখারি: ৫২)। বিনয়ী ও নম্র: তাকওয়া মানুষকে বিনয়ী করে কারণ সে জানে যে সে আল্লাহর সামনে অসহায়। অহংকার ও গর্ব তাকওয়ার পরিপন্থী। মানুষের অধিকার রক্ষা: তাকওয়াবান ব্যক্তি শুধু আল্লাহর হক নয় বরং মানুষের হকও আদায় করে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সুন্দর ব্যবহার তার চরিত্রের অংশ।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকওয়াবান বান্দাদের আল্লাহর প্রিয় করে তোলে এবং তাদের জীবন হয় অনুকরণীয়। তাকওয়া শুধু কিছু নিয়ম পালন নয় বরং এটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
কীভাবে তাকওয়া অর্জন করা যায়
তাকওয়া অর্জন করা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি সম্ভব। কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন: নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বুঝা তাকওয়া বৃদ্ধি করে। কুরআন তাকওয়ার দিকনির্দেশনা এবং হেদায়েত দেয়। নিয়মিত নামাজ ও ইবাদত: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া, তাহাজ্জুদ পড়া এবং নফল ইবাদত করা তাকওয়া বাড়ায়। ইবাদত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে। আল্লাহকে স্মরণ রাখা: সবসময় মনে রাখা যে আল্লাহ দেখছেন এবং জানছেন। "আমি যদি মানুষকে দেখতে না পাই তবুও আল্লাহ আমাকে দেখছেন" - এই চিন্তা তাকওয়া সৃষ্টি করে। হারাম থেকে কঠোরভাবে বিরত: হারাম খাবার, পানীয়, আয় এবং সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। একটু হলেও হারামের সাথে সম্পর্ক না রাখা। সৎ সঙ্গ: তাকওয়াবান ও নেক মানুষদের সাথে থাকা। সঙ্গ মানুষকে প্রভাবিত করে এবং ভালো সঙ্গ তাকওয়া বৃদ্ধি করে। দোয়া করা: আল্লাহর কাছে তাকওয়া চাওয়া। "আল্লাহুম্মা আতি নাফসি তাকওয়াহা" - হে আল্লাহ আমার অন্তরে তাকওয়া দান করুন। আত্মসমালোচনা: নিজের কাজের হিসাব নিজে করা এবং ভুল সংশোধন করা। রাতে ঘুমানোর আগে দিনের কাজের পর্যালোচনা করা।
তাকওয়া একদিনে আসে না বরং এটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও আল্লাহর তৌফিকের ফল। যে সত্যিকার অর্থে তাকওয়া চায় আল্লাহ তাকে তৌফিক দেন এবং তাকওয়ার পথে সাহায্য করেন।
তাকওয়ার দুনিয়াবি ও আখিরাতের ফায়দা
তাকওয়া শুধু আখিরাতের জন্য নয় বরং দুনিয়াতেও এর অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। সমস্যা সমাধানের পথ: আল্লাহ বলেন যে তাকওয়া অবলম্বন করলে তিনি বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন (সূরা তালাক: ২)। তাকওয়াবান ব্যক্তি সমস্যায় পড়লেও আল্লাহ সমাধান দেন। অপ্রত্যাশিত রিজিক: তাকওয়া অবলম্বনকারীকে আল্লাহ এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না (সূরা তালাক: ৩)। তাকওয়া বরকত ও রিজিক বৃদ্ধির মাধ্যম। পাপ থেকে রক্ষা: তাকওয়া পাপ থেকে রক্ষা করে এবং জীবনকে পরিচ্ছন্ন রাখে। তাকওয়াবান ব্যক্তি ছোট-বড় পাপ থেকে বেঁচে থাকে। মানসিক শান্তি: তাকওয়াবান ব্যক্তির হৃদয়ে শান্তি থাকে কারণ সে জানে যে আল্লাহ তার সাথে আছেন। দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে মুক্তি পায়। সম্মান ও মর্যাদা: তাকওয়া মানুষকে সম্মানিত করে। আল্লাহর কাছে এবং মানুষের কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। জান্নাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি: আখিরাতে তাকওয়াবানদের জন্য জান্নাত এবং সবচেয়ে বড় পুরস্কার আল্লাহর সন্তুষ্টি যা সর্বোচ্চ সফলতা।
তাকওয়ার এই দুনিয়াবি ও আখিরাতের উপকারিতা দেখে প্রতিটি মুমিনের উচিত তাকওয়া অর্জনের জন্য চেষ্টা করা। তাকওয়া শুধু ত্যাগ নয় বরং এটি সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
উপসংহার
তাকওয়া ইসলামের মূল ভিত্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। তাকওয়াবান বান্দারা আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় কারণ তারা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য জীবনযাপন করে।
আসুন, আমরা সবাই তাকওয়া অর্জনের জন্য চেষ্টা করি এবং এটিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানাই। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করি এবং এর অর্থ বুঝি যাতে আল্লাহর নির্দেশনা জানতে পারি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ি এবং তাহাজ্জুদের অভ্যাস করি। সবসময় মনে রাখি যে আল্লাহ আমাদের দেখছেন এবং জানছেন - এই সচেতনতা তাকওয়া সৃষ্টি করে। হারাম খাবার, পানীয়, আয় এবং সম্পর্ক থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকি। সন্দেহজনক বিষয় থেকেও বিরত থাকি যাতে নিশ্চিতভাবে হারাম থেকে বাঁচা যায়। তাকওয়াবান ও নেক মানুষদের সঙ্গ গ্রহণ করি এবং খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করি। নিয়মিত আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তিনি আমাদের তাকওয়া দান করেন। প্রতিদিন রাতে নিজের কাজের হিসাব নিই এবং ভুল সংশোধন করি। মানুষের অধিকার রক্ষা করি এবং সুন্দর ব্যবহার করি। মনে রাখি যে তাকওয়া হৃদয়ের বিষয় এবং বাহ্যিক প্রদর্শনী নয়। আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ভয় করি এবং তাঁর ভালোবাসায় ভালো কাজ করি। বিশ্বাস রাখি যে তাকওয়া দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের সফলতার চাবি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাকওয়াবান বান্দাদের কাতারে শামিল করুন এবং তাকওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমাদের জীবনকে তাকওয়ার আলোকে পরিচালিত করার শক্তি দিন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. তাকওয়া কী এবং এর প্রকৃত অর্থ কী?
তাকওয়া আরবি শব্দ যার মূল অর্থ আত্মরক্ষা করা, সতর্ক থাকা এবং ভয় করা। ইসলামি পরিভাষায় তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষ সবসময় সচেতন থাকে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং এই সচেতনতা থেকে সে ভালো কাজ করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। হযরত উমর (রা.) এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাকওয়া হলো কাঁটাযুক্ত পথে সাবধানে চলার মত - জীবনে পাপ এড়িয়ে সাবধানে চলা। তাকওয়ার তিনটি স্তর রয়েছে: প্রথমত শিরক ও কুফর থেকে বিরত থাকা, দ্বিতীয়ত কবিরা গুনাহ ও হারাম থেকে বিরত থাকা এবং তৃতীয়ত সন্দেহজনক ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে বিরত থাকা। রাসুল (সা.) বুকে হাত রেখে বলেছেন তাকওয়া হৃদয়ে থাকে (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)। তাকওয়া শুধু ভয় নয় বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত একটি সম্পূর্ণ জীবনযাপন পদ্ধতি।
২. কুরআন ও হাদিসে তাকওয়াবানদের কী মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে?
কুরআনে আল্লাহ বলেন যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত (সূরা হুজরাত: ১৩)। সূরা বাকারায় মুত্তাকিদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে যে তারা গায়েবে ঈমান আনে, নামাজ কায়েম করে এবং যাকাত দেয় (সূরা বাকারা: ২-৫)। জান্নাত মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত (সূরা আলে ইমরান: ১৩৩) এবং আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন (সূরা নাহল: ১২৮)। তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ বের করেন এবং অপ্রত্যাশিত রিজিক দেন (সূরা তালাক: ২-৩)। আল্লাহ মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন (সূরা মায়েদা: ২৭)। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন তাকওয়া সর্বোত্তম সম্পদ (মুসনাদে আহমাদ)। তাকওয়া ও সুন্দর চরিত্র সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায় (সুনানে তিরমিজি: ২০০৪)। বিদায় হজ্জে রাসুল (সা.) বলেছেন তাকওয়া ছাড়া কারো শ্রেষ্ঠত্ব নেই (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৮৯)। এই মর্যাদাগুলো প্রমাণ করে তাকওয়া দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মূল চাবি।
৩. তাকওয়াবান বান্দাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
তাকওয়াবান বান্দাদের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, তারা সবসময় সচেতন থাকে যে আল্লাহ তাদের দেখছেন এবং এই সচেতনতা তাদের পাপ থেকে বিরত রাখে। দ্বিতীয়ত, তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, যাকাত এবং অন্যান্য ফরজ নিষ্ঠার সাথে আদায় করে এবং কোনো ফরজ ছাড়ে না। তৃতীয়ত, তারা হারাম খাবার, পানীয়, কথা, কাজ ও সম্পর্ক থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকে। চতুর্থত, তারা হালাল ও হারামের মাঝের সন্দেহজনক বিষয় থেকেও দূরে থাকে (সহিহ বুখারি: ৫২)। পঞ্চমত, তারা বিনয়ী ও নম্র কারণ জানে যে আল্লাহর সামনে অসহায় - অহংকার তাকওয়ার পরিপন্থী। ষষ্ঠত, তারা শুধু আল্লাহর হক নয় বরং মানুষের হকও আদায় করে এবং সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও সুন্দর ব্যবহার তাদের চরিত্রের অংশ। এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাকওয়াবান বান্দাদের আল্লাহর প্রিয় করে এবং তাদের জীবন অনুকরণীয় হয়। তাকওয়া শুধু কিছু নিয়ম পালন নয় বরং সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
৪. কীভাবে তাকওয়া অর্জন করা যায়?
তাকওয়া অর্জন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং কিছু ব্যবহারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব। প্রথমত, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করা যা তাকওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়। দ্বিতীয়ত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া, তাহাজ্জুদ পড়া এবং নফল ইবাদত করা যা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে। তৃতীয়ত, সবসময় মনে রাখা যে আল্লাহ দেখছেন - এই চিন্তা তাকওয়া সৃষ্টি করে। চতুর্থত, হারাম খাবার, পানীয়, আয় ও সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং একটু হলেও হারামের সাথে সম্পর্ক না রাখা। পঞ্চমত, তাকওয়াবান ও নেক মানুষদের সাথে থাকা কারণ সঙ্গ মানুষকে প্রভাবিত করে। ষষ্ঠত, আল্লাহর কাছে তাকওয়া চেয়ে দোয়া করা। সপ্তমত, নিজের কাজের হিসাব নিজে করা এবং ভুল সংশোধন করা। তাকওয়া একদিনে আসে না বরং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও আল্লাহর তৌফিকের ফল। যে সত্যিকার অর্থে তাকওয়া চায় আল্লাহ তাকে তৌফিক দেন এবং সাহায্য করেন।
৫. তাকওয়ার দুনিয়াবি ও আখিরাতের কী কী ফায়দা রয়েছে?
তাকওয়ার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়েই অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। দুনিয়ায়: প্রথমত, তাকওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ বিপদ থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করেন (সূরা তালাক: ২) এবং সমস্যার সমাধান দেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা কল্পনাও করা যায় না (সূরা তালাক: ৩) - তাকওয়া বরকত ও রিজিক বৃদ্ধির মাধ্যম। তৃতীয়ত, তাকওয়া পাপ থেকে রক্ষা করে এবং জীবনকে পরিচ্ছন্ন রাখে। চতুর্থত, তাকওয়াবান ব্যক্তির হৃদয়ে শান্তি থাকে এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায়। পঞ্চমত, তাকওয়া মানুষকে সম্মানিত করে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে। আখিরাতে: জান্নাত যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত এবং সবচেয়ে বড় পুরস্কার আল্লাহর সন্তুষ্টি যা সর্বোচ্চ সফলতা। তাকওয়ার এই উপকারিতা দেখে প্রতিটি মুমিনের উচিত তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করা। তাকওয়া শুধু ত্যাগ নয় বরং সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
