তাকওয়া কী এবং এটি মানুষকে কিভাবে বদলে দেয়? – কুরআন ও হাদীসের আলোকে
তাকওয়া কী এবং এটি মানুষকে কিভাবে বদলে দেয়? – কুরআন ও হাদীসের আলোকে
তাকওয়া কী? তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ ও এটি কিভাবে মানুষের চরিত্র, আমল ও জীবনধারা পরিবর্তন করে—কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা।
ভূমিকা
মানুষের জীবনে প্রকৃত সফলতা কেবল সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতির মাধ্যমে আসে না। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা। এই সন্তুষ্টি অর্জনের প্রধান চাবিকাঠি হলো তাকওয়া। কুরআন ও হাদীসে তাকওয়ার গুরুত্ব এত বেশি যে, এটিকে একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় বলা হয়েছে।
তাকওয়া কী? (সংজ্ঞা)
তাকওয়া শব্দটি এসেছে আরবি “ওয়াকায়া” ধাতু থেকে, যার অর্থ—রক্ষা করা বা বাঁচিয়ে রাখা। ইসলামী পরিভাষায় তাকওয়া বলতে বোঝায়—
আল্লাহকে ভয় করে তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
(সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া—বংশ, ধন বা বাহ্যিক রূপ নয়।
তাকওয়ার প্রকৃত রূপ
তাকওয়া কেবল মুখে বলা কোনো বিষয় নয়, বরং এটি অন্তরের একটি গুণ। এটি মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একজন তাকওয়াবান মানুষ—
-
গোপনেও গুনাহ থেকে দূরে থাকে
-
হালাল ও হারামের ব্যাপারে সতর্ক থাকে
-
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের নফসকে দমন করে
রাসূল ﷺ বলেন:
“তাকওয়া এখানে—”
(তিনি তাঁর বুকের দিকে তিনবার ইশারা করলেন)
(সহিহ মুসলিম)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, তাকওয়ার কেন্দ্র হলো মানুষের হৃদয়।
তাকওয়া কিভাবে মানুষকে বদলে দেয়?
১. চরিত্র গঠনে পরিবর্তন আনে
তাকওয়াবান মানুষ মিথ্যা, প্রতারণা ও অহংকার থেকে নিজেকে দূরে রাখে। তার কথাবার্তায় নম্রতা ও আচরণে শালীনতা প্রকাশ পায়।
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’, অতঃপর তারা অবিচল থাকে—তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।”
(সূরা আল-আহকাফ: ১৩)
২. গুনাহ থেকে বাঁচার শক্তি দেয়
তাকওয়া মানুষকে এমন আত্মনিয়ন্ত্রণ দেয়, যার মাধ্যমে সে একাকীত্বেও গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে। কারণ সে জানে—আল্লাহ সবকিছু দেখছেন।
৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণে আল্লাহভীতি তৈরি করে
তাকওয়া মানুষকে প্রতিটি সিদ্ধান্তে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়। ব্যবসা, সম্পর্ক, কথা—সব ক্ষেত্রে সে হালাল ও ন্যায়ের পথ বেছে নেয়।
৪. অন্তরের প্রশান্তি দান করে
তাকওয়াবান ব্যক্তির অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি থাকে, যা দুনিয়ার কোনো সম্পদ দিতে পারে না।
আল্লাহ বলেন:
“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।”
(সূরা আর-রা‘দ: ২৮)
৫. আখিরাতের সাফল্য নিশ্চিত করে
তাকওয়াই আখিরাতে জান্নাত লাভের মূল চাবিকাঠি।
আল্লাহ বলেন:
“এটা সেই জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করা হবে তাদেরকে যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে।”
(সূরা মারইয়াম: ৬৩)
তাকওয়া অর্জনের উপায়
-
নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝার চেষ্টা
-
ফরজ ইবাদতে যত্নবান হওয়া
-
গোপনে ও প্রকাশ্যে গুনাহ পরিহার
-
আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করা
-
মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা
উপসংহার
তাকওয়া কোনো সাময়িক অনুভূতি নয়; এটি একটি আজীবনের সাধনা। তাকওয়া মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়—তার চরিত্র, চিন্তা ও জীবনের লক্ষ্যকে আল্লাহমুখী করে তোলে। যে ব্যক্তি তাকওয়ার পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই কল্যাণের ব্যবস্থা করে দেন।
