শবে বরাতের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত
শবে বরাত মুসলিম সমাজে একটি বহুল আলোচিত রাত। এই রাতে ইবাদত, দোয়া ও নফল নামাজ নিয়ে মানুষের আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শবে বরাতের নামাজ ও এর নিয়ত নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি প্রচলিত আছে। কেউ মনে করেন এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ ফরজ, কেউ আবার নির্দিষ্ট রাকাত ও বিশেষ নিয়ত আবশ্যক বলে ধারণা করেন। অথচ শরিয়তের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
এই লেখায় কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে শবে বরাতের নামাজের প্রকৃত অবস্থান, নিয়তের সঠিক ধারণা এবং প্রচলিত ভুলগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হলো।
শবে বরাতের নামাজ কী?
শরিয়তের দৃষ্টিতে “শবে বরাতের নামাজ” বলতে কোনো আলাদা, নির্দিষ্ট বা বিশেষ নামাজ বোঝায় না। বরং এটি একটি নফল ইবাদতের রাত, যেখানে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করা যায়। অর্থাৎ, এই রাতে যে নামাজ পড়া হয়, তা মূলত অন্যান্য দিনের নফল নামাজের মতোই।
ইসলামে এমন কোনো সহিহ দলিল নেই, যেখানে শবে বরাত উপলক্ষে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট নামাজের বিধান দেওয়া হয়েছে। তাই এই রাতের নামাজকে বিশেষ কোনো নতুন ইবাদত হিসেবে গণ্য করা সঠিক নয়।
শবে বরাতের নামাজ ফরজ, নফল না সুন্নত?
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
পরিষ্কার উত্তর হলো—
শবে বরাতের নামাজ ফরজ নয়, ওয়াজিব নয় এবং সুন্নাতে মুয়াক্কাদাও নয়।
এটি একটি নফল নামাজ।
নফল ইবাদত হওয়ায়—
-
পড়লে সওয়াব পাওয়া যায়
-
না পড়লে কোনো গুনাহ হয় না
অতএব, শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়াকে বাধ্যতামূলক মনে করা বা না পড়লে গুনাহ হবে—এমন ধারণার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত কী ও কেন জরুরি
নিয়ত ইসলামের প্রতিটি ইবাদতের মূলভিত্তি। নিয়ত মানে হলো—কোনো ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার অন্তরের দৃঢ় সংকল্প। নামাজের ক্ষেত্রেও নিয়ত অপরিহার্য, কারণ নিয়ত ছাড়া ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।
শবে বরাতের নামাজ যেহেতু নফল নামাজ, তাই এর নিয়তও নফল নামাজের নিয়ত হিসেবেই হবে। নিয়তের উদ্দেশ্য হলো—এই নামাজ আল্লাহর জন্য আদায় করা, কোনো লোক দেখানো বা সামাজিক চাপে নয়।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত কি মুখে বলতে হয়?
না, শবে বরাতের নামাজের নিয়ত মুখে বলতে হয় না। বরং অন্তরে সিদ্ধান্ত থাকলেই নিয়ত সম্পন্ন হয়।
মুখে আরবি ভাষায় নির্দিষ্ট বাক্য বলা ফরজ বা আবশ্যক নয়। কেউ যদি মনে মনে বলে—
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নফল নামাজ আদায় করছি”—তাহলেই নিয়ত হয়ে যায়।
মুখে নিয়ত বলা একটি প্রচলিত অভ্যাস মাত্র, শরিয়তের বাধ্যবাধকতা নয়।
শবে বরাতের নামাজের আরবি নিয়ত ও বাংলা অর্থ
শবে বরাতের নামাজের আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلّٰهِ تَعَالَى رَكْعَتَي صَلَاةِ لَيْلَةِ الْبَرَاءَةِ نَفْل، مُتَوَجِّهًا إِلَىٰ جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ، اللّٰهُ أَكْبَرُ
শবে বরাতের নামাজের নিয়তের বাংলা উচ্চারণ
নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা,রাক‘আতাই সালাতি লাইলাতিল বারা-আতি নাফ্লি,মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা‘বাতিশ শারীফাতি,আল্লাহু আকবার।
শবে বরাতের নামাজের বাংলা নিয়ত
আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য শবে বরাতের দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করার নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার।
👉 মনে রাখতে হবে, এই বাক্য মুখে বলা বাধ্যতামূলক নয়। অন্তরের নিয়তই মূল।
শবে বরাতের নামাজ কত রাকাত পড়বেন
শবে বরাতের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা নির্ধারিত নেই।
২ রাকাত করে যত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়া যায়।
১২ রাকাত, ১৪ রাকাত বা নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে নামাজ পড়ার ব্যাপারে সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কোনো নির্দেশনা নেই। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বাধ্যতামূলক মনে করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
একা নাকি জামাতে—কোনটি উত্তম
শবে বরাতের নামাজ একাকী পড়াই উত্তম। কারণ নফল নামাজ সাধারণত একা পড়াই সুন্নাহসম্মত।
জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। তাই দলবদ্ধভাবে আয়োজন করে জামাতে নামাজ পড়াকে শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তম বলা যায় না।
শবে বরাতের নামাজ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
শবে বরাতের নামাজ নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে—
-
এই রাতে নির্দিষ্ট একটি নামাজ ফরজ
-
নির্দিষ্ট রাকাত না পড়লে ইবাদত অসম্পূর্ণ
-
মুখে আরবি নিয়ত না বললে নামাজ হবে না
-
নামাজ না পড়লে গুনাহ হবে
এসব ধারণার কোনোটি কুরআন বা সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই এসব থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
উপসংহার
শবে বরাতের নামাজ মূলত একটি নফল ইবাদত। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাত বা বাধ্যতামূলক নিয়ত নির্ধারিত নেই। অন্তরের নিয়ত নিয়ে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করলেই যথেষ্ট। আবেগ নয়, বরং কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে আমল করাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।(শবে বরাতের নামাজ, শবে বরাতের নিয়ত, শবে বরাত নফল নামাজ, শবে বরাতের ইবাদত, শবে বরাতের আমল, শাবান মাসের ইবাদত, নফল নামাজের নিয়ত)
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত: গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: শবে বরাতের নামাজ কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, এটি বাধ্যতামূলক নয়; এটি নফল নামাজ।
প্রশ্ন ২: নির্দিষ্ট রাকাত না পড়লে কি সমস্যা হবে?
উত্তর: না, নির্দিষ্ট রাকাত নির্ধারিত নেই।
প্রশ্ন ৩: মুখে নিয়ত না বললে কি নামাজ হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অন্তরের নিয়ত থাকলেই নামাজ সহিহ হবে।
প্রশ্ন ৪: জামাতে শবে বরাতের নামাজ পড়া যাবে কি?
উত্তর: একাকী পড়াই উত্তম; জামাতে পড়ার কোনো সহিহ দলিল নেই।
প্রশ্ন ৫: শবে বরাতের নামাজ না পড়লে গুনাহ হবে কি?
উত্তর: না, গুনাহ হবে না; কারণ এটি নফল ইবাদত।

