শবে বরাতের রোজা কয়টি ও রোজার নিয়ম ও নিয়ত

shab-e-barat-roja-niyat


শবে বরাতের রোজা কয়টি ও রোজার নিয়ম ও নিয়ত

শবে বরাত মুসলিম সমাজে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। প্রতি বছর শা‘বান মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই রাত ও এর পরের দিনের রোজা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো করা হয় তা হলো—শবে বরাতের রোজা কয়টি, এটি ফরজ না নফল, রোজার সঠিক নিয়ম কী এবং নিয়ত কখন ও কীভাবে করতে হবে। দুঃখজনকভাবে এসব বিষয়ে অনেক ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। তাই আবেগ নয়, বরং কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি
এই লেখায় শবে বরাতের রোজা সম্পর্কে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সহজ ও তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা হলো।

শবে বরাতের রোজা কয়টি?


শবে বরাত মূলত শা‘বান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত। এর পরের দিন অর্থাৎ ১৫ শা‘বানের দিনে নফল রোজা রাখা যায়
ইসলামী শরিয়তে শবে বরাত উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যক রোজা ফরজ বা ওয়াজিব করা হয়নি
👉 পরিষ্কার ও সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—
শবে বরাত উপলক্ষে সাধারণভাবে ১টি নফল রোজা রাখা যায়।
এর বেশি বা কম রোজা রাখাকে শবে বরাতের সঙ্গে আবশ্যকভাবে যুক্ত করার কোনো সহিহ দলিল নেই। কেউ যদি শা‘বান মাসে নিয়মিত নফল রোজা রাখেন, সেটি আলাদা আমল হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু “শবে বরাতের জন্য ৩টি বা ৫টি রোজা রাখা জরুরি”—এমন ধারণার কোনো প্রমাণ শরিয়তে পাওয়া যায় না।

শা‘বান মাসে রোজার গুরুত্ব


শবে বরাতের রোজা সঠিকভাবে বোঝার জন্য আগে শা‘বান মাসে রোজার গুরুত্ব জানা প্রয়োজন, কারণ শবে বরাত এই শা‘বান মাসেরই একটি অংশ।
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন—
তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন,
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শা‘বান মাসে এত বেশি রোজা রাখেন কেন?”
রাসূল ﷺ উত্তরে বলেন—
“এটি এমন একটি মাস, যেটিকে মানুষ রজব ও রমজানের মাঝখানে অবহেলা করে। এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়, আর আমি চাই আমার আমল রোজা অবস্থায় পেশ হোক।”
(সুনানে নাসাঈ: ২৩৫৭ – সহিহ)
এই হাদীস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে শা‘বান মাসে নফল রোজা রাখা একটি সুন্নাহ ও ফজিলতপূর্ণ আমল

শবে বরাতের রাতের আমল

শবে বরাতের রাতকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে ইবাদতের আগ্রহ দেখা যায়। তবে এই রাতের আমল নির্ধারণ করতে হলে আবেগ নয়, বরং কুরআন ও সহিহ হাদীসের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আন্তরিক তওবা করা। হাদীসের আলোকে বোঝা যায়, এই রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং যারা শিরক ও অন্তরের বিদ্বেষে লিপ্ত নয়, তাদের ক্ষমা করেন। তাই এই রাতের ইবাদতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তরকে পরিষ্কার করা, হিংসা ও শত্রুতা দূর করা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা।
এ রাতে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইস্তিগফারে সময় কাটানো উত্তম। তবে নির্দিষ্ট কোনো সূরা বা নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত বাধ্যতামূলক—এমন কোনো সহিহ দলিল নেই। তাই সাধ্যের মধ্যে সাধারণ নফল ইবাদত করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সুন্নাহসম্মত পথ।


১৫ শা‘বানের রোজা—ফরজ না নফল?

১৫ শা‘বানের দিনের রোজা সম্পর্কে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি। এই রোজা—

ফরজ নয়
ওয়াজিব নয়
সুন্নাতে মুয়াক্কাদাও নয়
👉 এটি একটি নফল রোজা।
কিছু হাদীস ও আলেমদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এই দিনে নফল রোজা রাখা জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। তবে একে বাধ্যতামূলক মনে করা বা না রাখলে গুনাহ হবে—এমন ধারণা শরিয়তসম্মত নয়।


শবে বরাতের রোজার নিয়ম


শবে বরাতের রোজার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ নিয়ম নেই। এটি অন্যান্য নফল রোজার মতোই পালন করতে হয়।
রোজার নিয়ম সংক্ষেপে হলো—
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া, পান করা এবং সব ধরনের রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা। একই সঙ্গে রোজার মূল উদ্দেশ্য মনে রাখতে হবে—নিজেকে সংযত রাখা, মিথ্যা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহভীতি অর্জন করা। শুধু না খেয়ে থাকাই রোজার পূর্ণতা নয়।


শবে বরাতের রোজার নিয়ত

নফল রোজার নিয়ত করা অত্যন্ত সহজ। ইসলামে নিয়ত হলো অন্তরের দৃঢ় সংকল্প। মুখে আরবি ভাষায় নিয়ত বলা ফরজ নয়।
নফল রোজার নিয়তের নিয়ম হলো—
রাতে নিয়ত করা উত্তম। তবে প্রয়োজনে দিনের বেলাতেও নিয়ত করা যায়, যদি তখন পর্যন্ত কিছু খাওয়া বা পান করা না হয়।
শবে বরাতের রোজার একটি সহজ বাংলা নিয়ত হতে পারে—
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল শবে বরাতের নফল রোজা রাখার নিয়ত করলাম।”
তবে মনে রাখতে হবে—এই বাক্য মুখে না বললেও, অন্তরে সিদ্ধান্ত থাকলেই রোজা সহিহ হয়ে যায়।


শবে বরাতের রোজা না রাখলে গুনাহ হবে কি?


এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর পরিষ্কার উত্তর হলো—
👉 না, শবে বরাতের রোজা না রাখলে কোনো গুনাহ হবে না।
কারণ এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং নফল ইবাদত। নফল ইবাদত পালন করলে সওয়াব পাওয়া যায়, আর না করলে গুনাহ হয় না। তবে কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই রোজা রাখেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সওয়াবের অধিকারী হবেন।


প্রচলিত ভুল ধারণা

শবে বরাতের রোজা নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন—
শবে বরাতে ৩টি বা ৫টি রোজা রাখা বাধ্যতামূলক,
এই রোজা না রাখলে গুনাহ হবে,
নির্দিষ্ট আরবি নিয়ত না পড়লে রোজা হবে না।
এসব ধারণার কোনোটি সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়। ইসলামে গ্রহণযোগ্য আমল সেইটাই, যা কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।


উপসংহার

শবে বরাতের রোজা কয়টি, এর নিয়ম ও নিয়ত—এই বিষয়গুলো কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে পরিষ্কারভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। সংক্ষেপে বলা যায়, শবে বরাত উপলক্ষে ১টি নফল রোজা রাখা যায়, এটি ফরজ নয় এবং না রাখলে গুনাহ হয় না। রোজার নিয়ম অন্যান্য নফল রোজার মতোই এবং নিয়ত অন্তরে করলেই যথেষ্ট।
আবেগ নয়, বরং সুন্নাহভিত্তিক আমলই একজন সচেতন মুসলমানের পথ।


শবে বরাতের রোজা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১: শবে বরাতের রোজা কয়টি রাখা যায়?

উত্তর:
শবে বরাত উপলক্ষে সাধারণভাবে ১৫ শা‘বানের দিনে ১টি নফল রোজা রাখা যায়। ইসলামী শরিয়তে এই রোজার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই শবে বরাতের সঙ্গে ৩টি বা ৫টি রোজা আবশ্যক মনে করার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।


প্রশ্ন ২: শবে বরাতের রোজা কি ফরজ?

উত্তর:
না, শবে বরাতের রোজা ফরজ নয়। এটি একটি নফল ইবাদত। নফল রোজা রাখলে সওয়াব পাওয়া যায়, আর না রাখলে কোনো গুনাহ হয় না। তাই এই রোজাকে বাধ্যতামূলক মনে করা ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।


প্রশ্ন ৩: শবে বরাতের রোজার নিয়ত কখন করতে হয়?

উত্তর:
নফল রোজার নিয়ত রাতে করা উত্তম। তবে কেউ যদি রাতে নিয়ত করতে না পারে, তাহলে দিনের বেলাতেও নিয়ত করা যায়—শর্ত হলো সুবহে সাদিকের পর থেকে তখন পর্যন্ত কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা হয়নি। ইসলামে নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ।


প্রশ্ন ৪: শবে বরাতের রোজা না রাখলে গুনাহ হবে কি?

উত্তর:
না, শবে বরাতের রোজা না রাখলে কোনো গুনাহ হবে না। কারণ এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং নফল রোজা। তবে কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই রোজা রাখে, তাহলে সে অবশ্যই সওয়াবের অধিকারী হবে।


প্রশ্ন ৫: শবে বরাতের রোজার জন্য আলাদা কোনো নিয়ম আছে কি?

উত্তর:
না, শবে বরাতের রোজার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ নিয়ম নেই। এটি অন্যান্য নফল রোজার মতোই আদায় করতে হয়। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকাই এর মূল নিয়ম।


 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url