শবে বরাত কবে? শবে বরাতের ফজিলত ও আমল
ইসলামী বর্ষপঞ্জির অন্যতম আলোচিত রাত হলো শবে বরাত। প্রতি বছর শা‘বান মাসের মাঝামাঝি এ রাতটি মুসলমানদের মধ্যে ইবাদত, দোয়া ও আত্মসমালোচনার রাত হিসেবে পরিচিত। তবে শবে বরাত নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে—শবে বরাত কবে? এর প্রকৃত ফজিলত কী? এবং কোন আমলগুলো কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত?
এই লেখায় আমরা আবেগ বা প্রচলিত ধারণা নয়; বরং কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে তথ্যভিত্তিকভাবে শবে বরাতের সময়, মর্যাদা ও করণীয় আমল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
শবে বরাত কবে?
শবে বরাত পালিত হয় শা‘বান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতে—অর্থাৎ ১৫ শা‘বানের রাত। আরবি ভাষায় এই রাতকে বলা হয় “লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান” (শা‘বান মাসের মধ্যরাত্রি)।
ইসলামী ক্যালেন্ডার চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, অঞ্চলভেদে শবে বরাতের তারিখ একদিন এদিক–ওদিক হতে পারে।
“শবে বরাত” নামের অর্থ কী?
“বরাত” শব্দটি ফারসি, যার অর্থ—
✔️ মুক্তি
✔️ নিষ্কৃতি
✔️ রেহাই
এই রাতকে অনেকেই গুনাহ থেকে মুক্তির রাত হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ইসলামে কোনো নাম বা ধারণা গ্রহণযোগ্য হয় তখনই, যখন তা কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয়।
শবে বরাতের ফজিলত
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি বহুল আলোচিত হাদীস
“আল্লাহ তাআলা শা‘বান মাসের মধ্যরাতে (শবে বরাতে) আসমানে দুনিয়াতে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।”
📚 (ইবনে মাজাহ)
এই হাদীস থেকে বোঝা যায়—
✔️ এই রাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়
✔️ ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত থাকে
✔️ অন্তরের রোগ (হিংসা, বিদ্বেষ) ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করে
📌 অনেক মুহাদ্দিস এই হাদীসের সনদকে হাসান লিগাইরিহি বলেছেন—অর্থাৎ একাধিক বর্ণনার কারণে অর্থ গ্রহণযোগ্য।
কুরআনের আলোকে শবে বরাত
কুরআনে সরাসরি “শবে বরাত” শব্দটি উল্লেখ নেই। তবে সূরা দুখানে এসেছে—
“নিশ্চয়ই আমি এটি এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি।”
📖 (সূরা আদ-দুখান: ৩)
বেশিরভাগ তাফসিরকারদের মতে, এখানে “বরকতময় রাত” বলতে লাইলাতুল কদর বোঝানো হয়েছে।
অতএব, কুরআনের দৃষ্টিতে শবে বরাতের ফজিলত প্রমাণে আমাদের হাদীসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
শবে বরাতের রাতে করণীয় আমল
১. নফল নামাজ ও ইবাদত
শবে বরাতে নফল ইবাদত করা জায়েজ ও উত্তম। তবে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতির নামাজ সহিহ হাদীসে প্রমাণিত নয়।
✔️ দুই রাকাত করে নফল নামাজ
✔️ তাহাজ্জুদ আদায়
✔️ খুশু-খুযু সহ ইবাদত
২. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার
এই রাতের অন্যতম মূল আমল হলো ক্ষমা প্রার্থনা।
“হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন—আমাকে ক্ষমা করুন।”
📌 অন্তর থেকে তওবা করা এই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল।
৩. কুরআন তিলাওয়াত
নির্দিষ্ট সূরা নির্ধারণ না করে, যতটুকু সম্ভব মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম।
৪. পরের দিনে নফল রোজা
১৫ শা‘বানের দিনে নফল রোজা রাখা সম্পর্কে কিছু হাদীস পাওয়া যায়।
তাই সাধারণ নফল রোজার নিয়তে রোজা রাখা জায়েজ।
তবে এটিকে ফরজ বা আবশ্যক মনে করা যাবে না।
শবে বরাত নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
❌নির্দিষ্ট সূরা পড়ে নির্দিষ্ট ফজিলত নির্ধারণ
❌ আতশবাজি, আলোকসজ্জা
❌ ভাগ্য লেখা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়—এমন বিশ্বাস
এসব বিষয়ের সহিহ দলিল নেই। তাই সুন্নাহভিত্তিক আমলে সীমাবদ্ধ থাকাই নিরাপদ।
শবে বরাত ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা
শবে বরাত আমাদের শেখায়—
✔️ আল্লাহর রহমত অবারিত
✔️ ক্ষমা পাওয়ার আগে অন্তর পরিষ্কার করতে হবে
✔️ অহংকার ও বিদ্বেষ ত্যাগ জরুরি
এই রাত যদি আমাদের চরিত্র বদলে দিতে না পারে, তবে শুধু রাত জাগার কোনো মূল্য নেই।
উপসংহার
শবে বরাত কবে, এর ফজিলত ও আমল—সবকিছুই বুঝতে হবে কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে।
এই রাত আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের একটি বড় সুযোগ। তবে আবেগ নয়, সুন্নাহভিত্তিক আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। তাই শবে বরাতকে গুনাহ মাফ, তওবা ও আত্মশুদ্ধির রাত হিসেবে কাজে লাগানোই একজন মুমিনের প্রকৃত সাফল্য।
