মোহরানা | কত দিতে হয়, নিয়ম কী (ইসলামের আলোকে সম্পূর্ণ গাইড)
মোহরানা কত দিতে হয়, নিয়ম কী: শরীয়তসম্মত সম্পূর্ণ গাইড
ভূমিকা
মোহরানা ইসলামি বিবাহের একটি অপরিহার্য অংশ এবং স্ত্রীর অধিকার যা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে তাদের মোহরানা সদিচ্ছার সাথে প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা আন-নিসা: ৪)। এটি শুধু একটি প্রথা নয় বরং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব এবং তার সম্মানের প্রতীক। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে মোহরানা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়েছে। কেউ মোহরানা অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়, কেউ আবার এর গুরুত্ব উপেক্ষা করে। কুরআন ও হাদিসে মোহরানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে যা মেনে চললে বিবাহ সহজ এবং বরকতময় হয় বলে আশা করা যায়। সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকে মোহরানা নির্ধারণ, পরিশোধ এবং অধিকার সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে থাকেন। এই লেখায় আমরা ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী মোহরানা কত হওয়া উচিত, কীভাবে নির্ধারণ করতে হয়, পরিশোধের নিয়ম এবং প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান সঠিক জ্ঞান নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতে পারেন।
মোহরানা কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
মোহরানা হলো বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত একটি নির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদ যা তার একান্ত অধিকার। শরয়ী সংজ্ঞা: মোহরানা হলো সেই অর্থ বা সম্পদ যা বিবাহের কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে দিতে বাধ্য থাকে এবং এটি স্ত্রীর একচ্ছত্র মালিকানা। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন যে তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহরানা খুশি মনে প্রদান করো (সূরা নিসা: ৪)। এটি স্ত্রীর অধিকার এবং স্বামীর দায়িত্ব। স্ত্রীর সম্মান: মোহরানা স্ত্রীর সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে ইসলাম নারীকে আর্থিক অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছে। বাধ্যতামূলক: মোহরানা বিবাহের একটি বাধ্যতামূলক শর্ত এবং এটি ছাড়া বিবাহ সম্পূর্ণ হয় না। আইনি অধিকার: মোহরানা পরিশোধ করা স্বামীর আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব এবং এতে অবহেলা করা গুনাহ। আর্থিক নিরাপত্তা: মোহরানা স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তার একটি মাধ্যম এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদ। তালাকের অধিকার: যদি স্বামী মোহরানা পরিশোধ না করে তাহলে স্ত্রী তালাক চাইতে পারে এবং আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে।
মোহরানা স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং এর সঠিক পরিশোধ স্বামীর ঈমানি দায়িত্ব যা পালন করা আবশ্যক।
কুরআনের আলোকে মোহরানা
কুরআনে মোহরানা সম্পর্কে স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন নির্দেশনা রয়েছে। ফরজ হিসেবে: আল্লাহ তায়ালা মোহরানাকে ফরজ বা বাধ্যতামূলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন তোমরা নারীদের তাদের মোহরানা ফরজ হিসেবে প্রদান করো (সূরা নিসা: ৪)। খুশি মনে দেওয়া: মোহরানা শুধু দিলেই হবে না বরং খুশি মনে এবং সম্মানের সাথে দিতে হবে। কুরআনে 'নিহলাহ' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ খুশি মনে উপহার। স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার: কুরআনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে মোহরানা সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর এবং এতে স্বামী, শ্বশুরবাড়ি বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। মাফ করার অধিকার: যদি স্ত্রী নিজে খুশি মনে মোহরানার কিছু অংশ মাফ করে দেয় তাহলে সেটা গ্রহণ করা যায় (সূরা নিসা: ৪)। তবে চাপ দিয়ে বা জোর করে মাফ করানো হারাম। তালাকের ক্ষেত্রে: তালাক হলেও মোহরানা পরিশোধ করতে হবে। স্পর্শ করার আগে তালাক হলে অর্ধেক মোহরানা দিতে হবে (সূরা বাকারা: ২৩৭)। বিধবার মোহরানা: স্বামী মারা গেলেও মোহরানা পরিশোধ করতে হবে এবং এটি তার সম্পত্তি থেকে প্রথমে দিতে হবে।
কুরআনে মোহরানা স্ত্রীর একটি মৌলিক অধিকার এবং এটি পরিশোধ করা স্বামীর ফরজ দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
মোহরানা কত হওয়া উচিত
শরিয়তে মোহরানার সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত আছে তবে মধ্যপন্থা উৎসাহিত করা হয়েছে। সর্বনিম্ন সীমা: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মোহরানার সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো দশ দিরহাম (প্রায় ৩০ গ্রাম রুপা) যা বর্তমান মূল্যে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। এর কম হলে শরিয়তসম্মত হবে না। সর্বোচ্চ সীমা: মোহরানার কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই এবং যত ইচ্ছা তত দেওয়া যায়। তবে সামর্থ্যের বাইরে মোহরানা নির্ধারণ করা উচিত নয়। রাসুলের সুন্নত: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এর মোহরানা ছিল ৪৮০ দিরহাম রুপা (সুনানে নাসায়ি: ৩৩৫৭) যা মধ্যম পর্যায়ের এবং অনুসরণযোগ্য। সহজীকরণ: হাদিসে এসেছে যে সর্বোত্তম নারী সেই যার মোহরানা সহজ (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৯৯৮, সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭)। অতিরিক্ত মোহরানা বিবাহকে কঠিন করে। পারিবারিক প্রথা: একই পরিবারের মেয়েদের মোহরানার সমান হওয়া উচিত যাতে বৈষম্য না হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী: স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে মোহরানা নির্ধারণ করা উচিত যাতে পরিশোধ করতে পারে। বরকতের মোহরানা: কম মোহরানায় বেশি বরকত থাকে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। অতিরিক্ত মোহরানা বিবাহে জটিলতা সৃষ্টি করে।
মোহরানা মধ্যপন্থী এবং সামর্থ্য অনুযায়ী হওয়া উচিত যাতে স্বামী সহজে পরিশোধ করতে পারে এবং বিবাহ সহজ হয়।
মোহরানা নির্ধারণের নিয়ম
মোহরানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু ইসলামি নিয়ম ও শিষ্টাচার রয়েছে। আকদের সময়: মোহরানা বিবাহের আকদের সময় নির্ধারণ করা উত্তম এবং এটি বিবাহনামায় লিখতে হয়। উভয়পক্ষের সম্মতি: মোহরানা নির্ধারণে বর ও কনে উভয়ের সম্মতি প্রয়োজন। জোর করে বা চাপ দিয়ে মোহরানা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। স্পষ্টতা: মোহরানার পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে - কত টাকা, কখন দিবে (তাৎক্ষণিক বা বিলম্বিত), কোন মুদ্রায় ইত্যাদি। তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত: মোহরানা দুই ভাগে ভাগ করা যায় - প্রম্পট (বিবাহের সময় দিতে হবে) এবং ডিফার্ড (তালাক বা মৃত্যুর সময় দিতে হবে)। তবে সম্পূর্ণ তাৎক্ষণিক দেওয়া উত্তম। লিখিত রাখা: মোহরানা বিবাহনামায় এবং আলাদা দলিলে লিখে রাখা উচিত যাতে পরে বিবাদ না হয়। অর্থ বা সম্পদ: মোহরানা নগদ টাকা, সোনা-রুপা বা অন্য যেকোনো মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। তবে মূল্য নির্ধারিত থাকতে হবে। পরিবর্তন: একবার নির্ধারণের পর মোহরানা পরিবর্তন করতে হলে স্ত্রীর সম্মতি লাগবে।
মোহরানা নির্ধারণে স্বচ্ছতা, সততা এবং উভয়পক্ষের সম্মতি থাকা জরুরি এবং লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।
মোহরানা পরিশোধের সঠিক পদ্ধতি
মোহরানা পরিশোধের ক্ষেত্রে ইসলামি নিয়মকানুন মেনে চলা আবশ্যক। বিবাহের সময়: যদি প্রম্পট বা তাৎক্ষণিক মোহরানা ধার্য করা হয় তাহলে বিবাহের সময়ই তা পরিশোধ করা উচিত। বিলম্ব করা অন্যায়। স্ত্রীর দাবি: স্ত্রী যখনই মোহরানা দাবি করবে তখনই দিতে হবে। এটি তার অধিকার এবং বিলম্ব করা গুনাহ। কিস্তিতে পরিশোধ: যদি একসাথে পরিশোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে স্ত্রীর সম্মতিতে কিস্তিতে দেওয়া যায়। তবে এটি অবশ্যই লিখিত থাকতে হবে। বাস্তববাদী: যদি মোহরানা অতিরিক্ত বেশি নির্ধারণ করা হয় এবং পরিশোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে কমানো যায়। সম্মানের সাথে: মোহরানা পরিশোধ করার সময় সম্মান এবং ভালোবাসার সাথে দিতে হবে, অনিচ্ছা বা বিরক্তি প্রকাশ করা অনুচিত। তালাকের ক্ষেত্রে: তালাক হলে পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে এবং এতে কোনো ছাড় নেই। মোহরানা না দিয়ে তালাক দেওয়া যাবে না। মৃত্যুর পূর্বে: স্বামীর মৃত্যুর পূর্বে মোহরানা পরিশোধ করে যাওয়া উচিত নয়তো এটি তার সম্পত্তির ঋণ হিসেবে গণ্য হবে।
মোহরানা পরিশোধ করা স্বামীর ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব এবং এতে বিলম্ব বা অবহেলা করা অন্যায় ও গুনাহ।
মোহরানা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে মোহরানা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা এবং কুসংস্কার রয়েছে যা দূর করা জরুরি। ভুল ১: মোহরানা লেনদেন: অনেকে মনে করে মোহরানা একটি লেনদেন বা দরদাম যা সম্পূর্ণ ভুল। মোহরানা স্ত্রীর অধিকার এবং সম্মানের প্রতীক, কেনাবেচা নয়। ভুল ২: যত বেশি তত ভালো: অনেকে মনে করে মোহরানা যত বেশি হবে তত ভালো। কিন্তু হাদিসে কম মোহরানায় বেশি বরকত বলা হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭)। ভুল ৩: মোহরানা না দিলেও চলে: কেউ কেউ মনে করে মোহরানা শুধু কাগজে-কলমে এবং আসলে দিতে হয় না। এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং গুনাহ। ভুল ৪: শ্বশুরবাড়ির অধিকার: অনেক জায়গায় মোহরানা শ্বশুরবাড়ি নিয়ে নেয় যা সম্পূর্ণ হারাম। মোহরানা শুধুমাত্র স্ত্রীর। ভুল ৫: তালাক হলে ফেরত: কেউ কেউ মনে করে তালাক হলে মোহরানা ফেরত দিতে হয়। এটি ভুল, তালাক হলেও মোহরানা স্ত্রীর থাকবে। ভুল ৬: মৌখিক মাফ: অনেক সময় মেয়েকে জোর করে বা চাপ দিয়ে মোহরানা মাফ করানো হয় যা হারাম। মাফ করতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। ভুল ৭: নামমাত্র মোহরানা: অনেকে নামমাত্র (যেমন ১ টাকা) মোহরানা দেয় যা শরিয়তসম্মত নয়। সর্বনিম্ন সীমা আছে।
এই ভুল ধারণাগুলো সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং স্ত্রীর অধিকার হরণ করে যা থেকে বিরত থাকা উচিত।
উপসংহার
মোহরানা ইসলামি বিবাহের একটি অপরিহার্য অংশ এবং স্ত্রীর মৌলিক অধিকার। কুরআন ও হাদিসে এর স্পষ্ট বিধান রয়েছে এবং সঠিকভাবে পালন করলে বিবাহে বরকত আসে বলে আশা করা যায়। ইসলামে মোহরানা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সম্মান, দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আসুন, আমরা সবাই মোহরানা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করি এবং ইসলামি নিয়ম মেনে চলি। মনে রাখি যে মোহরানা স্ত্রীর অধিকার এবং স্বামীর ফরজ দায়িত্ব যা পরিশোধ করা আবশ্যক। মোহরানা নির্ধারণে মধ্যপন্থা অবলম্বন করি - না অতিরিক্ত বেশি যা পরিশোধ করা কঠিন, না এত কম যা শরিয়তসম্মত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত অনুসরণ করি এবং সহজ মোহরানা নির্ধারণ করি যাতে বিবাহ সহজ হয়। বিবাহের সময়ই মোহরানা স্পষ্ট করে নির্ধারণ করি এবং বিবাহনামায় লিখে রাখি। তাৎক্ষণিক মোহরানা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিশোধ করি এবং বিলম্ব না করি। স্ত্রীর দাবিতে খুশি মনে এবং সম্মানের সাথে মোহরানা পরিশোধ করি। মোহরানা স্ত্রীর একচ্ছত্র সম্পদ - শ্বশুরবাড়ি বা অন্য কেউ নিতে পারবে না। জোর করে বা চাপ দিয়ে মোহরানা মাফ করানো থেকে বিরত থাকি। প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো পরিহার করি এবং সঠিক ইসলামি বিধান মেনে চলি। সমাজে সচেতনতা তৈরি করি যাতে সবাই মোহরানার গুরুত্ব বুঝে। মনে রাখি যে মোহরানা সঠিকভাবে পরিশোধ করা স্বামীর ঈমানের পরিচয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। পরিবার ও সন্তানদের মোহরানার সঠিক বিধান শেখাই যাতে পরবর্তী প্রজন্ম সচেতন হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মোহরানার অধিকার রক্ষা করার এবং সঠিকভাবে পরিশোধ করার তৌফিক দান করুন। আমাদের বিবাহে বরকত দিন এবং সুখী দাম্পত্য জীবন দান করুন। আমীন।
মোহরানা নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. মোহরানা কী এবং এটি কেন বাধ্যতামূলক?
মোহরানা হলো বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রদত্ত একটি নির্দিষ্ট অর্থ বা সম্পদ যা তার একান্ত অধিকার এবং আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এটি বাধ্যতামূলক করেছেন। আল্লাহ বলেন তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহরানা খুশি মনে প্রদান করো এবং এটি ফরজ হিসেবে দাও (সূরা নিসা: ৪)। মোহরানা স্ত্রীর সম্মান এবং মর্যাদার প্রতীক যা প্রমাণ করে যে ইসলাম নারীকে আর্থিক অধিকার ও স্বাধীনতা দিয়েছে। এটি বিবাহের একটি বাধ্যতামূলক শর্ত এবং এটি ছাড়া বিবাহ সম্পূর্ণ হয় না। মোহরানা পরিশোধ করা স্বামীর আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব এবং এতে অবহেলা করা গুনাহ। এটি স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তার একটি মাধ্যম এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদ যা সে যেকোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। যদি স্বামী মোহরানা পরিশোধ না করে তাহলে স্ত্রী তালাক চাইতে পারে এবং আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। মোহরানা শুধু একটি প্রথা নয় বরং স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব এবং তার সম্মানের চিহ্ন যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা সমর্থিত।
২. শরিয়ত অনুযায়ী মোহরানার সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ কত?
শরিয়তে মোহরানার সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত আছে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মোহরানার সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো দশ দিরহাম অর্থাৎ প্রায় ৩০ গ্রাম রুপা যা বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। এর কম হলে শরিয়তসম্মত মোহরানা হবে না এবং বিবাহ অসম্পূর্ণ থাকবে। অন্যদিকে মোহরানার কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই এবং যত ইচ্ছা তত দেওয়া যায় তবে সামর্থ্যের বাইরে মোহরানা নির্ধারণ করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কন্যা ফাতিমা (রা.) এর মোহরানা ছিল ৪৮০ দিরহাম রুপা (সুনানে নাসায়ি: ৩৩৫৭) যা মধ্যম পর্যায়ের এবং অনুসরণযোগ্য। হাদিসে এসেছে যে সর্বোত্তম নারী সেই যার মোহরানা সহজ (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৯৯৮, সুনানে আবু দাউদ: ২১১৭) এবং অতিরিক্ত মোহরানা বিবাহকে কঠিন করে দেয়। তাই স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে মোহরানা নির্ধারণ করা উচিত যাতে সে সহজে পরিশোধ করতে পারে এবং বিবাহ সহজ হয়। কম মোহরানায় বেশি বরকত থাকে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।
৩. মোহরানা কখন এবং কীভাবে পরিশোধ করতে হয়?
মোহরানা পরিশোধের ক্ষেত্রে ইসলামি নিয়মকানুন রয়েছে। যদি প্রম্পট বা তাৎক্ষণিক মোহরানা ধার্য করা হয় তাহলে বিবাহের সময়ই তা পরিশোধ করা উচিত এবং বিলম্ব করা অন্যায়। স্ত্রী যখনই মোহরানা দাবি করবে তখনই দিতে হবে কারণ এটি তার অধিকার এবং বিলম্ব করা গুনাহ। যদি একসাথে পরিশোধ করা সম্ভব না হয় তাহলে স্ত্রীর সম্মতিতে কিস্তিতে দেওয়া যায় তবে এটি অবশ্যই লিখিত থাকতে হবে। মোহরানা দুই ভাগে ভাগ করা যায় - প্রম্পট (বিবাহের সময় দিতে হবে) এবং ডিফার্ড (তালাক বা মৃত্যুর সময় দিতে হবে) তবে সম্পূর্ণ তাৎক্ষণিক দেওয়া উত্তম। মোহরানা পরিশোধ করার সময় সম্মান এবং ভালোবাসার সাথে দিতে হবে এবং অনিচ্ছা বা বিরক্তি প্রকাশ করা অনুচিত। তালাক হলে পূর্ণ মোহরানা দিতে হবে এবং এতে কোনো ছাড় নেই। স্বামীর মৃত্যুর পূর্বে মোহরানা পরিশোধ করে যাওয়া উচিত নয়তো এটি তার সম্পত্তির ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং অন্যান্য উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে মোহরানা পরিশোধ করতে হবে। মোহরানা নগদ টাকা, সোনা-রুপা বা অন্য যেকোনো মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
৪. মোহরানা কি স্ত্রী মাফ করতে পারে এবং কীভাবে?
হ্যাঁ, স্ত্রী চাইলে তার মোহরানা সম্পূর্ণ বা আংশিক মাফ করতে পারে কিন্তু শর্ত হলো এটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং খুশি মনে হতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে যে যদি স্ত্রী নিজে খুশি মনে মোহরানার কিছু অংশ মাফ করে দেয় তাহলে সেটা গ্রহণ করা যায় (সূরা নিসা: ৪)। তবে চাপ দিয়ে, জোর করে বা কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করে মাফ করানো সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং এমন মাফ শরিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক সময় পরিবার বা সমাজের চাপে মেয়েরা মোহরানা মাফ করে দেয় যা অন্যায়। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কারো উচিত নয় মোহরানা মাফ করতে বলা বা চাপ দেওয়া। স্ত্রী যদি সত্যিকার অর্থে খুশি মনে এবং কোনো প্রকার চাপ ছাড়াই মাফ করে তাহলে সেটা বৈধ এবং স্বামী গ্রহণ করতে পারে। তবে মাফ করার জন্য অনুরোধ করা বা প্ররোচিত করা উচিত নয়। মোহরানা স্ত্রীর অধিকার এবং তার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। যদি স্ত্রী মাফ করে তাহলে সেটা লিখিত রাখা উচিত যাতে পরে কোনো বিবাদ না হয়।
৫. মোহরানা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো কী এবং সঠিক বিধান কী?
আমাদের সমাজে মোহরানা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। প্রথম ভুল হলো অনেকে মনে করে মোহরানা একটি লেনদেন বা দরদাম কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি স্ত্রীর অধিকার এবং সম্মানের প্রতীক, কেনাবেচা নয়। দ্বিতীয় ভুল হলো মনে করা যে মোহরানা যত বেশি হবে তত ভালো কিন্তু হাদিসে কম মোহরানায় বেশি বরকত বলা হয়েছে। তৃতীয় ভুল হলো মনে করা মোহরানা শুধু কাগজে-কলমে এবং আসলে দিতে হয় না যা সম্পূর্ণ ভুল এবং গুনাহ। চতুর্থ ভুল হলো মোহরানা শ্বশুরবাড়ি নিয়ে নেওয়া যা সম্পূর্ণ হারাম কারণ মোহরানা শুধুমাত্র স্ত্রীর। পঞ্চম ভুল হলো মনে করা তালাক হলে মোহরানা ফেরত দিতে হয় কিন্তু তালাক হলেও মোহরানা স্ত্রীর থাকবে। ষষ্ঠ ভুল হলো জোর করে বা চাপ দিয়ে মোহরানা মাফ করানো যা হারাম এবং মাফ করতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। সপ্তম ভুল হলো নামমাত্র (যেমন ১ টাকা) মোহরানা দেওয়া যা শরিয়তসম্মত নয় কারণ সর্বনিম্ন সীমা আছে। এই ভুল ধারণাগুলো সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং স্ত্রীর অধিকার হরণ করে তাই সঠিক ইসলামি বিধান জানা এবং মেনে চলা জরুরি।
.jpeg)
