মাহরাম ও নন-মাহরাম তালিকা | কুরআন ও হাদীসের আলোকে


mahram-non-mahram-talika-islam

মাহরাম ও নন-মাহরাম তালিকা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে সম্পূর্ণ গাইড

ভূমিকা

ইসলামে মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখার মূল ভিত্তি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন কাদের সামনে নারী-পুরুষ পর্দা করতে পারবে এবং কাদের সামনে পর্দা করতে হবে। সূরা নূরে এই বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে (সূরা নূর: ৩১)। মাহরাম সম্পর্ক জানা প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ কারণ এটি দৈনন্দিন জীবনে পর্দার বিধান পালন, বিবাহ-শাদি এবং সফরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। অনেক মুসলমান মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না যা ভুল বোঝাবুঝি এবং শরিয়ত লঙ্ঘনের কারণ হতে পারে। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে মাহরাম কারা, নন-মাহরাম কারা এবং এদের সাথে কী ধরনের আচরণ করতে হবে তা বিস্তারিত আলোচনা করব।

মাহরাম কী: ইসলামে এর ধারণা

মাহরাম শব্দটি আরবি 'হারাম' থেকে এসেছে যার অর্থ নিষিদ্ধ। ইসলামি পরিভাষায় মাহরাম হলো সেই সব আত্মীয় যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম এবং যাদের সামনে পর্দা করা আবশ্যক নয়। সহজ ভাষায়, যেসব নিকট আত্মীয়ের সাথে বিবাহ ইসলামে কখনোই জায়েজ নয় তারাই মাহরাম। মাহরাম সম্পর্ক তিন ধরনের কারণে হতে পারে - রক্তের সম্পর্কে (নাসাব), দুধ পানের সম্পর্কে (রাদা'আহ) এবং বিবাহের সম্পর্কে (মুসাহারা)। রক্তের সম্পর্কে মাহরাম হলো মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা, দাদি, নানা, নানি ইত্যাদি। দুধ পানের সম্পর্কে মাহরাম হলো যে মহিলা শিশুকালে দুধ পান করিয়েছেন তিনি এবং তার স্বামী ও সন্তানরা। বিবাহের সম্পর্কে মাহরাম হলো শ্বশুর, শাশুড়ি, জামাই, পুত্রবধূ ইত্যাদি।

মাহরাম সম্পর্ক জানা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বিভিন্ন শরয়ি হুকুম নির্ধারণ করে। মাহরামদের সামনে নারীদের সাধারণ পর্দা করতে হয় না অর্থাৎ মুখ, হাত, পা খোলা রাখা যায় তবে শালীনতা বজায় রাখতে হয়। মাহরাম পুরুষের সাথে নারী নিরাপদে সফর করতে পারে। হাদিসে এসেছে যে নারীর মাহরাম ছাড়া সফর করা উচিত নয় (সহিহ বুখারি: ১৮৬২)। মাহরাম ও নন-মাহরামের পার্থক্য জানলে বিবাহের ক্ষেত্রেও ভুল হয় না এবং হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচা যায়। ইসলাম এই বিধান দিয়ে পরিবার ও সমাজে শালীনতা, সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত মাহরাম সম্পর্ক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা অনুসরণ করা।

কুরআনের আলোকে মাহরাম সম্পর্ক

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসায় স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন কাদের সাথে বিবাহ হারাম অর্থাৎ কারা মাহরাম। আল্লাহ বলেন, তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, দুধ-মা, দুধ-বোন, শ্বাশুড়ি, স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর কন্যা যদি তোমরা তার মায়ের সাথে সহবাস করে থাক, পুত্রবধূ এবং দুই বোনকে একসাথে বিবাহ করা (সূরা নিসা: ২৩)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মোট চৌদ্দ ধরনের নারীর কথা উল্লেখ করেছেন যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম। এই তালিকা থেকে স্পষ্ট হয় যে রক্তের নিকট সম্পর্ক, দুধ পানের সম্পর্ক এবং বিবাহসূত্রে তৈরি সম্পর্ক - এই তিন কারণে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে মুমিন নারীদের বলো তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে। আর তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র ছাড়া অন্যের কাছে সৌন্দর্য প্রকাশ না করে (সূরা নূর: ৩১)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে মাহরামদের সামনে নারীরা স্বাভাবিক পোশাকে থাকতে পারে তবে অন্যদের সামনে পর্দা করতে হবে। কুরআনের এই নির্দেশনা অনুসরণ করে মুসলমানরা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শালীনতা বজায় রাখে। এই বিধান শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং এটি সমাজে নিরাপত্তা, সম্মান এবং পবিত্রতা রক্ষার একটি কার্যকর ব্যবস্থা। কুরআনের এই স্পষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।

মাহরামদের পূর্ণ তালিকা

মাহরাম সম্পর্ক বোঝার জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য আলাদা তালিকা জানা জরুরি। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো।

নারীর জন্য মাহরাম কারা

একজন নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ হলেন যাদের সাথে তার বিবাহ চিরতরে হারাম এবং যাদের সামনে তিনি সাধারণ পর্দা করতে পারেন। রক্ত সম্পর্কীয় মাহরাম: পিতা, দাদা (বাবার বাবা), নানা (মায়ের বাবা), পুত্র, পৌত্র (ছেলের ছেলে), নাতি (মেয়ের ছেলে), ভাই (সহোদর, বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয়), ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা), বোনের ছেলে (ভাগনে), চাচা (বাবার ভাই), মামা (মায়ের ভাই)। দুধ সম্পর্কীয় মাহরাম: দুধ-পিতা (যিনি দুধ-মায়ের স্বামী), দুধ-ভাই, দুধ-ভাইয়ের ছেলে, দুধ-চাচা, দুধ-মামা। বিবাহসূত্রে মাহরাম: স্বামী, শ্বশুর (স্বামীর বাবা), স্বামীর দাদা, স্বামীর পূর্ববর্তী বিবাহের ছেলে (সৎ পুত্র), স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর পিতা (যদি বিবাহ সম্পন্ন হয়ে থাকে)।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: ভাইয়ের শ্বশুর, বোনের শ্বশুর, চাচার ছেলে, মামার ছেলে, খালার স্বামী, ফুফুর স্বামী - এরা মাহরাম নন। এদের সাথে পর্দা করতে হবে। অনেকে এই বিষয়ে ভুল করেন এবং মনে করেন চাচাতো/মামাতো ভাই বা দেবর মাহরাম, কিন্তু শরিয়তে তারা নন-মাহরাম। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দেবরকে মৃত্যু মনে কর (সহিহ বুখারি: ৫২৩২)। এর অর্থ হলো দেবর থেকে যেভাবে ভয় করা হয় সেভাবে সতর্ক থাকা কারণ সে নন-মাহরাম এবং তার সাথে অবাধে মেলামেশা করা ঠিক নয়।

পুরুষের জন্য মাহরাম কারা

একজন পুরুষের জন্য মাহরাম নারী হলেন যাদের সাথে তার বিবাহ চিরতরে হারাম এবং যাদের সামনে তিনি স্বাভাবিক পোশাকে থাকতে পারেন। রক্ত সম্পর্কীয় মাহরাম: মা, দাদি (বাবার মা), নানি (মায়ের মা), কন্যা, নাতনি (ছেলের মেয়ে), পৌত্রী (মেয়ের মেয়ে), বোন (সহোদর, বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয়), ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি), বোনের মেয়ে (ভাগনি), ফুফু (বাবার বোন), খালা (মায়ের বোন)। দুধ সম্পর্কীয় মাহরাম: দুধ-মা, দুধ-বোন, দুধ-ভাইয়ের মেয়ে, দুধ-ফুফু, দুধ-খালা। বিবাহসূত্রে মাহরাম: স্ত্রী, শাশুড়ি (স্ত্রীর মা), স্ত্রীর নানি/দাদি, স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর মেয়ে (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়ে থাকে), পুত্রবধূ (ছেলের স্ত্রী), পৌত্রবধূ (নাতির স্ত্রী)।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: স্ত্রীর বোন (শালী), স্ত্রীর ভাই এর স্ত্রী, ভাইয়ের স্ত্রী (ভাবি), চাচাতো/মামাতো/ফুফাতো/খালাতো বোন - এরা মাহরাম নন। এদের সাথে পর্দা করতে হবে এবং একান্তে বা অপ্রয়োজনে কথা বলা উচিত নয়। রক্ত, দুধ বা বিবাহ - এই তিন কারণ ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্ক মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে না।

নন-মাহরাম কারা

নন-মাহরাম হলো সেসব ব্যক্তি যারা মাহরাম নন এবং যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ। নন-মাহরামদের সাথে পর্দা করা ফরজ এবং তাদের সাথে একান্তে বা অবাধে মেলামেশা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। নারীর জন্য নন-মাহরাম পুরুষ: চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, খালাতো ভাই, দেবর (স্বামীর ভাই), জা (স্বামীর বোনের স্বামী), ভাইয়ের শ্বশুর, বোনের শ্বশুর, খালার স্বামী, ফুফুর স্বামী এবং অন্য সকল পর পুরুষ। পুরুষের জন্য নন-মাহরাম নারী: চাচাতো বোন, মামাতো বোন, ফুফাতো বোন, খালাতো বোন, ভাবি (ভাইয়ের স্ত্রী), শালী (স্ত্রীর বোন), স্ত্রীর ভাবি, ভাইয়ের শাশুড়ি এবং অন্য সকল পর নারী।

নন-মাহরামদের সাথে পর্দা করার অর্থ হলো নারী-পুরুষ উভয়ে নিজেদের দৃষ্টি নিচু রাখবে, একান্তে দেখা করবে না, অপ্রয়োজনে কথা বলবে না এবং প্রয়োজনে কথা বললেও শালীন ও সংক্ষিপ্ত কথা বলবে। হাদিসে এসেছে যে নারী-পুরুষ যখন একান্তে থাকে তখন শয়তান তৃতীয় জন হয় (তিরমিজি: ২১৬৫)। এর অর্থ হলো নন-মাহরামদের সাথে একান্তে থাকলে পাপের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই ইসলাম কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে নন-মাহরামদের সাথে সীমা বজায় রাখতে হবে। অনেকে আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে নন-মাহরামদের সাথে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে মেলামেশা করেন যা শরিয়ত সম্মত নয়। মনে রাখতে হবে যে আত্মীয় হলেই মাহরাম হয় না, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সম্পর্কই মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে।

মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কের ইসলামী নির্দেশনা

মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কে ইসলামের কিছু স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যা মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। মাহরামদের সাথে আচরণ: মাহরামদের সাথে স্বাভাবিক এবং সম্মানজনক সম্পর্ক রাখা উচিত। মাহরাম হলেও শালীনতা বজায় রাখতে হবে এবং অশ্লীল বা অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলতে হবে। মাহরাম পুরুষের সাথে নারী নিরাপদে সফর করতে পারে। হাদিসে এসেছে যে নারীর মাহরাম ছাড়া এক দিন এক রাতের পথ সফর করা উচিত নয় (সহিহ মুসলিম: ১৩৩৯)। মাহরামদের সামনে নারীরা মুখ, হাত, পা খোলা রাখতে পারে তবে শরীরের অন্যান্য অংশ ঢেকে রাখা উত্তম। নন-মাহরামদের সাথে আচরণ: নন-মাহরামদের সাথে পর্দা করা ফরজ। নারী-পুরুষ উভয়ে দৃষ্টি নিচু রাখবে এবং একে অপরের দিকে তাকাবে না। অপ্রয়োজনে কথা বলা থেকে বিরত থাকবে এবং প্রয়োজনে শুধু প্রয়োজনীয় কথা বলবে।

নন-মাহরামদের সাথে একান্তে বা দরজা বন্ধ করে থাকা হারাম। কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেখানে নন-মাহরামদের সাথে কাজ করতে হয় সেখানে শালীনতা বজায় রেখে কাজ করতে হবে এবং পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে। হাত মেলানো, কোলাকুলি বা শারীরিক স্পর্শ নন-মাহরামদের সাথে সম্পূর্ণ হারাম। অনেকে সামাজিকতার নামে নন-মাহরামদের সাথে হাত মেলান যা শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো পুরুষের মাথায় লোহার শলাকা বিদ্ধ করা তার জন্য উত্তম এমন নারী স্পর্শ করার চেয়ে যে তার জন্য হালাল নয় (তাবারানি)। বিশেষ নির্দেশনা: দুধ পান সম্পর্কীয় মাহরাম তৈরি হয় যদি শিশু দুই বছর বয়সের আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ (পাঁচবার পেট ভরে) দুধ পান করে। তাই দুধ পানের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত এবং প্রয়োজনে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কের এই নির্দেশনা মেনে চললে পরিবার ও সমাজে শালীনতা, সম্মান এবং নিরাপত্তা বজায় থাকে।

উপসংহার

মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্ক ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পর্দা এবং শালীনতা নিশ্চিত করে। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যা মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।

আসুন, আমরা সবাই মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্ক সঠিকভাবে জানি এবং মেনে চলি। পরিবারের সদস্যদের বিশেষত তরুণ-তরুণীদের এই বিষয়ে শিক্ষা দিই। মনে রাখি যে চাচাতো/মামাতো ভাই-বোন, দেবর, ভাবি, শালী - এরা মাহরাম নন এবং এদের সাথে পর্দা করতে হবে। নন-মাহরামদের সাথে অবাধে মেলামেশা, হাত মেলানো বা একান্তে থাকা থেকে বিরত থাকি। কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্দার বিধান মেনে চলি এবং শালীনতা বজায় রাখি। সন্তানদের ছোটবেলা থেকে এই শিক্ষা দিই যাতে তারা বড় হয়ে সঠিকভাবে চলতে পারে। বিবাহের ক্ষেত্রে মাহরাম-নন-মাহরাম জেনে সিদ্ধান্ত নিই যাতে ভুল না হয়। দুধ পানের বিষয়ে সতর্ক থাকি এবং প্রয়োজনে আলেমদের পরামর্শ নিই। মনে রাখি যে ইসলামের এই বিধান আমাদের সুরক্ষা ও সম্মানের জন্য এবং সমাজে শালীনতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে পর্দা করার এবং মাহরাম-নন-মাহরাম সম্পর্কের বিধান মেনে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।


FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. চাচাতো/মামাতো ভাই কি মাহরাম?

না, চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, ফুফাতো ভাই এবং খালাতো ভাই কেউই মাহরাম নন। এরা সবাই নন-মাহরাম এবং এদের সাথে পর্দা করা ফরজ। অনেকে ভুল করে মনে করেন যে আত্মীয় হলেই মাহরাম কিন্তু শরিয়তে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু সম্পর্কই মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন কারা মাহরাম এবং সেই তালিকায় চাচাতো/মামাতো ভাই নেই। তাই চাচাতো/মামাতো বোনদের সাথে পর্দা করতে হবে, একান্তে মিশতে হবে না এবং প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা উচিত নয়। তবে এদের সাথে বিবাহ জায়েজ আছে কারণ এরা নন-মাহরাম। অনেক মুসলমান পরিবারে এই বিষয়ে শিথিলতা দেখা যায় যা শরিয়ত সম্মত নয় এবং এ থেকে বিরত থাকা উচিত।

২. দেবর কি মাহরাম এবং তার সাথে কেমন আচরণ করতে হবে?

না, দেবর (স্বামীর ভাই) মাহরাম নন। দেবর সম্পূর্ণ নন-মাহরাম এবং তার সাথে কঠোর পর্দা করা ফরজ। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেবরকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করে বলেছেন যে দেবর থেকে সতর্ক থাকো (সহিহ বুখারি: ৫২৩২)। এর অর্থ হলো দেবরের সাথে যেমন ভয়ে থাকা হয় তেমনি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। দেবরের সাথে একান্তে থাকা, অবাধে কথা বলা বা মেলামেশা করা সম্পূর্ণ হারাম। যেহেতু দেবর ঘরের মানুষ এবং প্রায়ই আসা-যাওয়া করে তাই এক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। দেবরকে দেখলে পর্দা করতে হবে এবং প্রয়োজনে শুধু প্রয়োজনীয় কথা বলতে হবে। একইভাবে জেঠ (স্বামীর বড় ভাই) বা অন্যান্য দেবরও নন-মাহরাম।

৩. দুধ পানের মাধ্যমে কীভাবে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হয়?

দুধ পানের মাধ্যমে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হয় যদি একটি শিশু অন্য কোনো মহিলার (তার মা ছাড়া) দুধ পান করে নির্দিষ্ট শর্তে। হাদিসে বলা হয়েছে যে দুধ পানে যা হারাম হয় তা বংশ সম্পর্কেও হারাম হয় (সহিহ বুখারি: ২৬৪৫)। অর্থাৎ যে মহিলা শিশুকে দুধ পান করান তিনি তার দুধ-মা হয়ে যান এবং সেই মহিলার স্বামী দুধ-পিতা, তার সন্তানরা দুধ-ভাই-বোন হয়ে যায়। তবে এর জন্য কিছু শর্ত আছে - শিশুর বয়স দুই বছরের কম হতে হবে এবং কমপক্ষে পাঁচবার পেট ভরে দুধ পান করতে হবে। একবার বা দুইবার দুধ পান করলে মাহরাম সম্পর্ক তৈরি হয় না। দুধ পানের বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকা উচিত কারণ এটি ভবিষ্যতে বিবাহের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। যদি কোনো সন্দেহ হয় তাহলে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. নন-মাহরামের সাথে হাত মেলানো কি জায়েজ?

না, নন-মাহরামের সাথে হাত মেলানো বা কোনো ধরনের শারীরিক স্পর্শ করা সম্পূর্ণ হারাম। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন নন-মাহরাম নারী-পুরুষের স্পর্শ করা। তিনি বলেছেন যে কোনো পুরুষের মাথায় লোহার শলাকা বিদ্ধ করা উত্তম এমন নারী স্পর্শ করার চেয়ে যে তার জন্য হালাল নয় (তাবারানি)। রাসুল (সা.) নিজে কখনো নন-মাহরাম নারীর সাথে হাত মেলাননি। অনেকে সামাজিকতা, শিষ্টাচার বা আধুনিকতার নামে নন-মাহরামদের সাথে হাত মেলান যা শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নন-মাহরামদের সাথে হাত মেলানো থেকে বিরত থাকা উচিত এবং ভদ্রভাবে বলা যেতে পারে যে ধর্মীয় কারণে হাত মেলানো সম্ভব নয়। মুসলমানদের উচিত এ বিষয়ে দৃঢ় থাকা এবং শরিয়তের বিধান মেনে চলা।

৫. কর্মক্ষেত্রে নন-মাহরামদের সাথে কীভাবে আচরণ করবেন?

আধুনিক কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় নন-মাহরামদের সাথে কাজ করতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে ইসলামি নির্দেশনা মেনে চলা সম্ভব। প্রথমত, পর্দা বজায় রাখা - নারীরা হিজাব পরবেন এবং শালীন পোশাক পরবেন। দ্বিতীয়ত, দৃষ্টি নিচু রাখা এবং একে অপরের দিকে সরাসরি তাকানো থেকে বিরত থাকা। তৃতীয়ত, শুধু প্রয়োজনীয় কাজের কথা বলা এবং অপ্রয়োজনীয় আড্ডা বা হাসি-ঠাট্টা এড়িয়ে চলা। চতুর্থত, একান্তে বা দরজা বন্ধ করে কোনো নন-মাহরামের সাথে না থাকা। যদি মিটিং করতে হয় তাহলে দরজা খোলা রাখা বা তৃতীয় কেউ থাকা নিশ্চিত করা। পঞ্চমত, শারীরিক স্পর্শ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা - হাত মেলানো বা কাঁধে হাত রাখা থেকে বিরত থাকা। ষষ্ঠত, পেশাদার এবং সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখা। এভাবে কর্মক্ষেত্রে থেকেও ইসলামি বিধান মেনে চলা সম্ভব এবং এতে কাজের কোনো ক্ষতি হয় না বরং সম্মান বৃদ্ধি পায়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url