মাহরাম ও নন-মাহরাম তালিকা | কুরআন ও হাদীসের আলোকে
মাহরাম ও নন-মাহরাম তালিকা | কুরআন ও হাদীসের আলোকে (দলিলসহ)
ভূমিকা
ইসলাম মানুষের জীবনকে শালীনতা, নিরাপত্তা ও পবিত্রতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাহরাম ও নন-মাহরাম বিষয়টি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে যায়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে গুনাহের কারণ হতে পারে।
এই লেখায় আমরা জানবো—
-
মাহরাম ও নন-মাহরাম কী
-
কুরআনের আলোকে মাহরাম সম্পর্ক
-
হাদীসের দলিল
-
পূর্ণাঙ্গ মাহরাম ও নন-মাহরাম তালিকা
-
দৈনন্দিন জীবনে এর গুরুত্ব
মাহরাম কাকে বলে?
মাহরাম হলো সেইসব নিকট আত্মীয়, যাদের সাথে বিবাহ চিরস্থায়ীভাবে হারাম। এদের সাথে পর্দার বিধান শিথিল, সফর করা জায়েজ এবং স্বাভাবিক পারিবারিক মেলামেশা বৈধ।
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে—তোমাদের মা, কন্যা, বোন…”
— সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৩
এই আয়াত থেকেই মাহরামের মূল ভিত্তি নির্ধারিত হয়েছে।
মাহরাম কয় প্রকার?
ইসলামী শরিয়তে মাহরাম ৩ প্রকার—
-
রক্তের সম্পর্কের কারণে মাহরাম
-
দুধের সম্পর্কের কারণে মাহরাম
-
বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে মাহরাম
১️. রক্তের সম্পর্কের কারণে মাহরাম
নিম্নোক্ত ব্যক্তিরা চিরস্থায়ী মাহরাম—
-
বাবা, দাদা (উর্ধ্বতন)
-
ছেলে, নাতি (নিম্নতন)
-
সহোদর ভাই
-
চাচা (বাবার ভাই)
-
মামা (মায়ের ভাই)
-
ভাইয়ের ছেলে
-
বোনের ছেলে
📌 এদের সাথে বিয়ে হারাম এবং পর্দার বিধান সহজ।
২️. দুধের সম্পর্কের কারণে মাহরাম
যদি কোনো নারী শরিয়তসম্মতভাবে কোনো শিশুকে দুধ পান করান, তবে—
📖 রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
“যা রক্তসূত্রে হারাম, তা দুধসূত্রেও হারাম।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৬৪৫
দুধের সম্পর্কের মাহরাম উদাহরণ—
-
দুধ মা
-
দুধ বাবা
-
দুধ ভাই
-
দুধ চাচা, মামা
৩️.বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে মাহরাম
বিয়ের কারণে যেসব সম্পর্ক মাহরাম হয়ে যায়—
-
শ্বশুর (স্বামীর বাবা)
-
সৎ ছেলে
-
জামাই
-
শাশুড়ি
📖 কুরআনে বলা হয়েছে—
“তোমাদের স্ত্রীদের মায়েরা তোমাদের জন্য হারাম।”
— সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৩
নন-মাহরাম কাকে বলে?
নন-মাহরাম হলো সেইসব ব্যক্তি, যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে)। এদের ক্ষেত্রে পূর্ণ পর্দা ও শালীনতা ফরজ।
নন-মাহরাম তালিকা (গুরুত্বপূর্ণ)
-
দেবর
-
ভাসুর
-
চাচাতো / মামাতো ভাই
-
খালাতো / ফুফাতো ভাই
-
স্বামীর বন্ধু
-
স্ত্রীর বান্ধবীর স্বামী
-
কাজিন (cousin)
👉 সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—কাজিন বা দেবরকে “ভাইয়ের মতো” ভাবা; কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে তারা নন-মাহরাম।
আরো পড়ুন: 👉 দেবর–ভাবির সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত
নন-মাহরামের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
— সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১
📖 রাসূল ﷺ বলেন—
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে না থাকে, যদি তার মাহরাম না থাকে।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩০০৬
কেন মাহরাম-নন-মাহরাম জানা জরুরি?
✔ পর্দা রক্ষা করা সহজ হয়
✔ হারাম থেকে বাঁচা যায়
✔ পারিবারিক পবিত্রতা বজায় থাকে
✔ সমাজে ফিতনা কমে
ইসলাম কখনো সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলেনি; বরং শালীন সীমারেখা নির্ধারণ করেছে।
সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
❌ দেবর মানেই ভাই
❌ কাজিন মানেই মাহরাম
❌ আত্মীয় হলে পর্দা নেই
👉 এগুলো শরিয়তসম্মত নয়।
আরো পড়ুন: 👉 দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত | কুরআন ও হাদীসের আলোকে
উপসংহার
মাহরাম ও নন-মাহরাম সম্পর্কের সঠিক জ্ঞান প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য অপরিহার্য। কুরআন ও হাদীস স্পষ্টভাবে এই সীমারেখা নির্ধারণ করেছে মানুষের সম্মান, নিরাপত্তা ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য। আমাদের উচিত আবেগ বা সামাজিক প্রচলনের পরিবর্তে ইসলামের নির্দেশনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া।
