দেবর–ভাবির সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত | কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে
দেবর–ভাবির সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত | কুরআন ও হাদীসের আলোকে (দলিলসহ)
ভূমিকা
ইসলাম পারিবারিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পরিবারে শান্তি, শালীনতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য ইসলাম স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। আত্মীয়তার বন্ধন যতই ঘনিষ্ঠ হোক, শরিয়তের বিধান অমান্য করে ঘনিষ্ঠতা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই আলোচনায় কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে দেবর–ভাবির সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, কীভাবে শালীনতা ও তাকওয়ার সঙ্গে এই সম্পর্ক বজায় রাখা যায়—তা ব্যাখ্যা করা হবে।
নোট: এই লেখা সম্পূর্ণ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য নৈতিক দায়িত্ব সমান।
ইসলামে মাহরাম ও নন-মাহরামের ধারণা
ইসলামে মাহরাম সেইসব ব্যক্তি, যাদের সঙ্গে বিয়ে চিরতরে হারাম। অন্যদিকে, নন-মাহরাম হলেন তারা, যাদের সঙ্গে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে বৈধ।
👉 দেবর (স্বামীর ভাই) ভাবির জন্য নন-মাহরাম।
অতএব, দেবর–ভাবির সম্পর্কের ক্ষেত্রে পর্দা, শালীনতা ও সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা আবশ্যক।
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর যখন তোমরা তাদের কাছে কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।”
— সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৩
এই আয়াত শালীনতা ও সীমা রক্ষার মূলনীতি শেখায়।
হাদীসে দেবর–ভাবির সম্পর্ক সম্পর্কে সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে আত্মীয়তার অজুহাতে অসতর্কতা থেকে বারণ করেছেন।
📖 তিনি বলেন—
“দেবর হলো মৃত্যুর মতো।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৩২
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৭২
👉 এই হাদীসের অর্থ হলো—দেবর যেহেতু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, তাই অসতর্ক হলে ফিতনার আশঙ্কা বেশি। এজন্য ইসলাম এখানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
দেবর–ভাবির সম্পর্কের মৌলিক নীতিমালা
১) পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা
-
পর্দা ফরজ বিধান
-
ঘরের ভেতরেও নন-মাহরামের সামনে শালীন পোশাক আবশ্যক
-
স্বাভাবিক সৌজন্য বজায় রেখে কথা বলা
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে।”
— সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১
২) একান্তে অবস্থান (খলওয়া) পরিহার করা
নন-মাহরাম নারী-পুরুষের একান্তে থাকা ইসলামে নিষিদ্ধ।
📖 রাসূল ﷺ বলেন—
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে একান্তে না থাকে; তৃতীয়জন সেখানে শয়তান হয়।”
— সুনান তিরমিযি, হাদীস: ২১৬৫
👉 দেবর–ভাবির ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য।
৩) প্রয়োজনের বাইরে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়ানো
-
কথাবার্তা হবে সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনভিত্তিক
-
হাসি-তামাশা বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বর্জনীয়
-
পারিবারিক শালীনতা বজায় রাখা
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা নরম স্বরে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লালসা না করে।”
— সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৩২
৪) সামাজিক রীতির নামে শরিয়ত লঙ্ঘন না করা
অনেক সমাজে বলা হয়—“সে তো পরিবারের লোক।”
কিন্তু ইসলাম বলে—শরিয়তের সীমা সবার আগে।
👉 সামাজিক রীতি কখনোই আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের ঊর্ধ্বে নয়।
কেন ইসলাম এত সতর্ক?
-
পরিবারে ফিতনা এড়ানো
-
সম্মান ও আস্থা রক্ষা করা
-
সমাজে নৈতিকতা বজায় রাখা
-
শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ থাকা
ইসলাম নিষেধ করে ক্ষতির আশঙ্কা আছে এমন পথগুলো আগেই বন্ধ করে দিতে।
বাস্তব জীবনে করণীয়
-
পারিবারিক পরিবেশে আলাদা বসার ব্যবস্থা
-
প্রয়োজনে অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে কথা বলা
-
পোশাক ও আচরণে শালীনতা
-
পারস্পরিক সম্মান ও দূরত্ব বজায় রাখা
উপসংহার
দেবর–ভাবির সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; তবে এটি সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত। কুরআন ও হাদীস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—দেবর ভাবির জন্য নন-মাহরাম, তাই পর্দা, শালীনতা ও সতর্কতা অপরিহার্য।
ইসলামের এই নির্দেশনা মানলে পরিবার থাকবে নিরাপদ, সম্পর্ক থাকবে সম্মানজনক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হবে—ইনশাআল্লাহ।
