রমজানের ফজিলত | কেন এই মাস বিশেষ?
রমজানের ফজিলত: কেন এই মাস বিশেষ এবং আমাদের জন্য কী নিয়ে আসে
ভূমিকা
রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এবং মর্যাদাপূর্ণ সময়। এই মাসটি শুধুমাত্র রোজা রাখার মাস নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং জীবনে নতুন দিক নির্দেশনা পাওয়ার এক অনন্য সুযোগ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে রমজান এমন একটি মাস যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে। হাদিসে বর্ণিত আছে যে এই মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। এই লেখায় আমরা রমজান মাসের বিশেষত্ব, এর ফজিলত এবং কেন এই মাসটি আমাদের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
রমজান মাসে কুরআন নাজিলের তাৎপর্য
রমজান মাসের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এই মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। লাইলাতুল কদরে, যা রমজানের শেষ দশকের একটি রাত, আল্লাহ তায়ালা সম্পূর্ণ কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ করেন। এরপর ২৩ বছর ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উপর ওহি হিসেবে নাজিল হতে থাকে।
কুরআন হলো মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নির্দেশনা। এটি আমাদের জীবনযাপনের পথ দেখায়, সঠিক-ভুলের পার্থক্য শেখায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক কীভাবে গড়তে হয় তা বলে দেয়। রমজান মাসে কুরআন নাজিল হওয়ায় এই মাসের মর্যাদা অসীম বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্যই রমজানে কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং এর সওয়াবও বহুগুণ বেড়ে যায়।
অনেক মুসলমান রমজান মাসে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করার চেষ্টা করেন। তারাবির নামাজে জামাতবদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শোনা রমজানের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কুরআনের সাথে এই মাসের সম্পর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের জীবনে আল্লাহর বাণীর গুরুত্ব কতটা এবং এই গ্রন্থ অনুসরণ করেই আমাদের জীবন পরিচালিত করা উচিত।
লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত
রমজান মাসের আরেকটি অসাধারণ বিশেষত্ব হলো লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। এই রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই একটি রাতে ইবাদত করা ৮৩ বছরের বেশি সময় ইবাদত করার চেয়ে বেশি সওয়াবের কাজ।
লাইলাতুল কদর সাধারণত রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হয়ে থাকে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। বিশেষভাবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখের রাতে এই মহিমান্বিত রাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে সঠিক কোন রাতে এটি হবে তা গোপন রাখা হয়েছে যাতে মুসলমানরা পুরো রমজান মাস, বিশেষত শেষ দশক গুরুত্বের সাথে ইবাদতে কাটায়।
এই রাতে ফেরেশতারা এবং জিবরাইল (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে। যারা এই রাতে ইবাদত করেন, তাদের দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সুযোগ থাকে বলে আশা করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে বিশেষভাবে "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি" (হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসো, আমাকে ক্ষমা করে দাও) দোয়া পড়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
আরো পড়ুন: রোজা রাখার নিয়ম ও নিয়ত
রমজানে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি
রমজান মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি ফরজ আমল করলে সত্তরটি ফরজের সওয়াব পাওয়া যায় এবং একটি নফল আমল করলে একটি ফরজের সওয়াব পাওয়া যায় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। এই বিশেষত্ব রমজানকে অন্য সব মাস থেকে আলাদা করেছে।
নামাজ, দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তারাবি, তাহাজ্জুদ - সবকিছুতেই এই বর্ধিত সওয়াব প্রযোজ্য। যারা সারা বছর হয়তো নিয়মিত ইবাদত করতে পারেন না, রমজান তাদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ। এক মাসের ইবাদত দিয়ে পুরো বছরের ঘাটতি পূরণ করার সম্ভাবনা থাকে।
রমজানে দান-সদকার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে বেশি বেশি দান করতেন। গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা, রোজাদারদের ইফতার করানো, এতিম ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো - এসব কাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। হাদিসে বলা হয়েছে যে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে রোজাদারের সমান সওয়াব পায়, তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছু কমানো হয় না।
আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস
রমজান মাসের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীরুতা অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন যে তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। তাকওয়া মানে শুধু পাপ থেকে বিরত থাকা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে সংযত রাখা এবং তাঁর আদেশ মেনে চলা।
রোজার মাধ্যমে আমরা আত্মসংযম শিখি। সারাদিন খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থেকে আমরা নিজের ইচ্ছাশক্তি শক্তিশালী করি। শুধু খাবার নয়, রোজা আমাদের জিহ্বা, চোখ, কান সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। মিথ্যা না বলা, গীবত না করা, অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা - এসব রোজার অংশ।
রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এক মাস নিয়মিত ইবাদত করে আমরা একটি ভালো অভ্যাস তৈরি করতে পারি যা রমজানের পরেও চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। রমজান যেন আমাদের জীবনে একটি রিসেট বাটন, যেখান থেকে আমরা নতুন করে শুরু করতে পারি।
আরো পড়ুন: রমজানে কোন আমল আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?
ক্ষমা ও মাগফিরাতের বিশেষ মৌসুম
রমজান মাস হলো আল্লাহর রহমত, বরকত এবং মাগফিরাতের মাস। হাদিসে বর্ণিত আছে যে রমজানের প্রথম দশক রহমতের, মাঝের দশক মাগফিরাতের এবং শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির। এই তিন পর্যায়ে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়া প্রদর্শন করেন।
রমজানে তওবা করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। যারা সারা বছর পাপ করেছে, তারা রমজানে তওবা করে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং তিনি তওবাকারীদের ভালোবাসেন। শর্ত হলো তওবা হতে হবে আন্তরিক এবং আর সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে।
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। শেষ রাতে সেহরির সময়, দিনের বেলায় রোজা অবস্থায়, ইফতারের ঠিক আগে এবং তারাবির নামাজে - এসব সময়ে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে। যারা আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং তাঁর দয়া প্রার্থনা করেন, তারা আশা করতে পারেন যে আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।
সামাজিক ঐক্য ও সহমর্মিতার মাস
রমজান মাস শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়, এটি সামাজিক ঐক্য ও সহমর্মিতার মাসও। সবাই একসাথে রোজা রাখে, একসাথে ইফতার করে, একসাথে তারাবি পড়ে - এতে মুসলিম সমাজে এক অনন্য বন্ধন তৈরি হয়। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সবাই একই সময়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করে, যা সমাজে সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগায়।
রমজানে গরিবদের কষ্ট বোঝার সুযোগ হয়। যারা সারা বছর তিন বেলা খাবার পায়, তারা রোজা রেখে বুঝতে পারে যাদের প্রতিদিন অভুক্ত থাকতে হয় তাদের অবস্থা কেমন। এই অনুভূতি থেকে দান-সদকার প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং মানুষ বেশি বেশি গরিবদের সাহায্য করে।
মসজিদগুলো রমজানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তারাবির নামাজে সবাই একসাথে দাঁড়ায়, ইফতার মাহফিলে একসাথে খায়। প্রতিবেশীরা একে অপরকে ইফতার পাঠায়, রাস্তায় পথচারীদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এসব কার্যক্রম সমাজে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে, যা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
আরো পড়ুন: রোজার নিয়ত ও ইফতারের দোয়া আরবি ও বাংলা উচ্চারণ সহ
উপসংহার
রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশেষ উপহার। এই মাসে কুরআন নাজিল, লাইলাতুল কদরের উপস্থিতি, ইবাদতের বহুগুণ সওয়াব, আত্মশুদ্ধির সুযোগ এবং ক্ষমা লাভের বিশেষ সম্ভাবনা - এসব কিছু মিলে রমজান অন্য সব মাস থেকে আলাদা এবং বিশেষ হয়ে ওঠে।
আসুন, আমরা রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাই। নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা এবং নেক কাজের মাধ্যমে এই মাসকে আমাদের জীবনের সেরা মাস বানাই। রমজানের শিক্ষা - সংযম, ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং আল্লাহভীরুতা - আমরা যেন সারা বছর ধরে রাখতে পারি।
রমজান শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এর প্রভাব থাকুক আমাদের জীবনে। এই মাসে যে ভালো অভ্যাসগুলো তৈরি হবে, সেগুলো চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের পূর্ণ বরকত নসিব করুন এবং এই মাসের শিক্ষা দিয়ে আমাদের জীবন সাজানোর তৌফিক দিন। আমীন।
রমজানের ফজিলত নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. রমজান মাস অন্য মাসের চেয়ে বিশেষ কেন?
রমজান মাস বিশেষ কারণ এই মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। এছাড়া এই মাসে লাইলাতুল কদর রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। রমজানে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। এই মাস আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়।
২. লাইলাতুল কদর কোন রাতে এবং কীভাবে চিনব?
লাইলাতুল কদর সাধারণত রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে হয়ে থাকে। বিশেষভাবে ২৭ তারিখের রাতে এই মহিমান্বিত রাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে অনেকে মনে করেন। তবে সঠিক রাতটি গোপন রাখা হয়েছে যাতে মুসলমানরা সব রাতেই ইবাদত করে। এই রাতে শান্তি অনুভূত হয়, রাত নাতিশীতোষ্ণ থাকে এবং সকালে সূর্য হালকা আলো নিয়ে উদিত হয় বলে কিছু আলামত বর্ণিত আছে।
৩. রমজানে দান-সদকার বিশেষ গুরুত্ব কেন?
রমজানে দান-সদকার সওয়াব স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে অধিক পরিমাণে দান করতেন। রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের সমান সওয়াব পাওয়া যায় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। রমজানে ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করে মানুষ গরিবদের কষ্ট বুঝতে পারে, যা দানশীলতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া দান আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।
৪. রমজানের তাকওয়া কীভাবে সারা বছর ধরে রাখা যায়?
রমজানে যে ভালো অভ্যাসগুলো তৈরি হয় - নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা - সেগুলো রমজানের পরেও চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রতি মাসে কিছু নফল রোজা রাখা, নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া, সদকা করা এবং পাপ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাকওয়া ধরে রাখা সম্ভব। রমজান একটি প্রশিক্ষণ মাস, এর শিক্ষা সারা বছর প্রয়োগ করাই মূল লক্ষ্য।
৫. যারা রোজা রাখতে পারে না তারা কীভাবে রমজানের ফজিলত লাভ করতে পারে?
অসুস্থতা বা অন্য কোনো বৈধ কারণে যারা রোজা রাখতে পারে না, তারা অন্যভাবে রমজানের ফজিলত লাভ করতে পারে। নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দান-সদকা, রোজাদারদের ইফতার করানো, তারাবিতে অংশগ্রহণ এবং বেশি বেশি দোয়া করার মাধ্যমে এই মাসের বরকত পাওয়া যায়। যারা পরে রোজা রাখতে পারবে তারা কাজা আদায় করবে, আর যারা একেবারেই পারবে না তারা ফিদইয়া দেবে।
