রোজা মাকরূহ হওয়ার কারণ | যা এড়িয়ে চলা উচিত

 

রোজা মাকরূহ হওয়ার কারণসমূহ: যা এড়িয়ে চলা উচিত

ভূমিকা

রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং রমজান মাসে প্রতিটি সক্ষম মুসলমানের জন্য রোজা রাখা ফরজ। রোজা পালনের ক্ষেত্রে শুধু ফরজ ও হারাম বিষয়গুলো জানাই যথেষ্ট নয়, বরং মাকরূহ বিষয়গুলো সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। মাকরূহ কাজ করলে রোজা ভাঙে না, কিন্তু রোজার পূর্ণতা ও বরকত কমে যেতে পারে। অনেকে মাকরূহ বিষয়গুলো না জানার কারণে অজান্তেই এমন কাজ করে বসেন যা রোজার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। এই লেখায় আমরা ইসলামী শরিয়তের আলোকে রোজার মাকরূহ কাজগুলো বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে আপনি সচেতনভাবে এগুলো এড়িয়ে চলতে পারেন এবং রোজাকে আরও ফজিলতপূর্ণ করে তুলতে পারেন।

roja-makruh-howar-karonsomuho


মাকরূহ কী এবং কেন এড়িয়ে চলা উচিত

মাকরূহ হলো এমন কাজ যা করা অপছন্দনীয় এবং না করাই উত্তম। ইসলামী শরিয়তে মাকরূহ দুই ধরনের: মাকরূহে তাহরিমি এবং মাকরূহে তানজিহি। মাকরূহে তাহরিমি হারামের কাছাকাছি এবং এটি করা গুনাহের কাজ। অন্যদিকে মাকরূহে তানজিহি হলো এমন কাজ যা না করলে সওয়াব পাওয়া যায় কিন্তু করলে গুনাহ হয় না।

রোজার ক্ষেত্রে মাকরূহ কাজগুলো এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এগুলো রোজার পূর্ণতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যদিও এই কাজগুলো করলে রোজা ভাঙে না, তবে রোজার সওয়াব কমে যেতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য শুধু হারাম থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং মাকরূহ থেকেও দূরে থাকা উচিত।

হাদিসে বর্ণিত আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) মাকরূহ কাজ থেকে বিরত থাকতেন এবং সাহাবীদেরকেও এ বিষয়ে সতর্ক করতেন। তাই একজন মুমিনের উচিত মাকরূহ সম্পর্কে জানা এবং সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা। এতে রোজা আরও পবিত্র ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

মাকরূহ থেকে বিরত থাকা তাকওয়া বা আল্লাহভীরুতার নিদর্শন। যে ব্যক্তি শুধু হারাম নয়, বরং মাকরূহও এড়িয়ে চলে, সে আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করে।

অতিরিক্ত কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া

রোজা অবস্থায় ওজু করার সময় অতিরিক্ত কুলি করা এবং গভীরভাবে নাকে পানি দেওয়া মাকরূহ। এর কারণ হলো এতে পানি গলা বা পেটে প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকে। হাদিসে রাসুল (সা.) রোজাদারকে কুলি ও নাকে পানি দেওয়ার ব্যাপারে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন।

ওজু করা রোজার অবস্থায় জরুরি এবং এটি মাকরূহ নয়। তবে অতিরিক্ত জোরে বা গভীরভাবে কুলি করা এবং নাকে পানি নেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। সাধারণভাবে কুলি ও নাকে পানি দিলে কোনো সমস্যা নেই। শুধু সতর্ক থাকতে হবে যাতে পানি গলায় না যায়।

যদি ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কুলি করার সময় কিছু পানি গলায় চলে যায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত কুলি করে পানি পেটে পৌঁছানো হলে রোজা ভেঙে যাবে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

বিশেষ করে যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, তাদের রোজার দিনে ওজু করার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। হালকাভাবে কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া যথেষ্ট। এতে রোজার পবিত্রতা রক্ষা হয় এবং ইবাদতে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

খাবার বা পানীয় চেখে দেখা

রোজা অবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া খাবার বা পানীয় চেখে দেখা মাকরূহ। অনেক সময় রান্নার কাজে লবণ বা মসলা ঠিক আছে কিনা তা বুঝতে খাবার চেখে দেখার প্রয়োজন হতে পারে। একান্ত প্রয়োজনে এবং সতর্কতার সাথে চেখে দেখা যায়, তবে গিলে ফেলা যাবে না।

যদি কোনো খাবার চেখে দেখতেই হয়, তাহলে জিহ্বার ডগায় সামান্য নিয়ে দেখা উচিত এবং তারপর তা পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে। গলা পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে না। অনেক আলেম বলেছেন যে অপ্রয়োজনে এভাবে খাবার চেখে দেখা রোজার আদবের পরিপন্থী।

বর্তমান যুগে অনেক মায়েরা সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করতে গিয়ে এই সমস্যায় পড়েন। এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো যথাসম্ভব চেখে না দেখে রান্না করা এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মসলা দেওয়া। যদি একান্তই চেখে দেখার প্রয়োজন হয়, তাহলে পরিবারের অন্য কাউকে দিয়ে চাখিয়ে নেওয়া উত্তম।

চুইংগাম বা টফি চোষা একই কারণে মাকরূহ কারণ এতেও স্বাদ গ্রহণ হয় এবং লালা গলায় যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রোজার পবিত্রতা রক্ষার জন্য এই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উত্তম।

অশ্লীল কথাবার্তা ও অহেতুক ঝগড়া

রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং সকল প্রকার অসৎ কাজ ও কথা থেকে বিরত থাকা রোজার মূল উদ্দেশ্য। অশ্লীল কথাবার্তা, গালিগালাজ, মিথ্যা বলা এবং ঝগড়া-বিবাদ করা রোজা অবস্থায় মাকরূহে তাহরিমি তথা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী আমল ত্যাগ করেনি, তার পানাহার পরিত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রোজার প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মসংযম এবং পাপ থেকে বিরত থাকা।

রোজা অবস্থায় কেউ গালি দিলে বা ঝগড়া করতে চাইলে রাসুল (সা.) বলতে বলেছেন, "আমি রোজাদার।" এটি নিজেকে এবং অপরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি উত্তম পদ্ধতি। রোজাদার হিসেবে আমাদের উচিত সংযমী হওয়া এবং প্রতিটি কথা ও কাজে সতর্ক থাকা।

অনেকে রোজা রেখে অফিসে বা বাজারে কথা কাটাকাটি করেন, রাগারাগি করেন এবং অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন। এগুলো রোজার মর্যাদা নষ্ট করে এবং সওয়াব কমিয়ে দেয়। তাই রোজা রাখলে শুধু পেট নয়, বরং জিহ্বা, চোখ ও কানকেও রোজা রাখাতে হবে। এভাবেই রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জিত হয় এবং তাকওয়া বৃদ্ধি পায়।

অতিরিক্ত ঘুম ও অলসতা

রোজার দিনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুমানো এবং অলস থাকা মাকরূহ। অবশ্যই শারীরিক প্রয়োজনে বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমানো জায়েজ, তবে সারাদিন শুধু ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া রোজার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।

রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, দোয়া-দরুদ পড়া এবং নেক কাজে সময় ব্যয় করা। যদি কেউ সারাদিন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেন, তাহলে রোজার প্রকৃত ফায়দা থেকে বঞ্চিত হবেন। অনেকে মনে করেন ঘুমিয়ে থাকলে ক্ষুধা-তৃষ্ণা কম লাগবে, কিন্তু এটি রোজার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়।

রমজান মাস হলো রহমত ও বরকতের মাস। এই সময়ে ইবাদত-বন্দেগিতে বেশি সময় দেওয়া উচিত। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া যায়, তারপর দিনের বেলায় কাজকর্ম করা, কুরআন পড়া এবং অন্যান্য ইবাদত করা উচিত।

অবশ্য যারা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করেন বা বয়স্ক, তাদের জন্য বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমানো স্বাভাবিক। তবে সুস্থ ও সবল মানুষের জন্য অতিরিক্ত ঘুম ও অলসতা এড়িয়ে চলা উচিত। সময়কে কাজে লাগিয়ে রোজার মাসকে ইবাদতে পূর্ণ করা একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

দাঁত মাজা ও মিসওয়াক ব্যবহারের বিধান

রোজা অবস্থায় দাঁত মাজা এবং মিসওয়াক ব্যবহারের বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেমের মতে দুপুরের পর (জোহরের পর) মিসওয়াক করা মাকরূহ, কারণ এতে রোজাদারের মুখের বিশেষ গন্ধ দূর হয়ে যায় যা আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও উত্তম বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।

তবে অধিকাংশ আলেমের মতে যেকোনো সময় মিসওয়াক করা জায়েজ এবং সুন্নত। শুধু টুথপেস্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে যাতে পেটে কিছু না যায়। টুথপেস্টের স্বাদ গলায় যাওয়া এবং ফেনা পেটে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে বলে অনেক আলেম রোজা অবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।

মিসওয়াক হলো সুন্নত এবং এতে মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে। রাসুল (সা.) মিসওয়াক ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন। তাই রোজা অবস্থায় মিসওয়াক ব্যবহার করা যায়, তবে সেহরির পর এবং ইফতারের পূর্বে টুথপেস্ট ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ।

যদি কেউ দিনের বেলায় দাঁত মাজতেই চান, তাহলে শুধু পানি ও ব্রাশ ব্যবহার করা অথবা মিসওয়াক ব্যবহার করা উত্তম। এতে মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকবে এবং রোজার ক্ষতি হবে না। মূল বিষয় হলো সতর্ক থাকা এবং পেটে কিছু না যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া।

উপসংহার

রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। মাকরূহ কাজগুলো এড়িয়ে চললে রোজা আরও পবিত্র ও গ্রহণযোগ্য হয় বলে আশা করা যায়। অতিরিক্ত কুলি করা, অপ্রয়োজনে খাবার চেখে দেখা, অশ্লীল কথাবার্তা, ঝগড়া-বিবাদ এবং অতিরিক্ত ঘুম ও অলসতা থেকে বিরত থাকা উচিত।

প্রতিটি রোজাদারের উচিত রোজার মর্যাদা রক্ষা করা এবং শুধু শারীরিকভাবে নয়, বরং আত্মিক ও নৈতিকভাবেও রোজা পালন করা। মাকরূহ সম্পর্কে জানা এবং সেগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা তাকওয়া বৃদ্ধির একটি মাধ্যম।

আসুন, আমরা এই রমজানে শুধু ফরজ ও হারামের বিধান নয়, বরং মাকরূহ বিষয়গুলোও মেনে চলি। রোজার প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতে পরিণত করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবার রোজা কবুল করুন এবং মাকরূহ থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন। আমীন।


 রোজা মাকরূহ হওয়ার কারণ সমূহ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. মাকরূহ কাজ করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

না, মাকরূহ কাজ করলে রোজা ভাঙে না। মাকরূহ হলো এমন কাজ যা না করা উত্তম এবং করা অপছন্দনীয়। যদি কেউ মাকরূহ কাজ করে ফেলে, তাহলে রোজা বহাল থাকে তবে রোজার পূর্ণতা ও বরকত কমে যেতে পারে। এজন্য মাকরূহ থেকে বিরত থাকা উচিত যাতে রোজা আরও ফজিলতপূর্ণ হয় এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

২. রোজা অবস্থায় ওজু করার সময় কি বিশেষ সতর্কতা নেওয়া উচিত?

হ্যাঁ, রোজা অবস্থায় ওজু করার সময় কুলি ও নাকে পানি দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। অতিরিক্ত জোরে কুলি করা বা গভীরভাবে নাকে পানি দেওয়া এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এতে পানি গলা বা পেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণভাবে হালকা কুলি এবং নাকে পানি দিলে কোনো সমস্যা নেই। মূল বিষয় হলো সতর্কতা অবলম্বন করা।

৩. রান্নার সময় খাবার চেখে দেখা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ?

অপ্রয়োজনে খাবার চেখে দেখা মাকরূহ। তবে একান্ত প্রয়োজনে যেমন রান্নায় লবণ বা মসলার পরিমাণ ঠিক আছে কিনা বুঝতে সামান্য চেখে দেখা যায়, তবে গিলে ফেলা যাবে না। জিহ্বার ডগায় নিয়ে দেখে পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে। তবে উত্তম হলো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রান্না করা বা পরিবারের অন্য কাউকে দিয়ে চাখিয়ে নেওয়া।

৪. রোজা রেখে কেউ গালি দিলে কী করা উচিত?

রোজা অবস্থায় কেউ গালি দিলে বা ঝগড়া করতে চাইলে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়। হাদিস অনুযায়ী বলা উচিত, "আমি রোজাদার।" এটি নিজেকে এবং অপরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে রোজাদার হিসেবে আমাদের সংযমী হওয়া উচিত। ঝগড়া-বিবাদ, গালিগালাজ এবং মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকা রোজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৫. রোজার দিনে কতটুকু ঘুমানো উচিত?

প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘুমানো জায়েজ, তবে সারাদিন শুধু ঘুমিয়ে কাটানো উচিত নয়। রমজান মাস ইবাদতের মাস এবং এই সময়ে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ এবং নেক কাজে বেশি সময় দেওয়া উচিত। সেহরির পর ফজরের নামাজ পড়ে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া যায়, কিন্তু দিনের বাকি সময় ইবাদত ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করা উত্তম।


Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url