রমজানে কোন আমল আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?


রমজানে আল্লাহর পছন্দের আমল নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতের দৃশ্য

রমজানে কোন আমল আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন? কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা

রমজান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের নাম নয়; বরং এটি মুমিন জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের প্রশিক্ষণকাল। এই মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি বিশেষ রহমত নাজিল করেন, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেন, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেন এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। এমন মহিমান্বিত পরিবেশে একজন মুমিন স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায়—রমজানে কোন আমল আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

অনেক মুসলমান মনে করেন, শুধু রোজা রাখলেই রমজানের সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ শুধুমাত্র তারাবির নামাজকেই রমজানের মূল আমল মনে করেন। কিন্তু কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে বিষয়টি গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, রমজানে আল্লাহ তাআলা কিছু নির্দিষ্ট আমলকে বিশেষভাবে ভালোবাসেন—যেগুলো শুধু বাহ্যিক ইবাদত নয়, বরং বান্দার চরিত্র, চিন্তা ও জীবনধারাকে বদলে দেয়।

রোজা—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল

রমজানের কেন্দ্রীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা। রোজার মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সওয়াবের দায়িত্ব নিয়েছেন। হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” এই ঘোষণাই প্রমাণ করে, রোজা আল্লাহর কাছে অন্য সব আমলের তুলনায় বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন।

রোজা কেবল খাবার ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়। এটি একটি গভীর আত্মিক ইবাদত, যা মানুষকে গোপনে আল্লাহভীরু করে তোলে। কেউ দেখুক বা না দেখুক—রোজাদার শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে সংযত রাখে। এই আত্মসংযমই তাকওয়ার মূল ভিত্তি। রোজা মানুষের ভেতরে আল্লাহভীতি, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী অভ্যাস তৈরি করে। এ কারণেই রোজা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর একটি।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবি—রমজানের প্রাণশক্তি

রমজানে আল্লাহ তাআলা যে আমলগুলো সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত নামাজ আদায় করা। নামাজ ইসলামের স্তম্ভ হলেও রমজানে এর গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়। এই মাসে বান্দা আল্লাহর দিকে আরও বেশি মনোযোগী হয়, হৃদয় নরম হয় এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা, খুশু-খুজু বজায় রাখা এবং গাফিলতি পরিহার করা রমজানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি তারাবির নামাজ রমজানের একটি বিশেষ ইবাদত, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে আদায় করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে উৎসাহিত করেছেন। ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে যে ব্যক্তি নামাজে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেন—এটি আল্লাহর এক বিশেষ রহমত।

আরো পড়ুন:  রোজা রাখার নিয়ম ও নিয়ত

কুরআন তিলাওয়াত—আল্লাহর কালামের সাথে গভীর সম্পর্ক

রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস। তাই এই মাসে কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল। রমজানে শুধু কুরআন খতম করাই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়; বরং তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ বোঝার চেষ্টা এবং বাস্তব জীবনে কুরআনের শিক্ষা প্রয়োগ করাই হলো প্রকৃত লক্ষ্য।

নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত মানুষের অন্তরকে জীবিত করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে দৃঢ় করে। কুরআনের আলো একজন মুমিনকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। তাই রমজানে কুরআনের সাথে যত বেশি সময় কাটানো যায়, তত বেশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়।

দোয়া ও কান্নাকাটি—বান্দার অসহায় আত্মসমর্পণ

রমজানে দোয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। কারণ এই মাসে রোজাদার আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থায় থাকে। বিশেষ করে ইফতারের সময়, তাহাজ্জুদের মুহূর্ত এবং সেহরির শেষ ভাগ—এই সময়গুলো দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন এমন দোয়া, যা অন্তর থেকে আসে। কান্নার সাথে করা তওবা, অহংকারহীন প্রার্থনা এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর দরজায় দাঁড়ানো—এসবই দোয়ার সৌন্দর্য। দোয়া শুধু কিছু চাওয়ার নাম নয়; দোয়া হলো আল্লাহর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করা।

আরো পড়ুন: রোজার নিয়ত ও ইফতারের দোয়া আরবি ও বাংলা উচ্চারণ সহ

দান-সদকা ও মানুষের উপকার

রমজানে দান-সদকা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল। এই মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সবচেয়ে বেশি দান করতেন। রমজানে দানের সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।

গোপনে দান করা, অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং রোজাদারকে ইফতার করানো—এসব আমল রমজানে আল্লাহ বিশেষভাবে পছন্দ করেন। একজন রোজাদারকে ইফতার করালে তার রোজার সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়—এটি বান্দার জন্য এক অসাধারণ সুযোগ।

তাকওয়া ও চরিত্র সংশোধন—রমজানের মূল উদ্দেশ্য

রমজানের সব আমলের কেন্দ্রবিন্দু হলো তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, “তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” অর্থাৎ রমজানের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু কিছু আমল করা নয়, বরং চরিত্র ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনা।

রমজানে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন এমন মানুষকে, যে মিথ্যা ত্যাগ করে, গিবত ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকে, নিজের দৃষ্টি ও জিহ্বাকে সংযত রাখে। যদি রোজা একজন মানুষকে ভালো চরিত্রবান না বানায়, তবে সেই রোজা তার পূর্ণতা অর্জন করে না।

রমজানে আল্লাহর পছন্দের আমল নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতের দৃশ্য

আরো পড়ুন:  রমজানে দোয়া কবুল হওয়ার সেরা সময়

কোন আমল আল্লাহ পছন্দ করেন না?

রমজানে কিছু আমল রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ অপছন্দ করেন। লোক দেখানো ইবাদত, নামাজ পড়েও গুনাহে লিপ্ত থাকা, রোজা রেখে মিথ্যা বলা, অহংকার ও অন্তরের বিদ্বেষ পোষণ করা—এসব রমজানের আত্মার পরিপন্থী। রমজান পরিবর্তনের মাস, অভিনয়ের নয়। বাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি অন্তরের সংশোধন না হলে রমজানের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

উপসংহার

রমজানে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন সেই আমল, যা বান্দাকে তাঁর আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। রোজা, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, দান-সদকা ও তাকওয়া—এই সব আমল একসাথে মিলেই একজন মুমিনের রমজানকে পূর্ণতা দেয়। রমজান যেন কেবল সময় কাটানোর মাস না হয়ে ওঠে; বরং এটি হোক জীবন বদলে দেওয়ার মাস। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।


 প্রশ্ন ও উত্তর 

প্রশ্ন ১: রমজানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল কোনটি?
উত্তর: রোজা—কারণ আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান দেবেন।

প্রশ্ন ২: শুধু রোজা রাখলে কি রমজান সফল হয়?
উত্তর: না, রোজার সাথে নামাজ, কুরআন, দোয়া ও চরিত্র সংশোধন জরুরি।

প্রশ্ন ৩: রমজানে দোয়া কখন বেশি কবুল হয়?
উত্তর: ইফতারের সময়, সেহরির শেষ অংশ ও তাহাজ্জুদের সময়।

প্রশ্ন ৪: রমজানে দান করলে কি সওয়াব বেশি?
উত্তর: হ্যাঁ, রমজানে দানের সওয়াব বহুগুণে বাড়ানো হয়।

প্রশ্ন ৫: রমজানের মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ।



Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url