রোজা রাখার সঠিক নিয়ম ও নিয়ত | কুরআন ও হাদীসের আলোকে
রোজা রাখার সঠিক নিয়ম ও নিয়ত | কুরআন ও হাদীসের আলোকে
ভূমিকা
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসের প্রধান ইবাদত হলো রোজা (সাওম)। রোজা শুধু না খাওয়া–দাওয়া থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং এটি আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ। রোজা সঠিকভাবে আদায় করতে হলে এর নিয়ম ও নিয়ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এই লেখায় রোজা রাখার সঠিক নিয়ম ও নিয়ত সহজভাবে তুলে ধরা হলো।
রোজা কী?
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, ফজরের সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার, সহবাস ও রোজাভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকার নামই রোজা।
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩
রোজার গুরুত্ব ও ফজিলত
রোজা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। এর মাধ্যমে—
-
গুনাহ মাফ হয়
-
আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয়
-
তাকওয়া বৃদ্ধি পায়
📖 রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৮
রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত
নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের ওপর রোজা ফরজ—
-
মুসলমান হওয়া
-
বালেগ হওয়া
-
সুস্থ ও সক্ষম হওয়া
-
মুকিম (মুসাফির না হওয়া)
-
হায়েজ ও নেফাসমুক্ত হওয়া (নারীদের জন্য)
রোজা রাখার সঠিক নিয়ম
১. সেহরি খাওয়া
সেহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে বরকত রয়েছে।
📖 রাসূল ﷺ বলেন—
“সেহরি খাও, কেননা সেহরিতে বরকত রয়েছে।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯২৩
👉 সামান্য পানি হলেও সেহরি করা উত্তম।
২. নিয়ত করা (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)
রোজা সহীহ হওয়ার জন্য নিয়ত আবশ্যক। নিয়ত মুখে বলা শর্ত নয়; অন্তরে থাকলেই যথেষ্ট।
📖 হাদীস—
“সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ১
৩. ফজরের আগে নিয়ত সম্পন্ন করা
রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত অবশ্যই ফজরের আগেই করতে হবে।
৪. সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিরত থাকা
এই সময়ের মধ্যে—
-
খাওয়া
-
পান করা
-
সহবাস
-
ইচ্ছাকৃত বমি
-
ধূমপান
থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. মিথ্যা, গিবত ও অশ্লীলতা পরিহার করা
রোজা শুধু পেটের নয়, বরং চোখ, কান ও জিহ্বারও।
📖 রাসূল ﷺ বলেন—
“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯০৩
রোজার নিয়ত (বাংলা ও আরবি)
🌙 রোজার আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم
📖 বাংলা উচ্চারণ
নাওয়াইতু আন আসূমা গাদাম, মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।
🌱 অর্থ
হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।
🍽️ ইফতারের দোয়া
بِسْمِ اللهِ اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
📖 বাংলা উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
🌱 অর্থ
হে আল্লাহ! আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করছি।
📚 সূত্র: আবু দাউদ, হাদীস: ২৩৫৮ (মু‘আয ইবনে জাহরা রা.)
👉 মনে রাখতে হবে, নিয়ত অন্তরের কাজ।
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ (সংক্ষেপে)
-
ইচ্ছাকৃত খাওয়া বা পান করা
-
ইচ্ছাকৃত সহবাস
-
ধূমপান
-
ইচ্ছাকৃত বমি করা
👉 ভুলবশত খেলে রোজা ভাঙে না।
📖 হাদীস—
“যদি কেউ ভুলে খেয়ে বা পান করে, তবে সে যেন রোজা পূর্ণ করে; এটি আল্লাহ তাকে খাইয়েছেন।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৫৫
রোজা না রাখতে পারলে কী করবেন?
-
অসুস্থ বা মুসাফির → পরে কাজা
-
স্থায়ী অসুস্থ → ফিদইয়া
📖 সূরা আল-বাকারা: ১৮৪
উপসংহার
রোজা ইসলামের এক মহান ইবাদত, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। সঠিক নিয়ত ও শরিয়তসম্মত নিয়মে রোজা আদায় করলে এর পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়। তাই আমাদের উচিত রোজার বাহ্যিক ও আত্মিক উভয় দিকের প্রতি যত্নবান হওয়া।
🤲 আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
