মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি: কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে
মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি: কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে আজই যা করতে পারেন
ভূমিকা
গত বছর এই সময়ে যাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ হয়তো আজ আর নেই। হঠাৎ একটা ফোন আসে, একটা খবর, আর মুহূর্তেই বুঝতে পারি, জীবন আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী।
মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে আমরা সাধারণত অস্বস্তি বোধ করি। অথচ ইসলাম এই বিষয়টিকে খুব শান্ত, স্পষ্ট ও আশাবাদী দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। মৃত্যুর স্মরণ এখানে ভয় পাওয়ার জন্য নয়, বরং জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলার জন্য।
এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে দেখব, মৃত্যুকে কীভাবে দেখা উচিত, আর এমন কিছু বাস্তব প্রস্তুতির কথা, যা আজই শুরু করা যায়: তাওবা, ইবাদত, মানুষের হক, ওসিয়ত এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা নিয়ে বাঁচা।
১. মৃত্যু: জীবনের একমাত্র নিশ্চিত সত্য
জীবনে অনেক কিছুই অনিশ্চিত। চাকরি হবে কি না, বিয়ে কবে হবে, ব্যবসা কেমন যাবে, কিছুই আগে থেকে নিশ্চিত বলা যায় না। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই, আর তা হলো মৃত্যু।
সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর সূরা লুকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতে জানিয়েছেন, কেউ জানে না সে আগামীকাল কী অর্জন করবে, আর কেউ জানে না কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে।
সূরা আন-নিসার ৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যেখানেই থাকো, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, এমনকি সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরে থাকলেও।
এই আয়াতগুলো পড়ে মন ভারী হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটু অন্যভাবে ভাবুন। যে জিনিস নিশ্চিত, তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই তো সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আমরা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিই, চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুতি নিই। অথচ যে যাত্রা নিশ্চিত, সেটার প্রস্তুতি অনেক সময় "পরে করব" বলে ফেলে রাখি।
২. মৃত্যুর স্মরণের উদ্দেশ্য: ভয় নয়, সচেতনতা
ইসলামে মৃত্যুকে স্মরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, কিন্তু এর উদ্দেশ্য মানুষকে হতাশ বা ভীত করা নয়।
জামে তিরমিযীর ২৩০৭ নম্বর হাদীসে (হাসান) রাসূল ﷺ বলেছেন, স্বাদ বিনষ্টকারী বিষয়টি, অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে "স্বাদ বিনষ্ট" মানে দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ কমিয়ে আনা, জীবনের আনন্দ নষ্ট করা নয়।
মুসাফিরের মতো জীবন
সহিহ বুখারীর ৬৪১৬ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ ইবনে উমর (রা.)-এর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত বা পথিক।
একজন মুসাফির পথে কোনো সুন্দর জায়গায় থামলে সেখানে বিশ্রাম নেয়, উপভোগও করে, কিন্তু সেখানে স্থায়ী বাড়ি বানায় না। কারণ সে জানে, তার আসল গন্তব্য অন্য কোথাও।
মৃত্যুর স্মরণ ঠিক এই ভারসাম্যটাই শেখায়। দুনিয়াকে উপভোগ করো, কিন্তু এখানেই সব শেষ ভেবো না। এই চিন্তা মানুষকে অহংকার, লোভ ও অন্যায় থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।
৩. প্রথম প্রস্তুতি: তাওবা ও আল্লাহর দিকে ফেরা
মৃত্যুর প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। আর এই দরজা কখনো বন্ধ হয় না, যতক্ষণ জীবন আছে।
সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতটি কুরআনের সবচেয়ে আশাজাগানিয়া আয়াতগুলোর একটি। আল্লাহ বলেছেন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
জামে তিরমিযীর ৩৫৩৭ নম্বর হাদীসে (হাসান) এসেছে, মৃত্যুর একদম শেষ মুহূর্ত, অর্থাৎ রুহ কণ্ঠনালিতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আল্লাহ বান্দার তাওবা গ্রহণ করেন।
তাহলে দেরি কেন নয়?
এই হাদীস আশার কথা বলে, কিন্তু সেই শেষ মুহূর্ত কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো আজই তাওবা করা।
সূরা আত-তাহরীমের ৮ নম্বর আয়াতে "তাওবাতান নাসূহা", অর্থাৎ খাঁটি তাওবার কথা এসেছে। আলেমগণ এর তিনটি অংশ বলেছেন: গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা, সঙ্গে সঙ্গে তা ছেড়ে দেওয়া এবং আর না করার দৃঢ় সংকল্প। আর গুনাহটি মানুষের হক সম্পর্কিত হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।
৪. দ্বিতীয় প্রস্তুতি: ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্ন
আখিরাতের হিসাবের কথা ভাবলে প্রথমেই আসে ফরজ ইবাদতগুলোর কথা।
জামে তিরমিযীর ৪১৩ নম্বর হাদীসে (হাসান) এসেছে, কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে প্রথম যে বিষয়ের হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো নামাজ। নামাজ ঠিক থাকলে আশা করা যায় বাকি হিসাবও সহজ হবে। আর ফরজে কিছু ঘাটতি থাকলে আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, বান্দার কোনো নফল আছে কি না, যা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়।
এই হাদীসের শেষ অংশটা খুব আশাব্যঞ্জক। নফল ইবাদত যেন ফরজের ঘাটতি পূরণের একটি সঞ্চয়।
আজ থেকে যা করতে পারেন
- নামাজে নিয়মিত না হলে অন্তত পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ দিয়ে শুরু করুন।
- ছুটে যাওয়া নামাজ বা রোজা থাকলে তার একটা হিসাব করে ধীরে ধীরে কাযা আদায় শুরু করুন।
- যাকাত ফরজ হলে হিসাব করে আদায় করুন।
- সামর্থ্য থাকলে হজের পরিকল্পনা করুন, দেরি না করে।
- ফরজের পাশাপাশি দু-একটি নফল আমল নিয়মিত রাখুন, পরিমাণে অল্প হলেও (সহিহ বুখারী ৬৪৬৪)।
৫. তৃতীয় প্রস্তুতি: মানুষের হক ও ঋণ পরিশোধ
আল্লাহর হক আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু মানুষের হকের বিষয়টি আলাদা। যার হক নষ্ট করা হয়েছে, সে ক্ষমা না করলে বিষয়টি থেকে যায়।
সহিহ বুখারীর ২৪৪৯ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, কারও প্রতি তার ভাইয়ের কোনো জুলুম, সম্মানহানি বা অন্য কোনো পাওনা থাকলে, সে যেন আজই তা মিটিয়ে নেয়, সেই দিন আসার আগে, যেদিন টাকা-পয়সা থাকবে না। সেদিন নেক আমল দিয়ে সেই হক মেটাতে হবে।
ঋণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব
সহিহ মুসলিমের ১৮৮৬ নম্বর হাদীসে এসেছে, শহীদের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়, শুধু ঋণ ছাড়া। জামে তিরমিযীর ১০৭৮ নম্বর হাদীসে এসেছে, মুমিনের রুহ তার ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।
বাস্তব পদক্ষেপ
- কার কাছে কত টাকা ঋণ আছে, তার একটা তালিকা লিখে রাখুন, পরিবারের কেউ যেন জানে।
- কারও সঙ্গে অন্যায় করে থাকলে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নিন।
- কারও কিছু ধার নিয়ে ফেরত না দিয়ে থাকলে ফেরত দিন।
- দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য মিটিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিন।
৬. চতুর্থ প্রস্তুতি: ওসিয়ত লিখে রাখা
আমাদের সমাজে ওসিয়ত লেখাকে অনেকে অশুভ মনে করেন, যেন লিখলেই মৃত্যু কাছে চলে আসবে। অথচ এটি একটি সুন্নাহসম্মত ও দায়িত্বশীল কাজ।
সহিহ বুখারী (২৭৩৮) ও সহিহ মুসলিমের (১৬২৭) হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, যে মুসলিমের ওসিয়ত করার মতো কিছু আছে, তার জন্য লিখিত ওসিয়ত ছাড়া দুই রাত কাটানো উচিত নয়। হাদীসটির বর্ণনাকারী ইবনে উমর (রা.) বলেছেন, এই কথা শোনার পর থেকে তিনি এক রাতও ওসিয়ত ছাড়া কাটাননি।
ওসিয়তের কিছু নিয়ম
- এক-তৃতীয়াংশের সীমা: সহিহ বুখারীর ২৭৪২ নম্বর হাদীসে সা‘দ (রা.)-এর ঘটনায় রাসূল ﷺ সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করার অনুমতি দিয়েছেন।
- উত্তরাধিকারীদের জন্য নয়: সুনানে আবু দাউদের ২৮৭০ নম্বর হাদীস অনুযায়ী, যারা শরিয়ত অনুযায়ী মিরাস পাবে, তাদের জন্য আলাদা ওসিয়ত করা যায় না।
ব্যবহারিক ওসিয়ত
শরয়ি ওসিয়তের পাশাপাশি কিছু ব্যবহারিক তথ্যও লিখে রাখা পরিবারের জন্য বড় উপকার: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, জমির কাগজপত্র কোথায় আছে, কার কাছে কী পাওনা। দেশের আইন অনুযায়ী সঠিকভাবে লিখতে একজন আইনজীবী ও আলেমের পরামর্শ নিন।
৭. পঞ্চম প্রস্তুতি: চলমান কল্যাণ রেখে যাওয়া
মৃত্যুর পর মানুষের নিজের আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে কিছু জানালা খোলা থাকে।
সহিহ মুসলিমের ১৬৩১ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ জানিয়েছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি বিষয় ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
তিনটি জানালা, তিনটি সুযোগ
- সদকায়ে জারিয়া: মসজিদে কুরআন দান, নলকূপ বসানো, গাছ লাগানো, অল্প সামর্থ্যেও এগুলো সম্ভব।
- উপকারী জ্ঞান: সন্তানকে সূরা শেখানো, কাউকে কুরআন পড়তে শেখানো, কিংবা সঠিক তথ্যসমৃদ্ধ একটি উপকারী লেখা।
- নেক সন্তান: সন্তানকে শুধু ভালো ক্যারিয়ার নয়, ভালো মানুষ ও আল্লাহভীরু করে গড়ে তোলার চেষ্টা। আর নিজেও বাবা-মায়ের জন্য নিয়মিত দোয়া করা, যাতে সন্তানরা দেখে শেখে।
সদকায়ে জারিয়ার বিভিন্ন ধরন ও সহজ উপায় নিয়ে আমাদের আলাদা একটি বিস্তারিত লেখা রয়েছে।
৮. আল্লাহর প্রতি সুধারণা নিয়ে বাঁচা
মৃত্যুর প্রস্তুতির সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো আল্লাহর প্রতি আশা ও সুধারণা।
সহিহ মুসলিমের ২৮৭৭ নম্বর হাদীসে জাবির (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল ﷺ তাঁর ইন্তেকালের মাত্র তিন দিন আগে বলেছিলেন, তোমাদের কেউ যেন আল্লাহর প্রতি সুধারণা ছাড়া মৃত্যুবরণ না করে।
সহিহ বুখারী (৭৪০৫) ও সহিহ মুসলিমের (২৬৭৫) হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ জানিয়েছেন, আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা রাখে, আমি তার সঙ্গে তেমনই আচরণ করি।
মৃত্যুকে ভয় নয়, সাক্ষাতের প্রস্তুতি
সহিহ বুখারী (৬৫০৭) ও সহিহ মুসলিমের (২৬৮৩) হাদীসে এসেছে, যে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমরা তো সবাই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রাসূল ﷺ ব্যাখ্যা করেছিলেন, মুমিনকে যখন আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন সে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে।
অর্থাৎ মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে অপছন্দ করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু একজন মুমিন জীবনভর এমনভাবে প্রস্তুতি নেয়, যেন শেষ মুহূর্তে আল্লাহর রহমতের আশা ভয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
৯. ভারসাম্য: মৃত্যুর স্মরণ যেন জীবন থেকে দূরে না সরায়
মৃত্যুর প্রস্তুতি মানে জীবন থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং ইসলাম শেখায়, জীবনকে আরও সুন্দর ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো।
ইমাম বুখারীর "আল-আদাবুল মুফরাদ" গ্রন্থের (৪৭৯) একটি হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, কিয়ামত শুরু হয়ে যাচ্ছে, আর তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ আছে, সম্ভব হলে সে যেন তা লাগিয়ে দেয়।
কী অসাধারণ শিক্ষা! পৃথিবীর শেষ মুহূর্তেও ভালো কাজ থেকে বিরত না থাকা।
পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটির আগে
মুস্তাদরাকে হাকিমে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল ﷺ পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের আগে মূল্যবান মনে করতে বলেছেন: বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতা, ব্যস্ততার আগে অবসর, আর মৃত্যুর আগে জীবন।
তাই মৃত্যুর স্মরণ আমাদের আলস্য নয়, বরং কাজের তাগিদ দেয়: পরিবারকে সময় দেওয়া, হালাল উপার্জন করা, মানুষের উপকার করা, এগুলোও আখিরাতের প্রস্তুতির অংশ।
একটি কোমল কথা
এই লেখা পড়ে কারও মনে যদি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা বা হতাশা জাগে, তাহলে মনে রাখবেন, ইসলাম কখনো নিরাশার কথা বলে না। এমন অনুভূতি দীর্ঘদিন থাকলে পরিবারের কারও সঙ্গে, একজন বিশ্বস্ত আলেমের সঙ্গে, প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। নিজের যত্ন নেওয়াও আল্লাহর দেওয়া আমানতের হেফাজত।
উপসংহার
মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু তার সময় অজানা। এই সত্যটি ইসলাম আমাদের ভয় দেখানোর জন্য মনে করিয়ে দেয় না, বরং জীবনকে অর্থবহ করার জন্য। তাওবা, ফরজ ইবাদতের যত্ন, মানুষের হক আদায়, ওসিয়ত লেখা, চলমান কল্যাণ রেখে যাওয়া এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা, এই প্রস্তুতিগুলো একজন মুমিনকে শান্ত ও আশাবাদী রাখে।
আর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হলো, আল্লাহর রহমতের দরজা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খোলা।
আজ থেকেই ছোট তিনটি কাজ দিয়ে শুরু করতে পারেন:
- আজ রাতে ঘুমানোর আগে আন্তরিকভাবে তাওবা করুন এবং সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পড়ুন।
- এই সপ্তাহে একটি কাগজে নিজের ঋণ ও পাওনার তালিকা এবং জরুরি কাগজপত্রের অবস্থান লিখে পরিবারের বিশ্বস্ত কাউকে জানিয়ে রাখুন।
- দীর্ঘদিন কথা বন্ধ আছে এমন একজন মানুষকে আজই একটি সালাম বা ছোট মেসেজ পাঠান।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উত্তম জীবন ও উত্তম পরিসমাপ্তি দান করুন, এবং তাঁর রহমতের আশা নিয়ে তাঁর সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার তাওফিক দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ইসলামে মৃত্যুকে স্মরণ করার উদ্দেশ্য কী?
জামে তিরমিযীর (২৩০৭) হাদীসে মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ভয় পাওয়া নয়, বরং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মোহ কমিয়ে জীবনকে আরও অর্থবহ ও দায়িত্বশীলভাবে কাটানো।
২. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার উপায় কী?
কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে প্রধান প্রস্তুতিগুলো হলো: আন্তরিক তাওবা, ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্ন, মানুষের হক ও ঋণ পরিশোধ, ওসিয়ত লিখে রাখা, সদকায়ে জারিয়ার মতো চলমান কল্যাণ রেখে যাওয়া এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখা।
৩. তাওবা কতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য?
জামে তিরমিযীর (৩৫৩৭) হাদীস অনুযায়ী, মৃত্যুর একেবারে শেষ মুহূর্তের আগ পর্যন্ত আল্লাহ বান্দার তাওবা গ্রহণ করেন। তবে সেই মুহূর্ত কখন আসবে কেউ জানে না, তাই আজই তাওবা করা উত্তম।
৪. ইসলামে ওসিয়ত করা কি জরুরি?
সহিহ বুখারী (২৭৩৮) ও সহিহ মুসলিমের (১৬২৭) হাদীসে ওসিয়ত করার মতো কিছু থাকলে লিখিত ওসিয়ত রাখতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করা যায়, এবং শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের জন্য আলাদা ওসিয়ত করা যায় না।
৫. মৃত্যুকে ভয় পাওয়া কি ঈমানের দুর্বলতা?
না। সহিহ বুখারী (৬৫০৭) ও সহিহ মুসলিমের (২৬৮৩) হাদীসে আয়েশা (রা.) নিজেই বলেছেন, আমরা সবাই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। এটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। তবে আল্লাহর রহমতের আশা ও সুধারণা নিয়ে প্রস্তুতি নিলে এই ভয় ধীরে ধীরে আশায় বদলে যায় বলে আশা করা যায়।
