সদকায়ে জারিয়া কী? কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা

 

সদকায়ে জারিয়া কী?

sodkaye-jaria-ki


কুরআন ও হাদীসের আলোকে সদকায়ে জারিয়ার পূর্ণ ব্যাখ্যা

ভূমিকা

ইসলাম মানুষের জীবনকে শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মৃত্যুর পরও নেকি অর্জনের সুযোগ রেখেছে। এমন একটি বিশেষ আমল হলো সদকায়ে জারিয়া—যার সওয়াব মানুষের মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। একজন মুসলিম যদি জীবদ্দশায় সদকায়ে জারিয়ার কোনো কাজ করে যান, তবে কবরেও তার আমলনামা বন্ধ হয় না।

এই লেখায় কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে জানবো—সদকায়ে জারিয়া কী, এর গুরুত্ব, উদাহরণ এবং কীভাবে আমরা সদকায়ে জারিয়ার আমল করতে পারি।


সদকায়ে জারিয়া কী?

সদকায়ে জারিয়া বলতে এমন দান বা সৎকর্মকে বোঝায়, যার উপকার দীর্ঘদিন বা স্থায়ীভাবে মানুষের উপকারে আসে এবং যার সওয়াব দানকারী মৃত্যুর পরও পেতে থাকে।

সহজ ভাষায় বলা যায়—
👉 যে সদকার ফল থেমে যায় না, সেটাই সদকায়ে জারিয়া।


সদকায়ে জারিয়া সম্পর্কে হাদীস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া—
১) সদকায়ে জারিয়া
২) উপকারী জ্ঞান
৩) নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”

(সহীহ মুসলিম: ১৬৩১)

এই হাদীস থেকেই সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।


কুরআনের আলোকে সদকায়ে জারিয়া

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

“যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রতিটি শীষে থাকে একশ দানা।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৬১)

এই আয়াত প্রমাণ করে—আল্লাহ তাআলা সদকার সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন, বিশেষ করে যখন তা মানুষের কল্যাণে দীর্ঘস্থায়ী হয়।


সদকায়ে জারিয়ার কিছু উদাহরণ

নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত সদকায়ে জারিয়ার উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. মসজিদ নির্মাণ বা সহযোগিতা করা

রাসূল ﷺ বলেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।”
(সহীহ বুখারি ও মুসলিম)


২. কূপ বা পানির ব্যবস্থা করা

পানি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম উত্তম উদাহরণ।


৩. দ্বীনি শিক্ষা প্রচার

  • কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র

  • মাদ্রাসা নির্মাণ

  • ইসলামি বই বা কুরআন বিতরণ

এসব কাজের মাধ্যমে যতদিন মানুষ উপকৃত হবে, ততদিন সওয়াব চলতে থাকবে।


৪. উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া

ইসলামি বই লেখা, ওয়েবসাইট, ইউটিউব ভিডিও, ইসলামি পোস্ট—সবই সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি তা সহীহ জ্ঞানভিত্তিক হয়।


৫. নেক সন্তান গড়ে তোলা

সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় গড়ে তুললে সে সন্তান আজীবন বাবা-মায়ের জন্য সদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকে।


সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব

  • মৃত্যুর পরও আমলনামা চালু থাকে

  • কবরের আজাব থেকে রক্ষার কারণ হতে পারে

  • জান্নাতের মর্যাদা বৃদ্ধি করে

  • দুনিয়াতে বরকত ও কল্যাণ আনে

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“সবচেয়ে উত্তম মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।”
(তাবারানি – হাসান)


কীভাবে আমরা সদকায়ে জারিয়া শুরু করতে পারি?

  • সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন

  • অনলাইনে ইসলামি কনটেন্ট শেয়ার করুন

  • একটি ভালো কাজের অংশীদার হোন

  • নিয়ত খাঁটি রাখুন—শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

মনে রাখবেন, সদকায়ে জারিয়ার জন্য বড় অংকের টাকা লাগবে—এমন নয়। নিয়তই আসল।


উপসংহার

সদকায়ে জারিয়া হলো একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব চলতে থাকবে অনন্তকাল। তাই আমাদের উচিত—জীবিত অবস্থাতেই সদকায়ে জারিয়ার আমল শুরু করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সদকায়ে জারিয়া করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url