অজুর দোয়া | নবীজি ﷺ শুরুতে, মাঝে ও শেষে যা পড়তেন
অজুর দোয়া | নবীজি ﷺ অজুর শুরুতে, মাঝে ও শেষে কোন দোয়া পড়তেন
অজু শুধু শারীরিক পবিত্রতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া নয় বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধিরও একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) অজুর প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করতেন যা এই ইবাদতকে আরও অর্থবহ ও ফজিলতপূর্ণ করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নামাজের জন্য পবিত্রতা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অজুর বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন (সূরা মায়িদা: ৬)। অনেক মুসলমান শুধু অজুর শারীরিক নিয়ম জানেন কিন্তু এর সাথে সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো সম্পর্কে অবগত নন। অথচ এই দোয়াগুলো পাঠ করলে অজুর ফজিলত আরও বৃদ্ধি পায় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। এই লেখায় আমরা অজু শুরু করার আগে, অজুর মাঝে এবং অজু শেষে পাঠ করার দোয়াগুলো আরবি, উচ্চারণ, অর্থ ও দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান তাদের অজুকে আরও ফজিলতপূর্ণ করে তুলতে পারেন।
অজুর দোয়া পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত
অজুর সময় দোয়া পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা: অজু শুধু শরীর পরিষ্কার করে না বরং দোয়ার মাধ্যমে অন্তরের পবিত্রতাও বৃদ্ধি করে। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াতে চাও তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো (সূরা মায়িদা: ৬)। রাসুলের সুন্নত: রাসুলুল্লাহ (সা.) অজুর প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও এই আমল শিখিয়েছেন। গুনাহ ঝরে পড়া: সঠিক নিয়মে অজু করলে শরীরের অঙ্গ থেকে গুনাহ ঝরে পড়ে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে (সহিহ মুসলিম: ২৪৪)। নামাজের প্রস্তুতি: অজুর দোয়া পাঠ করলে নামাজের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া যায় এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। দৈনিক বহুবার সুযোগ: যেহেতু দিনে একাধিকবার অজু করতে হয়, তাই এই দোয়াগুলো পাঠ করে বারবার সওয়াব অর্জনের সুযোগ পাওয়া যায়। সহজ কিন্তু ফজিলতপূর্ণ: এই দোয়াগুলো ছোট ও সহজ কিন্তু এর প্রতিদান অত্যন্ত বড়।
অজুর দোয়া পাঠ করা একটি সহজ সুন্নত যা নিয়মিত পালন করলে দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি বরকত লাভ করা যায় বলে আশা করা যায়।
অজু শুরু করার আগের দোয়া (বিসমিল্লাহ)
অজু শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত যা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত।
আরবি: بِسْمِ اللَّهِ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ
অর্থ: আল্লাহর নামে শুরু করছি।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহ না বলে অজু করে তার অজু হয় না, অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ ফজিলতযুক্ত অজু হয় না (সুনানে আবু দাউদ: ১০১, সুনানে তিরমিজি: ২৫)। কিছু ফিকহবিদের মতে এই হাদিস দুর্বল সনদের হলেও অন্যান্য শক্তিশালী দলিলের সমর্থনে বিসমিল্লাহ বলা মুস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসেবে বিবেচিত।
কখন বলবেন: পানি স্পর্শ করার আগে বা হাত ধোয়া শুরু করার প্রথম মুহূর্তে বিসমিল্লাহ বলা উচিত।
সাধারণ নিয়ম: যেকোনো ভালো কাজ শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলা রাসুলুল্লাহর একটি সাধারণ সুন্নত যা অজুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বিসমিল্লাহ দিয়ে অজু শুরু করলে এই ইবাদতে বরকত ও পূর্ণতা আসে বলে আশা করা যায়।
অজুর মাঝে পাঠ করার দোয়া
অজুর মাঝামাঝি সময়ে বিশেষত কুলি করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পাঠ করা যায় যদিও এটি সব হাদিস সংকলনে সমানভাবে শক্তিশালী সনদে বর্ণিত নয়।
আরবি: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَوَسِّعْ لِي فِي دَارِي وَبَارِكْ لِي فِي رِزْقِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলি জাম্বি ওয়া ওয়াসসি'লি ফি দারি ওয়া বারিকলি ফি রিজকি
অর্থ: হে আল্লাহ, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার গৃহে প্রশস্ততা দান করুন এবং আমার রিজিকে বরকত দিন।
সতর্কতা: এই দোয়াটি কিছু বর্ণনায় এসেছে তবে এর সনদ নিয়ে হাদিস বিশারদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তাই এটি নফল দোয়া হিসেবে পড়া যায় তবে এটিকে সুনির্দিষ্ট সুন্নত হিসেবে জোর দিয়ে দাবি করা থেকে বিরত থাকা সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
সাধারণ যিকির: অজুর মাঝে সাধারণভাবে আল্লাহর যিকির করা, মনে মনে দোয়া করা এবং প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় মনোযোগী থাকা উত্তম।
একাগ্রতা বজায় রাখা: অজুর সময় অন্য চিন্তা থেকে বিরত থেকে সম্পূর্ণ মনোযোগের সাথে অঙ্গগুলো ধোয়া এবং আল্লাহর স্মরণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
অজুর মাঝে আল্লাহর স্মরণে থাকলে এই ইবাদত আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে বলে আশা করা যায়।
অজু শেষে পাঠ করার দোয়া (কালিমা শাহাদাত)
অজু সম্পন্ন করার পর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দোয়া পাঠ করা সুন্নত যার ফজিলত সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আরবি: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে তারপর এই দোয়া পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সে যেকোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারে (সহিহ মুসলিম: ২৩৪)।
অতিরিক্ত অংশ: কিছু বর্ণনায় এই দোয়ার সাথে আরও একটি অংশ যুক্ত পাওয়া যায় - "আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতাহহিরিন" অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যা সুনানে তিরমিজিতে (৫৫) বর্ণিত হয়েছে যদিও এই সংযোজনের সনদ নিয়ে কিছু আলোচনা রয়েছে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়া: কিছু বর্ণনায় আকাশের দিকে তাকিয়ে এই দোয়া পড়ার কথা উল্লেখ আছে যদিও এই অংশটুকুর সনদ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
অজু শেষে এই দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং এটি জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম হতে পারে বলে হাদিসে আশার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
অজুর সময় প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার ক্রমে সাধারণ যিকির
যদিও প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার জন্য পৃথক পৃথক নির্দিষ্ট দোয়া রাসুলুল্লাহ থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়, তবে অজুর প্রতিটি ধাপে আল্লাহর স্মরণে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে সতর্কতা: বাজারে প্রচলিত কিছু বইয়ে প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার জন্য আলাদা আলাদা দোয়ার কথা উল্লেখ থাকে (যেমন মুখ ধোয়ার সময় একটি দোয়া, হাত ধোয়ার সময় আরেকটি) কিন্তু হাদিস বিশেষজ্ঞদের মতে এই দোয়াগুলোর অধিকাংশই দুর্বল বা ভিত্তিহীন সনদের। নির্ভরযোগ্য আমল: তাই শুধুমাত্র বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা এবং শেষে কালিমা শাহাদাত পড়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণিত সুন্নত হিসেবে বিবেচিত। সাধারণ যিকির করা: প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় মনে মনে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বা অন্য কোনো সাধারণ যিকির করা যেতে পারে যা নির্দিষ্ট কোনো দোয়া হিসেবে দাবি না করে সাধারণ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। তিনবার ধোয়ার সুন্নত: প্রতিটি অঙ্গ তিনবার ধোয়া সুন্নত এবং এই সংখ্যা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। পানি অপচয় না করা: অজুর সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন।
সঠিক ও প্রমাণিত দোয়াগুলো পাঠ করা এবং ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে বিরত থাকা একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য।
অজুর দোয়া মুখস্থ করার সহজ পদ্ধতি
অজুর দোয়াগুলো মুখস্থ করা এবং নিয়মিত অভ্যাস করার জন্য কিছু কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। ছোট অংশে ভাগ করা: প্রথমে শুধু বিসমিল্লাহ বলার অভ্যাস করা, তারপর ধীরে ধীরে শেষের কালিমা শাহাদাত যোগ করা। বাথরুমের আয়নায় লিখে রাখা: যেখানে অজু করা হয় সেখানে দোয়াটি লিখে রাখলে বারবার দেখে দেখে পড়া যায় এবং সহজে মুখস্থ হয়ে যায়। নিয়মিত পুনরাবৃত্তি: যেহেতু দিনে একাধিকবার অজু করতে হয়, তাই প্রতিবার সচেতনভাবে দোয়া পড়ার চেষ্টা করলে দ্রুত মুখস্থ হয়ে যায়। অর্থ বুঝে পড়া: শুধু মুখস্থ না করে দোয়ার অর্থ বুঝে পড়লে তা হৃদয়ে গেঁথে যায় এবং আন্তরিকতার সাথে পাঠ করা সহজ হয়। পরিবারকে শেখানো: সন্তানদের ছোট থেকে এই দোয়াগুলো শেখালে তারা সহজেই আয়ত্ত করে ফেলে। সঠিক উচ্চারণ শেখা: কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম বা অ্যাপের মাধ্যমে সঠিক উচ্চারণ শুনে শেখা উচিত যাতে ভুল উচ্চারণ না হয়।
নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে অজুর দোয়াগুলো সহজেই মুখস্থ হয়ে যাবে এবং তা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়।
উপসংহার
অজুর দোয়া পাঠ করা একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত যা আমাদের দৈনন্দিন ইবাদতে বাড়তি বরকত নিয়ে আসে। বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করে কালিমা শাহাদাত দিয়ে শেষ করার এই সংক্ষিপ্ত আমল জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার মতো বিশাল ফজিলতের প্রতিশ্রুতি বহন করে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।
আসুন আমরা প্রতিবার অজু করার সময় এই সুন্নত আমলগুলো পালন করি। অজু শুরু করার আগে পানি স্পর্শ করার সাথে সাথে বিসমিল্লাহ বলি। অজুর সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে প্রতিটি অঙ্গ ধৌত করি এবং আল্লাহর স্মরণে থাকি। অজু শেষে কালিমা শাহাদাত পাঠ করি এবং যদি সম্ভব হয় তাহলে "আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাওয়াবিন" দোয়াটিও যোগ করি। ভিত্তিহীন বা দুর্বল সনদের দোয়া থেকে বিরত থেকে শুধুমাত্র সহিহ হাদিসে প্রমাণিত দোয়াগুলো পাঠ করার চেষ্টা করি। এই দোয়াগুলো মুখস্থ না থাকলে লিখে রেখে প্রতিদিন অনুশীলন করি। সন্তানদের ছোট থেকে এই দোয়াগুলো শেখাই যাতে তারা সঠিকভাবে অজু করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধোয়ার সুন্নত মেনে চলি এবং পানির অপচয় থেকে বিরত থাকি। মনে রাখি যে অজু শুধু শারীরিক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধিরও একটি সুযোগ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে অজু করার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তৌফিক দান করুন। আমাদের অজু ও নামাজ কবুল করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা কি বাধ্যতামূলক?
অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা অধিকাংশ ফিকহবিদের মতে মুস্তাহাব বা উত্তম আমল, তবে এটি ফরজ বা বাধ্যতামূলক নয় বলে অধিকাংশ ফিকহি মাজহাবে বিবেচিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহ না বলে অজু করে তার অজু হয় না (সুনানে আবু দাউদ: ১০১, সুনানে তিরমিজি: ২৫), তবে হাদিস বিশারদদের মধ্যে এই হাদিসের সনদ নিয়ে কিছু আলোচনা রয়েছে এবং একে দুর্বল সনদের হাদিস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে অজু হয় না বলতে বোঝানো হয়েছে যে সম্পূর্ণ ফজিলতযুক্ত ও পরিপূর্ণ অজু হয় না, শারীরিকভাবে অজু বাতিল হয়ে যায় এমনটি নয়। তাই অনেক ফিকহবিদের মতে বিসমিল্লাহ না বললেও অজু শুদ্ধ হয়ে যায় কিন্তু এর পূর্ণ বরকত ও ফজিলত থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই বিসমিল্লাহ বলা অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এটি অজুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত যা নিয়মিত পালন করা উচিত যাতে অজুর পূর্ণ ফজিলত লাভ করা যায়।
২. অজু শেষে কোন দোয়া পড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ফজিলত কী?
অজু শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সহিহ হাদিসে প্রমাণিত দোয়া হলো কালিমা শাহাদাত - "আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু" যার অর্থ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল। এই দোয়ার ফজিলত সহিহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে - রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে তারপর এই দোয়া পাঠ করে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সে যেকোনো দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারে (সহিহ মুসলিম: ২৩৪)। এই হাদিসটি অত্যন্ত সহিহ ও নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হওয়ায় এটি অজুর পরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও কিছু বর্ণনায় "আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতাহহিরিন" অংশটুকু যুক্ত করার কথাও পাওয়া যায় (সুনানে তিরমিজি: ৫৫) যা তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দোয়া, যদিও এই সংযোজনের সনদ নিয়ে কিছুটা আলোচনা আছে।
৩. অজুর মাঝামাঝি সময়ে বা প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সময় কি আলাদা আলাদা দোয়া পড়তে হয়?
সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণা থাকলেও বাস্তবে প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার জন্য পৃথক পৃথক নির্দিষ্ট দোয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সহিহ সনদে প্রমাণিত নয়। বাজারে প্রচলিত কিছু বই বা লিফলেটে মুখ ধোয়ার সময়, হাত ধোয়ার সময়, মাথা মাসেহ করার সময় ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা দোয়ার কথা উল্লেখ থাকে, কিন্তু হাদিস বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে এই দোয়াগুলোর অধিকাংশই দুর্বল বা ভিত্তিহীন সনদের এবং এগুলো রাসুলুল্লাহর থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়। তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত এই বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং শুধুমাত্র প্রমাণিত আমল অনুসরণ করা। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো অজু শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা এবং শেষে কালিমা শাহাদাত পাঠ করা। অজুর মাঝামাঝি সময়ে সাধারণভাবে আল্লাহর স্মরণে থাকা, মনোযোগ সহকারে প্রতিটি অঙ্গ ধোয়া এবং প্রয়োজনে সাধারণ যিকির যেমন সুবহানাল্লাহ বা আলহামদুলিল্লাহ পড়া যেতে পারে তবে এগুলোকে নির্দিষ্ট সুন্নত দোয়া হিসেবে দাবি করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৪. অজুর দোয়া আরবিতে বলতে না পারলে বাংলায় বলা যাবে কি?
অজুর দোয়া মূলত আরবিতে পড়াই উত্তম এবং সুন্নত অনুযায়ী সঠিক, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে আরবি ভাষায় এই দোয়াগুলো পাঠ করতেন এবং এই শব্দগুলোর একটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক ও ভাষাগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে যারা নতুন মুসলমান বা আরবি উচ্চারণে এখনও দক্ষ নন তাদের জন্য প্রথমে দোয়ার অর্থ বাংলায় বুঝে নেওয়া এবং ধীরে ধীরে সঠিক আরবি উচ্চারণ শেখার চেষ্টা করা উচিত। এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে ধাপে ধাপে শেখা ভালো - প্রথমে ছোট দোয়া বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করা যায় যা মাত্র দুটি শব্দ এবং সহজেই মুখস্থ করা যায়। এরপর ধীরে ধীরে কালিমা শাহাদাতের মতো বড় দোয়া শেখা যেতে পারে। শেখার প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য অ্যাপ বা অডিও রেকর্ডিং ব্যবহার করে সঠিক উচ্চারণ অনুশীলন করা সহায়ক হতে পারে। যতক্ষণ না আরবি উচ্চারণ আয়ত্তে আসে ততক্ষণ মনে মনে বাংলায় দোয়ার অর্থ স্মরণ করে অজু করা যেতে পারে, তবে লক্ষ্য রাখা উচিত যেন ধীরে ধীরে সঠিক আরবি উচ্চারণে দোয়াগুলো পাঠের অভ্যাস গড়ে ওঠে যা সুন্নত অনুযায়ী সম্পূর্ণ ও উত্তম পদ্ধতি।
৫. অজুর দোয়া না জানলে বা ভুলে গেলে অজু কি বাতিল হয়ে যাবে?
না, অজুর দোয়া না জানা বা ভুলে যাওয়ার কারণে অজু বাতিল হয়ে যায় না বা অশুদ্ধ হয়ে যায় না। অজু শুদ্ধ হওয়ার জন্য মূল শর্ত হলো সঠিক নিয়মে অঙ্গগুলো ধৌত করা - মুখমণ্ডল, উভয় হাত কনুই পর্যন্ত, মাথা মাসেহ এবং পা গোড়ালি পর্যন্ত ধোয়া, যা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন (সূরা মায়িদা: ৬)। বিসমিল্লাহ বলা এবং শেষে কালিমা শাহাদাত পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ সুন্নত হলেও এগুলো অজু শুদ্ধ হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত নয় বলে অধিকাংশ ফিকহবিদ মত দিয়েছেন। তাই কেউ যদি ভুলে যান বা এখনও শেখেননি তাহলে তার অজু শুদ্ধ থাকবে এবং সেই অজু দিয়ে নামাজ আদায় করা যাবে। তবে যেহেতু এই দোয়াগুলোর ফজিলত অত্যন্ত বেশি বিশেষত অজু শেষের কালিমা শাহাদাত যা জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার মতো বিশাল প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি বহন করে, তাই এই দোয়াগুলো শেখার এবং নিয়মিত পাঠ করার চেষ্টা করা উচিত যাতে অজুর পূর্ণ বরকত ও সওয়াব লাভ করা যায়। ধীরে ধীরে অভ্যাস করলে এই দোয়াগুলো সহজেই আয়ত্তে চলে আসবে।
