কাজের ফাঁকে জিকির করার সহজ উপায়: সহিহ হাদীসের আলোকে
কাজের ফাঁকে জিকির করার সহজ উপায়: ব্যস্ত জীবনে আল্লাহর স্মরণ | সহিহ হাদীসের আলোকে
সকালে অফিসের জন্য দৌড়, রাস্তায় জ্যাম, সারাদিন মিটিং আর কাজের চাপ, বাসায় ফিরে রান্না, বাচ্চাদের পড়ানো। দিন শেষে মনে হয়, ইবাদতের জন্য আলাদা সময় তো বের করাই হলো না।
আমাদের অনেকের ধারণা, জিকির মানে জায়নামাজে বসে তাসবীহ হাতে লম্বা সময় দেওয়া। সেটা অবশ্যই উত্তম। কিন্তু ইসলাম জিকিরকে শুধু নির্দিষ্ট সময় বা জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখেনি।
রাসূল ﷺ সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতেন, আর এমন কিছু ছোট জিকির শিখিয়ে গেছেন, যা হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে, এমনকি অপেক্ষার কয়েক সেকেন্ডেও পড়া যায়। আর হাদীসে এসব ছোট জিকিরের ফজিলত অবাক করার মতো।
এই লেখায় সহিহ হাদীসের আলোকে সেই সহজ জিকিরগুলো এবং ব্যস্ত দিনের প্রতিটি মুহূর্তে এগুলোকে কীভাবে মিশিয়ে নেওয়া যায়, তার বাস্তব কৌশল তুলে ধরা হলো।
১. জিকির কী এবং কেন কাজের মাঝেও
"জিকির" শব্দের অর্থ স্মরণ করা। মুখে আল্লাহর নাম, প্রশংসা ও পবিত্রতা উচ্চারণ করা, আর অন্তরে তাঁকে মনে রাখা, দুটিই জিকিরের অংশ।
সূরা আল-বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। একটু ভাবুন, আমরা যখন অফিসের ডেস্কে বসে একবার "সুবহানাল্লাহ" বলি, তখন আসমান-জমিনের মালিক আমাদের স্মরণ করেন।
সব অবস্থায় স্মরণ
সূরা আলে ইমরানের ১৯১ নম্বর আয়াতে জ্ঞানী মানুষদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে, তারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে।
সহিহ মুসলিমের ৩৭৩ নম্বর হাদীসে আয়েশা (রা.) জানিয়েছেন, রাসূল ﷺ তাঁর সব অবস্থায় আল্লাহর জিকির করতেন।
এই আয়াত ও হাদীস থেকে বোঝা যায়, জিকিরের জন্য কাজ থামিয়ে আলাদা হয়ে বসা সবসময় জরুরি নয়। বরং দৈনন্দিন কাজের ভেতরেই আল্লাহর স্মরণকে মিশিয়ে নেওয়া যায়। তখন সাধারণ কাজও এক ধরনের ইবাদতের আবহে পরিণত হয়।
২. ব্যস্ততা ও জিকির: কুরআনের আদর্শ মানুষ
কেউ কেউ মনে করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরিতে ব্যস্ত থাকলে আল্লাহর স্মরণ হয়তো কম হবেই। কুরআন এর একটি সুন্দর জবাব দিয়েছে।
সূরা আন-নূরের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এমন কিছু মানুষের প্রশংসা করেছেন, যাদের ব্যবসা ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ, নামাজ কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে উদাসীন করে না।
লক্ষ করুন, এখানে বলা হয়নি তারা ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। বরং তারা ব্যবসা করেন, কিন্তু ব্যবসা তাদের আল্লাহ থেকে দূরে সরাতে পারে না। এটাই ভারসাম্য।
জিহ্বা সতেজ রাখো
জামে তিরমিযীর ৩৩৭৫ নম্বর হাদীসে (হাসান) এক সাহাবি রাসূল ﷺ-কে বলেছিলেন, ইসলামের বিধানগুলো আমার জন্য অনেক হয়ে গেছে, আমাকে এমন একটি কাজ বলে দিন, যা আমি ধরে রাখতে পারি। রাসূল ﷺ বলেছিলেন, তোমার জিহ্বা যেন সবসময় আল্লাহর জিকিরে সতেজ থাকে।
এই হাদীসটি বিশেষভাবে ব্যস্ত মানুষদের জন্য সুসংবাদ। যারা অনেক বড় আমল করতে পারেন না, তাদের জন্যও এই সহজ পথটি খোলা।
৩. কাজের ফাঁকে পড়ার মতো সহজ জিকির
নিচের জিকিরগুলো খুব ছোট, যেকোনো সময় পড়া যায়, আর প্রতিটির ফজিলত সহিহ হাদীসে বর্ণিত।
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
সহিহ বুখারী (৬৪০৬) ও সহিহ মুসলিমের (২৬৯৪) হাদীসে এই দুটি বাক্যকে জিহ্বায় হালকা, মিজানে ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রিয় বলা হয়েছে।
চারটি প্রিয় বাক্য
"সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার"। সহিহ মুসলিমের ২৬৯৫ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, এই কথাগুলো বলা তাঁর কাছে সূর্য যা কিছুর ওপর উদিত হয়, তার সবকিছুর চেয়ে প্রিয়।
দিনে এক হাজার নেকি
সহিহ মুসলিমের ২৬৯৮ নম্বর হাদীসে এসেছে, কেউ দিনে ১০০ বার "সুবহানাল্লাহ" বললে তার জন্য এক হাজার নেকি লেখা হয়, অথবা এক হাজার গুনাহ মুছে দেওয়া হয়।
জান্নাতের গুপ্তধন
"লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"। সহিহ বুখারী (৬৩৮৪) ও সহিহ মুসলিমের (২৭০৪) হাদীসে একে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর একটি বলা হয়েছে।
ইস্তিগফার
"আস্তাগফিরুল্লাহ"। সহিহ মুসলিমের ২৭০২ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ জানিয়েছেন, তিনি দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে তাওবা করেন।
৪. যাতায়াতের সময় জিকির
শহরের মানুষের দিনের একটি বড় অংশ কাটে যাতায়াতে। বাসে, রিকশায়, সিএনজিতে বা জ্যামে আটকে থাকা এই সময়টা জিকিরের জন্য সবচেয়ে সুবর্ণ সুযোগ।
বাহনে ওঠার দোয়া
সূরা আয-যুখরুফের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে বাহনে আরোহণের দোয়া এসেছে: "সুবহানাল্লাযী সাখখারা লানা হাযা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবূন" (পবিত্র তিনি, যিনি একে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে বশ করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের রবের কাছে ফিরে যাব)।
সহিহ মুসলিমের ১৩৪২ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ সফরে বের হওয়ার সময় এই দোয়া পড়তেন।
উঁচুতে ওঠা ও নিচে নামা
সহিহ বুখারীর ২৯৯৩ নম্বর হাদীসে জাবির (রা.) জানিয়েছেন, সাহাবিরা উঁচুতে উঠলে "আল্লাহু আকবার" এবং নিচে নামলে "সুবহানাল্লাহ" বলতেন। আজকের দিনে সিঁড়ি বা ফ্লাইওভারে ওঠা-নামার সময় এই সুন্নাতটি পালন করা যায়।
জ্যামে আটকে থাকলে
জ্যামে বিরক্ত না হয়ে সময়টাকে কাজে লাগান। ২০ মিনিটের জ্যামে ধীরে ধীরে কয়েকশ বার তাসবীহ পড়া সম্ভব। হেডফোনে গান না শুনে কুরআন তিলাওয়াত শোনাও একটি সুন্দর বিকল্প।
৫. অফিস বা কাজের টেবিলে জিকির
কর্মক্ষেত্রে জিকির নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য মনে রাখা দরকার: কাজের মান ও সময়ের আমানত রক্ষা করা।
কাজের আমানত আগে
অফিসের সময় প্রতিষ্ঠানের প্রতি একটি আমানত। জিকিরের কারণে যেন কাজের মনোযোগ বা মান না কমে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সূরা আন-নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে। আলেমগণ বলেছেন, সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাও ইবাদতের অংশ।
কাজের ফাঁকের মুহূর্তগুলো
তবে কাজের মধ্যেও অনেক ছোট ছোট ফাঁকা মুহূর্ত থাকে, যা আমরা সাধারণত ফোন স্ক্রল করে কাটাই:
- কম্পিউটার চালু বা ফাইল লোড হওয়ার অপেক্ষায়।
- লিফটের জন্য অপেক্ষা বা লিফটে ওঠার সময়।
- মিটিং শুরু হওয়ার আগের কয়েক মিনিট।
- চা বা পানি আনতে যাওয়ার পথে।
- একটি কাজ শেষ করে পরেরটা শুরুর আগে।
এই মুহূর্তগুলোতে নিঃশব্দে কয়েকবার "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী" বা "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়া যায়, কাউকে বিরক্ত না করে, কাজের ক্ষতি না করে।
কাজ শুরু ও শেষ
প্রতিটি কাজ "বিসমিল্লাহ" বলে শুরু করুন, আর শেষ হলে "আলহামদুলিল্লাহ" বলুন। এতে পুরো কাজটাই আল্লাহর স্মরণের ফ্রেমে বাঁধা পড়ে।
৬. ঘরের কাজ, রান্না ও সন্তান সামলানোর সময়
যারা ঘরের দায়িত্ব সামলান, তাদের দিনও কম ব্যস্ত নয়। রান্না, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া, বাচ্চাদের দেখাশোনা, সারাদিন হাত ব্যস্ত। কিন্তু অনেক কাজে মুখ ও মন অনেকটা মুক্ত থাকে।
রাসূল ﷺ-এর কন্যার জন্য উপহার
সহিহ বুখারী (৩১১৩) ও সহিহ মুসলিমের (২৭২৭) হাদীসে একটি হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা আছে। ফাতিমা (রা.) ঘরের কাজে, বিশেষ করে যাঁতা ঘোরানোয় অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। তিনি আলী (রা.)-এর সঙ্গে রাসূল ﷺ-এর কাছে একজন খাদেম চাইতে গিয়েছিলেন।
রাসূল ﷺ তাঁদের একটি আমল শিখিয়ে দিলেন: ঘুমানোর আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার। আর বললেন, এটি তোমাদের জন্য খাদেমের চেয়ে উত্তম।
আলেমগণ এখান থেকে বুঝেছেন, জিকির ক্লান্তি সহ্য করার আত্মিক শক্তি জোগায়।
ঘরের কাজে জিকিরের কিছু উপায়
- সবজি কাটার সময় বা রান্না নাড়ার সময় তাসবীহ পড়া।
- বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর সময় নিচু স্বরে জিকির বা ছোট সূরা পড়া। বাচ্চারাও শুনে শুনে শিখে যায়।
- কাপড় ভাঁজ করার সময় ইস্তিগফার।
- ঝাড়ু দেওয়ার সময় "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"।
৭. জিকিরকে অভ্যাসে পরিণত করার কৌশল
জিকিরের ফজিলত জানা সহজ, কিন্তু নিয়মিত করাটাই চ্যালেঞ্জ। কিছু ব্যবহারিক কৌশল সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে জুড়ে দিন
নতুন অভ্যাস সবচেয়ে সহজে গড়ে ওঠে পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত করলে। যেমন:
- "যখনই লিফটে উঠব, তখনই সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী।"
- "যখনই ফোন আনলক করব, একবার আস্তাগফিরুল্লাহ।"
- "যখনই কোনো লাল বাতিতে গাড়ি থামবে, তাসবীহ।"
আঙুলে গণনা
সুনানে আবু দাউদের ১৫০২ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ-কে ডান হাতের আঙুলে তাসবীহ গুনতে দেখা গেছে বলে বর্ণিত হয়েছে। আঙুলে গোনার সুবিধা হলো, এর জন্য আলাদা কিছু লাগে না, আর কেউ টেরও পায় না।
দৃশ্যমান রিমাইন্ডার
- ডেস্কে বা কম্পিউটারের কোণে একটি ছোট স্টিকি নোট: "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী"।
- ফোনে দিনে কয়েকবার একটি নীরব রিমাইন্ডার।
- আঙুলে পরার ডিজিটাল তাসবীহ কাউন্টার, যারা গুনে পড়তে চান।
ছোট লক্ষ্য দিয়ে শুরু
প্রথম সপ্তাহে লক্ষ্য রাখুন দিনে ১০০ বার যেকোনো একটি জিকির। ধীরে ধীরে বাড়ান।
৮. জিকিরের আদব ও কিছু সাধারণ প্রশ্ন
অন্তর ও মুখ একসঙ্গে
আলেমগণ বলেছেন, সবচেয়ে উত্তম জিকির হলো যেখানে মুখ ও অন্তর একসঙ্গে থাকে। তবে শুধু মুখের জিকিরও মূল্যহীন নয়। শুরুতে মন না বসলেও চালিয়ে যান, ধীরে ধীরে অন্তরও যুক্ত হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
অজু কি জরুরি?
না। মুখে জিকির করার জন্য অজু শর্ত নয়। সহিহ মুসলিমের ৩৭৩ নম্বর হাদীস অনুযায়ী রাসূল ﷺ সব অবস্থায় জিকির করতেন। তবে কুরআন স্পর্শ করার বিধান আলাদা।
কোথায় মুখে জিকির করবেন না
টয়লেট বা বাথরুমের ভেতরে মুখে উচ্চারণ করে জিকির না করাই আদব। সহিহ মুসলিমের ৩৭০ নম্বর হাদীসে এমন অবস্থায় রাসূল ﷺ সালামের উত্তর দেননি। এ সময় মনে মনে স্মরণ করা যায়।
নিচু স্বরে
সূরা আল-আ'রাফের ২০৫ নম্বর আয়াতে বিনয় ও ভয়ের সঙ্গে, উচ্চস্বরে নয়, বরং নিচু স্বরে রবকে স্মরণ করার কথা এসেছে। অফিস বা গণপরিবহনে নিঃশব্দে বা খুব নিচু স্বরে জিকির করুন, যাতে অন্যের অসুবিধা না হয়।
৯. জিকিরের প্রভাব: জীবন্ত হৃদয়
জিকির শুধু নেকি অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি হৃদয়কে জীবন্ত রাখে।
সহিহ বুখারীর ৬৪০৭ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন। যে তার রবকে স্মরণ করে আর যে করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো।
অর্থাৎ শরীর জীবিত থাকলেও আল্লাহর স্মরণহীন হৃদয় এক অর্থে নিষ্প্রাণ। আর জিকির সেই হৃদয়ে প্রাণ ফেরায়।
আল্লাহ সঙ্গে থাকেন
সহিহ বুখারী (৭৪০৫) ও সহিহ মুসলিমের (২৬৭৫) হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ জানিয়েছেন, বান্দা যখন তাঁকে স্মরণ করে, তিনি তার সঙ্গে থাকেন। বান্দা মনে মনে স্মরণ করলে আল্লাহও তাকে নিজের কাছে স্মরণ করেন। আর কোনো মজলিসে স্মরণ করলে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম মজলিসে স্মরণ করেন।
অন্তরের প্রশান্তি
সূরা আর-রা'দের ২৮ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। ব্যস্ত, চাপের দিনের মাঝে কয়েক সেকেন্ডের একটি "সুবহানাল্লাহ" অনেক সময় মনকে একটু থামিয়ে দেয়, একটু হালকা করে দেয়।
উপসংহার
ব্যস্ততা আল্লাহর স্মরণের পথে বাধা নয়, যদি আমরা একটু সচেতন হই। যাতায়াতের জ্যাম, অফিসের ফাঁকা মুহূর্ত, রান্নাঘরের কাজ, সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে জিকিরের অসংখ্য সুযোগ। আর হাদীস অনুযায়ী এসব ছোট জিকিরের প্রতিটিই মিজানে ভারী, আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
আজ থেকেই শুরু করতে পারেন এভাবে:
- আজকের দিনের জন্য একটি জিকির বেছে নিন, যেমন "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম"।
- এটিকে একটি দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে জুড়ে দিন, যেমন প্রতিবার লিফটে ওঠা বা রাস্তার লাল বাতিতে থামা।
- আজ যাতায়াতের সময় অন্তত দশ মিনিট ফোনের বদলে জিকিরে কাটান।
এক সপ্তাহ চেষ্টা করুন। আশা করা যায়, ধীরে ধীরে জিহ্বা নিজে থেকেই আল্লাহর নাম নিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আর ব্যস্ত দিনের মাঝেও মনে একটা প্রশান্তি অনুভব করবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার জিহ্বাকে সবসময় তাঁর স্মরণে সতেজ রাখার এবং ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁকে না ভোলার তাওফিক দান করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কাজের ফাঁকে কোন জিকিরগুলো পড়া সহজ?
"সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম" (সহিহ বুখারী ৬৪০৬), "সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার" (সহিহ মুসলিম ২৬৯৫), "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (সহিহ বুখারী ৬৩৮৪) এবং "আস্তাগফিরুল্লাহ" ছোট ও সহজ জিকির।
২. জিকির করার জন্য কি অজু থাকা জরুরি?
না। মুখে জিকির করার জন্য অজু শর্ত নয়। সহিহ মুসলিমের (৩৭৩) হাদীস অনুযায়ী রাসূল ﷺ সব অবস্থায় আল্লাহর জিকির করতেন। তবে অজু অবস্থায় জিকির করা উত্তম।
৩. অফিসের সময় জিকির করা কি ঠিক?
কাজের মান ও সময়ের আমানত রক্ষা করে, কাজের ফাঁকা মুহূর্তগুলোতে নিঃশব্দে জিকির করা যায়। জিকিরের কারণে যেন দায়িত্বে অবহেলা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি (সূরা আন-নিসা ৫৮)।
৪. মন না বসলে কি শুধু মুখে জিকির করলে লাভ আছে?
আলেমগণের মতে মুখ ও অন্তর একসঙ্গে থাকা উত্তম, তবে শুধু মুখের জিকিরও মূল্যহীন নয়। নিয়মিত চালিয়ে গেলে ধীরে ধীরে অন্তরও যুক্ত হয় বলে আশা করা যায়।
৫. দিনে কতবার জিকির করা উচিত?
নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই, যত বেশি সম্ভব। তবে সহিহ মুসলিমের (২৬৯৮) হাদীসে দিনে ১০০ বার "সুবহানাল্লাহ" বললে এক হাজার নেকির কথা এসেছে, আর রাসূল ﷺ দিনে ১০০ বার ইস্তিগফার করতেন (সহিহ মুসলিম ২৭০২)। এটি শুরু করার জন্য একটি ভালো লক্ষ্য।
