দুশ্চিন্তা দূর করার কুরআনিক সমাধান ও দোয়া
দুশ্চিন্তা দূর করার কুরআনিক সমাধান: কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে মনের প্রশান্তির পথ
ভূমিকা
রাত গভীর হয়, চারপাশ নিঃশব্দ, কিন্তু মাথার ভেতরে চিন্তার ভিড় থামে না। চাকরি, সংসারের খরচ, সন্তানের ভবিষ্যৎ, কারও অসুস্থতা, কোনো ভুল সিদ্ধান্ত। একটার পর একটা দুশ্চিন্তা মনকে ভারী করে রাখে, ঘুম আসে না।
আপনি যদি এই অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হন, তাহলে জেনে রাখুন, আপনি একা নন। নবী-রাসূলরাও কষ্ট ও দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, আর কুরআন তাঁদের সেই মুহূর্তগুলোর কথা খুব মমতার সঙ্গে বর্ণনা করেছে।
কুরআন ও হাদীসে দুশ্চিন্তার সময় মনকে শক্ত রাখার অনেক সুন্দর দিকনির্দেশনা আছে: আল্লাহর স্মরণ, ভরসা, নামাজ, দোয়া, আর জীবনকে দেখার একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। এই লেখায় সেই পথগুলোই একে একে তুলে ধরা হলো। পাশাপাশি থাকছে একটি জরুরি কথা: কখন আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে পেশাদার সাহায্যও নেওয়া উচিত।
১. দুশ্চিন্তা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি
অনেকে মনে করেন, দুশ্চিন্তা হওয়া মানেই ঈমান দুর্বল। কিন্তু কুরআনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আল্লাহর প্রিয় বান্দারাও গভীর কষ্ট অনুভব করেছেন।
ইয়াকুব (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তান ইউসুফকে হারিয়ে এত কেঁদেছিলেন যে, তাঁর চোখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। সূরা ইউসুফের ৮৬ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছিলেন, আমি আমার দুঃখ ও বেদনার অভিযোগ শুধু আল্লাহর কাছেই করি।
রাসূল ﷺ-ও কষ্ট পেয়েছেন। সূরা আল-হিজরের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁকে বলেছেন, আমি জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার মন সংকুচিত হয়।
দুশ্চিন্তাও বৃথা যায় না
সহিহ বুখারী (৫৬৪১) ও সহিহ মুসলিমের (২৫৭৩) হাদীসে রাসূল ﷺ জানিয়েছেন, একজন মুসলিম যে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা মনোবেদনায় ভোগে, এমনকি একটি কাঁটা বিঁধলেও, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার কিছু গুনাহ মাফ করে দেন।
অর্থাৎ আপনার রাতের নির্ঘুম দুশ্চিন্তাও আল্লাহর কাছে হিসাবের বাইরে নয়। এটি দুর্বলতা নয়, মানুষ হওয়ার অংশ। আর এই কষ্টের মধ্যেও কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে বলে আশা করা যায়।
২. আল্লাহর স্মরণে অন্তরের প্রশান্তি
দুশ্চিন্তার সময় মন একটা আশ্রয় খোঁজে। কুরআন সেই আশ্রয়ের কথা খুব স্পষ্টভাবে বলেছে।
সূরা আর-রা'দের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।
এই আয়াতে "জেনে রেখো" শব্দটি দিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেন বলা হচ্ছে, এই কথাটি ভালো করে মনে রাখো।
জিকির কীভাবে সাহায্য করে
যখন মাথায় চিন্তার ঝড় চলে, তখন জিকির মনকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফিরিয়ে আনে। "সুবহানাল্লাহ", "আলহামদুলিল্লাহ", "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", "আস্তাগফিরুল্লাহ", এই ছোট শব্দগুলো ধীরে ধীরে, অর্থ মনে রেখে বলতে থাকলে মন অনেকটা স্থির হয়ে আসে বলে অনেকেই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন।
কুরআন তিলাওয়াত
কুরআন নিজেই সবচেয়ে বড় জিকির। দুশ্চিন্তার সময় ধীরে ধীরে কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করা, বা কোনো ভালো ক্বারীর তিলাওয়াত শোনা অনেক মানুষের জন্য সান্ত্বনার উৎস।
৩. কষ্টের সঙ্গেই আছে স্বস্তি
দুশ্চিন্তার সময় মনে হয়, এই অবস্থা আর কখনো বদলাবে না। কুরআন এই ধারণাকে ভেঙে দেয়।
সূরা আশ-শারহের ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পরপর দুবার বলেছেন, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।
তাফসিরবিদগণ একটি সুন্দর সূক্ষ্মতা উল্লেখ করেছেন। আরবিতে "কষ্ট" শব্দটি দুবারই নির্দিষ্টবাচক, অর্থাৎ একই কষ্ট। কিন্তু "স্বস্তি" শব্দটি অনির্দিষ্ট, অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন স্বস্তি। এখান থেকে অনেক আলেম বুঝেছেন, একটি কষ্টের সঙ্গে একাধিক স্বস্তি আসে।
লক্ষ করুন, আয়াতে বলা হয়েছে "কষ্টের পরে" নয়, বরং "কষ্টের সঙ্গে"। অর্থাৎ কঠিন সময়ের মধ্যেই কোনো না কোনো স্বস্তি, কোনো না কোনো সাহায্য লুকিয়ে থাকে।
সামর্থ্যের বাইরে নয়
সূরা আল-বাকারার ২৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। আপনি যে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আল্লাহ জানেন আপনি তা বহন করতে পারবেন।
৪. তাওয়াক্কুল: চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা
অনেক দুশ্চিন্তার মূলে থাকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। কী হবে, কীভাবে হবে, যদি না হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে কুরআন তাওয়াক্কুলের কথা বলে।
সূরা আত-তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
ভরসা মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়
জামে তিরমিযীর ২৫১৭ নম্বর হাদীসে এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, উট বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে ভরসা করব? রাসূল ﷺ বলেছিলেন, আগে বাঁধো, তারপর ভরসা করো।
অর্থাৎ নিজের দিক থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করুন, তারপর ফলাফলের দুশ্চিন্তা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিন।
"হাসবুনাল্লাহ"
সহিহ বুখারীর ৪৫৬৩ নম্বর হাদীসে ইবনে আব্বাস (রা.) জানিয়েছেন, ইবরাহিম (আ.)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তিনি বলেছিলেন "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল" (আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি উত্তম কর্মবিধায়ক)। রাসূল ﷺ-ও কঠিন সময়ে একই কথা বলেছিলেন (সূরা আলে ইমরান ১৭৩)।
৫. নামাজ ও সবরের মাধ্যমে সাহায্য
সূরা আল-বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের বলেছেন, তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।
রাসূল ﷺ-এর অভ্যাস
সুনানে আবু দাউদের ১৩১৯ নম্বর হাদীসে হুযাইফা (রা.) জানিয়েছেন, রাসূল ﷺ কোনো বিষয়ে চিন্তিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।
সুনানে আবু দাউদের ৪৯৮৫ নম্বর হাদীসে এসেছে, রাসূল ﷺ বিলাল (রা.)-কে বলতেন, হে বিলাল, ইকামত দাও, নামাজের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও। অর্থাৎ নামাজ তাঁর কাছে বোঝা ছিল না, ছিল বিশ্রাম ও প্রশান্তির জায়গা।
সিজদায় মন খুলে বলা
সূরা আল-হিজরের ৯৮ নম্বর আয়াতে রাসূল ﷺ-এর মন সংকুচিত হওয়ার কথা বলার পরপরই আল্লাহ বলেছেন, তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করো এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।
দুশ্চিন্তার সময় দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে সিজদায় দীর্ঘক্ষণ থাকুন। সিজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে (সহিহ মুসলিম ৪৮২)। নফল নামাজের সিজদায় নিজের ভাষায়ও মনের কথা আল্লাহকে বলা যায় বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন।
৬. দুশ্চিন্তার সময় পড়ার মাসনুন দোয়া
রাসূল ﷺ দুশ্চিন্তা ও কষ্টের সময় পড়ার জন্য কিছু দোয়া শিখিয়েছেন।
দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয়
সহিহ বুখারীর ৬৩৬৯ নম্বর হাদীসে আনাস (রা.) জানিয়েছেন, রাসূল ﷺ প্রায়ই এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দালাইদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের বোঝা থেকে এবং মানুষের দমন-পীড়ন থেকে।
কঠিন বিপদের মুহূর্তে
সহিহ বুখারী (৬৩৪৬) ও সহিহ মুসলিমের (২৭৩০) হাদীসে রাসূল ﷺ কঠিন বিপদের সময় এই দোয়া পড়তেন:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আযীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রাব্বুল আরদি ওয়া রাব্বুল আরশিল কারীম।
অর্থ: মহান ও সহনশীল আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আসমানসমূহের রব, জমিনের রব এবং সম্মানিত আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
আরও একটি সহজ দোয়া
সুনানে আবু দাউদের ১৫২৫ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ আসমা বিনতে উমাইস (রা.)-কে বিপদের সময় পড়ার জন্য শিখিয়েছিলেন: "আল্লাহু আল্লাহু রাব্বী, লা উশরিকু বিহী শাইআ" (আল্লাহ, আল্লাহই আমার রব, আমি তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করি না)।
৭. নবীদের দোয়া থেকে শিক্ষা
কুরআনে নবীদের যেসব দোয়া এসেছে, সেগুলো দুশ্চিন্তার সময় আমাদের জন্যও সুন্দর পাথেয়।
মুসা (আ.): বুকে প্রশস্ততা চাওয়া
ফেরাউনের মতো শক্তিশালী শাসকের সামনে যাওয়ার দায়িত্ব পেয়ে মুসা (আ.) চিন্তিত হয়েছিলেন। সূরা ত্বা-হার ২৫ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতে তাঁর দোয়া এসেছে: "রাব্বিশরাহলী সাদরী, ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী" (হে আমার রব, আমার বুক প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন)।
পরীক্ষা, ইন্টারভিউ বা কঠিন কোনো কাজের আগে এই দোয়াটি পড়া যায়।
ইউনুস (আ.): অন্ধকারে আলোর দোয়া
মাছের পেটের তিন স্তরের অন্ধকারে ইউনুস (আ.) যে দোয়া করেছিলেন, তা সূরা আল-আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে এসেছে: "লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যালিমীন"। পরের আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, আর এভাবেই মুমিনদের মুক্তি দেন।
জামে তিরমিযীর ৩৫০৫ নম্বর হাদীসে এসেছে, কোনো মুসলিম কোনো বিষয়ে এই দোয়া করলে আল্লাহ তাতে সাড়া দেন।
ইয়াকুব (আ.): "সবরুন জামীল"
সূরা ইউসুফের ১৮ ও ৮৩ নম্বর আয়াতে ইয়াকুব (আ.) বলেছিলেন "ফাসাবরুন জামীল", অর্থাৎ সুন্দর ধৈর্য। এমন ধৈর্য, যাতে মানুষের কাছে অভিযোগ নেই, কিন্তু আল্লাহর কাছে মন খুলে বলা আছে।
৮. মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি: সবকিছুতেই কল্যাণের আশা
দুশ্চিন্তা অনেক সময় বাড়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। একই ঘটনাকে দুজন মানুষ দুইভাবে দেখতে পারেন।
সহিহ মুসলিমের ২৯৯৯ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, মুমিনের বিষয়টি কতই না আশ্চর্যজনক! তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর। আনন্দের কিছু ঘটলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তা তার জন্য কল্যাণ। আর কষ্টের কিছু ঘটলে সে ধৈর্য ধরে, সেটাও তার জন্য কল্যাণ।
যা আমাদের হাতে নেই
সূরা আল-বাকারার ২১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো কিছু পছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।
একটি ছোট অনুশীলন
যখন কোনো বিষয়ে দুশ্চিন্তা হবে, একটি কাগজে দুটি কলাম করুন। একটিতে লিখুন, "এখানে আমি কী করতে পারি", অন্যটিতে, "যা আমার হাতে নেই"। প্রথম কলামের কাজগুলো করুন, আর দ্বিতীয় কলামের বিষয়গুলো দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর হাতে সঁপে দিন।
৯. ঈমান ও চিকিৎসা: দুটোই আল্লাহর দেওয়া পথ
এই লেখার সবচেয়ে জরুরি অংশ হয়তো এটি।
সাধারণ দুশ্চিন্তা আর দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা এক জিনিস নয়। কারও যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুম না হয়, কোনো কিছুতে আগ্রহ না থাকে, দৈনন্দিন কাজ করা কঠিন হয়ে যায়, বা হঠাৎ বুক ধড়ফড়, প্রচণ্ড ভয় বা অস্থিরতা হয়, তাহলে এটি এমন একটি অবস্থা হতে পারে, যার জন্য চিকিৎসকের সাহায্য প্রয়োজন।
চিকিৎসা নেওয়া ঈমানের দুর্বলতা নয়
সহিহ বুখারীর ৫৬৭৮ নম্বর হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ এমন কোনো রোগ পাঠাননি, যার নিরাময়ের ব্যবস্থাও পাঠাননি। শরীরের অসুস্থতায় যেমন ডাক্তারের কাছে যাই, তেমনি মনের অসুস্থতায়ও একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ইসলামসম্মত। এটি সেই "উট বেঁধে রাখার" অংশ।
কুরআন, নামাজ ও দোয়া আত্মিক শক্তি দেয়, আর চিকিৎসা দেয় প্রয়োজনীয় সহায়তা। দুটি একসঙ্গে চলতে পারে।
জরুরি অবস্থায়
কারও মনে যদি নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসে, তাহলে দেরি না করে এখনই পরিবারের কাউকে, বিশ্বস্ত কোনো বন্ধুকে জানান, অথবা নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন। সাহায্য চাওয়া সাহসের কাজ, আর আপনার জীবন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
উপসংহার
দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনের অংশ, নবী-রাসূলরাও এর মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। কুরআন ও সহিহ হাদীস আমাদের শেখায়, এই সময়ে আল্লাহর স্মরণে মনকে স্থির করা, "কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে" এই আশা ধরে রাখা, চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা, নামাজ ও দোয়ায় মন খুলে বলা, আর প্রয়োজনে চিকিৎসার সাহায্যও নেওয়া।
আজ থেকে শুরু করতে পারেন এভাবে:
- সহিহ বুখারীর "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান..." দোয়াটি মুখস্থ করে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা পড়ুন।
- আজ রাতে ঘুমানোর আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে সিজদায় নিজের ভাষায় আল্লাহকে মনের কথা বলুন।
- যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা, কাগজে লিখে "আমার হাতে যা আছে" আর "যা আমার হাতে নেই" দুই ভাগে ভাগ করুন।
আর যদি দুশ্চিন্তা দীর্ঘদিন ধরে আপনার ঘুম, কাজ বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে, তাহলে একজন বিশ্বস্ত মানুষ ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অন্তরে প্রশান্তি দান করুন, দুশ্চিন্তার বোঝা হালকা করে দিন, এবং প্রতিটি কষ্টের সঙ্গে স্বস্তির দরজা খুলে দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য কুরআনে কী বলা হয়েছে?
সূরা আর-রা'দের (২৮) আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। সূরা আশ-শারহের (৫–৬) আয়াতে কষ্টের সঙ্গে স্বস্তির সুসংবাদ এসেছে, আর সূরা আল-বাকারার (১৫৩) আয়াতে ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে।
২. দুশ্চিন্তার সময় কোন দোয়া পড়া যায়?
সহিহ বুখারীর (৬৩৬৯) হাদীসে বর্ণিত "আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান..." দোয়াটি রাসূল ﷺ প্রায়ই পড়তেন। কঠিন বিপদে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম..." (বুখারী ৬৩৪৬) এবং ইউনুস (আ.)-এর দোয়াও পড়া যায়।
৩. দুশ্চিন্তা হওয়া কি ঈমানের দুর্বলতা?
না। ইয়াকুব (আ.) ও রাসূল ﷺ-ও কষ্ট ও দুশ্চিন্তা অনুভব করেছেন বলে কুরআনে এসেছে। সহিহ বুখারীর (৫৬৪১) হাদীস অনুযায়ী মুমিনের দুশ্চিন্তার বিনিময়েও আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করেন বলে আশা দেওয়া হয়েছে।
৪. দুশ্চিন্তার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া কি ইসলামসম্মত?
হ্যাঁ। সহিহ বুখারীর (৫৬৭৮) হাদীসে এসেছে, আল্লাহ প্রতিটি রোগের নিরাময়ও পাঠিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা বিষণ্ণতায় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া চিকিৎসার অংশ, আর এর পাশাপাশি দোয়া ও ইবাদত চালিয়ে যাওয়া যায়।
৫. তাওয়াক্কুল মানে কি চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া?
না। জামে তিরমিযীর (২৫১৭) হাদীসে রাসূল ﷺ আগে উট বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলেছেন। অর্থাৎ সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
