মৃত্যুর পর আত্মার সাথে কী ঘটে | কুরআন ও হাদীস আলোকে

 

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মার সাথে কী ঘটে - কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তারিত

মৃত্যুর পর মানুষের আত্মার সাথে কী ঘটে: কুরআন ও হাদীসের আলোকে

ভূমিকা

মৃত্যু মানুষের জীবনের একটি অনিবার্য সত্য এবং প্রতিটি প্রাণীকে এই পথ অতিক্রম করতে হবে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে প্রতিটি প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। মৃত্যুর পর আত্মা বা রূহের কী হয় এই প্রশ্ন মানুষের মনে সবসময় থাকে। ইসলাম এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে এবং কুরআন-হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মৃত্যু শেষ নয় বরং আখিরাতের জীবনের শুরু এবং আত্মার যাত্রা অব্যাহত থাকে। হাদিসে বর্ণিত আছে যে কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ এবং এটি হয় জান্নাতের বাগান নয়তো জাহান্নামের গর্ত (তিরমিজি: ২৩০৮)। এই লেখায় আমরা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রা, বারযাখ জীবন, কবরের অবস্থা এবং কিয়ামত পর্যন্ত আত্মার অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে আমরা সবাই প্রস্তুতি নিতে পারি।

মৃত্যুর মুহূর্তে আত্মার বিদায়

মৃত্যুর সময় আত্মা বা রূহ শরীর থেকে বের হয়ে যায় এবং এই প্রক্রিয়া ব্যক্তির জীবনের কর্মের উপর নির্ভর করে ভিন্ন রকম হতে পারে। মুমিনের আত্মা বের হওয়া: যারা জীবনে আল্লাহর আনুগত্য করেছে এবং নেক কাজ করেছে তাদের কাছে মৃত্যুর ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে আসেন। হাদিসে এসেছে যে মুমিনের আত্মা সহজে বের হয়ে যায় যেমন পানির পাত্র থেকে পানি পড়ে (সহিহ ইবনে হিব্বান)। ফেরেশতারা তাকে বলেন: "হে পবিত্র আত্মা! বের হও প্রশংসিত অবস্থায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ নাও।" এরপর আত্মাকে সাদা কাফনে মুড়িয়ে উর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জান্নাতের দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। কাফের ও পাপীর আত্মা বের হওয়া: যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে বা বড় পাপে লিপ্ত ছিল তাদের আত্মা বের করা কঠিন হয় এবং ফেরেশতারা কঠোরভাবে তা বের করেন। হাদিসে বলা হয়েছে যে তাদের আত্মা বের করা হয় যেভাবে ভেজা পশম থেকে কাঁটা বের করা হয় (মুসনাদে আহমাদ)।

আত্মা বের হওয়ার পর তা পুনরায় শরীরে ফিরানো হয় না বরং এক নতুন জগতে প্রবেश করে যাকে বারযাখ বলা হয়। কুরআনে বলা হয়েছে যে মৃত্যুর পর মানুষ দুনিয়ায় ফিরে আসার আবেদন করবে কিন্তু তা আর সম্ভব হবে না (সূরা মুমিনুন: ৯৯-১০০)। এই সময় ব্যক্তি বুঝতে পারে তার আমলের পরিণতি এবং আখিরাতের বাস্তবতা। তাই জীবদ্দশায় নেক আমল করা এবং পাপ থেকে বাঁচা অত্যন্ত জরুরি।

বারযাখ জীবন: মৃত্যু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত

মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কে বারযাখ বলা হয় যা আরবি শব্দ এবং এর অর্থ হলো মধ্যবর্তী স্থান বা সময়। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন যে মানুষের সামনে এবং পেছনে বারযাখ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত (সূরা মুমিনুন: ১০০)। এই সময়ে আত্মা একটি বিশেষ অবস্থায় থাকে যা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। বারযাখে আত্মার অবস্থা: মুমিনদের আত্মা ইল্লিয়্যিনে (উচ্চ স্থানে) থাকে এবং তারা শান্তিতে ও আনন্দে থাকেন। কাফেরদের আত্মা সিজ্জিনে (নিম্ন স্থানে) থাকে এবং শাস্তি ভোগ করে। হাদিসে এসেছে যে শহীদদের আত্মা সবুজ পাখির পেটে জান্নাতে বিচরণ করে (সহিহ মুসলিম: ১৮৮৭)। বারযাখে কি আত্মা সচেতন থাকে? হ্যাঁ, বারযাখে আত্মা সচেতন থাকে এবং তারা তাদের অবস্থা অনুভব করে। তবে দুনিয়ার মত নয় বরং ভিন্ন মাত্রায়। রাসুল (সা.) বলেছেন যে মৃত ব্যক্তি তার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের পদধ্বনি শুনতে পায় (সহিহ বুখারি: ১৩৩৮)।

বারযাখে কি আত্মারা একে অপরের সাথে দেখা করে? কিছু বর্ণনা অনুযায়ী নেক আত্মারা একে অপরের সাথে দেখা করতে পারে এবং আলাপ করতে পারে। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান আল্লাহর কাছে। কতদিন বারযাখে থাকবে? বারযাখ থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত যা হতে পারে হাজার বা লক্ষ বছর। তবে আত্মার কাছে সময়ের অনুভূতি ভিন্ন হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো এই সময়ে নতুন কোনো আমল করার সুযোগ নেই তাই জীবদ্দশায় যথাসাধ্য ভালো কাজ করা উচিত।

কবরের প্রশ্ন এবং পরীক্ষা

কবরে দাফনের পর আত্মাকে পুনরায় শরীরের সাথে যুক্ত করা হয় এবং মুনকার-নাকির নামক দুই ফেরেশতা এসে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন। এই প্রশ্নোত্তরের উপর নির্ভর করে কবরে নিয়ামত বা আজাব শুরু হয়। তিনটি প্রশ্ন: প্রথম প্রশ্ন: "মান রাব্বুকা?" (তোমার রব কে?) উত্তর: আল্লাহ। দ্বিতীয় প্রশ্ন: "মা দ্বিনুকা?" (তোমার দীন কী?) উত্তর: ইসলাম। তৃতীয় প্রশ্ন: "মান নাবিয়্যুকা?" (তোমার নবী কে?) উত্তর: মুহাম্মদ (সা.)। মুমিনের উত্তর: যারা ঈমান ও আমলে সৎ ছিল তারা সহজে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন এবং ফেরেশতারা তাদের সুসংবাদ দেবেন। হাদিসে এসেছে যে আল্লাহ মুমিনকে দৃঢ় রাখবেন এবং সে সঠিক উত্তর দিতে পারবে (সহিহ বুখারি: ১৩৬৯)। কাফের ও পাপীর অবস্থা: যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে বা গুরুতর পাপে লিপ্ত ছিল তারা উত্তর দিতে পারবে না এবং বলবে "হা হা, লা আদরি" (আফসোস, আমি জানি না)।

জীবদ্দশায় প্রস্তুতি: এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য জীবনভর আল্লাহর ইবাদত করা, ইসলামের অনুসরণ করা এবং রাসুল (সা.) এর সুন্নত মেনে চলা জরুরি। শুধু মুখে উত্তর জানলেই হবে না বরং হৃদয়ে বিশ্বাস এবং কর্মে প্রমাণ থাকতে হবে। নিয়মিত এই প্রশ্নগুলো মনে রাখা এবং নিজেকে পরীক্ষা করা উচিত যে আমরা সত্যিই আল্লাহকে রব, ইসলামকে দীন এবং মুহাম্মদ (সা.) কে নবী মানি কিনা। এই প্রস্তুতি নিলে কবরে সহজ হবে বলে আশা করা যায়।

কবরের নিয়ামত এবং শাস্তি

কবরের প্রশ্নের উত্তরের পর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তার আমল অনুযায়ী কবরে নিয়ামত বা শাস্তি শুরু হয়। মুমিনদের কবরের নিয়ামত: যারা সঠিক উত্তর দেবে তাদের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে যা দিয়ে তারা জান্নাতের সুঘ্রাণ ও দৃশ্য দেখতে পাবে। হাদিসে বলা হয়েছে যে মুমিনের কবর হবে জান্নাতের বাগান (তিরমিজি: ১০৭১)। কবরে তাদের জন্য আরামদায়ক বিছানা এবং সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হবে। তারা শান্তিতে ঘুমাবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কাফের ও পাপীদের কবরের আজাব: যারা ভুল উত্তর দেবে বা উত্তর দিতে পারবে না তাদের কবর সংকুচিত করে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে। তারা কবরে শাস্তি ভোগ করবে। হাদিসে বলা হয়েছে যে কবরের আজাব সত্য এবং মুমিনদের উচিত তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (সহিহ বুখারি: ১৩৭৭)। কোন পাপে কবরের আজাব হয়? হাদিসে কিছু নির্দিষ্ট পাপের কথা উল্লেখ আছে যেমন প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক না থাকা, পরনিন্দা করা, সুদ খাওয়া, যিনা করা ইত্যাদি (সহিহ বুখারি: ১৩৭৮)।

কবরের আজাব থেকে বাঁচার উপায়: নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং রোজা রাখা। সূরা মুলক নিয়মিত পড়া - হাদিসে এসেছে এটি কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি: ২৮৯১)। সকল পাপ থেকে তওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করা। প্রস্রাব-পায়খানার পর ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করা। পরনিন্দা, মিথ্যা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা। জীবিতদের দোয়া এবং সদকা মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব কমাতে পারে বলে আশা করা যায়।

আত্মা কি জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে

মৃত্যুর পর আত্মা জীবিতদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে কিনা এ নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়ে কিছু স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সীমিত সংযোগ: হাদিসে এসেছে যে মৃত ব্যক্তি তার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের পদধ্বনি শুনতে পায় (সহিহ বুখারি: ১৩৩৮)। এছাড়া রাসুল (সা.) বলেছেন যে যে কেউ তাঁর কবরের কাছে গিয়ে সালাম দেয় তিনি তার সালাম শুনতে পান (আবু দাউদ: ২০৪১)। তবে এর অর্থ এই নয় যে মৃত ব্যক্তিরা সবসময় জীবিতদের কথা শুনতে পায় বা তাদের সাহায্য করতে পারে। স্বপ্নে দেখা: কখনো কখনো মানুষ স্বপ্নে মৃত আত্মীয়দের দেখে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বার্তা বা সান্ত্বনা হতে পারে তবে এটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। স্বপ্ন অনেক সময় মনের প্রতিফলনও হতে পারে। আত্মার কাছে সাহায্য চাওয়া হারাম: মৃত ব্যক্তিদের কাছে সাহায্য চাওয়া, তাদের নামে মানত করা বা তাদের মাধ্যম মনে করা শিরক এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।

জীবিতদের করণীয়: মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং তাদের নামে সদকা করা যা তাদের উপকারে আসতে পারে। কবর জিয়ারত করা এবং তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা। তবে কবরে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া নয়। বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইসলামে রূহ বা আত্মা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত এবং অনেক বিষয় গায়েবের অন্তর্ভুক্ত যা শুধু আল্লাহই জানেন। তাই এই বিষয়ে কুরআন-হাদিসে যা এসেছে তার উপর বিশ্বাস রাখা এবং অতিরিক্ত কল্পনা না করা উচিত।

কিয়ামত এবং পুনরুত্থান

বারযাখ জীবনের পর আসবে কিয়ামত যখন সকল মৃত মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং চূড়ান্ত বিচার হবে। কিয়ামত কীভাবে শুরু হবে: ইস্রাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন এবং তার আওয়াজে পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে (সূরা যুমার: ৬৮)। এরপর দ্বিতীয়বার ফুঁ দেওয়া হবে এবং সকল মৃত মানুষ জীবিত হয়ে উঠবে। আত্মা ও শরীরের পুনর্মিলন: আত্মা আবার তার পূর্বের শরীরে ফিরে আসবে যা আল্লাহ নতুন করে সৃষ্টি করবেন। মানুষ তার সম্পূর্ণ অবস্থায় দাঁড়াবে এবং তার সকল কর্মের হিসাব দিতে হবে। বিচার দিবস: প্রতিটি মানুষকে তার কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। ছোট-বড় সব আমলের হিসাব নেওয়া হবে এবং কেউ অণু পরিমাণ ভালো বা মন্দ কাজ থেকে বাদ পড়বে না (সূরা যিলযাল: ৭-৮)। আমলনামা: প্রতিটি ব্যক্তিকে তার আমলের খাতা দেওয়া হবে। নেককারদের ডান হাতে এবং পাপীদের বাম হাতে বা পিঠের পেছন থেকে দেওয়া হবে (সূরা ইনশিকাক: ৭-১২)।

মীজান বা দাঁড়িপাল্লা: সকল আমল ওজন করা হবে। ভালো কাজ ও মন্দ কাজ মাপা হবে এবং যার ভালো কাজ ভারী হবে সে সফল হবে (সূরা আরাফ: ৮-৯)। সিরাত পুল: জাহান্নামের উপর একটি সূক্ষ্ম পুল থাকবে যা পার হয়ে জান্নাতে যেতে হবে। মুমিনরা দ্রুত পার হয়ে যাবে এবং পাপীরা পড়ে যাবে (সহিহ মুসলিম: ১৯৫)। চূড়ান্ত গন্তব্য: বিচারের পর মানুষ দুই দলে বিভক্ত হবে - একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে। এটাই হবে চিরস্থায়ী জীবন এবং আত্মার চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই দুনিয়াতে নেক আমল করা এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

জান্নাত ও জাহান্নামে আত্মার অবস্থা

চূড়ান্ত বিচারের পর আত্মা তার শরীরসহ চিরকালের জন্য হয় জান্নাতে নয়তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে। জান্নাতে মুমিনদের আত্মা: যারা ঈমান এবং নেক আমলে জীবন কাটিয়েছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতে আত্মা পূর্ণ শান্তি, আনন্দ এবং সুখে থাকবে। সেখানে কোনো কষ্ট, দুঃখ, ক্লান্তি বা মৃত্যু থাকবে না (সূরা ওয়াকিয়া: ১৭-২৬)। মুমিনরা আল্লাহর দর্শন লাভ করবে যা সবচেয়ে বড় নিয়ামত (সূরা কিয়ামাহ: ২২-২৩)। জান্নাতে বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং আমল অনুযায়ী স্থান নির্ধারিত হবে। নবী, শহীদ, সিদ্দিক এবং সালেহীনদের উচ্চ স্থান হবে। জাহান্নামে কাফের ও পাপীদের আত্মা: যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে এবং কুফরি অবস্থায় মারা গেছে তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। সেখানে তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে (সূরা বাকারা: ১৬১)। তবে মুসলমান পাপীরা যারা তওবা না করে মারা গেছে তারা শাস্তি ভোগ করার পর একসময় জান্নাতে যেতে পারবে কারণ তাদের ঈমান ছিল। চিরস্থায়ী জীবন: জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই চিরস্থায়ী এবং এর কোনো শেষ নেই। আত্মা সেখানে চিরকাল থাকবে।

আমাদের প্রস্তুতি: দুনিয়ার এই ছোট জীবনে আমরা যা আমল করব তার উপর নির্ভর করবে আমাদের চিরস্থায়ী জীবন। তাই প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান এবং ভালো কাজে ব্যয় করা উচিত। আল্লাহর ইবাদত করা, নামাজ-রোজা পালন করা, সৎ কাজ করা এবং পাপ থেকে বাঁচা - এসবই জান্নাতের পথ। মনে রাখতে হবে মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে আসতে পারে এবং তার পর আর নতুন আমলের সুযোগ থাকবে না। তাই এখনই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

উপসংহার

মৃত্যুর পর আত্মার যাত্রা একটি দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ পথ যা কবর, বারযাখ, কিয়ামত এবং চূড়ান্তভাবে জান্নাত বা জাহান্নাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সম্পর্কে জানা আমাদের দুনিয়ার জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।

আসুন, আমরা সবাই মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে সচেতন হই এবং প্রস্তুতি নিই। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি এবং রোজা রাখি। কুরআন তিলাওয়াত করি এবং এর অর্থ বুঝার চেষ্টা করি। বিশেষভাবে সূরা মুলক নিয়মিত পড়ি যা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করতে পারে। কবরের তিনটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ রাখি এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করি। সকল পাপ থেকে তওবা করি এবং মানুষের হক আদায় করি। মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নিয়মিত দোয়া করি এবং তাদের নামে সদকা করি। কবর জিয়ারত করি এবং মৃত্যুকে স্মরণ রাখি যাতে দুনিয়ার মোহ কমে। শিরক ও বিদআত থেকে দূরে থাকি এবং শুধু আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। দান-সদকা করি যাতে মৃত্যুর পরও সওয়াব চলতে থাকে। সৎ সঙ্গ অবলম্বন করি এবং ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করি। মনে রাখি যে এই দুনিয়া অস্থায়ী এবং আখিরাত চিরস্থায়ী। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ঈমানের সাথে মৃত্যুর, কবরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার এবং জান্নাত লাভের তৌফিক দান করুন। আমীন।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের  উত্তর

১. মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় যায়?

মৃত্যুর পর আত্মা বা রূহ শরীর থেকে বের হয়ে বারযাখ জীবনে প্রবেশ করে যা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। মুমিনদের আত্মা ইল্লিয়্যিনে (উচ্চ স্থানে) নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। হাদিসে এসেছে যে নেককার মুমিনদের আত্মা উর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে স্বাগত জানানো হয় (ইবনে মাজাহ)। পক্ষান্তরে কাফের ও পাপীদের আত্মা সিজ্জিনে (নিম্ন স্থানে) নিয়ে যাওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা খুলে দেওয়া হয়। কবরে দাফনের পর আত্মাকে আবার শরীরের সাথে যুক্ত করা হয় এবং মুনকার-নাকির ফেরেশতা প্রশ্ন করেন। এরপর আমল অনুযায়ী কবরে নিয়ামত বা আজাব শুরু হয় যা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই জীবদ্দশায় নেক আমল করা এবং পাপ থেকে বাঁচা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. কবরে কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়?

কবরে মুনকার ও নাকির নামক দুই ফেরেশতা এসে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন। প্রথম প্রশ্ন: "মান রাব্বুকা?" অর্থাৎ তোমার রব বা প্রতিপালক কে? সঠিক উত্তর হলো "আল্লাহ"। দ্বিতীয় প্রশ্ন: "মা দ্বিনুকা?" অর্থাৎ তোমার দীন বা ধর্ম কী? সঠিক উত্তর হলো "ইসলাম"। তৃতীয় প্রশ্ন: "মান নাবিয়্যুকা?" অর্থাৎ তোমার নবী কে? সঠিক উত্তর হলো "মুহাম্মদ (সা.)"। যারা জীবনে আল্লাহর ইবাদত করেছে, ইসলামের অনুসরণ করেছে এবং রাসুল (সা.) এর সুন্নত মেনে চলেছে তারা সহজে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে এবং আল্লাহ তাদের দৃঢ় রাখবেন (সহিহ বুখারি: ১৩৬৯)। তবে যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে বা গাফেল ছিল তারা উত্তর দিতে পারবে না এবং বলবে "হা হা, লা আদরি" (আফসোস, আমি জানি না)। তাই এই তিন প্রশ্নের উত্তর শুধু মুখস্থ নয় বরং হৃদয়ে বিশ্বাস এবং কর্মে প্রমাণ রাখা জরুরি।

৩. জীবিতদের দোয়া কি মৃত ব্যক্তির উপকারে আসে?

হ্যাঁ, জীবিতদের দোয়া মৃত ব্যক্তির উপকারে আসতে পারে বলে ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে মানুষ মারা যাওয়ার পর তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায় তবে তিনটি জিনিস থেকে সওয়াব চলতে থাকে - সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। জীবিতরা মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দোয়া করতে পারে, তাদের নামে সদকা করতে পারে, কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছাতে পারে এবং তাদের পক্ষ থেকে হজ্জ-উমরাহ করতে পারে। এসব আমল মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং তাদের উপকার করতে পারে। তবে শিরক করা যাবে না অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া যাবে না। শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে মৃত ব্যক্তির জন্য। নিয়মিত মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া করা এবং তাদের নামে সদকা করা একটি ফজিলতপূর্ণ আমল।

৪. কবরের আজাব থেকে বাঁচার উপায় কী?

কবরের আজাব থেকে বাঁচার জন্য জীবদ্দশায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল করা উচিত। প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত এবং সময়মত আদায় করা। দ্বিতীয়ত, সূরা মুলক নিয়মিত পড়া - হাদিসে এসেছে যে এই সূরা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি: ২৮৯১)। তৃতীয়ত, প্রস্রাব-পায়খানার পর সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন করা কারণ হাদিসে বলা হয়েছে যে প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক না থাকার কারণে কবরের আজাব হয় (সহিহ বুখারি: ১৩৭৮)। চতুর্থত, পরনিন্দা, মিথ্যা, সুদ এবং যিনা থেকে বিরত থাকা। পঞ্চমত, সকল পাপ থেকে তওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করা। ষষ্ঠত, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকির করা। সপ্তমত, দান-সদকা করা এবং মানুষের উপকার করা। অষ্টমত, নামাজে কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া যেমন রাসুল (সা.) করতেন (সহিহ বুখারি: ১৩৭৭)। এসব আমল করলে কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা যায়।

৫. কিয়ামতের দিন আত্মার কী হবে?

কিয়ামতের দিন সকল মৃত মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং আত্মা আবার তার শরীরের সাথে যুক্ত হবে। ইস্রাফিল (আ.) শিঙ্গায় দ্বিতীয়বার ফুঁ দেবেন এবং সবাই কবর থেকে জীবিত হয়ে উঠবে (সূরা যুমার: ৬৮)। এরপর মহাবিচার শুরু হবে এবং প্রতিটি মানুষকে তার সকল কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। আমলনামা দেওয়া হবে - নেককারদের ডান হাতে এবং পাপীদের বাম হাতে। মীজানে (দাঁড়িপাল্লায়) আমল ওজন করা হবে এবং যার ভালো কাজ ভারী হবে সে সফল হবে। সিরাত পুল পার হতে হবে যেখানে মুমিনরা দ্রুত পার হবে এবং পাপীরা পড়ে যাবে। চূড়ান্ত বিচারের পর আত্মা তার শরীরসহ চিরকালের জন্য হয় জান্নাতে নয়তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে। মুমিনরা জান্নাতে পূর্ণ শান্তি ও আনন্দে থাকবে এবং আল্লাহর দর্শন লাভ করবে। কাফেররা চিরকাল জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। তাই দুনিয়ার জীবনে নেক আমল করা অত্যন্ত জরুরি কারণ এর উপর নির্ভর করবে আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url