কবরের জীবন (বারযাখ) কী | কুরআন ও হাদীস
কবরের জীবন (বারযাখ) কী: কুরআন ও হাদীসের আলোকে সম্পূর্ণ ধারণা
ভূমিকা
মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ নয় বরং আখিরাতের যাত্রার শুরু। মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কে ইসলামে বারযাখ বলা হয় যা আরবি শব্দ এবং এর অর্থ হলো মধ্যবর্তী স্থান বা সময়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে মানুষের সামনে এবং পেছনে বারযাখ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত (সূরা মুমিনুন: ১০০)। এই সময়ে আত্মা একটি বিশেষ অবস্থায় থাকে এবং কবরের জীবন অনুভব করে। বারযাখ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের দুনিয়ার জীবনে ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে এবং মৃত্যুর ভয় কমায়। হাদিসে এসেছে যে কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ এবং এটি হয় জান্নাতের বাগান নয়তো জাহান্নামের গর্ত (তিরমিজি: ২৩০৮)। এই লেখায় আমরা বারযাখ কী, এর স্বরূপ, কবরের অবস্থা এবং এই সময়ে আত্মার অবস্থান সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানব।
বারযাখ শব্দের অর্থ এবং পরিচয়
বারযাখ একটি আরবি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হলো দুটি জিনিসের মধ্যবর্তী স্থান, প্রতিবন্ধক বা পর্দা। ইসলামি পরিভাষায় বারযাখ হলো মৃত্যু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কাল যখন মৃত ব্যক্তির আত্মা একটি মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে। বারযাখের বৈশিষ্ট্য: এটি দুনিয়া এবং আখিরাতের মাঝের একটি সময়। এই সময়ে আত্মা শরীর থেকে আলাদা থাকে তবে সম্পূর্ণ সংযোগহীন নয়। বারযাখের জীবন দুনিয়ার জীবনের মত নয় এবং আখিরাতের চূড়ান্ত জীবনও নয়। এটি একটি বিশেষ অবস্থা যা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। কুরআনে বলা হয়েছে যে দুই সাগরের মাঝে বারযাখ রয়েছে যা তারা অতিক্রম করতে পারে না (সূরা রহমান: ২০)। এই উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে বারযাখ একটি পৃথক স্তর যা দুটি অবস্থার মধ্যে বিভাজন রেখা। সময়সীমা: বারযাখ শুরু হয় মৃত্যুর সাথে সাথে এবং শেষ হয় কিয়ামতের দিন যখন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে। এই সময় কতদিন হবে তা আল্লাহই জানেন, হতে পারে হাজার বা লক্ষ বছর।
বারযাখ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত এবং যা কুরআন-হাদিসে এসেছে তার উপর বিশ্বাস রাখাই আমাদের দায়িত্ব। অতিরিক্ত কল্পনা বা ধারণা করা ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) রূহ বা আত্মা সম্পর্কে বলেছেন যে এটি আল্লাহর আদেশের বিষয় এবং আমাদের এ সম্পর্কে খুব কম জ্ঞান দেওয়া হয়েছে (সূরা বনি ইসরাইল: ৮৫)। তাই বারযাখ সম্পর্কে বিশ্বাস রাখা এবং সে অনুযায়ী দুনিয়াতে আমল করাই হলো মুমিনের কাজ।
কবরে মুনকার-নাকিরের প্রশ্ন
বারযাখ জীবনের প্রথম পরীক্ষা হলো কবরে মুনকার ও নাকির নামক দুই ফেরেশতার প্রশ্ন। মৃত ব্যক্তিকে কবরে দাফনের পর এই ফেরেশতারা এসে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন যার উত্তরের উপর নির্ভর করে কবরের নিয়ামত বা আজাব। তিনটি প্রশ্ন: প্রথম প্রশ্ন - "মান রাব্বুকা?" অর্থাৎ তোমার রব বা প্রতিপালক কে? সঠিক উত্তর হলো আল্লাহ। দ্বিতীয় প্রশ্ন - "মা দ্বিনুকা?" অর্থাৎ তোমার দীন বা ধর্ম কী? সঠিক উত্তর হলো ইসলাম। তৃতীয় প্রশ্ন - "মান নাবিয়্যুকা?" অর্থাৎ তোমার নবী কে? সঠিক উত্তর হলো মুহাম্মদ (সা.)। মুমিনের উত্তর: যারা জীবনে আল্লাহর ইবাদত করেছে, ইসলাম মেনে চলেছে এবং রাসুল (সা.) কে অনুসরণ করেছে তারা সহজে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। হাদিসে এসেছে যে আল্লাহ মুমিনকে দৃঢ় রাখবেন এবং সে সঠিক উত্তর দিতে পারবে (সহিহ বুখারি: ১৩৬৯)। ফেরেশতারা তখন বলবেন যে সত্য বলেছ এবং তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে। কাফের ও পাপীর অবস্থা: যারা দুনিয়াতে আল্লাহকে অস্বীকার করেছে বা গুরুতর পাপে লিপ্ত ছিল তারা উত্তর দিতে পারবে না এবং বলবে "হা হা, লা আদরি" অর্থাৎ আফসোস, আমি জানি না। তাদের কবর সংকুচিত করে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের আগুন দেখানো হবে (তিরমিজি: ১০৭১)।
এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত জীবদ্দশায়। শুধু মুখে উত্তর জানলেই হবে না বরং হৃদয়ে বিশ্বাস এবং কর্মে প্রমাণ থাকতে হবে। নিয়মিত এই প্রশ্নগুলো নিজেকে জিজ্ঞাসা করা এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করা জরুরি। কবরের এই পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর পর শুরু হয় কবরের নিয়ামত বা আজাব যা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।
কবরের নিয়ামত এবং শাস্তি
কবরের প্রশ্নের উত্তরের পর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তার আমল অনুযায়ী কবরে নিয়ামত বা শাস্তি শুরু হয় এবং এটি বারযাখ জীবনের একটি প্রধান অংশ। মুমিনদের কবরের নিয়ামত: যারা সঠিক উত্তর দেবে তাদের কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে যা দিয়ে তারা জান্নাতের সুঘ্রাণ ও দৃশ্য দেখতে পাবে। হাদিসে বলা হয়েছে যে মুমিনের কবর হবে জান্নাতের বাগান (তিরমিজি: ১০৭১)। কবরে তাদের জন্য আরামদায়ক বিছানা এবং সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হবে। তারা শান্তিতে থাকবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কাফের ও পাপীদের কবরের আজাব: যারা ভুল উত্তর দেবে বা উত্তর দিতে পারবে না তাদের কবর সংকুচিত করে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের একটি জানালা খুলে দেওয়া হবে। তারা কবরে শাস্তি ভোগ করবে। হাদিসে বলা হয়েছে যে কবরের আজাব সত্য এবং মুমিনদের উচিত তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া (সহিহ বুখারি: ১৩৭৭)। কোন পাপে কবরের আজাব: হাদিসে কিছু নির্দিষ্ট পাপের কথা উল্লেখ আছে যেমন প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক না থাকা, পরনিন্দা করা, সুদ খাওয়া, যিনা করা ইত্যাদি (সহিহ বুখারি: ১৩৭৮)।
কবরের আজাব থেকে বাঁচার উপায়: নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং রোজা রাখা। সূরা মুলক নিয়মিত পড়া - হাদিসে এসেছে এটি কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি: ২৮৯১)। সকল পাপ থেকে তওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করা। প্রস্রাব-পায়খানার পর ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করা। পরনিন্দা, মিথ্যা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা। জীবিতদের দোয়া এবং সদকা মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব কমাতে পারে বলে আশা করা যায়। কবরের নিয়ামত বা আজাব সত্য এবং এটি আমাদের দুনিয়ার কর্মের ফল। তাই জীবদ্দশায় ভালো আমল করা এবং পাপ থেকে বাঁচা অত্যন্ত জরুরি।
বারযাখে আত্মার অবস্থা এবং সচেতনতা
বারযাখে আত্মার অবস্থা কেমন এবং তারা কতটুকু সচেতন থাকে এ নিয়ে কিছু বর্ণনা হাদিসে পাওয়া যায় তবে সম্পূর্ণ বিস্তারিত আমরা জানি না। আত্মা কি সচেতন থাকে? হ্যাঁ, বারযাখে আত্মা সচেতন থাকে এবং তারা তাদের অবস্থা অনুভব করে। তবে দুনিয়ার মত নয় বরং ভিন্ন মাত্রায়। রাসুল (সা.) বলেছেন যে মৃত ব্যক্তি তার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের পদধ্বনি শুনতে পায় (সহিহ বুখারি: ১৩৩৮)। আত্মারা কি একে অপরের সাথে দেখা করে? কিছু বর্ণনা অনুযায়ী নেক আত্মারা একে অপরের সাথে দেখা করতে পারে এবং আলাপ করতে পারে। হাদিসে এসেছে যে মৃত ব্যক্তি নতুন মৃতকে দেখে এবং তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে (ইবনে আবি দুনিয়া)। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান আল্লাহর কাছে। শহীদদের বিশেষ অবস্থা: শহীদদের আত্মার বিষয়ে কুরআনে বলা হয়েছে যে তারা মৃত নয় বরং জীবিত এবং তাদের রবের কাছে তাদের রিজিক দেওয়া হয় (সূরা আলে ইমরান: ১৬৯)। হাদিসে এসেছে যে শহীদদের আত্মা সবুজ পাখির পেটে জান্নাতে বিচরণ করে (সহিহ মুসলিম: ১৮৮৭)।
আত্মারা কি জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করে? সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ নেই তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে আল্লাহ চাইলে তা হতে পারে যেমন সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তবে এটি নিয়মিত বা সাধারণ ঘটনা নয়। জীবিতদের দোয়া এবং সদকা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং তারা তা অনুভব করে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: বারযাখ সম্পর্কে অতিরিক্ত কল্পনা করা বা নিজের মত ধারণা তৈরি করা ঠিক নয়। যা কুরআন-হাদিসে এসেছে তার উপর বিশ্বাস রাখা এবং এর বাইরে গিয়ে না ভাবা উচিত। আত্মার জগত গায়েবের বিষয় এবং এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত।
বারযাখ থেকে দুনিয়ায় ফেরার অসম্ভবতা
বারযাখের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এখান থেকে দুনিয়ায় ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই এবং নতুন আমল করার সুযোগও নেই। কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে মৃত্যুর পর মানুষ বলবে হে আমার রব! আমাকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দাও যাতে আমি ভালো কাজ করতে পারি। কিন্তু এটি সম্ভব নয় কারণ তাদের সামনে বারযাখ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত (সূরা মুমিনুন: ৯৯-১০০)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে বারযাখ একটি পর্দা বা বাধা যা দুনিয়া এবং মৃতদের মধ্যে রয়েছে এবং এটি অতিক্রম করা অসম্ভব। নতুন আমলের সুযোগ নেই: মৃত্যুর পর কোনো নতুন নেক আমল বা তওবা করার সুযোগ নেই। হাদিসে এসেছে যে মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তবে তিনটি জিনিস থেকে সওয়াব চলতে থাকে - সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান যে দোয়া করে (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। জীবিতদের করণীয়: যেহেতু বারযাখে নতুন আমলের সুযোগ নেই তাই জীবিতদের উচিত মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তাদের নামে সদকা করা এবং হজ্জ-উমরাহ করা যা তাদের কাজে আসতে পারে।
দুনিয়ার গুরুত্ব: এই বিষয় আমাদের শেখায় যে দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত মূল্যবান এবং এখানেই আমাদের আমল করার সুযোগ। একবার মৃত্যু হলে আর ফেরার সুযোগ নেই তাই প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো উচিত। আল্লাহ বলেছেন যে মৃত্যুর আগে কাজ করো কারণ তারপর কোনো কাজ, উপার্জন বা পরিবার থাকবে না (সূরা মুনাফিকুন: ১০)। তাই দেরি না করে আজই তওবা করা, ভালো আমল শুরু করা এবং পাপ থেকে বাঁচা উচিত।
বারযাখ এবং কিয়ামত: চূড়ান্ত পরিণতির দিকে
বারযাখ একটি অস্থায়ী অবস্থা এবং এর শেষ হবে কিয়ামতের দিন যখন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে চূড়ান্ত বিচারের জন্য। কিয়ামত কীভাবে শুরু হবে: ইস্রাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন এবং তার আওয়াজে পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। বারযাখে থাকা সকল আত্মাও প্রভাবিত হবে (সূরা যুমার: ৬৮)। এরপর দ্বিতীয়বার ফুঁ দেওয়া হবে এবং সকল মৃত মানুষ জীবিত হয়ে উঠবে। বারযাখের শেষ: কিয়ামতের দিন বারযাখ শেষ হয়ে যাবে এবং সবাই একসাথে হাশরের ময়দানে জমা হবে। এরপর শুরু হবে চূড়ান্ত বিচার এবং জান্নাত বা জাহান্নামে যাওয়া। বারযাখে সময়ের অনুভূতি: কুরআনে বলা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন মানুষ মনে করবে তারা খুব অল্প সময় কবরে ছিল - হয়তো একদিন বা তার কিছু অংশ (সূরা রুম: ৫৫)। এটি বোঝায় যে বারযাখে সময়ের অনুভূতি দুনিয়ার মত নয়। চূড়ান্ত গন্তব্য: বিচারের পর মানুষ দুই দলে বিভক্ত হবে - একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে। এটাই হবে চিরস্থায়ী জীবন এবং বারযাখ শুধু একটি মধ্যবর্তী পর্যায় ছিল।
আমাদের প্রস্তুতি: বারযাখ এবং কিয়ামত সম্পর্কে জানা আমাদের দুনিয়ার জীবনকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। মৃত্যু, কবর এবং কিয়ামত - এসব স্মরণ রাখলে মানুষ পাপ থেকে দূরে থাকে এবং ভালো কাজ করে। রাসুল (সা.) বলেছেন যে মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো কারণ এটি সকল স্বাদ নষ্ট করে দেয় অর্থাৎ দুনিয়ার মোহ কমায় (তিরমিজি: ২৩০৭)। তাই বারযাখ সম্পর্কে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
উপসংহার
বারযাখ বা কবরের জীবন একটি বাস্তব সত্য যা মৃত্যুর পর শুরু হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলে। এই সময়ে আত্মা তার দুনিয়ার কর্মের ফল ভোগ করে এবং চূড়ান্ত বিচারের জন্য অপেক্ষা করে।
আসুন, আমরা সবাই বারযাখ সম্পর্কে সচেতন হই এবং প্রস্তুতি নিই। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি এবং রোজা রাখি। সূরা মুলক নিয়মিত পড়ি যা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করতে পারে। কবরের তিনটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ রাখি এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করি - আল্লাহকে রব, ইসলামকে দীন এবং মুহাম্মদ (সা.) কে নবী মানি। সকল পাপ থেকে তওবা করি বিশেষভাবে প্রস্রাবের পবিত্রতা, পরনিন্দা, সুদ থেকে বাঁচি। মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য নিয়মিত দোয়া করি এবং তাদের নামে সদকা করি। মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করি যাতে দুনিয়ার মোহ কমে এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারি। নামাজে কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই যেমন রাসুল (সা.) করতেন। সন্তানদের নেক হিসেবে গড়ে তুলি যাতে তারা আমাদের মৃত্যুর পর দোয়া করে। সদকায়ে জারিয়া এবং উপকারী ইলম রেখে যাই যাতে মৃত্যুর পর সওয়াব চলতে থাকে। মনে রাখি যে বারযাখে নতুন আমলের সুযোগ নেই তাই এখনই সময় ভালো কাজ করার। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার, কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং বারযাখে শান্তিতে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নে উত্তর
১. বারযাখ কী এবং এটি কতদিন স্থায়ী হয়?
বারযাখ হলো মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময় যখন আত্মা একটি বিশেষ অবস্থায় থাকে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন যে মৃত ব্যক্তির সামনে বারযাখ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত (সূরা মুমিনুন: ১০০)। এটি দুনিয়া এবং আখিরাতের মাঝের একটি পর্যায়। বারযাখের সময়সীমা কতদিন তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় কারণ কিয়ামত কখন হবে তা শুধু আল্লাহই জানেন। এটি হতে পারে হাজার, লক্ষ বা তারও বেশি বছর। তবে কুরআনে বলা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন মানুষ মনে করবে তারা খুব অল্প সময় কবরে ছিল (সূরা রুম: ৫৫)। বারযাখ শুরু হয় মৃত্যুর সাথে সাথে এবং শেষ হয় যখন ইস্রাফিল (আ.) দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন এবং সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে। এই সময়ে আত্মা কবরের নিয়ামত বা আজাব ভোগ করে এবং চূড়ান্ত বিচারের জন্য অপেক্ষা করে।
২. কবরে কোন তিনটি প্রশ্ন করা হয় এবং সঠিক উত্তর কী?
কবরে মুনকার ও নাকির নামক দুই ফেরেশতা তিনটি মৌলিক প্রশ্ন করেন। প্রথম প্রশ্ন: "মান রাব্বুকা?" অর্থাৎ তোমার রব কে? সঠিক উত্তর হলো "আল্লাহ"। দ্বিতীয় প্রশ্ন: "মা দ্বিনুকা?" অর্থাৎ তোমার দীন কী? সঠিক উত্তর হলো "ইসলাম"। তৃতীয় প্রশ্ন: "মান নাবিয়্যুকা?" অর্থাৎ তোমার নবী কে? সঠিক উত্তর হলো "মুহাম্মদ (সা.)"। যারা জীবনে আল্লাহর ইবাদত করেছে, ইসলাম মেনে চলেছে এবং রাসুল (সা.) এর সুন্নত অনুসরণ করেছে তারা সহজে উত্তর দিতে পারবে এবং আল্লাহ তাদের দৃঢ় রাখবেন (সহিহ বুখারি: ১৩৬৯)। কাফের ও পাপীরা উত্তর দিতে পারবে না এবং বলবে "হা হা, লা আদরি" অর্থাৎ আফসোস, আমি জানি না। তাই জীবদ্দশায় শুধু এই উত্তর মুখস্থ করাই নয় বরং হৃদয়ে বিশ্বাস এবং কর্মে প্রমাণ রাখা জরুরি।
৩. কবরের আজাব থেকে বাঁচার উপায় কী?
কবরের আজাব থেকে বাঁচার জন্য জীবদ্দশায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল করা উচিত। প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত এবং সময়মত আদায় করা। দ্বিতীয়ত, সূরা মুলক নিয়মিত পড়া - হাদিসে এসেছে যে এই সূরা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি: ২৮৯১)। তৃতীয়ত, প্রস্রাব-পায়খানার পর সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন করা কারণ হাদিসে বলা হয়েছে যে প্রস্রাবের ব্যাপারে সতর্ক না থাকার কারণে কবরের আজাব হয় (সহিহ বুখারি: ১৩৭৮)। চতুর্থত, পরনিন্দা, মিথ্যা, সুদ এবং যিনা থেকে বিরত থাকা। পঞ্চমত, সকল পাপ থেকে তওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করা। ষষ্ঠত, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকির করা। সপ্তমত, দান-সদকা করা। অষ্টমত, নামাজে কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া যেমন রাসুল (সা.) করতেন (সহিহ বুখারি: ১৩৭৭)।
৪. বারযাখে আত্মা কি সচেতন থাকে এবং জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে?
হ্যাঁ, বারযাখে আত্মা সচেতন থাকে এবং তারা তাদের অবস্থা অনুভব করে তবে দুনিয়ার মত নয় বরং ভিন্ন মাত্রায়। রাসুল (সা.) বলেছেন যে মৃত ব্যক্তি তার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের পদধ্বনি শুনতে পায় (সহিহ বুখারি: ১৩৩৮)। কিছু বর্ণনা অনুযায়ী নেক আত্মারা একে অপরের সাথে দেখা করতে পারে। তবে জীবিতদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ নেই। কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে আল্লাহ চাইলে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে তা হতে পারে তবে এটি নিয়মিত নয়। জীবিতদের দোয়া এবং সদকা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং তারা তা অনুভব করে বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। তবে মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া বা তাদের মাধ্যম মনে করা শিরক এবং হারাম। শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হবে। বারযাখ গায়েবের বিষয় এবং এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত তাই যা কুরআন-হাদিসে এসেছে তার উপর বিশ্বাস রাখাই যথেষ্ট।
৫. মৃত্যুর পর কি দুনিয়ায় ফিরে আসা সম্ভব?
না, মৃত্যুর পর দুনিয়ায় ফিরে আসা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কুরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে মৃত্যুর পর মানুষ বলবে তাকে দুনিয়ায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক যাতে সে ভালো কাজ করতে পারে কিন্তু এটি সম্ভব নয় কারণ তার সামনে বারযাখ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত (সূরা মুমিনুন: ৯৯-১০০)। বারযাখ একটি পর্দা বা বাধা যা দুনিয়া এবং মৃতদের মধ্যে রয়েছে এবং এটি অতিক্রম করা যায় না। মৃত্যুর পর কোনো নতুন নেক আমল বা তওবা করার সুযোগ নেই। হাদিসে এসেছে যে মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। তাই দুনিয়ার জীবন অত্যন্ত মূল্যবান এবং এখানেই আমাদের আমল করার সুযোগ। একবার মৃত্যু হলে আর ফেরার সুযোগ নেই তাই প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো উচিত। দেরি না করে আজই তওবা করা, ভালো আমল শুরু করা এবং পাপ থেকে বাঁচা জরুরি কারণ মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে।
