মৃত্যুর আগের লক্ষণ ও প্রস্তুতি | ইসলামিক দৃষ্টিকোণ

মৃত্যুর আগে মানুষের যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে - ইসলামিক দৃষ্টিকোণ ও প্রস্তুতি

মৃত্যুর আগে মানুষের যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ ও প্রস্তুতি

ভূমিকা

মৃত্যু একটি অবধারিত সত্য যা প্রতিটি প্রাণীকে স্পর্শ করবে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে প্রতিটি প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। মৃত্যু কখন আসবে তা কেউ জানে না, তবে ইসলামিক শিক্ষা এবং মানবিক অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লক্ষণ সম্পর্কে জানা যায় যা মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে দেখা দিতে পারে। এই বিষয়ে জানা শুধু তথ্যের জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের এবং প্রিয়জনদের জন্য আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত আছে যে বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জন্য আমল করে (তিরমিজি: ২৪৫৯)। এই লেখায় আমরা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ এবং সাধারণ মানবিক অভিজ্ঞতা থেকে মৃত্যুর আগের সম্ভাব্য লক্ষণ এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করব।

মৃত্যু সম্পর্কে ইসলামিক শিক্ষা

ইসলামে মৃত্যুকে শেষ নয় বরং আখিরাতের যাত্রা শুরুর একটি দরজা হিসেবে দেখা হয়। মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে আসে এবং কেউ তা এক মুহূর্ত আগে বা পিছে করতে পারে না। কুরআনে বলা হয়েছে যে যখন কারো নির্ধারিত সময় আসে তখন তা এক মুহূর্তও বিলম্বিত হয় না (সূরা আরাফ: ৩৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছেন কারণ এটি মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং দুনিয়ার প্রতি মোহ কমায়। মৃত্যুর সময় একজন মুমিনের জন্য ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে আসেন এবং তার রূহ সহজে বের হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের জন্য মৃত্যু কষ্টদায়ক হতে পারে। মৃত্যু সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে মানুষ দুনিয়াতে ভালো কাজে মনোযোগী হয় এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেয়।

মুসলমানদের উচিত মৃত্যুকে ভয়ের চোখে নয় বরং আল্লাহর সাথে মিলনের একটি ধাপ হিসেবে দেখা। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ মৃত্যু কামনা করবে। বরং জীবনকে মূল্যবান মনে করে প্রতিটি মুহূর্ত ভালো কাজে ব্যয় করা উচিত। হাদিসে এসেছে যে তোমাদের কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে, বরং বলে: হে আল্লাহ! যতদিন জীবন আমার জন্য কল্যাণকর ততদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং যখন মৃত্যু কল্যাণকর হয় তখন আমাকে মৃত্যু দিন (সহিহ বুখারি: ৬৩৫১)।

শারীরিক লক্ষণসমূহ যা দেখা যেতে পারে

মৃত্যুর আগে কিছু শারীরিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে যা সাধারণত মানুষের অভিজ্ঞতায় পরিলক্ষিত হয়। তবে মনে রাখতে হবে এসব লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম নাও হতে পারে এবং এগুলো নিশ্চিত চিহ্ন নয়। শারীরিক দুর্বলতা বৃদ্ধি পাওয়া যেখানে ব্যক্তি ধীরে ধীরে শক্তি হারাতে থাকেন। খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে এবং পানি পান করতেও কষ্ট হতে পারে। শ্বাসকষ্ট বা অনিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাস লক্ষ্য করা যায়। চেতনা হ্রাস পেতে পারে এবং ব্যক্তি আশেপাশের মানুষদের চিনতে পারেন না। শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তন হতে পারে, বিশেষত হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা বা দূরের দিকে তাকিয়ে থাকা। এসব লক্ষণ দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই লক্ষণগুলো দেখা মানেই যে মৃত্যু নিশ্চিত তা নয়। অনেক সময় অসুস্থতার কারণেও এমন হতে পারে এবং ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তাই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর কাছে আরোগ্যের জন্য দোয়া করা জরুরি। একইসাথে যদি মৃত্যুর সময় এসে যায় তাহলে যেন ঈমানের সাথে মৃত্যু হয় সেজন্য প্রস্তুতি রাখা উচিত। হাদিসে বলা হয়েছে যে মানুষ যেভাবে জীবন যাপন করে সেভাবেই মৃত্যু হয় (মুসনাদে আহমাদ)। তাই জীবনভর ভালো কাজ করা এবং আল্লাহর আনুগত্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

আধ্যাত্মিক লক্ষণ এবং অনুভূতি

কিছু মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে কিছু আধ্যাত্মিক অনুভূতি বা লক্ষণের কথা জানান যা ইসলামিক বর্ণনায় এবং মানুষের অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়। মৃত আত্মীয়দের দেখা - কিছু মানুষ বলেন যে তারা তাদের মৃত আত্মীয়-স্বজনদের দেখেছেন বা অনুভব করেছেন। ইসলামিক দৃষ্টিকোণে রূহের জগত সম্পর্কে আমাদের সীমিত জ্ঞান আছে। শান্তি অনুভব করা - কিছু মুমিন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে অস্বাভাবিক শান্তি এবং প্রশান্তি অনুভব করেন। হাদিসে এসেছে যে মুমিনের জন্য মৃত্যুর সময় জান্নাতের সুসংবাদ আসে (সহিহ বুখারি)। আল্লাহকে স্মরণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা - কিছু মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে কুরআন শোনা, জিকির করা বা দোয়া করার প্রতি বেশি আগ্রহী হন। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি - ব্যক্তি অনুভব করেন যে তিনি দুনিয়াবি বিষয় থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন এবং আখিরাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

এসব অভিজ্ঞতা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে এবং এগুলো ব্যক্তির ঈমান এবং আমলের উপর নির্ভর করতে পারে। আল্লাহ পাক কাউকে হয়তো সহজ মৃত্যু দান করেন এবং কাউকে পরীক্ষা করেন। তবে যারা জীবনভর আল্লাহর পথে চলেছেন তাদের জন্য মৃত্যু সহজ হবে বলে আশা করা যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে" (সহিহ বুখারি: ৫৮২৭)। তাই মৃত্যুর আগে কালেমা পড়ানোর চেষ্টা করা এবং নিজে সর্বদা কালেমায় বিশ্বাস রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর সময় পরিবারের করণীয়

যখন কেউ মৃত্যুশয্যায় থাকে তখন পরিবার এবং আত্মীয়দের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা উচিত। কালেমা স্মরণ করানো - রাসুল (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ স্মরণ করাও" (সহিহ মুসলিম: ৯১৬)। তবে জোর করে নয়, বরং নিজেরা পাশে বসে কালেমা পড়তে থাকুন যাতে ব্যক্তি শুনে নিজেও পড়তে পারেন। সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত - কিছু হাদিসে মৃত্যুশয্যায় সূরা ইয়াসিন পড়ার কথা উল্লেখ আছে (সুনানে আবু দাউদ: ৩১২১)। দোয়া করা - মৃত ব্যক্তির জন্য এবং নিজেদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। ব্যক্তি যেন ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেন এবং আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। সান্ত্বনা দেওয়া - মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তিকে ভয় দেখানো নয় বরং আল্লাহর রহমতের কথা বলা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া। হাদিসে এসেছে যে তোমরা আল্লাহর রহমতের ভালো ধারণা রাখো (সহিহ মুসলিম: ২৮৭৭)।

কিবলামুখী করা - সম্ভব হলে ব্যক্তিকে ডান কাতে কিবলামুখী করে শোয়ানো। পরিবেশ শান্ত রাখা - মৃত্যুশয্যায় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি বা বিলাপ করা থেকে বিরত থাকা। রাসুল (সা.) বিলাপ করতে নিষেধ করেছেন। ক্ষমা চাওয়া - যদি মৃত ব্যক্তির সাথে কারো মনোমালিন্য থাকে তাহলে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এবং ক্ষমা করে দেওয়া। চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া - শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাব্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কারণ জীবন আল্লাহর দান এবং তা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এসব কাজ করলে মৃত ব্যক্তির জন্য সহায়ক হতে পারে এবং পরিবারও সান্ত্বনা পায় যে তারা যথাসাধ্য করেছে।

মৃত্যুর প্রস্তুতি: জীবদ্দশায় যা করা উচিত

মৃত্যু যেহেতু অনিবার্য এবং যেকোনো সময় আসতে পারে তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত জীবদ্দশায় মৃত্যুর প্রস্তুতি রাখা। তওবা করা - সকল পাপ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন (সূরা বাকারা: ২২২)। নামাজ-রোজা নিয়মিত করা - পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা এবং রমজানের রোজা রাখা। এগুলো ইসলামের মূল স্তম্ভ। হক আদায় করা - মানুষের হক যদি নিয়ে থাকেন তা ফিরিয়ে দেওয়া। ঋণ থাকলে পরিশোধ করা বা ব্যবস্থা রাখা। ওসিয়ত করা - সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করার অনুমতি আছে। তবে ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা যাবে না। সুসম্পর্ক রাখা - পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা। কারো সাথে শত্রুতা থাকলে মিটিয়ে ফেলা। মৃত্যু বেশি স্মরণ করা - রাসুল (সা.) বলেছেন সকল স্বাদ নষ্টকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো (তিরমিজি: ২৩০৭)।

কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন - ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করা এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করা। দান-সদকা - গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা এবং নিয়মিত দান করা। মৃত্যুর পর সদকায়ে জারিয়া সওয়াব দিতে থাকে। ভালো কাজের অভ্যাস - নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা। দুনিয়ার মোহ কমানো - দুনিয়া অস্থায়ী এবং আখিরাত চিরস্থায়ী এই বিশ্বাস মনে রাখা এবং সে অনুযায়ী চলা। এই প্রস্তুতিগুলো নিলে মৃত্যু যখনই আসুক মুমিন প্রস্তুত থাকবে এবং সহজে আখিরাতের সফর শুরু করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

সুন্দর পরিণতির জন্য দোয়া

ইসলামে সুমৃত্যু বা হুসনুল খাতিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত যেন ঈমানের সাথে মৃত্যু হয় এবং কালেমা পড়ার তৌফিক হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে দোয়া করতেন: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুসনাল খাতিমাহ" (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সুন্দর পরিণতি চাই)। কালেমার উপর মৃত্যুর জন্য দোয়া - নিয়মিত দোয়া করা যেন শেষ কথা হয় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। হাদিসে এসেছে যার শেষ কথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে (আবু দাউদ: ৩১১৬)। ঈমানের সাথে মৃত্যুর জন্য দোয়া - আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেন কুফরি অবস্থায় মৃত্যু না হয় এবং ঈমান ঠিক থাকে। কবরের আজাব থেকে পানাহ চাওয়া - রাসুল (সা.) প্রতিদিন নামাজে কবরের আজাব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন (সহিহ বুখারি: ১৩৭৭)। সহজ মৃত্যুর জন্য দোয়া - আল্লাহর কাছে সহজ এবং কষ্টহীন মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করা।

এই দোয়াগুলো নিয়মিত করলে আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেন বলে আশা করা যায়। তবে শুধু দোয়া নয়, ভালো আমলও জরুরি। হাদিসে এসেছে যে মানুষ যেভাবে জীবন কাটায় সেভাবেই মৃত্যু হয় তাই সারাজীবন নেক কাজ করা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার দোয়া পড়া, নামাজের পর দোয়া করা এবং বিশেষভাবে তাহাজ্জুদের সময় সুন্দর পরিণতির জন্য কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু এবং যারা আন্তরিকভাবে তাঁর কাছে চায় তিনি তা দান করেন।

মৃত্যু-পরবর্তী বিষয়ে সচেতনতা

মৃত্যুর পরপরই কবরের জীবন শুরু হয় যা আখিরাতের প্রথম ধাপ। কবরে মুনকার-নাকির নামক দুই ফেরেশতা প্রশ্ন করবেন: তোমার রব কে? তোমার দীন কী? তোমার নবী কে? (তিরমিজি: ১০৭১)। সঠিক উত্তরের প্রস্তুতি - জীবদ্দশায় এই প্রশ্নের উত্তর শিখে রাখা এবং অনুশীলন করা। আল্লাহ, ইসলাম এবং মুহাম্মদ (সা.) - এই তিন উত্তর জানা এবং মনে রাখা। কবরের নিয়ামত বা আজাব - নেককার ব্যক্তিদের কবর হবে জান্নাতের বাগান এবং পাপীদের কবর হবে জাহান্নামের গর্ত (তিরমিজি: ১০৭১)। তাই ভালো আমল করা জরুরি। সূরা মুলক পড়া - হাদিসে এসেছে যে সূরা মুলক কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে (তিরমিজি: ২৮৯১)। নিয়মিত এই সূরা পড়া উচিত। কবরে নামাজ-রোজা সাহায্য করবে - যারা নিয়মিত নামাজ পড়েছে এবং রোজা রেখেছে তাদের কবরে এগুলো সাহায্য করবে।

মৃত্যুর পর আমলের সুযোগ নেই - মৃত্যুর পর কোনো নতুন আমল করার সুযোগ থাকে না তাই জীবদ্দশায় যথাসম্ভব ভালো কাজ করা উচিত। কুরআনে বলা হয়েছে যে মৃত্যুর পর ব্যক্তি দুনিয়ায় ফিরে ভালো কাজ করতে চাইবে কিন্তু সুযোগ পাবে না (সূরা মুমিনুন: ৯৯-১০০)। বারযাখ জীবন - মৃত্যু থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মধ্যবর্তী জীবনকে বারযাখ বলা হয়। এই সময় রূহ বিশেষ অবস্থায় থাকে। জীবিতদের দোয়া উপকারী - মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের দোয়া, সদকা এবং হজ্জ-উমরাহ করে সওয়াব পৌঁছানো উপকারী হতে পারে। এসব বিষয়ে জানা থাকলে মানুষ দুনিয়াতে আরও সচেতন হয়ে চলে এবং প্রস্তুতি নেয়।

উপসংহার

মৃত্যু একটি অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা এবং প্রতিটি মানুষকে একদিন এই পথ অতিক্রম করতে হবে। মৃত্যুর আগের লক্ষণ সম্পর্কে জানা আমাদের নিজেদের এবং প্রিয়জনদের জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।

আসুন, আমরা সবাই মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করি এবং প্রস্তুতি নিই। নিয়মিত তওবা করি এবং পাপ থেকে দূরে থাকি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো পড়ি এবং রোজা রাখি। মানুষের হক আদায় করি এবং ঋণ পরিশোধ করি। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখি এবং ক্ষমা চেয়ে নিই। সূরা মুলক এবং সূরা ইয়াসিন নিয়মিত পড়ি। কালেমার উপর মৃত্যুর জন্য এবং হুসনুল খাতিমার জন্য দোয়া করি। সদকা-খয়রাত করি যাতে মৃত্যুর পরও সওয়াব চলতে থাকে। কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন করি এবং ইসলামিক জ্ঞান বৃদ্ধি করি। দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখিরাতের জন্য আমল করি। পরিবারকে মৃত্যুশয্যায় কী করতে হবে তা শিখিয়ে রাখি। মনে রাখি যে মৃত্যু শেষ নয় বরং আখিরাতের যাত্রা শুরু। আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখি এবং জান্নাতের আশা করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ঈমানের সাথে মৃত্যুর এবং কালেমা পড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

১. মৃত্যুর আগে কি নিশ্চিত কোনো লক্ষণ আছে?

না, মৃত্যুর নিশ্চিত কোনো লক্ষণ নেই কারণ মৃত্যু আল্লাহর হাতে এবং তিনি যখন চান তখনই মৃত্যু ঘটে। তবে কিছু শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে যেমন শারীরিক দুর্বলতা, খাবারে অনীহা, শ্বাসকষ্ট, চেতনা হ্রাস ইত্যাদি। এসব লক্ষণ দেখা মানেই যে মৃত্যু নিশ্চিত তা নয়, অনেক সময় অসুস্থতার কারণেও হতে পারে এবং ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তাই এসব লক্ষণ দেখলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। কুরআনে বলা হয়েছে যে কেউ জানে না সে কোথায় মৃত্যুবরণ করবে (সূরা লুকমান: ৩৪)। তাই প্রতিটি মুহূর্ত প্রস্তুত থাকা এবং ভালো কাজে ব্যস্ত থাকা জরুরি। মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে তাই সবসময় তওবা এবং নেক আমলে থাকা উচিত।

২. মৃত্যুশয্যায় কালেমা কীভাবে পড়াতে হয়?

মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তিকে জোর করে বা বারবার বলে কালেমা পড়ানো ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন মৃত ব্যক্তিদের লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ স্মরণ করাও (সহিহ মুসলিম: ৯১৬)। সঠিক পদ্ধতি হলো পাশে বসে নিজেরা কালেমা পড়া যাতে ব্যক্তি শুনতে পায় এবং নিজে থেকে পড়তে পারেন। যদি ব্যক্তি একবার পড়ে ফেলেন তাহলে আবার বলা যাবে না যতক্ষণ না তিনি অন্য কিছু বলেন। কারণ শেষ কথা যেন কালেমা হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। নরম ভাষায় এবং ভালোবাসার সাথে স্মরণ করানো উচিত। যদি ব্যক্তি কথা বলতে না পারেন তাহলে তার পাশে বসে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং জিকির করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর রহমতের কথা বলা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া যাতে ব্যক্তি শান্তি পায়।

৩. মৃত্যুর পর রূহের কী হয়?

মৃত্যুর পর রূহ শরীর থেকে বের হয়ে যায় এবং বারযাখ জীবনে প্রবেশ করে যা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। নেককার মুমিনদের রূহ উর্ধ্বাকাশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় (ইবনে মাজাহ)। পক্ষান্তরে পাপীদের রূহ নিচের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। কবরে মুনকার-নাকির ফেরেশতা এসে তিনটি প্রশ্ন করবেন এবং উত্তরের উপর ভিত্তি করে কবরে নিয়ামত বা আজাব শুরু হবে। মুমিনদের কবর হবে জান্নাতের বাগান এবং তারা শান্তিতে থাকবেন। জীবিতদের দোয়া এবং সদকা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং তাদের উপকার করতে পারে। কিয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং হিসাব-নিকাশ হবে। তাই মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

৪. হুসনুল খাতিমা বা সুন্দর পরিণতির জন্য কী করতে হবে?

হুসনুল খাতিমা বা ঈমানের সাথে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলমানের কাম্য। এর জন্য সারাজীবন নেক আমল করতে হবে কারণ হাদিসে এসেছে মানুষ যেভাবে জীবন কাটায় সেভাবেই মৃত্যু হয়। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রমজানের রোজা রাখা এবং যাকাত দেওয়া। সকল পাপ থেকে তওবা করা এবং মানুষের হক আদায় করা। কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং দোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। বিশেষভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করা: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুসনাল খাতিমাহ"। পিতা-মাতার সেবা করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। দান-সদকা করা এবং মানুষের উপকার করা। হারাম থেকে দূরে থাকা এবং হালালভাবে জীবন যাপন করা। সৎ সঙ্গ অবলম্বন করা এবং মন্দ সঙ্গ ত্যাগ করা। এসব আমল করলে আল্লাহ তায়ালা সুন্দর পরিণতি দান করবেন বলে আশা করা যায়।

৫. মৃত্যুশয্যায় কাউকে দেখতে গেলে কী করা উচিত?

মৃত্যুশয্যায় কাউকে দেখতে গেলে ইসলামিক শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত। প্রথমত, শান্ত এবং সান্ত্বনাদায়ক পরিবেশ তৈরি করা। উচ্চস্বরে কথা বলা বা কান্নাকাটি করা থেকে বিরত থাকা কারণ এতে ব্যক্তি বিচলিত হতে পারেন। আল্লাহর রহমতের কথা বলা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন মৃত ব্যক্তির কাছে আল্লাহর রহমতের ভালো ধারণা রাখার কথা বলো (সহিহ মুসলিম: ২৮৭৭)। দোয়া করা এবং পাশে বসে কুরআন তিলাওয়াত করা। সম্ভব হলে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করা। পরিবারকে ধৈর্য ধরতে এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে উৎসাহিত করা। যদি কোনো মনোমালিন্য থাকে তাহলে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। অল্প সময় থাকা এবং পরিবারকে ব্যক্তিগত সময় দেওয়া। মনে রাখতে হবে এই সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল তাই যত্ন এবং সম্মানের সাথে আচরণ করা উচিত। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url