হাদিসের আলোকে শা‘বান মাসের মর্যাদা: কেন এই মাস এত গুরুত্বপূর্ণ?
হাদিসের আলোকে শা‘বান মাসের মর্যাদা: কেন এই মাস এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভূমিকা
ইসলামী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস হলো শা‘বান। এই মাসটি রজব ও রমজানের মাঝখানে অবস্থান করলেও এর গুরুত্ব অনেকের কাছেই অজানা। অনেক মুসলমান এই মাসকে সাধারণ একটি মাস হিসেবে পার করে দেন, অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ শা‘বান মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং এই মাসে ইবাদত বৃদ্ধি করতেন। হাদিসের আলোকে দেখা যায়—শা‘বান মাস মূলত আত্মশুদ্ধি, আমল বৃদ্ধির এবং রমজানের প্রস্তুতির মাস। এই লেখায় আমরা সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে শা‘বান মাসের মর্যাদা, গুরুত্ব ও করণীয় বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে জানবো।
শা‘বান মাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শা‘বান মাসের গুরুত্ব বোঝার জন্য প্রথমেই আমাদের রাসূল ﷺ-এর আমলের দিকে তাকাতে হবে। তিনি কখনোই কোনো মাসকে অকারণে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। যেসব মাসে তিনি বেশি ইবাদত করতেন, সেগুলোর পেছনে গভীর হিকমত ও শিক্ষা রয়েছে। শা‘বান মাসও তার ব্যতিক্রম নয়। এই মাসে বান্দার বার্ষিক আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়—এ বিষয়টি হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
হাদিসের আলোকে শা‘বান মাসের মর্যাদা
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন—
“আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শা‘বান মাসে এত বেশি রোজা রাখেন কেন?”
তিনি বললেন—
‘এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী একটি মাস, যেটিকে মানুষ অবহেলা করে। এই মাসে মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর কাছে উঠানো হয়, আর আমি চাই আমার আমল রোজা অবস্থায় উঠানো হোক।’
📚 (সুনানে নাসাঈ: ২৩৫৭ – সহিহ)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—
১) শা‘বান মাস অবহেলিত
২) এই মাসে আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়
৩) রাসূল ﷺ এই মাসে রোজা ও ইবাদত বাড়িয়ে দিতেন
শা‘বান মাসে বেশি নফল রোজা রাখার কারণ
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন—
“আমি রাসূল ﷺ-কে শা‘বান মাসের মতো আর কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।”
📚 (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস প্রমাণ করে—শা‘বান মাসে নফল রোজা রাখা সুন্নাত আমল। নফল রোজা মানুষের নফসকে সংযত করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং রমজানের ফরজ রোজার জন্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।
তবে মনে রাখতে হবে—শা‘বানের শেষ এক বা দুই দিন রমজানের নিয়তে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।
শা‘বান মাস: আত্মসমালোচনার সময়
শা‘বান মাস হলো নিজের আমল যাচাই করার মাস। গত এক বছরে আমরা কী করেছি, কতটা আল্লাহর আদেশ মেনেছি, কোথায় গাফিলতি হয়েছে—এসব ভেবে দেখার শ্রেষ্ঠ সময় এটি। কারণ হাদিস অনুযায়ী এই মাসেই বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে উঠানো হয়। তাই এই মাসে তওবা, ইস্তিগফার ও আত্মশুদ্ধির দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
শা‘বান মাসে তওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করো।”
📖 (সূরা তাহরীম: ৮)
শা‘বান মাসে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা মানে—আল্লাহর কাছে নিজেকে পেশ করার আগে নিজের গুনাহগুলো ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা। এটি বান্দার অন্তরকে নরম করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের পথ সুগম করে।
আরো পড়ুন: শা‘বান মাসে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ আমল
শা‘বান মাস ও কুরআনের সম্পর্ক
রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস, আর শা‘বান হলো কুরআনের প্রস্তুতির মাস। সালাফে সালেহিন এই মাসে কুরআন তিলাওয়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। শা‘বান মাসে কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করলে রমজানে কুরআন পড়া ও বুঝা অনেক সহজ হয়ে যায়।
শা‘বান মাসে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
শা‘বান মাসকে কেন্দ্র করে কিছু আমল সমাজে প্রচলিত আছে, যেগুলোর সহিহ দলিল নেই। হাদিসের আলোকে প্রমাণিত আমল বাদ দিয়ে ভিত্তিহীন আমলে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী নফল রোজা, তওবা ও কুরআন তিলাওয়াতই শা‘বান মাসের মূল আমল।
শা‘বান ও রমজানের সংযোগ
শা‘বান মাস মূলত রমজানের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রস্তুতির আহ্বান। এই মাসে যারা নিজেদের ঠিক করে নেয়, তাদের জন্য রমজান সহজ ও বরকতময় হয়ে ওঠে। আর যারা শা‘বান অবহেলা করে, তারা রমজানে গিয়ে হঠাৎ করে ইবাদতের ভার অনুভব করে।
আরো পড়ুন: শা‘বান মাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উপসংহার
হাদিসের আলোকে শা‘বান মাসের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। এটি এমন একটি মাস, যেখানে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়, রাসূল ﷺ নিজে বেশি ইবাদত করতেন এবং যা রমজানের প্রস্তুতির জন্য সর্বোত্তম সময়। তাই আমাদের উচিত শা‘বান মাসকে অবহেলা না করে নফল রোজা, তওবা, ইস্তিগফার ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে এই মাসকে অর্থবহ করে তোলা। ইনশাআল্লাহ, এতে আমাদের রমজান ও পুরো জীবনই বদলে যাবে।
.jpeg)