শা‘বান মাসে নফল রোজার ফজিলত
শা‘বান মাসে নফল রোজার ফজিলত?
কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে জানুন কেন রাসূল ﷺ এই মাসে বেশি রোজা রাখতেন।
ভূমিকা
ইসলামী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শা‘বান—রমজানের ঠিক আগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। এই মাসকে অনেকেই অবহেলা করে থাকেন, অথচ হাদীসের আলোকে দেখা যায়—রাসূলুল্লাহ ﷺ এই মাসে বিশেষভাবে নফল রোজা রাখতেন। শা‘বান মাস মূলত আত্মসংযম, আমল বৃদ্ধির এবং রমজানের প্রস্তুতির মাস। বিশেষ করে নফল রোজা এই মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোর একটি। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে শা‘বান মাসে নফল রোজার ফজিলত সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক আলোচনা করবো।
শাবান মাসের নফল রোজার গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কুরআনে বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়—রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। ফরজ রোজার পাশাপাশি নফল রোজাও তাকওয়া বৃদ্ধি ও নফস সংযমের একটি কার্যকর মাধ্যম। শা‘বান মাসে নফল রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন রমজানের তাকওয়াভিত্তিক জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে।
হাদীসের আলোকে শাবান মাসে নফল রোজার গুরুত্ব
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন—
“আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শা‘বান মাসে এত বেশি রোজা রাখেন কেন?”
তিনি বললেন—
‘এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী একটি মাস, যেটিকে মানুষ অবহেলা করে। এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে উঠানো হয়, আর আমি চাই আমার আমল রোজা অবস্থায় উঠানো হোক।’
(সুনানে নাসাঈ: ২৩৫৭ – সহিহ)
এই হাদীস থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়—
১) শা‘বান মাস সাধারণত অবহেলিত
২) এই মাসে মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়
৩) রাসূল ﷺ ইচ্ছা করতেন, তার আমল রোজা অবস্থায় পেশ হোক
রাসূল ﷺ শাবান মাসে কতটা রোজা রাখতেন?
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন—
“আমি রাসূল ﷺ-কে শা‘বান মাসের মতো আর কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে—
“তিনি শা‘বান মাসের অধিকাংশ দিন রোজা রাখতেন।”
এ থেকে বোঝা যায়—রাসূল ﷺ পুরো মাস রোজা না রাখলেও অধিকাংশ দিন নফল রোজা রাখতেন। এটি শা‘বান মাসে নফল রোজার সুন্নাহ ও ফজিলতকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
শাবান মাসে নফল রোজা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
১. আমল পেশের মাস
হাদীস অনুযায়ী এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই নফল রোজার মাধ্যমে আমলকে আরও সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
২. নফস সংযম ও আত্মশুদ্ধি
নফল রোজা নফসকে দুর্বল করে এবং আত্মাকে শক্তিশালী করে। শা‘বান মাসে এই অভ্যাস গড়ে তুললে রমজানে ফরজ রোজা রাখা সহজ হয়ে যায়।
৩. রমজানের প্রস্তুতি
যেমন খেলোয়াড় ম্যাচের আগে অনুশীলন করে, তেমনি শা‘বান মাসে নফল রোজা রমজানের প্রস্তুতির একটি বাস্তব অনুশীলন।
শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সীমা
হাদীসের আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো—
“তোমরা রমজানের এক বা দুই দিন আগে রোজা রাখবে না।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ, শা‘বানের শেষ এক–দুই দিন রমজানের নিয়তে রোজা রাখা নিষেধ। তবে যার নিয়মিত নফল রোজার অভ্যাস রয়েছে, সে ব্যতিক্রম হতে পারে।
নফল রোজার সাধারণ ফজিলত (শা‘বান মাসে বিশেষভাবে প্রযোজ্য)
রাসূল ﷺ বলেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তার চেহারা জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে দেন।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদীস নফল রোজার সাধারণ ফজিলত বর্ণনা করে, যা শা‘বান মাসে রোজা রাখার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
শাবান মাস ও রমজানের আত্মিক সংযোগ
শা‘বান মাস রমজানের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি সেতুবন্ধন। যারা এই মাসে নফল রোজার মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করে, তাদের জন্য রমজান হয় আরও সহজ, আনন্দময় ও বরকতময়। আর যারা এই মাসে অবহেলা করে, তারা রমজানে হঠাৎ ইবাদতের চাপ অনুভব করে।
কিছু ভুল ধারণা থেকে সতর্কতা
শা‘বান মাসে নফল রোজার ফজিলত থাকলেও ভিত্তিহীন আমল বা নির্দিষ্ট তারিখকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো উচিত নয়। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সুন্নাহ অনুযায়ী রোজা রাখা সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম পথ।
উপসংহার
কুরআন ও সহিহ হাদীসের আলোকে স্পষ্ট—শা‘বান মাসে নফল রোজা একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এটি এমন এক ইবাদত, যা আমল পেশের মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। রাসূল ﷺ নিজে এই মাসে অধিক রোজা রেখে আমাদের জন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাই আমাদের উচিত শা‘বান মাসকে অবহেলা না করে নফল রোজার মাধ্যমে রমজানের জন্য প্রস্তুত হওয়া। ইনশাআল্লাহ, এতে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই উপকৃত হবে।
