যেনা করার পরিণতি ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি | কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে
যেনা করার পরিণতি ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি | কুরআন ও হাদীসের আলোকে (দলিলসহ)
ভূমিকা
ইসলাম মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা ও আত্মসংযমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। পারিবারিক পবিত্রতা, সামাজিক শালীনতা এবং ব্যক্তিগত আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য ইসলাম কিছু কাজকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। যেনা এমনই একটি কাজ, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই লেখায় কুরআন ও হাদীসের আলোকে যেনা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, এর পরিণতি, তাওবার সুযোগ এবং সমাজের জন্য শিক্ষণীয় দিকগুলো আলোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ইসলামে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই নৈতিক দায়িত্ব ও গুনাহের বিধান সমান। এই আলোচনা সম্পূর্ণ শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে।
যেনা কী?
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করাকে যেনা বলা হয়। নারী ও পুরুষ—উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি ইসলামে নিষিদ্ধ।
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা যেনার কাছে পর্যন্ত যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।”
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩২
👉 এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু কাজটিকেই নয়, বরং এর দিকে নিয়ে যায়—এমন সব পথ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।
কেন ইসলাম যেনা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে?
যেনা শুধু ব্যক্তিগত একটি ভুল নয়; বরং এটি সমাজে নানা ধরনের সমস্যার জন্ম দিতে পারে, যেমন—
-
পারিবারিক অস্থিরতা
-
নৈতিক অবক্ষয়
-
পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট
-
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা
এই কারণেই ইসলাম এটিকে কবিরা (বড় গুনাহ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা প্রদান করেছে।
কুরআনের আলোকে যেনা সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যেনাকারী নারী ও যেনাকারী পুরুষ—তোমরা উভয়কে একশ’ বেত্রাঘাত করো।”
— সূরা আন-নূর, আয়াত: ২
👉 এই বিধানটি শরিয়ত অনুযায়ী প্রমাণিত অপরাধ, নির্দিষ্ট শর্ত ও যোগ্য ইসলামী বিচারব্যবস্থার অধীনে প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষ নিজেরা এই বিধান কার্যকর করতে পারে না।
এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো সমাজকে অনৈতিকতা থেকে রক্ষা করা এবং মানুষকে সতর্ক করা।
হাদীসের আলোকে যেনার পরিণতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“যখন কোনো ব্যক্তি যেনায় লিপ্ত হয়, তখন তার ঈমান দুর্বল হয়ে যায়।”
— সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬৯০
👉 এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, যেনা মানুষের আত্মিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরেক বর্ণনায় রাসূল ﷺ যেনার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়; বরং গুনাহ থেকে দূরে রাখা এবং আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করা।
আখিরাতের দিক থেকে জবাবদিহি
যদি কেউ তাওবা না করে এই গুনাহের ওপর অটল থাকে, তবে আখিরাতে তাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে। হাদীসে রাসূল ﷺ কিছু গুনাহের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন—যার মাধ্যমে মানুষকে দুনিয়াতেই সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
👉 তবে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—
-
আল্লাহর রহমত অপরিসীম
-
আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে ক্ষমার দরজা সবসময় খোলা
তাওবা করলে কি ক্ষমা হয়?
হ্যাঁ—নিশ্চয়ই।
📖 আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
— সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৩
খাঁটি তাওবার শর্ত
-
গুনাহ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত হওয়া
-
আন্তরিক অনুশোচনা করা
-
ভবিষ্যতে পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা
-
গুনাহ প্রকাশ না করা
👉 এমন তাওবাকে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত পছন্দ করেন।
সমাজের করণীয়
ইসলাম সমাজকে দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দেয়। যেমন—
-
গুনাহকে ঘৃণা করা, ব্যক্তিকে নয়
-
ভুলকারীকে সংশোধনে সহায়তা করা
-
শালীনতা ও পর্দার পরিবেশ বজায় রাখা
-
অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে সমাজকে রক্ষা করা
ইসলাম কখনোই অপমান বা ঘৃণার শিক্ষা দেয় না; বরং সংশোধন ও কল্যাণের পথ দেখায়।
নারীদের জন্য উপদেশ
ইসলাম নারীকে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রদান করেছে। পর্দা, শালীনতা ও তাকওয়া নারীর ব্যক্তিত্বকে আরও সুদৃঢ় করে। সাময়িক প্রবৃত্তির অনুসরণ নয়—বরং আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি একজন মুমিন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য।
উপসংহার
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম যেনার মতো কাজকে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তা থেকে দূরে থাকার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাম মানুষকে আশাহীন করে না; বরং খাঁটি তাওবার মাধ্যমে সংশোধনের পূর্ণ সুযোগ দেয়।
আমাদের উচিত ইসলামের এই শিক্ষাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, নিজেকে সংযত রাখা এবং অন্যকে সঠিক পথে উৎসাহিত করা।
