খেজুর খাওয়ার সুন্নত পদ্ধতি ও উপকারিতা | কুরআন-হাদীস
খেজুর খাওয়ার সুন্নত পদ্ধতি ও এর ৭টি উপকারিতা | কুরআন-হাদীসের আলোকে
খেজুর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় খাদ্যগুলোর একটি এবং কুরআনে এই ফলের উল্লেখ একাধিকবার এসেছে। মরুভূমির এই সহজলভ্য ফলটি আরব সংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে খেজুর খাওয়ার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতেন এবং এটি সেবনের বিশেষ সময় ও নিয়মের কথাও হাদিসে বর্ণিত আছে। তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন - এই লেখাটি খেজুর সম্পর্কে ইসলামি ঐতিহ্য ও সুন্নত পদ্ধতির একটি ধর্মীয় পর্যালোচনা, কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়। কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা বা রোগের জন্য অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই লেখায় আমরা খেজুর খাওয়ার সুন্নত পদ্ধতি এবং কুরআন-হাদিসে বর্ণিত এর সাধারণ উপকারী দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
কুরআনে খেজুরের উল্লেখ
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে খেজুর গাছ ও এর ফল সম্পর্কে একাধিক স্থানে উল্লেখ করেছেন যা এই ফলের গুরুত্ব প্রকাশ করে। মরিয়ম (আ.) এর সন্তান জন্মদানের ঘটনায় আল্লাহ তাঁকে খেজুর গাছের ডাল নাড়া দিতে বলেছিলেন যাতে তাজা ও পাকা খেজুর ঝরে পড়ে (সূরা মারইয়াম: ২৫)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে খেজুর প্রসবকালীন সময়ে একটি প্রথাগতভাবে গ্রহণযোগ্য খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যদিও এটি কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত নির্দেশনা নয়। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন যার মাধ্যমে খেজুর, আঙুরসহ বিভিন্ন ফলমূল উৎপন্ন হয় (সূরা নাহল: ১১)। কুরআনে জান্নাতের নেয়ামতসমূহের বর্ণনায়ও খেজুরের উল্লেখ এসেছে যা এই ফলের প্রতি একটি বিশেষ মর্যাদার ইঙ্গিত দেয়। এই আয়াতগুলো মূলত আল্লাহর সৃষ্টির প্রাচুর্য ও তাঁর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আহ্বান জানায়, কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য উপকারিতার দাবি নয়।
রাসুলুল্লাহর খেজুর খাওয়ার সুন্নত পদ্ধতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুর খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস অনুসরণ করতেন যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার একটি প্রসিদ্ধ সুন্নত রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমাদের কেউ ইফতার করার সময় যেন খেজুর দিয়ে করে, কারণ এতে বরকত আছে, আর যদি খেজুর না পাওয়া যায় তাহলে পানি দিয়ে করবে কারণ পানি পবিত্র (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬, সুনানে তিরমিজি: ৬৯৬)। বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার একটি সুন্নত রয়েছে, যেমন এক, তিন, পাঁচ বা সাতটি খেজুর খাওয়া। আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে যাওয়ার আগে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৩)। সকালে খালি পেটে খেজুর খাওয়ার একটি বর্ণনাও হাদিসে পাওয়া যায় যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাতটি আজওয়া খেজুর সকালে খাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন (সহিহ বুখারি: ৫৭৬৯, সহিহ মুসলিম: ২০৪৭)। তবে এই হাদিসটি নির্দিষ্ট আজওয়া খেজুর এবং সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, তাই একে সার্বজনীন চিকিৎসা নির্দেশনা হিসেবে না দেখে একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বর্ণনা হিসেবে বোঝা উচিত।
রমজানে ইফতারে খেজুরের বিশেষ গুরুত্ব
রমজান মাসে ইফতারের সময় খেজুর খাওয়া মুসলিম বিশ্বে একটি সার্বজনীন প্রথা যার পেছনে সহিহ হাদিসের সমর্থন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এই সুন্নত অনুসরণ করে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা ইফতারে প্রথমে খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙেন। এই প্রথার পেছনে একটি ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে যা রাসুলুল্লাহর সুন্নত অনুসরণের একটি সুযোগ এনে দেয়। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার পর খেজুরের মতো একটি সহজপাচ্য ও মিষ্টি খাদ্য দিয়ে রোজা ভাঙার এই ঐতিহ্য শতাব্দী ধরে চলে আসছে। বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার সুন্নত রমজান মাসে বিশেষভাবে পালন করা হয়, অনেকে তিনটি খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এই প্রথা শুধু একটি খাদ্যাভ্যাস নয় বরং এটি রাসুলুল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। তবে খেজুর সেবনের পরিমাণ ও ধরন নির্ধারণে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন, বিশেষত ডায়াবেটিসের মতো সমস্যায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।
হাদিসে খেজুরের সাধারণ উপকারী বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা
সহিহ হাদিসে খেজুরের কিছু সাধারণ উপকারী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ আছে যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বোঝা প্রয়োজন। একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ঘরে খেজুর নেই সেই ঘরের বাসিন্দারা যেন ক্ষুধার্ত (সহিহ মুসলিম: ২০৪৬), যা খেজুরের পুষ্টিগুণ ও গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। আজওয়া খেজুর সম্পর্কে একটি বিশেষ হাদিস রয়েছে যেখানে সকালে এটি সেবনের কথা বলা হয়েছে (সহিহ বুখারি: ৫৭৬৯), তবে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইসলামি স্কলাররা সতর্ক করেছেন যে এটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল এবং সরাসরি কোনো রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দাবি করা উচিত নয়। এই বর্ণনাগুলো মূলত খেজুরের সাধারণ পুষ্টিকর ও উপকারী প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করে, নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসাগত প্রতিশ্রুতি নয়। ইসলামি ঐতিহ্যে "তিব্বে নববী" নামে একটি শাখা থাকলেও আধুনিক আলেমরা এই বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয়কেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
খেজুরকে সাধারণভাবে যে ৭টি ইতিবাচক দিক থেকে দেখা হয়
কুরআন-হাদিস ও ইসলামি ঐতিহ্যের আলোকে খেজুরের কিছু সাধারণ ইতিবাচক দিক লক্ষ্য করা যায় যা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। প্রথমত এটি রাসুলুল্লাহর প্রিয় ও নিয়মিত সেবনকৃত একটি খাদ্য ছিল যা এর প্রতি একটি সুন্নতি গুরুত্ব যোগ করে। দ্বিতীয়ত এটি সহজপাচ্য একটি প্রাকৃতিক মিষ্টি খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় যা দীর্ঘ রোজার পর শরীরের জন্য আরামদায়ক হতে পারে বলে ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হয়। তৃতীয়ত এটি ইফতারের সুন্নত পালনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সংযোগ ও রাসুলুল্লাহর অনুসরণের একটি সুযোগ এনে দেয়। চতুর্থত এটি সংরক্ষণে সহজ এবং দীর্ঘদিন খাদ্যযোগ্য থাকে যা মরুভূমির পরিবেশে এটিকে একটি ব্যবহারিক খাদ্য করে তুলেছিল। পঞ্চমত কুরআনে এর উল্লেখ থাকায় এটি একটি আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ ফল হিসেবে বিবেচিত হয়। ষষ্ঠত এটি সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে, বিশেষত ইফতার মাহফিলে, একতা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সপ্তমত এটি বেজোড় সংখ্যায় খাওয়ার সুন্নত পালনের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট সুন্নত অনুসরণের অভ্যাস গড়ে তোলে। এই বিষয়গুলো মূলত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের দিক থেকে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা দাবি হিসেবে নয়।
খেজুর সেবনে সতর্কতা ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
খেজুর একটি প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর ফল হলেও এর সেবনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের এটি সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেকোনো খাদ্যের মতোই খেজুরও পরিমিতভাবে খাওয়া উচিত, অতিরিক্ত সেবন যেকোনো খাদ্যের ক্ষেত্রেই অস্বাস্থ্যকর হতে পারে। শিশু বা বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় খেজুর অন্তর্ভুক্ত করার আগে পরিবারের চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা বুদ্ধিমানের কাজ। ইসলামি ঐতিহ্যে খেজুরের প্রশংসা মূলত এর সাধারণ পুষ্টিগুণ, সহজলভ্যতা এবং রাসুলুল্লাহর সুন্নতের সাথে সম্পর্কের কারণে, এটিকে কোনো রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে দাবি করা হয়নি। তাই আমরা খেজুরকে আমাদের দৈনন্দিন সুষম খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে এবং সুন্নত পালনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তবে কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হিসেবে এর উপর নির্ভর করার আগে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার
খেজুর রাসুলুল্লাহর একটি প্রিয় খাদ্য এবং কুরআন-হাদিসে এর উল্লেখ আমাদের জন্য একটি সুন্দর ধর্মীয় ঐতিহ্য বহন করে। আসুন আমরা এই সুন্নত থেকে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা গ্রহণ করি এবং রমজান মাসে ইফতারের সময় খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙার সুন্নত পালন করি। বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলি এবং প্রতিটি খাদ্যগ্রহণের আগে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি। খেজুরকে আমাদের দৈনন্দিন সুষম খাদ্যতালিকার একটি স্বাস্থ্যকর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করি, তবে পরিমিতির বিষয়টি মাথায় রাখি। যাদের ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তারা খেজুর সেবনের পরিমাণ নির্ধারণে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিই। কুরআনে বর্ণিত খেজুরের প্রসঙ্গ থেকে আল্লাহর সৃষ্টির প্রাচুর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। সন্তানদের এই সুন্দর সুন্নত সম্পর্কে শিক্ষা দিই যাতে তারাও রাসুলুল্লাহর অনুসরণে উৎসাহিত হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক চিকিৎসা জ্ঞান উভয়কেই যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুন্নত অনুসরণের এবং তাঁর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. খেজুর দিয়ে ইফতার করার সুন্নত পদ্ধতি কী?
খেজুর দিয়ে ইফতার করা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি প্রসিদ্ধ সুন্নত যা সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমাদের কেউ ইফতার করার সময় যেন খেজুর দিয়ে করে, কারণ এতে বরকত আছে, আর যদি খেজুর না পাওয়া যায় তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করবে কারণ পানি পবিত্র (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৫৬, সুনানে তিরমিজি: ৬৯৬)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় খেজুর না থাকলে পানি দিয়েও ইফতার করা যায়, তাই খেজুর অপরিহার্য নয় বরং এটি একটি উত্তম সুন্নত। ইফতারের সময় সাধারণত বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার প্রথা রয়েছে, যেমন এক, তিন বা পাঁচটি খেজুর। এই সুন্নত পালন করলে রোজাদার শুধু শারীরিক প্রয়োজন পূরণ করেন না বরং রাসুলুল্লাহর সাথে একটি আধ্যাত্মিক সংযোগও স্থাপন করেন। তবে খেজুরের পরিমাণ নির্ধারণে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থা বিবেচনা করা উচিত এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
২. বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার সুন্নতের পেছনে কী কারণ রয়েছে?
বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়ার সুন্নত হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং এটি একটি ধর্মীয় প্রথা হিসেবে অনুসরণ করা হয়। আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৩)। ইসলামে বেজোড় সংখ্যার প্রতি একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহ বেজোড় এবং তিনি বেজোড় পছন্দ করেন, যা বিতর নামাজের প্রসঙ্গেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই কারণে খেজুর খাওয়ার ক্ষেত্রেও এক, তিন, পাঁচ বা সাত সংখ্যায় খাওয়ার প্রথা প্রচলিত হয়েছে। এটি মূলত একটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা রাসুলুল্লাহর সুন্নত অনুসরণের একটি মাধ্যম, এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ হাদিসে উল্লেখ নেই। তাই এই সুন্নত পালন করার সময় মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহর অনুসরণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নির্দিষ্ট কোনো শারীরিক উপকারিতার প্রত্যাশা নয়।
৩. আজওয়া খেজুর সম্পর্কিত হাদিসের সঠিক তাৎপর্য কী?
আজওয়া খেজুর সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন (সহিহ বুখারি: ৫৭৬৯, সহিহ মুসলিম: ২০৪৭)। তবে এই হাদিসের সঠিক তাৎপর্য বোঝার জন্য ইসলামি স্কলারদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক আলেম এই হাদিসকে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এবং সেই সময়ের ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বলা একটি বিশেষ বর্ণনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে সার্বজনীন প্রতিষেধক হিসেবে দাবি করার জন্য নয়। ইসলামি চিকিৎসাশাস্ত্র বা "তিব্বে নববী" সংক্রান্ত হাদিসগুলো সাধারণত সেই যুগের প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয় বলে অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম মত দিয়েছেন। তাই আজওয়া খেজুর খাওয়াকে একটি সুন্দর ধর্মীয় সুন্নত ও ঐতিহ্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার প্রতিকার হিসেবে এর উপর নির্ভর করার আগে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৪. প্রতিদিন খেজুর খাওয়া কি সবার জন্য উপযুক্ত?
খেজুর একটি প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর ফল হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রতিদিন এটি খাওয়া সবার জন্য একইভাবে উপযুক্ত নাও হতে পারে, এটি নির্ভর করে ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য অবস্থার উপর। খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে বলে সাধারণভাবে জানা যায়, তাই ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের এটি নিয়মিত সেবনের আগে অবশ্যই তাদের চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত। সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পরিমিত পরিমাণে খেজুর খাওয়া সাধারণত একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে যেকোনো খাদ্যের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত সেবন এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ। শিশু, গর্ভবতী নারী বা বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় নতুন কিছু যোগ করার আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবসময় উত্তম। ইসলামি ঐতিহ্যে খেজুরের প্রশংসা মূলত এর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে করা হয়েছে, তাই এটিকে একটি সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একইভাবে প্রযোজ্য কোনো নিয়ম হিসেবে নয়।
৫. খেজুর সম্পর্কিত হাদিসগুলোকে কীভাবে সঠিকভাবে বোঝা উচিত?
খেজুর সম্পর্কিত হাদিসগুলো বোঝার সময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা ধর্মীয় শিক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। এই হাদিসগুলো মূলত রাসুলুল্লাহর ব্যক্তিগত অভ্যাস, সেই সময়ের সংস্কৃতি এবং সাধারণ পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের প্রতি নির্দেশনা হিসেবে বোঝা উচিত, কোনো নির্দিষ্ট রোগের বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে নয়। ইসলামি স্কলাররা পরামর্শ দিয়েছেন যে "তিব্বে নববী" সংক্রান্ত হাদিসগুলো আধ্যাত্মিক বরকত এবং সাধারণ স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিস্থাপক হিসেবে নয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের মতো প্রাচীন স্কলাররাও এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন যেখানে ধর্মীয় অনুশীলন এবং যুগের চিকিৎসা জ্ঞান উভয়ই গুরুত্ব পায়। তাই আমাদের উচিত এই হাদিসগুলো থেকে আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা ও রাসুলুল্লাহর সুন্নত অনুসরণের শিক্ষা গ্রহণ করা, আর কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে সবসময় যোগ্য ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং তাঁর নির্দেশিত চিকিৎসা অনুসরণ করা।
