পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর পড়ার তাসবিহ | আরবি ও অর্থ
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর পড়ার তাসবিহ | আরবি, উচ্চারণ ও ফজিলতসহ
নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর পর কিছু সময় বসে তাসবিহ পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আমরা অনেকেই নামাজ পড়ে দ্রুত উঠে চলে যাই অথচ নামাজের পরের এই কয়েক মিনিট সময় অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নির্দিষ্ট কিছু তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিখিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন যে নামাজ শেষ করার পর দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করো (সূরা নিসা: ১০৩)।
এই তাসবিহগুলো পাঠ করতে বেশি সময় লাগে না কিন্তু এর ফজিলত ও প্রতিদান অসাধারণ। এই লেখায় আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর পাঠ করার গুরুত্বপূর্ণ তাসবিহগুলো আরবি, উচ্চারণ, অর্থ এবং দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান এই সুন্নত আমল নিয়মিত পালন করতে পারেন।
নামাজ শেষে তাসবিহ পাঠের গুরুত্ব
নামাজের পর তাসবিহ পাঠ করা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন নামাজ শেষ হলে দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করো, যখন তোমরা নিরাপদ হও তখন নামাজ পূর্ণভাবে কায়েম করো (সূরা নিসা: ১০৩)। রাসুলের নিয়মিত অভ্যাস: রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নিয়মিত তাসবিহ পাঠ করতেন এবং এটি কখনো ছাড়তেন না। সহজ কিন্তু ভারী আমল: এই তাসবিহগুলো মুখে হালকা কিন্তু আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং মিজানে ভারী। গুনাহ মাফের মাধ্যম: নিয়মিত তাসবিহ পাঠ করলে গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। দ্রুত উঠে যাওয়া থেকে বিরত থাকা: অনেক সময় আমরা নামাজ শেষে দ্রুত উঠে যাই কিন্তু রাসুলুল্লাহর সুন্নত হলো কিছুক্ষণ বসে এই আমলগুলো করা। দৈনিক অভ্যাস: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর নিয়মিত এই তাসবিহ পড়লে দিনে পাঁচবার এই ফজিলতপূর্ণ আমল করার সুযোগ পাওয়া যায়।
নামাজের পর তাসবিহ পাঠ করা একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত যা প্রতিটি মুসলমানের নিয়মিত পালন করা উচিত।
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার তেত্রিশবার
নামাজের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসিদ্ধ তাসবিহ হলো এই তিনটি বাক্য তেত্রিশ বার করে পাঠ করা।
আরবি: سُبْحَانَ اللَّهِ (৩৩ বার), الْحَمْدُ لِلَّهِ (৩৩ বার), اللَّهُ أَكْبَرُ (৩৩ বার)
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহ (৩৩ বার), আলহামদুলিল্লাহ (৩৩ বার), আল্লাহু আকবার (৩৩ বার)
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র, সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে প্রতি নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়লে মোট ৯৯ বার হয়, এরপর একশ পূর্ণ করতে বলতে হয় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির - এভাবে পড়লে গুনাহ মাফ হয়ে যায় যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো অসংখ্য হয় (সহিহ মুসলিম: ৫৯৭)।
গণনার পদ্ধতি: আঙুলের কর গুনে বা তাসবিহ দানার মাধ্যমে এই সংখ্যা গণনা করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) আঙুলে গুনে তাসবিহ পড়তেন বলে বর্ণিত আছে (সুনানে আবু দাউদ: ১৫০২)।
এই তাসবিহ নিয়মিত পাঠ করলে গুনাহ মাফের আশা করা যায় যা এই আমলের সবচেয়ে বড় ফজিলত।
আয়াতুল কুরসি পাঠ
প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল।
আরবি: اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম (সম্পূর্ণ আয়াত সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত)
অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করে তার এবং জান্নাতের মধ্যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না (সুনানে নাসায়ি: ৯৯২৮, তাবারানি)।
সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত: এই আয়াতকে কুরআনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আয়াত বলা হয়েছে (সহিহ মুসলিম: ৮১০)।
সম্পূর্ণ পাঠ: আয়াতুল কুরসি সম্পূর্ণভাবে পাঠ করা উচিত, শুধু শুরুর অংশ নয়। এটি মুখস্থ করে নিয়মিত পাঠ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য উপকারী।
আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পাঠ করলে জান্নাত লাভের পথ সুগম হয় বলে হাদিসে আশার বাণী দেওয়া হয়েছে।
আয়াতে শিফা ও শেষ দুই আয়াত সূরা বাকারা
কিছু নামাজের পর বিশেষভাবে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করার ফজিলত রয়েছে।
আরবি: آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ
উচ্চারণ: আমানার রাসুলু বিমা উনজিলা ইলাইহি মির রাব্বিহি (সূরা বাকারার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর আয়াত)
অর্থ: রাসুল বিশ্বাস স্থাপন করেছেন যা তাঁর রবের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে (সহিহ বুখারি: ৪০০৮, সহিহ মুসলিম: ৮০৭)।
পাঠের সময়: এই আয়াতগুলো বিশেষত রাতে ঘুমানোর আগে এবং এশার নামাজের পর পাঠ করা উত্তম যদিও অন্যান্য নামাজের পরও পড়া যায়।
সুরক্ষার মাধ্যম: এই আয়াতগুলো আল্লাহর সাহায্য ও সুরক্ষা লাভের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই আয়াতগুলো নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহর সাহায্য ও হেফাজত লাভের আশা করা যায়।
দরুদ শরীফ পাঠ
নামাজের পর রাসুলুল্লাহর উপর দরুদ পাঠ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমল।
আরবি: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ
অর্থ: হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবারের উপর রহমত বর্ষণ করুন।
কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন, মুমিনগণ তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাও (সূরা আহযাব: ৫৬)।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ দশবার রহমত বর্ষণ করেন (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)।
পূর্ণ দরুদ: দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা আরও উত্তম যা তাশাহহুদের সময়ও পড়া হয়।
নিয়মিত অভ্যাস: নামাজের পর অন্তত কয়েকবার দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
দরুদ পাঠ করলে আল্লাহর রহমত ও রাসুলুল্লাহর শাফায়াত লাভের আশা করা যায়।
ইস্তেগফার ও অন্যান্য দোয়া
নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে প্রথমেই যে আমলটি করা সুন্নত তা হলো ইস্তেগফার।
আরবি: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ (তিনবার), ثُمَّ اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ (তিনবার), আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া জাল জালালি ওয়াল ইকরাম
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। হে আল্লাহ, আপনিই শান্তিদাতা এবং আপনার কাছ থেকেই শান্তি আসে, হে মহিমান্বিত ও সম্মানিত সত্তা আপনি বরকতময়।
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করে সালাম ফেরানোর পর তিনবার ইস্তেগফার পড়তেন এবং তারপর এই দোয়া পড়তেন (সহিহ মুসলিম: ৫৯১)।
প্রথম আমল: এটি নামাজের পর সবচেয়ে প্রথমে পাঠ করা সুন্নত, তারপর অন্যান্য তাসবিহ পাঠ করা যায়।
অন্যান্য দোয়া: এছাড়াও লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ এবং অন্যান্য মাসনুন দোয়াও পড়া যায়।
ইস্তেগফার দিয়ে নামাজের পরের আমল শুরু করলে তা সুন্নত অনুযায়ী সঠিক ক্রম মেনে চলা হয়।
নামাজ শেষে তাসবিহ পাঠের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি
তাসবিহ পাঠের কিছু নিয়ম মেনে চললে এর পূর্ণ ফজিলত লাভ করা যায়। সঠিক ক্রম: নামাজ শেষে প্রথমে ইস্তেগফার, তারপর আয়াতুল কুরসি, এরপর সুবহানাল্লাহ-আলহামদুলিল্লাহ-আল্লাহু আকবার এবং সবশেষে অন্যান্য দোয়া পাঠ করা যায়। আঙুলে গণনা: তাসবিহ গণনার জন্য আঙুলের কর ব্যবহার করা সুন্নত পদ্ধতি, তবে তাসবিহ দানাও ব্যবহার করা যায়। তাড়াহুড়া না করা: প্রতিটি তাসবিহ মনোযোগ সহকারে এবং অর্থ বুঝে পাঠ করা উচিত, তাড়াহুড়া করে শুধু মুখে উচ্চারণ না করা।
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য: এই তাসবিহগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য এবং উভয়েই এর ফজিলত লাভ করতে পারেন। সময় বের করা: নামাজের পর অন্তত পাঁচ থেকে সাত মিনিট সময় বের করে এই আমলগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা করা উচিত। নিয়মিততা: মাঝে মাঝে নয় বরং প্রতি নামাজের পর নিয়মিত এই তাসবিহ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। মুখস্থ করা: শুরুতে লিখে রেখে দেখে দেখে পড়া যায় এবং ধীরে ধীরে মুখস্থ করে নেওয়া যায়।
সঠিক নিয়মে তাসবিহ পাঠ করলে এর পূর্ণ বরকত ও ফজিলত লাভ করা যায় বলে আশা করা যায়।
উপসংহার
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর তাসবিহ পাঠ করা একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সুন্নত আমল যা আমাদের গুনাহ মাফ, আল্লাহর নৈকট্য এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম করে বলে আশা করা যায়।
আসুন আমরা প্রতিটি নামাজের পর কিছুক্ষণ সময় বের করে এই তাসবিহগুলো নিয়মিত পাঠ করি। নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে দ্রুত উঠে না গিয়ে প্রথমে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ি। এরপর আয়াতুল কুরসি সম্পূর্ণভাবে পাঠ করি। তারপর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়ে একশ পূর্ণ করার তাসবিহ পাঠ করি। দরুদ শরীফ পাঠ করে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করি। রাতে বিশেষভাবে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করি। আঙুলের কর গুনে বা তাসবিহ দানা ব্যবহার করে সংখ্যা গণনা করি। প্রতিটি তাসবিহ অর্থ বুঝে ও মনোযোগ সহকারে পাঠ করি। এই আমলগুলো মুখস্থ না থাকলে প্রথমে লিখে রেখে দেখে দেখে পড়ি এবং ধীরে ধীরে মুখস্থ করি। পরিবারের সবাইকে এই তাসবিহগুলো শেখাই এবং একসাথে পালন করার চেষ্টা করি। সন্তানদের ছোট থেকে এই সুন্নত আমল শেখাই যাতে তারা অভ্যস্ত হয়। মনে রাখি যে নামাজের পরের এই কয়েক মিনিট সময় অত্যন্ত মূল্যবান এবং এতে বিনিয়োগ করলে দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নিয়মিত এই তাসবিহ পাঠের তৌফিক দান করুন এবং আমাদের নামাজ ও তাসবিহ কবুল করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. নামাজের পর তাসবিহ পাঠ করা কি বাধ্যতামূলক?
নামাজের পর তাসবিহ পাঠ করা ফরজ নয় বরং এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। এর অর্থ হলো এটি না পড়লে গুনাহ হয় না তবে এটি পড়লে অতিরিক্ত সওয়াব ও ফজিলত লাভ করা যায়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নামাজ শেষে আল্লাহকে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা নিসা: ১০৩) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিটি ফরজ নামাজের পর নিয়মিত এই তাসবিহগুলো পাঠ করতেন। যেহেতু রাসুলুল্লাহ এটি নিয়মিত করতেন এবং কখনো ছাড়তেন না, তাই এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় এবং নিয়মিত পালন করা অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে। যারা ব্যস্ততার কারণে সব তাসবিহ পড়তে পারেন না তারা অন্তত সংক্ষিপ্ত কিছু তাসবিহ যেমন তিনবার ইস্তেগফার এবং কিছু সুবহানাল্লাহ-আলহামদুলিল্লাহ-আল্লাহু আকবার পড়ার চেষ্টা করতে পারেন। ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তুললে সম্পূর্ণ তাসবিহ পাঠ করা সহজ হয়ে যায় এবং এতে জীবনে বরকত আসে বলে আশা করা যায়।
২. সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার তেত্রিশ বার করে পড়ার ফজিলত কী?
এই তাসবিহর ফজিলত অত্যন্ত ব্যাপক এবং এটি সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে প্রতি নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়লে মোট ৯৯ বার হয়, এরপর একশ পূর্ণ করতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু বলতে হয় - এভাবে নিয়মিত পাঠ করলে গুনাহ মাফ হয়ে যায় যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো অসংখ্য হয় (সহিহ মুসলিম: ৫৯৭)। এই তাসবিহ পড়তে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট সময় লাগে কিন্তু এর প্রতিদান অত্যন্ত বড়। আঙুলের কর গুনে বা তাসবিহ দানার মাধ্যমে এই সংখ্যা গণনা করা যায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও আঙুলে গুনে তাসবিহ পড়তেন (সুনানে আবু দাউদ: ১৫০২)। দিনে পাঁচবার নামাজের পর এই তাসবিহ পড়লে সারাদিনে অনেক বেশি সওয়াব অর্জনের সুযোগ পাওয়া যায় এবং এটি একটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু কার্যকর ইবাদত হিসেবে বিবেচিত।
৩. প্রতি নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়ার গুরুত্ব কী?
প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করে তার এবং জান্নাতের মধ্যে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না (সুনানে নাসায়ি: ৯৯২৮)। এই আয়াতকে কুরআনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আয়াত বলা হয়েছে (সহিহ মুসলিম: ৮১০) এবং এতে আল্লাহর মহান গুণাবলি বর্ণিত আছে যেমন তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, তন্দ্রা বা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না এবং আকাশ-পৃথিবীর সবকিছু তাঁর অধীনে। এই আয়াত সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত যা সম্পূর্ণভাবে পাঠ করা উচিত, শুধু শুরুর অংশ নয়। নিয়মিত এই আয়াত পাঠ করলে জান্নাত লাভের পথ সুগম হয় বলে আশা করা যায় এবং এটি প্রতিটি মুসলমানের মুখস্থ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে সহজেই প্রতি নামাজের পর পাঠ করা যায়।
৪. নামাজের পর কোন ক্রমে তাসবিহগুলো পড়া উচিত?
নামাজের পর তাসবিহ পাঠের একটি সুন্দর ক্রম অনুসরণ করা যায় যা হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়। প্রথমে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়া উচিত এবং তারপর "আল্লাহুম্মা আনতাস সালামু ওয়া মিনকাস সালাম" দোয়াটি পড়া সুন্নত (সহিহ মুসলিম: ৫৯১)। এরপর আয়াতুল কুরসি সম্পূর্ণভাবে পাঠ করা যায়। তারপর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়ে একশ পূর্ণ করার তাসবিহ পাঠ করা যায়। এরপর দরুদ শরীফ পাঠ করা যায় যাতে আল্লাহর দশগুণ রহমত লাভ করা যায় (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)। বিশেষত রাতের নামাজের পর সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতও পাঠ করা যায়। তবে এই ক্রম কঠোরভাবে মানা বাধ্যতামূলক নয়, বরং সময় ও সুবিধা অনুযায়ী এই তাসবিহগুলো পাঠ করলেই যথেষ্ট এবং এতে ফজিলত লাভের আশা করা যায়। মূল বিষয় হলো এই আমলগুলো নিয়মিত ও আন্তরিকতার সাথে পালন করা।
৫. তাসবিহ পাঠের সময় আঙুলে গণনা করা কি জরুরি নাকি তাসবিহ দানা ব্যবহার করা যায়?
তাসবিহ গণনার জন্য আঙুলের কর ব্যবহার করা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত পদ্ধতি এবং এটি বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) আঙুলে গুনে তাসবিহ পড়তেন (সুনানে আবু দাউদ: ১৫০২) এবং আরেকটি বর্ণনায় এসেছে যে আঙুলগুলো কিয়ামতের দিন কথা বলবে এবং সাক্ষ্য দেবে তাই এদের দিয়ে গণনা করা উত্তম (মুসনাদে আহমাদ)। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাসবিহ দানা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ - অনেক ফিকহবিদ মনে করেন তাসবিহ দানা বা মালা ব্যবহার করাও অনুমোদিত যদি এটি গণনায় সাহায্য করে এবং মনোযোগ বজায় রাখতে সহায়ক হয়। বিশেষ করে যারা বয়স্ক বা যাদের আঙুলে গুনতে অসুবিধা হয় তাদের জন্য তাসবিহ দানা একটি সহায়ক মাধ্যম হতে পারে। মূল উদ্দেশ্য হলো সঠিক সংখ্যক তাসবিহ পাঠ করা এবং মনোযোগ সহকারে আল্লাহকে স্মরণ করা, তাই যে পদ্ধতিতে এটি সহজ ও কার্যকরভাবে করা যায় সেই পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। তবে সুন্নত অনুসরণের ফজিলত লাভের জন্য আঙুলে গণনার অভ্যাস গড়ে তোলাও উত্তম।
