যেনার পরিণতি ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি | কুরআন-হাদীস
যেনা করার পরিণতি ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি | কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে
ইসলাম মানুষের চরিত্র, পরিবার এবং সমাজকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কিছু স্পষ্ট নৈতিক সীমারেখা নির্ধারণ করেছে যা মেনে চললে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই কল্যাণের পথে অগ্রসর হয়। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো অবৈধ যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা যাকে ইসলামি পরিভাষায় যেনা বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে স্পষ্টভাবে এই বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এর কাছেও না যেতে বলেছেন (সূরা ইসরা: ৩২)। এই নির্দেশনার পেছনে রয়েছে মানব সমাজের কল্যাণ, পারিবারিক বন্ধন রক্ষা এবং নৈতিক পবিত্রতা বজায় রাখার গভীর প্রজ্ঞা। আধুনিক সমাজে অনেক সময় এই বিষয়ে ভুল ধারণা বা উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়, তাই সঠিক ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখায় আমরা যেনা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, এর পরিণতি এবং এ থেকে বাঁচার উপায় কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত ও শালীন ভাষায় আলোচনা করব।
ইসলামে যেনা সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যেনা সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ় নির্দেশনা দিয়েছেন যা প্রতিটি মুসলমানের জানা প্রয়োজন। স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা: আল্লাহ তায়ালা বলেন তোমরা যেনার কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটি একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ (সূরা ইসরা: ৩২)। এই আয়াতে শুধু যেনা করতে নয় বরং এর কাছেও যেতে নিষেধ করা হয়েছে, অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি বা পথ এড়িয়ে চলা যা এই কাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মুমিনদের বৈশিষ্ট্য: আল্লাহ তায়ালা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, শুধুমাত্র তাদের স্ত্রী বা বৈধ অধিকারভুক্ত ব্যতীত (সূরা মুমিনুন: ৫-৬)। কঠোর শাস্তির বিধান: কুরআনে অবিবাহিত ব্যক্তিদের জন্য যেনার শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা একটি সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত (সূরা নূর: ২)। বড় গুনাহের তালিকায়: ইসলামি স্কলারদের মতে যেনা কবিরা গুনাহ বা বড় গুনাহগুলোর একটি যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়। তওবার দরজা খোলা: তবে আল্লাহ তায়ালা এই বিষয়েও ক্ষমাশীল এবং আন্তরিক তওবাকারীদের জন্য ক্ষমার পথ খোলা রেখেছেন যা পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে।
কুরআনের এই নির্দেশনাগুলো মানব চরিত্র ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখার একটি গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
সহিহ হাদিসে যেনার পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সহিহ হাদিসে যেনার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছেন। ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যখন কোনো ব্যক্তি যেনা করে তখন সে ঈমানদার অবস্থায় তা করে না, অর্থাৎ যেনা করার মুহূর্তে তার ঈমান দুর্বল হয়ে যায় (সহিহ বুখারি: ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম: ৫৭)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে যেনা ঈমানের সাথে গভীরভাবে সাংঘর্ষিক একটি কাজ। বড় গুনাহের তালিকায়: এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি হিসেবে প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যেনা করাকে উল্লেখ করেছেন এবং এটিকে আল্লাহর সাথে শরিক করার পরের অন্যতম বড় গুনাহ বলেছেন (সহিহ বুখারি: ৬৮১১, সহিহ মুসলিম: ৮৬)। আধ্যাত্মিক ক্ষতি: এই কাজের মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট হয় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি: যেনা পারিবারিক বন্ধন, বংশপরিচয় এবং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। আখেরাতের জবাবদিহিতা: প্রতিটি কাজের জন্য যেমন আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি এই গুনাহের জন্যও জবাবদিহিতা রয়েছে বলে ইসলামি শিক্ষায় উল্লেখ আছে।
এই হাদিসগুলো আমাদের যেনার গুরুতর পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং এ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করে।
যেনার পথে নিয়ে যাওয়া বিষয়গুলো থেকে সতর্কতা।
ইসলাম শুধু যেনা নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এই পথে নিয়ে যেতে পারে এমন বিষয়গুলো থেকেও সতর্ক থাকতে বলেছে। দৃষ্টি সংযত রাখা: আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারী-পুরুষ উভয়কে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা নূর: ৩০-৩১)। অসংযত দৃষ্টি অনেক সময় মনে খারাপ চিন্তার সৃষ্টি করতে পারে। একাকী সাক্ষাৎ এড়ানো: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একাকী না থাকুক, কারণ তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫)। শালীন পোশাক পরিধান: নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে অশালীন আকর্ষণ থেকে সমাজ সুরক্ষিত থাকে। অশ্লীল কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা: বর্তমান যুগে বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল কনটেন্টের সহজলভ্যতা মানুষকে এই পথে টেনে নিতে পারে, তাই এসব থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকা উচিত। হৃদয়কে পবিত্র রাখা: শুধু বাহ্যিক আচরণ নয় বরং অন্তরকে পাপ চিন্তা থেকে পবিত্র রাখার চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহকে সহজ করা: ইসলামে বিবাহকে সহজ করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে যুবক-যুবতীরা সহজেই বৈধ পথে তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে।
এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো মেনে চললে ব্যক্তি নিজেকে বড় গুনাহ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন বলে আশা করা যায়।
আন্তরিক তওবা ও আল্লাহর ক্ষমার সুযোগ।
যদি কেউ অতীতে এই ধরনের গুনাহে জড়িয়ে পড়েন, ইসলাম তার জন্য আন্তরিক তওবার একটি সুন্দর পথ উন্মুক্ত রেখেছে। আল্লাহর ক্ষমাশীলতা: আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন বলুন হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের উপর অতিরিক্ত জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করেন (সূরা যুমার: ৫৩)। এই আয়াত অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং প্রমাণ করে যে আল্লাহর ক্ষমা সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রকৃত তওবার শর্ত: প্রকৃত তওবার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে - অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া, সেই গুনাহ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। নবীদের উদাহরণ: কুরআনে বিভিন্ন নবী-রাসুলের উম্মতের তওবার কাহিনী বর্ণিত আছে যা আমাদের আশার সঞ্চার করে। গোপনীয়তা বজায় রাখা: যদি কেউ এই ধরনের গুনাহে জড়িয়ে পড়েন, ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী তা অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাই উত্তম, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের গুনাহ গোপন রাখাকে উৎসাহিত করেছেন। নতুন জীবন শুরু: আন্তরিক তওবার পর একজন ব্যক্তি নতুন করে সৎ ও পবিত্র জীবনযাপন শুরু করতে পারেন এবং আল্লাহর কাছে তার এই পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করা যায়। হতাশ না হওয়া: অতীতের ভুলের জন্য অতিরিক্ত হতাশ বা আত্মধিক্কারে না ভুগে বরং ইতিবাচকভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
আল্লাহর অসীম ক্ষমাশীলতার এই বার্তা প্রতিটি মানুষের জন্য একটি নতুন সূচনার সুযোগ তৈরি করে।
বিবাহ: একটি বৈধ ও সম্মানজনক সমাধান।
ইসলাম যেনার বিকল্প হিসেবে বিবাহকে একটি সুন্দর, বৈধ এবং সম্মানজনক পথ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। বিবাহের গুরুত্ব: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন হে যুবকগণ তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে, কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে বেশি সাহায্য করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)। সহজ বিবাহ উৎসাহিত: ইসলামে জটিলতাহীন ও সহজ বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে যাতে যুবক-যুবতীরা সহজেই বৈধ সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ সেটি যা সবচেয়ে সহজ (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৫২৯)। সামর্থ্য না থাকলে করণীয়: যাদের বিবাহের সামর্থ্য এখনো হয়নি, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যা প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)। পারিবারিক সহযোগিতা: পরিবারের উচিত সন্তানদের সময়মতো বিবাহে সহযোগিতা করা এবং অহেতুক জটিলতা বা অতিরিক্ত দাবি দিয়ে বিবাহকে কঠিন না করা। আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কল্যাণ: বিবাহের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ হয় না বরং একটি সুন্দর পরিবার গঠন হয় যা সমাজের জন্যও কল্যাণকর।
বিবাহকে সহজ ও সুলভ করে তোলা সমাজে যেনার প্রবণতা কমাতে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে বলে আশা করা যায়।
সমাজ ও পরিবারের ভূমিকা।
যেনা প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাই নয় বরং পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা: ছোট থেকে সন্তানদের ইসলামি মূল্যবোধ, শালীনতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা প্রদান করা পরিবারের দায়িত্ব। সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ: পরিবারে খোলামেলা কিন্তু শালীন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা যাতে সন্তানরা প্রয়োজনে অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে পারে। সামাজিক সচেতনতা: সমাজে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রচার করা। বিবাহে সহায়তা: সমাজের উচিত যুবক-যুবতীদের বিবাহে সহায়তা করা এবং এই প্রক্রিয়াকে জটিল না করে সহজ করে তোলা। অতীতের ভুল নিয়ে কটাক্ষ না করা: যদি কেউ অতীতে ভুল করে থাকেন এবং তওবা করে সৎপথে ফিরে আসতে চান, সমাজের উচিত তাকে সহায়তা করা এবং অতীত নিয়ে কটাক্ষ বা অপমান না করা। শিক্ষামূলক কার্যক্রম: মসজিদ, স্কুল এবং পারিবারিক পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা যা সমাজকে সচেতন করে তোলে।
পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নৈতিক ও সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে আশা করা যায়।
উপসংহার।
যেনা ইসলামে একটি গুরুতর নিষিদ্ধ কাজ হিসেবে বিবেচিত যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তবে আল্লাহ তায়ালার অসীম ক্ষমাশীলতা এবং তওবার দরজা সবসময় খোলা থাকে যা আমাদের আশাবাদী হতে শেখায়।
আসুন আমরা প্রতিটি মুসলমান এই বিষয়ে সচেতন হই এবং নিজেদের চরিত্র রক্ষায় সচেষ্ট থাকি। দৃষ্টি সংযত রাখার চেষ্টা করি এবং অপ্রয়োজনীয় একাকী সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলি। শালীন পোশাক পরিধান করি এবং অশ্লীল কনটেন্ট থেকে নিজেদের ও পরিবারকে দূরে রাখি। সামর্থ্য অনুযায়ী সহজ বিবাহকে উৎসাহিত করি এবং যুবক-যুবতীদের এক্ষেত্রে সহায়তা করি। যাদের বিবাহের সামর্থ্য এখনো হয়নি তারা নিয়মিত রোজা রাখার এবং প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। সন্তানদের ছোট থেকে শালীনতা ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা প্রদান করি। যদি অতীতে কেউ ভুল করে থাকেন তাহলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করি এবং নতুন করে সৎ জীবন শুরু করার সংকল্প করি। অন্যদের অতীত ভুল নিয়ে কটাক্ষ না করে বরং তাদের সৎপথে ফিরে আসতে সহায়তা করি। মনে রাখি যে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু এবং আন্তরিক তওবাকারীকে তিনি ভালোবাসেন। সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে কাজ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে চরিত্র রক্ষায় সাহায্য করুন এবং সকল প্রকার পাপ থেকে হেফাজত করুন। যারা ভুল করেছেন তাদের তওবা কবুল করুন এবং আমাদের সবাইকে পবিত্র জীবনযাপনের তৌফিক দান করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. ইসলামে যেনা সম্পর্কে কুরআনের মূল নির্দেশনা কী?
ইসলামে যেনা সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দৃঢ়। আল্লাহ তায়ালা সূরা ইসরায় বলেন তোমরা যেনার কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটি একটি অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ (সূরা ইসরা: ৩২)। এই আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে শুধু যেনা করতে নয় বরং এর কাছেও যেতে নিষেধ করা হয়েছে, যার অর্থ এমন পরিস্থিতি বা আচরণ এড়িয়ে চলতে হবে যা এই কাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সূরা মুমিনুনে সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন তারা তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, শুধুমাত্র তাদের বৈধ স্ত্রী ব্যতীত (সূরা মুমিনুন: ৫-৬)। এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে ইসলাম শুধু কাজটিকেই নিষিদ্ধ করেনি বরং এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলামি স্কলারদের মতে যেনা কবিরা গুনাহ বা বড় গুনাহগুলোর একটি যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয়। তবে সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম ক্ষমাশীলতার কথাও উল্লেখ করেছেন এবং আন্তরিক তওবাকারীদের জন্য ক্ষমার পথ খোলা রেখেছেন।
২. যেনা থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম কী কী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথা বলেছে?
ইসলাম যেনা থেকে বাঁচার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কথা বলেছে যা প্রতিরোধমূলক প্রজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত। প্রথমত দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে - আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারী-পুরুষ উভয়কে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে বলেছেন (সূরা নূর: ৩০-৩১) কারণ অসংযত দৃষ্টি অনেক সময় মনে খারাপ চিন্তার সূচনা করে। দ্বিতীয়ত একাকী সাক্ষাৎ এড়ানোর নির্দেশ - রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একাকী না থাকুক কারণ তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে (সুনানে তিরমিজি: ২১৬৫)। তৃতীয়ত শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যা সমাজে অশালীন আকর্ষণ কমাতে সাহায্য করে। চতুর্থত বর্তমান যুগে অশ্লীল কনটেন্ট থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পঞ্চমত বিবাহকে সহজ করে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে যুবক-যুবতীরা সহজেই বৈধ পথে তাদের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো একসাথে মেনে চললে একজন ব্যক্তি নিজেকে এই বড় গুনাহ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন বলে আশা করা যায়।
৩. যদি কেউ অতীতে এই ধরনের গুনাহে জড়িয়ে পড়েন, তার করণীয় কী?
যদি কেউ অতীতে যেনার মতো গুনাহে জড়িয়ে পড়ে থাকেন, ইসলাম তার জন্য আন্তরিক তওবার একটি সুন্দর ও আশাব্যঞ্জক পথ উন্মুক্ত রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের উপর অতিরিক্ত জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করেন (সূরা যুমার: ৫৩)। প্রকৃত তওবার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয় - প্রথমত অন্তর থেকে সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হওয়া, দ্বিতীয়ত সেই গুনাহ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া এবং তৃতীয়ত ভবিষ্যতে আর কখনো এই ভুল না করার দৃঢ় সংকল্প করা। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী এই ধরনের ব্যক্তিগত গুনাহ অন্যদের কাছে প্রকাশ না করে সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাই উত্তম পন্থা, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের গুনাহ গোপন রাখাকে উৎসাহিত করেছেন। আন্তরিক তওবার পর একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ নতুন করে সৎ ও পবিত্র জীবনযাপন শুরু করতে পারেন। অতীতের ভুলের জন্য অতিরিক্ত হতাশা বা আত্মধিক্কারে না ভুগে বরং ইতিবাচকভাবে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আল্লাহর ক্ষমা তাঁর সৃষ্টির চেয়েও ব্যাপক বলে বিশ্বাস করা হয়।
৪. ইসলামে বিবাহকে কেন যেনার একটি সমাধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে?
ইসলামে বিবাহকে যেনার একটি সুন্দর, বৈধ ও সম্মানজনক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের একটি বৈধ ও পবিত্র পথ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন হে যুবকগণ তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে, কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে বেশি সাহায্য করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয় বরং এটি নৈতিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইসলামে জটিলতাহীন ও সহজ বিবাহকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে - রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ সেটি যা সবচেয়ে সহজ (মুসনাদে আহমাদ: ২৪৫২৯)। অতিরিক্ত মোহরানা, ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান বা অহেতুক জটিলতার কারণে বিবাহ বিলম্বিত হলে তা সমাজে বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে। যাদের এখনও বিবাহের আর্থিক বা অন্যান্য সামর্থ্য হয়নি, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন যা প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬)। তাই পরিবার ও সমাজের উচিত যুবক-যুবতীদের সময়মতো বিবাহে সহায়তা করা এবং এই প্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলা।
৫. সমাজে যেনা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা কী হতে পারে?
সমাজে যেনা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পরিবারের প্রথম দায়িত্ব হলো ছোট থেকে সন্তানদের ইসলামি মূল্যবোধ, শালীনতা ও নৈতিকতা সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা প্রদান করা যাতে তারা সঠিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে। পরিবারে খোলামেলা কিন্তু শালীন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যাতে সন্তানরা প্রয়োজনে অভিভাবকদের সাথে যেকোনো বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারে এবং তারা গোপনে ভুল পথে পরিচালিত না হয়। সমাজের দায়িত্ব হলো অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রচার করা যা সামগ্রিকভাবে একটি সুস্থ পরিবেশ গঠনে সাহায্য করে। সমাজের উচিত যুবক-যুবতীদের বিবাহে সহায়তা করা এবং এই প্রক্রিয়াকে জটিল না করে সহজ ও সুলভ করে তোলা যাতে তারা সময়মতো বৈধ পথে তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এছাড়াও যদি কেউ অতীতে ভুল করে থাকেন এবং আন্তরিকভাবে তওবা করে সৎপথে ফিরে আসতে চান, সমাজের উচিত তাকে সহায়তা করা এবং অতীত নিয়ে কটাক্ষ বা অপমান না করে বরং তার পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো। মসজিদ, স্কুল এবং পারিবারিক পর্যায়ে নিয়মিত নৈতিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম আয়োজন করলে সমাজে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা যায়।
