ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব গাইড
ইসলামে পিতা-মাতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব | সম্পূর্ণ গাইড
.jpg)
পিতা-মাতা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিটি সন্তানের জন্য এক অমূল্য নেয়ামত এবং তাদের প্রতি সদাচরণ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের কথা উল্লেখ করেছেন যা এর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে (সূরা ইসরা: ২৩)। জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত পিতা-মাতা যে কষ্ট স্বীকার করেন, যে ত্যাগ ও ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলেন, তার প্রতিদান দেওয়া কোনো সন্তানের পক্ষেই সম্পূর্ণভাবে সম্ভব নয়। তবে ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালন করতে হয় এবং তাদের অধিকার রক্ষা করতে হয়। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার অধিকার এবং সন্তানের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান তাদের পারিবারিক জীবনে এই শিক্ষা প্রয়োগ করতে পারেন।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা
ইসলামে পিতা-মাতাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সন্তুষ্টিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহর ইবাদতের সাথে সংযুক্ত নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন তোমার রব সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে (সূরা ইসরা: ২৩)। জান্নাত-জাহান্নামের সাথে সম্পর্ক: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন পিতা-মাতা জান্নাতের মধ্যম দরজা, তুমি চাইলে এই দরজা রক্ষা করতে পারো অথবা নষ্ট করতে পারো (সুনানে তিরমিজি: ১৯০০)। মাতার বিশেষ মর্যাদা: এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন সবচেয়ে বেশি সদাচরণ পাওয়ার হকদার কে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন তোমার মা, তারপর বললেন তোমার বাবা (সহিহ বুখারি: ৫৯৭১, সহিহ মুসলিম: ২৫৪৮)। কবিরা গুনাহ: পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে বড় গুনাহগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে (সহিহ বুখারি: ৫৯৭৬)। অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতিও সদাচরণ: এমনকি পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে দুনিয়াবি বিষয়ে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা লুকমান: ১৫)।
পিতা-মাতার এই উচ্চ মর্যাদা আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে তাদের প্রতি কর্তব্য পালন কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অবদান ও ত্যাগ
পিতা-মাতা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেন তা বোঝা সন্তানের দায়িত্ব বোধ জাগ্রত করতে সাহায্য করে। মায়ের গর্ভধারণের কষ্ট: আল্লাহ তায়ালা কুরআনে মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন - তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছেন (সূরা লুকমান: ১৪)। দুধ পান করানোর সময়কাল: আল্লাহ বলেন মায়েরা তাদের সন্তানদের সম্পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে (সূরা বাকারা: ২৩৩) যা মায়ের দীর্ঘ ত্যাগের ইঙ্গিত দেয়। অক্লান্ত পরিশ্রম: সন্তানের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও লালনপালনে বাবা যে পরিশ্রম করেন তা অপরিসীম এবং প্রায়ই অলক্ষিত থাকে। নিদ্রাহীন রাত: সন্তান অসুস্থ হলে বা ছোট থাকাকালীন পিতা-মাতা যে নির্ঘুম রাত কাটান তা তাদের ভালোবাসার প্রমাণ। আর্থিক ত্যাগ: সন্তানের প্রয়োজন পূরণে পিতা-মাতা নিজেদের চাহিদা ত্যাগ করে সন্তানের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন। আজীবন উদ্বেগ: সন্তান যতই বড় হোক না কেন পিতা-মাতা সবসময় তাদের কল্যাণ নিয়ে চিন্তিত থাকেন।
এই ত্যাগের কথা স্মরণ করলে সন্তানের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ ও দায়িত্ববোধ আরও দৃঢ় হয়।
সন্তানের উপর পিতা-মাতার অধিকার
ইসলামে পিতা-মাতার বেশ কিছু নির্দিষ্ট অধিকার সন্তানের উপর রয়েছে যা পালন করা প্রতিটি সন্তানের কর্তব্য। সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন: পিতা-মাতার সাথে সবসময় সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আল্লাহ বলেন তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো এবং তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলো না (সূরা ইসরা: ২৩)। আনুগত্য প্রদর্শন: পিতা-মাতা আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ না দিলে তাদের যুক্তিসঙ্গত কথা মেনে চলা। আর্থিক সহায়তা: পিতা-মাতা প্রয়োজনে থাকলে তাদের আর্থিক সহায়তা করা সন্তানের দায়িত্ব, বিশেষত যখন তারা বৃদ্ধ বয়সে উপার্জনক্ষম নন। সময় ও মনোযোগ দেওয়া: ব্যস্ততার মাঝেও পিতা-মাতাকে সময় দেওয়া এবং তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। বৃদ্ধ বয়সে বিশেষ যত্ন: আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে বলেছেন যখন তোমাদের কাছে তাদের একজন বা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয় তখন তাদের 'উহ' শব্দও বলো না (সূরা ইসরা: ২৩)। দোয়া করা: পিতা-মাতার জন্য নিয়মিত দোয়া করা, জীবিত থাকাকালীন এবং মৃত্যুর পরেও।
এই অধিকারগুলো পালন করলে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন হয় যা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম মাধ্যম বলে বিবেচিত।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের ফজিলত
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের অসংখ্য ফজিলত রয়েছে যা কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত (সুনানে তিরমিজি: ১৮৯৯)। রিজিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ু দীর্ঘ হওয়া পছন্দ করে সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, যার মধ্যে পিতা-মাতার সাথে সম্পর্কও অন্তর্ভুক্ত (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)। সর্বোত্তম আমল: এক সাহাবি রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলেন কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়, তিনি বললেন যথাসময়ে নামাজ আদায়, তারপর পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ, তারপর আল্লাহর পথে জিহাদ (সহিহ বুখারি: ৫২৭, সহিহ মুসলিম: ৮৫)। জিহাদের চেয়ে অগ্রাধিকার: এক সাহাবি জিহাদে যেতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কিনা, হ্যাঁ শুনে বললেন তবে তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকো (সহিহ বুখারি: ৩০০৪, সহিহ মুসলিম: ২৫৪৯)। দোয়া কবুলের মাধ্যম: পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জনকারী সন্তানের দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় বলে বিশ্বাস করা হয়।
পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ শুধু সামাজিক কর্তব্য নয় বরং এটি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত যা দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।
পিতা-মাতার অবাধ্যতার পরিণতি
পিতা-মাতার অবাধ্যতা ইসলামে একটি গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত এবং এ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। কবিরা গুনাহ: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে বলব না, তারপর বললেন আল্লাহর সাথে শরিক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া (সহিহ বুখারি: ৫৯৭৬, সহিহ মুসলিম: ৮৭)। সালাত-সালামের সাথে তুলনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার সাথে পিতা-মাতার অবাধ্যতাকে একই স্তরের গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যা এর গুরুত্ব বোঝায়। উহ শব্দও নিষিদ্ধ: আল্লাহ তায়ালা এতটাই কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে পিতা-মাতাকে সামান্যতম বিরক্তিসূচক শব্দ 'উহ' বলাও নিষেধ করেছেন (সূরা ইসরা: ২৩)। আধুনিক সমাজে চ্যালেঞ্জ: বর্তমান সময়ে অনেক সন্তান কর্মব্যস্ততা বা দূরত্বের কারণে পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রাখেন যা সচেতনভাবে এড়ানো উচিত। ভারসাম্য বজায় রাখা: পিতা-মাতার আনুগত্যের অর্থ এই নয় যে আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ মানতে হবে - এক্ষেত্রে ইসলামি নির্দেশনা স্পষ্ট যে সৃষ্টির অবাধ্যতা করে স্রষ্টার আনুগত্য করা যাবে না।
পিতা-মাতার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা এবং তাদের প্রতি সদাচরণ বজায় রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মৃত্যুর পরেও পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও সন্তানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে যায় যা ইসলামে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত দোয়া করা: পিতা-মাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা মৃত্যুর পরেও অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে শিখিয়েছেন হে আমার রব তাদের প্রতি দয়া করুন যেমন তারা ছোটবেলায় আমাকে লালনপালন করেছেন (সূরা ইসরা: ২৪)। সদকায়ে জারিয়া: পিতা-মাতার নামে দান-সদকা করা যা তাদের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন মানুষের মৃত্যুর পর তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি বিষয় ছাড়া, তার মধ্যে একটি হলো নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। তাদের ওয়াদা পূরণ: পিতা-মাতা কোনো ওয়াদা অসম্পূর্ণ রেখে গেলে তা পূরণ করার চেষ্টা করা। বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা: পিতা-মাতার বন্ধু ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা একটি সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সবচেয়ে বড় সদাচরণ হলো ব্যক্তি তার পিতার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সহিহ মুসলিম: ২৫৫২)। কবর জিয়ারত: পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা।
মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার প্রতি এই দায়িত্বগুলো পালন করলে তাদের রুহের জন্য কল্যাণ বয়ে আসে বলে আশা করা যায়।
আধুনিক জীবনে পিতা-মাতার সেবার ব্যবহারিক উপায়
বর্তমান ব্যস্ত জীবনযাত্রায় পিতা-মাতার সেবা করার কিছু ব্যবহারিক পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। নিয়মিত যোগাযোগ: দূরে থাকলেও নিয়মিত ফোনে বা ভিডিও কলে কথা বলা এবং তাদের খোঁজখবর নেওয়া। সময় নির্ধারণ: ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও পিতা-মাতার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা, যেমন সপ্তাহে একদিন তাদের সাথে দেখা করা বা কথা বলা। তাদের মতামতের মূল্য দেওয়া: গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পিতা-মাতার পরামর্শ নেওয়া এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা। স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া: বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। ধৈর্য ধারণ: বার্ধক্যে পিতা-মাতা কখনো কখনো খিটখিটে বা বিস্মৃতিপ্রবণ হতে পারেন, এসময় ধৈর্য ধারণ করা এবং তাদের প্রতি নম্র থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের শেখানো: নিজের সন্তানদের সামনে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রদর্শন করা যাতে তারাও ভবিষ্যতে এই শিক্ষা অনুসরণ করে। যৌথ পারিবারিক সময়: সম্ভব হলে পিতা-মাতাকে পারিবারিক অনুষ্ঠান ও সিদ্ধান্তে অন্তর্ভুক্ত করা।
এই ব্যবহারিক পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে ব্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয় বলে আশা করা যায়।
উপসংহার
পিতা-মাতার অধিকার আদায় ও তাদের প্রতি সদাচরণ ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই দায়িত্ব পালন করলে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।
আসুন আমরা প্রতিটি সন্তান পিতা-মাতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হই এবং তা যথাযথভাবে পালন করি। পিতা-মাতার সাথে সবসময় সম্মানজনক ভাষায় কথা বলি এবং তাদের প্রতি নম্র থাকি। তাদের যুক্তিসঙ্গত কথা মেনে চলি এবং আনুগত্য প্রদর্শন করি। প্রয়োজনে তাদের আর্থিক সহায়তা করি এবং বৃদ্ধ বয়সে বিশেষ যত্নশীল হই। ব্যস্ততার মাঝেও তাদের জন্য সময় বের করি এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। প্রতিদিন তাদের জন্য দোয়া করি এবং তাদের সুস্থতা কামনা করি। পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করলে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাদের নামে সদকা করি। তাদের বন্ধু ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি। নিজের সন্তানদের সামনে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের উদাহরণ স্থাপন করি যাতে তারাও শিখতে পারে। মনে রাখি যে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সম্পর্কিত এবং তাদের অসন্তুষ্টি আমাদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। জিহাদের চেয়েও পিতা-মাতার সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা আমরা রাসুলুল্লাহর হাদিস থেকে গ্রহণ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালনের তৌফিক দান করুন এবং তাদের প্রতি আমাদের ব্যবহার তিনি কবুল করুন। আমাদের পিতা-মাতাকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু দান করুন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের প্রতি অসীম রহমত বর্ষণ করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন - তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে (সূরা ইসরা: ২৩)। এই সংযুক্তি প্রমাণ করে যে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন পিতা-মাতা জান্নাতের মধ্যম দরজা এবং তাদের সাথে সদাচরণের মাধ্যমে এই দরজা রক্ষা করা যায় (সুনানে তিরমিজি: ১৯০০)। এক সাহাবি সবচেয়ে বেশি সদাচরণ পাওয়ার হকদার কে জিজ্ঞাসা করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার মায়ের কথা বলেন এবং তারপর বাবার কথা বলেন (সহিহ বুখারি: ৫৯৭১) যা পিতা-মাতার বিশেষ মর্যাদা নির্দেশ করে। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ শুধু সামাজিক নৈতিকতার বিষয় নয় বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়াও পিতা-মাতা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ, কষ্ট এবং ভালোবাসা প্রদর্শন করেন তার প্রতিদান হিসেবেও তাদের প্রতি সদাচরণ একটি নৈতিক দায়িত্ব।
২. পিতা-মাতা অন্যায় বা ভুল নির্দেশ দিলে সন্তানের করণীয় কী?
ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্যের একটি স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে - যদি পিতা-মাতা আল্লাহর অবাধ্যতা করার নির্দেশ দেন তাহলে সেই নির্দেশ মেনে চলা যাবে না, কারণ সৃষ্টির অবাধ্যতা করে স্রষ্টার আনুগত্য করা যায় না এই মূলনীতি ইসলামে সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিতা-মাতার নির্দেশ অমান্য করলেও তাদের প্রতি সম্মান ও ভদ্র আচরণ বজায় রাখতে হবে, রুক্ষ ব্যবহার বা অসম্মানজনক কথা বলা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ যদি পিতা-মাতা সন্তানকে নামাজ ছেড়ে দিতে বলেন বা কোনো হারাম কাজ করতে বলেন তাহলে সন্তান সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য নয়, তবে তাদের সাথে নম্র ভাষায় বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। যেসব ক্ষেত্রে পিতা-মাতার নির্দেশ দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বরং শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় সেক্ষেত্রে যথাসম্ভব তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সম্মান জানানো উচিত। মূল কথা হলো দ্বীনি বিষয়ে আপস করা যাবে না কিন্তু এক্ষেত্রেও পিতা-মাতার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখতে হবে।
৩. পিতা-মাতা উভয়ের মধ্যে কার অধিকার বেশি, মা নাকি বাবার?
হাদিসের আলোকে দেখা যায় যে মায়ের অধিকার এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও উভয়ের অধিকারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন সবচেয়ে বেশি সদাচরণ পাওয়ার হকদার কে, তিনি উত্তর দিলেন তোমার মা। সাহাবি আবার জিজ্ঞাসা করলেন তারপর কে, তিনি আবারও বললেন তোমার মা। তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলে আবারও মায়ের কথা বললেন, এবং চতুর্থবারে বললেন তোমার বাবা (সহিহ বুখারি: ৫৯৭১, সহিহ মুসলিম: ২৫৪৮)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে মায়ের অধিকার তিনগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত, যার একটি কারণ হতে পারে মায়ের গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা এবং সন্তান লালনপালনে যে অতিরিক্ত কষ্ট ও ত্যাগ তিনি স্বীকার করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাবার অধিকার কম গুরুত্বপূর্ণ - বাবাও সমানভাবে সম্মান ও সদাচরণ পাওয়ার হকদার এবং তার অবদানও অপরিসীম। মূলত এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো মা-বাবা উভয়ের প্রতিই সর্বোচ্চ সদাচরণ প্রদর্শন করা উচিত, শুধু মায়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার অতিরিক্ত ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ।
৪. পিতা-মাতা মারা যাওয়ার পর সন্তানের কী কী দায়িত্ব থাকে?
পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও সন্তানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে যায় যা ইসলামে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত তাদের জন্য নিয়মিত দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা - আল্লাহ তায়ালা কুরআনে শিখিয়েছেন হে আমার রব তাদের প্রতি দয়া করুন যেমন তারা ছোটবেলায় আমাকে লালনপালন করেছেন (সূরা ইসরা: ২৪)। দ্বিতীয়ত পিতা-মাতার নামে দান-সদকা করা যা তাদের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন মৃত্যুর পর মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি বিষয় ছাড়া যার একটি হলো নেককার সন্তানের দোয়া (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)। তৃতীয়ত পিতা-মাতা কোনো ওয়াদা বা দায়িত্ব অসম্পূর্ণ রেখে গেলে তা পূরণ করার চেষ্টা করা। চতুর্থত পিতা-মাতার বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) সবচেয়ে বড় সদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সহিহ মুসলিম: ২৫৫২)। পঞ্চমত তাদের কবর জিয়ারত করা এবং সেখানে দোয়া করা। এই দায়িত্বগুলো পালন করলে পিতা-মাতার রুহের জন্য কল্যাণ বয়ে আসে বলে আশা করা যায় এবং এটি সন্তানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
৫. ব্যস্ত আধুনিক জীবনে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কীভাবে সম্ভব?
ব্যস্ত আধুনিক জীবনযাত্রায় পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও কিছু ব্যবহারিক পদ্ধতি অবলম্বন করে এটি সম্ভব করা যায়। প্রথমত দূরে থাকলেও নিয়মিত ফোনে বা ভিডিও কলে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের খোঁজখবর নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যেও পিতা-মাতার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা, যেমন সপ্তাহে অন্তত একবার তাদের সাথে সরাসরি দেখা করা বা দীর্ঘ সময় কথা বলা। তৃতীয়ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামত ও পরামর্শ নেওয়া যা তাদের সম্মানিত বোধ করায়। চতুর্থত বার্ধক্যে তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। পঞ্চমত বার্ধক্যজনিত কারণে তারা কখনো খিটখিটে হলেও ধৈর্য ধারণ করা এবং তাদের প্রতি নম্র আচরণ বজায় রাখা। ষষ্ঠত নিজের সন্তানদের সামনে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের উদাহরণ স্থাপন করা যাতে পরবর্তী প্রজন্মও এই শিক্ষা গ্রহণ করে। এই পদ্ধতিগুলো নিয়মিত অনুশীলন করলে ব্যস্ততার মধ্যেও পিতা-মাতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালন করা সম্ভব হয় বলে আশা করা যায়।