এক মিনিটে ১০টি শক্তিশালী আমল | হাদিসের আলোকে
এক মিনিটে করা যায় এমন ১০টি শক্তিশালী আমল: কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে
ভূমিকা
আমাদের দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় মনে হয় ইবাদতের জন্য পর্যাপ্ত সময় নেই। তবে ইসলাম এমন কিছু আমল শিখিয়েছে যা অল্প সময়ে করা যায় কিন্তু যার ফজিলত অসাধারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কিছু আমল আছে যা সহজ কিন্তু আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং ভারী। মাত্র এক মিনিট বা তারও কম সময়ে এমন কিছু আমল করা সম্ভব যা আল্লাহর নৈকট্য এনে দেয়, গুনাহ মাফ করে এবং জান্নাতের পথ সুগম করে। কুরআন ও সহীহ হাদিসে এমন অনেক দোয়া, যিকির এবং ছোট আমলের কথা বলা হয়েছে যা আমরা যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় করতে পারি। এই লেখায় আমরা এমন দশটি শক্তিশালী আমলের কথা জানব যা এক মিনিটেই সম্পন্ন করা যায় কিন্তু যার প্রতিদান এবং বরকত অপরিসীম। আসুন জেনে নিই কোন আমলগুলো আমরা আমাদের ব্যস্ততার মধ্যেও সহজে করতে পারি।
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি: অসাধারণ ফজিলতের যিকির
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী যিকির যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বলা যায়। যিকিরটি: "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" অর্থাৎ আল্লাহ পবিত্র এবং সকল প্রশংসা তাঁর জন্য। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ দিনে একশ বার এই যিকির পড়ে তার সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায় যদিও সেগুলো সমুদ্রের ফেনার মতো হয় (সহিহ বুখারি: ৬৪০৫, সহিহ মুসলিম: ২৬৯১)। একশ বার বলতে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট সময় লাগে এবং একবার বলতে মাত্র দুই সেকেন্ড। আরেকটি বর্ণনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন যে যে ব্যক্তি "সুবহানাল্লাহিল আজিম ওয়া বিহামদিহি" বলবে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে (সুনানে তিরমিজি: ৩৪৬৪)। কখন পড়বেন: দিনের যেকোনো সময়, হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িতে বসে, অফিসে বা বাসায় যেকোনো অবস্থায় এই যিকির করা যায়। সহজ: এটি মুখস্থ করা অত্যন্ত সহজ এবং নিয়মিত অভ্যাস করলে জিহ্বায় এসে যায়।
এই সংক্ষিপ্ত যিকিরটি নিয়মিত করলে গুনাহ মাফ এবং জান্নাত লাভের আশা করা যায় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে।
সুবহানাল্লাহিল আজিম: মিজানে ভারী আমল
সুবহানাল্লাহিল আজিম একটি ছোট কিন্তু মিজানে অত্যন্ত ভারী আমল। যিকিরটি: "সুবহানাল্লাহিল আজিম" অর্থাৎ মহান আল্লাহ পবিত্র। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে দুইটি বাক্য আছে যা রহমানের কাছে প্রিয়, জিহ্বায় হালকা কিন্তু মিজানে ভারী - সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি এবং সুবহানাল্লাহিল আজিম (সহিহ বুখারি: ৬৪০৬, সহিহ মুসলিম: ২৬৯৪)। মিজানে ভারী: কিয়ামতের দিন যখন আমলের ওজন করা হবে তখন এই ছোট্ট যিকিরটি অত্যন্ত ভারী হবে এবং নেকির পাল্লা ভারী করবে। বলা সহজ: মাত্র তিন শব্দের এই যিকিরটি বলতে দুই সেকেন্ডও লাগে না। নিয়মিততা: দিনে বিভিন্ন সময়ে এই যিকির করা যায়। বিশেষ করে রুকু ও সিজদায় এই তাসবিহ পড়া সুন্নত। সহজ মুখস্থ: ছোট বাচ্চারাও সহজে এই যিকির মুখস্থ করতে পারে এবং এর অভ্যাস গড়তে পারে। বরকত: অল্প সময়ে বেশি সওয়াব এবং কিয়ামতে ভারী আমল হিসেবে গণ্য হবে।
এই যিকিরটি নিয়মিত করা উচিত কারণ এটি সহজ কিন্তু আখেরাতে অত্যন্ত উপকারী হবে বলে আশা করা যায়।
আস্তাগফিরুল্লাহ: ক্ষমা প্রার্থনার শক্তিশালী দোয়া
আস্তাগফিরুল্লাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার যা মাত্র এক সেকেন্ডে বলা যায়। অর্থ: "আস্তাগফিরুল্লাহ" অর্থাৎ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। রাসুলের আমল: রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন যদিও তিনি নিষ্পাপ ছিলেন (সহিহ মুসলিম: ২৭০২)। ফজিলত: ইস্তেগফার করলে আল্লাহ গুনাহ মাফ করেন, রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং বিপদ থেকে উত্তরণের পথ করে দেন (সূরা নুহ: ১০-১২)। পূর্ণ ইস্তেগফার: আরও ফজিলতপূর্ণ হলো "আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি" বলা যা বললে গুনাহ মাফ হয়ে যায় যদিও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা হয় (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৭, সুনানে তিরমিজি: ৩৫৭৭)। কখন বলবেন: প্রতিটি নামাজের পর তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলা সুন্নত। দিনের যেকোনো সময়, বিশেষ করে ভুল করার পরপরই ইস্তেগফার করা উচিত। সংখ্যা: দিনে কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার করা উত্তম।
ইস্তেগফার নিয়মিত করলে গুনাহ মাফ, রিজিক বৃদ্ধি এবং বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: সবচেয়ে উত্তম যিকির
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তাওহিদের কালিমা এবং সবচেয়ে উত্তম যিকির। অর্থ: "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে সর্বোত্তম যিকির হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং সর্বোত্তম দোয়া হলো আলহামদুলিল্লাহ (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮৩, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮০০)। গাছ রোপণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে "সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবর" জান্নাতের বাগিচায় গাছ রোপণ করে (সুনানে তিরমিজি: ৩৪৬৩)। জান্নাতের চাবি: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জান্নাতের চাবি এবং এই কালিমা নিয়ে যে মারা যায় সে জান্নাতে যাবে বলে আশা করা যায়। নবায়ন: এই কালিমা বারবার বলা ঈমান নবায়ন করে এবং শয়তান থেকে রক্ষা করে। সময়: দিনে শত শত বার এই কালিমা পড়া যায় এবং প্রতিবার বলতে মাত্র এক সেকেন্ড লাগে। ওজনে ভারী: এই কালিমা মিজানে অত্যন্ত ভারী এবং কিয়ামতে উপকারী হবে।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ নিয়মিত বললে ঈমান মজবুত হয় এবং জান্নাত লাভের আশা করা যায়।
সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার: তাসবিহের সেরা সমন্বয়
এই তিনটি তাসবিহ একসাথে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং মাত্র দশ সেকেন্ডে পড়া যায়। তাসবিহগুলো: সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র), আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর) এবং আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে বড়)। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে এই তিনটি তাসবিহ সূর্য যার উপর উদিত হয় তার চেয়ে প্রিয় (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৫)। নামাজের পর: প্রতি ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলা সুন্নত এবং এগুলো ৯৯ বার হলে ১০০ পূর্ণ করতে একবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির বলা উচিত - এতে গুনাহ মাফ হয় যদিও সমুদ্রের ফেনার মতো হয় (সহিহ মুসলিম: ৫৯৭)। জান্নাতের গাছ: প্রতিটি তাসবিহ জান্নাতে একটি গাছ রোপণ করে। যেকোনো সময়: হাঁটতে, গাড়িতে বসে বা যেকোনো কাজ করতে করতে এই তাসবিহগুলো পড়া যায়।
এই তিন তাসবিহ নিয়মিত পড়লে অসংখ্য সওয়াব এবং জান্নাতে গাছ লাভ করা যায় বলে আশা করা যায়।
দরুদ শরীফ: রাসুলের প্রতি সালাম ও বরকতের উৎস
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উপর দরুদ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডে পড়া যায়। সংক্ষিপ্ত দরুদ: "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বা "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ" বলা যায় যা মাত্র দুই সেকেন্ডে পড়া যায়। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ আমার উপর একবার দরুদ পড়ে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত পাঠান (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)। গুনাহ মাফ: দরুদ পড়লে গুনাহ মাফ হয় এবং দুশ্চিন্তা দূর হয় (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৭)। জুমার দিন: জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া উৎসাহিত করা হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)। পূর্ণ দরুদ: দরুদে ইব্রাহিম পড়া আরও ফজিলতপূর্ণ যা প্রায় পনের সেকেন্ডে পড়া যায়। নিয়মিত: দিনে কমপক্ষে একশ বার দরুদ পড়া উত্তম এবং এতে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। বরকত: দরুদ পড়লে জীবনে বরকত আসে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতে শাফায়াত করবেন বলে আশা করা যায়।
দরুদ শরীফ নিয়মিত পড়লে আল্লাহর রহমত, গুনাহ মাফ এবং রাসুলের শাফায়াত লাভ করা যায় বলে হাদিসে আছে।
সুরা ইখলাস: এক তৃতীয়াংশ কুরআনের সমান
সুরা ইখলাস একটি ছোট সুরা যা মাত্র দশ সেকেন্ডে পড়া যায় কিন্তু এর ফজিলত অসাধারণ। সুরাটি: "কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ, লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ, ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।" ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে সুরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান (সহিহ বুখারি: ৫০১৩, সহিহ মুসলিম: ৮১২)। তিনবার পড়া: যে ব্যক্তি তিনবার সুরা ইখলাস পড়ে সে যেন সম্পূর্ণ কুরআন পড়ল - এতে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড সময় লাগে। জান্নাত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে সুরা ইখলাস ভালোবাসা জান্নাতে প্রবেশ করাবে (সহিহ বুখারি: ৭৩৭৫)। প্রতিদিন পড়া: ফজরের সুন্নত, মাগরিবের সুন্নত এবং শোয়ার আগে এই সুরা পড়া উত্তম। মুখস্থ: প্রতিটি মুসলমানের এই সুরা মুখস্থ থাকা উচিত কারণ এটি তাওহিদের মূল বাণী।
সুরা ইখলাস নিয়মিত তিনবার পড়লে সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।
আয়াতুল কুরসি: সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত
আয়াতুল কুরসি কুরআনের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ আয়াত যা মাত্র একমিনিটে পড়া যায়। আয়াতটি: সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত যা "আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম..." দিয়ে শুরু হয়। শ্রেষ্ঠ আয়াত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে আয়াতুল কুরসি কুরআনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আয়াত (সহিহ মুসলিম: ৮১০)। রক্ষাকবচ: প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়লে জান্নাতে প্রবেশে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই বাধা হবে না (সুনানে নাসায়ি: ৯৯২৮)। শয়তান থেকে রক্ষা: রাতে শোয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকে এবং শয়তান কাছে আসতে পারে না (সহিহ বুখারি: ২৩১১)। সকাল-সন্ধ্যা: সকাল ও সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি পড়লে সারাদিন ও রাত সুরক্ষিত থাকা যায়। মুখস্থ: এই আয়াত মুখস্থ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পড়লে আল্লাহর রক্ষা, শয়তান থেকে নিরাপত্তা এবং জান্নাত লাভের আশা করা যায়।
বিসমিল্লাহ: প্রতিটি কাজের বরকতের চাবি
বিসমিল্লাহ বলা মাত্র এক সেকেন্ডের কাজ কিন্তু এর বরকত অসীম। বিসমিল্লাহ: "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" অর্থাৎ পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। প্রতিটি কাজে: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু হয় না তা অসম্পূর্ণ থাকে (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫১০)। খাওয়ার সময়: খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বললে শয়তান সেই খাবারে অংশীদার হতে পারে না (সহিহ মুসলিম: ২০১৭)। বাড়িতে প্রবেশ: ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বললে শয়তান বলে আমাদের এখানে রাত কাটানোর জায়গা নেই (সহিহ মুসলিম: ২০১৮)। বরকত: বিসমিল্লাহ বললে সব কাজে বরকত হয় এবং সহজ হয়। অভ্যাস: প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
বিসমিল্লাহ বলা অত্যন্ত সহজ কিন্তু এর মাধ্যমে প্রতিটি কাজে বরকত এবং শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আলহামদুলিল্লাহ: কৃতজ্ঞতার সেরা প্রকাশ
আলহামদুলিল্লাহ বলা মাত্র দুই সেকেন্ডের কাজ কিন্তু এর গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থ: "আলহামদুলিল্লাহ" অর্থাৎ সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। মিজান পূর্ণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে আলহামদুলিল্লাহ মিজান পূর্ণ করে দেয় (সহিহ মুসলিম: ২২৩)। সর্বোত্তম দোয়া: আলহামদুলিল্লাহ সর্বোত্তম দোয়া এবং যিকির (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৮৩)। যেকোনো অবস্থায়: ভালো কিছু পেলে আলহামদুলিল্লাহ, বিপদে পড়লে আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল - সব অবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া। নিয়ামত বৃদ্ধি: আল্লাহ বলেন যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো তাহলে আমি তোমাদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেব (সূরা ইব্রাহিম: ৭)। ছিহাঁক পরে: ছিহাঁকের পর আলহামদুলিল্লাহ বলা সুন্নত। নিয়মিত: দিনে শত শত বার আলহামদুলিল্লাহ বলা উচিত।
আলহামদুলিল্লাহ নিয়মিত বললে নিয়ামত বৃদ্ধি পায় এবং মিজান ভারী হয় বলে আশা করা যায়।
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ: জান্নাতের ধনভাণ্ডার
এই যিকিরটি জান্নাতের ধনভাণ্ডার এবং মাত্র পাঁচ সেকেন্ডে বলা যায়। যিকিরটি: "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই। ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে এই বাক্যটি জান্নাতের ধনভাণ্ডার থেকে একটি ধন (সহিহ বুখারি: ৪২০৬, সহিহ মুসলিম: ২৭০৪)। বিপদে: যেকোনো বিপদ বা কষ্টের সময় এই যিকির পড়লে আল্লাহ সাহায্য করেন এবং সহজ করে দেন। রোগ থেকে: এই যিকির নিরানব্বইটি রোগ থেকে রক্ষা করে যার মধ্যে সবচেয়ে হালকা হলো দুশ্চিন্তা (মুসতাদরাকে হাকিম)। আজান শুনে: আজানের পর দোয়ায় এই বাক্য আছে এবং পড়া সুন্নত। সহজ মুখস্থ: এই যিকির খুব সহজে মুখস্থ করা যায় এবং নিয়মিত বলা উচিত।
এই যিকির নিয়মিত পড়লে বিপদে সাহায্য পাওয়া যায় এবং জান্নাতের ধন লাভ করা যায় বলে আশা করা যায়।
উপসংহার
এই দশটি আমল অত্যন্ত সহজ এবং মাত্র এক মিনিট বা তারও কম সময়ে করা যায় কিন্তু এর ফজিলত ও প্রতিদান অসাধারণ। কুরআন ও সহীহ হাদিসে এই আমলগুলোর কথা বলা হয়েছে এবং নিয়মিত করলে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।
আসুন আমরা সবাই এই দশটি আমল নিয়মিত করার চেষ্টা করি। প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি একশ বার বলি। নিয়মিত আস্তাগফিরুল্লাহ বলি এবং গুনাহ থেকে মুক্ত হই। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে ঈমান মজবুত করি। তাসবিহগুলো নিয়মিত পড়ি বিশেষ করে নামাজের পর। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর উপর দরুদ পাঠ করি। সুরা ইখলাস তিনবার পড়ি। আয়াতুল কুরসি মুখস্থ করি এবং প্রতিদিন পড়ি। প্রতিটি কাজ বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ বলি। এই আমলগুলো খুব সহজ এবং মোবাইলে নোট করে রাখতে পারি যাতে মনে থাকে। পরিবারের সবাইকে শেখাই এবং একসাথে করি। সন্তানদের ছোট থেকে এই আমলগুলো শেখাই। মনে রাখি যে অল্প সময়ে বেশি সওয়াব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই আমলগুলো নিয়মিত করার তৌফিক দান করুন এবং কবুল করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. এই দশটি আমল কি সত্যিই এক মিনিটে করা সম্ভব?
হ্যাঁ, এই দশটি আমলের প্রতিটি এক মিনিট বা তারও কম সময়ে করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলতে মাত্র দুই সেকেন্ড লাগে এবং একবার বললেই একটি আমল সম্পন্ন হয়। হাদিসে একশ বার বলার কথা আছে যা করতে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট লাগে। তবে আপনি একবার বা দশবার যেকোনো সংখ্যায় বলতে পারেন। আস্তাগফিরুল্লাহ বলতে মাত্র এক সেকেন্ড লাগে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে দুই সেকেন্ড। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার প্রতিটি বলতে দুই সেকেন্ড এবং তিনটি একসাথে বলতে মাত্র দশ সেকেন্ড। দরুদ শরীফ সংক্ষিপ্ত রূপে "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" বলতে দুই সেকেন্ড। সুরা ইখলাস পড়তে দশ থেকে পনের সেকেন্ড। আয়াতুল কুরসি পড়তে এক মিনিট। বিসমিল্লাহ বলতে এক সেকেন্ড। আলহামদুলিল্লাহ বলতে দুই সেকেন্ড। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ বলতে পাঁচ সেকেন্ড। অর্থাৎ প্রতিটি আমল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং সহজে করা যায়। এমনকি হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িতে বসে বা যেকোনো সময় এই আমলগুলো করা সম্ভব।
২. এই আমলগুলো কি সত্যিই কুরআন ও সহীহ হাদিসে আছে?
হ্যাঁ, এই দশটি আমলের প্রতিটি কুরআন ও সহীহ হাদিসে প্রমাণিত। সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহির ফজিলত সহীহ বুখারি (৬৪০৫) এবং সহীহ মুসলিম (২৬৯১) এ আছে। সুবহানাল্লাহিল আজিম সহীহ বুখারি (৬৪০৬) এবং সহীহ মুসলিম (২৬৯৪) এ আছে। ইস্তেগফার সহীহ মুসলিম (২৭০২) এ আছে এবং কুরআনের সূরা নুহে এর ফজিলত বর্ণিত। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ফজিলত সুনানে তিরমিজি (৩৩৮৩) এ আছে। তাসবিহগুলোর ফজিলত সহীহ মুসলিম (২৬৯৫, ৫৯৭) এ আছে। দরুদের ফজিলত সহীহ মুসলিম (৩৮৪) এবং সুনানে তিরমিজি (২৪৫৭) এ আছে। সুরা ইখলাসের ফজিলত সহীহ বুখারি (৫০১৩) এবং সহীহ মুসলিম (৮১২) এ আছে। আয়াতুল কুরসির ফজিলত সহীহ মুসলিম (৮১০), সহীহ বুখারি (২৩১১) এবং সুনানে নাসায়ি (৯৯২৮) এ আছে। বিসমিল্লাহর ফজিলত সুনানে আবু দাউদ (৩৫১০) এবং সহীহ মুসলিম (২০১৭, ২০১৮) এ আছে। আলহামদুলিল্লাহর ফজিলত সহীহ মুসলিম (২২৩) এবং সূরা ইব্রাহিম (৭) এ আছে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতার ফজিলত সহীহ বুখারি (৪২০৬) এবং সহীহ মুসলিম (২৭০৪) এ আছে। সবগুলো আমল সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
৩. এই আমলগুলো করার সঠিক সময় কখন?
এই আমলগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই এবং দিনের যেকোনো সময় করা যায়। তবে কিছু বিশেষ সময় আছে যখন করা আরও ফজিলতপূর্ণ। ফজরের পর এবং মাগরিবের পর সকাল-সন্ধ্যার যিকির হিসেবে এই আমলগুলো করা উত্তম। প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তাসবিহ, আয়াতুল কুরসি এবং সুরা ইখলাস পড়া সুন্নত। শোয়ার আগে আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া উৎসাহিত করা হয়েছে। খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ, খাওয়ার পরে আলহামদুলিল্লাহ বলা। ঘরে প্রবেশের সময় এবং বের হওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলা। জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া। যেকোনো কাজ শুরুর আগে বিসমিল্লাহ বলা। বিপদে পড়লে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা পড়া। ভুল করার পরপরই আস্তাগফিরুল্লাহ বলা। হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িতে বসে, অফিসে বা বাসায় যেকোনো সময় এই যিকিরগুলো করা যায়। মূল কথা হলো নিয়মিততা এবং যেকোনো সময় করা যায়।
৪. কীভাবে এই আমলগুলো মুখস্থ করব এবং নিয়মিত করব?
এই আমলগুলো মুখস্থ করা এবং নিয়মিত করার জন্য কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। প্রথমত একটি করে শুরু করুন - প্রথমে সবচেয়ে সহজ যেমন আস্তাগফিরুল্লাহ বা বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করুন এবং অভ্যাস হলে অন্যগুলো যোগ করুন। দ্বিতীয়ত মোবাইলে নোট করে রাখুন বা একটি ছোট কার্ড বানিয়ে পকেটে রাখুন যাতে দেখে দেখে পড়তে পারেন এবং ধীরে ধীরে মুখস্থ হয়ে যাবে। তৃতীয়ত নামাজের পর নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করুন কারণ নামাজ তো প্রতিদিন পাঁচ বার পড়েনই তাই এটি একটি নিয়মিত সময় হতে পারে। চতুর্থত পরিবারের সবাই একসাথে এই যিকিরগুলো করুন এবং একে অপরকে মনে করিয়ে দিন। পঞ্চমত সন্তানদের ছোট থেকে শেখান যাতে তারা অভ্যস্ত হয়। ষষ্ঠত মোবাইলে আলার্ম সেট করুন যাতে দিনে কয়েকবার মনে করিয়ে দেয়। সপ্তমত ইউটিউবে বা ইসলামিক অ্যাপে এই যিকিরগুলোর সঠিক উচ্চারণ শুনুন এবং অনুসরণ করুন। অষ্টমত নিয়ত করুন যে প্রতিদিন এই আমলগুলো করবেন এবং আল্লাহর কাছে তৌফিক চান। ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত চেষ্টা করুন।
৫. এই আমলগুলো করলে কী কী উপকার পাওয়া যাবে?
এই আমলগুলো নিয়মিত করলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গায় অসংখ্য উপকার পাওয়া যায় বলে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ আছে। প্রথমত গুনাহ মাফ হয় - সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি এবং আস্তাগফিরুল্লাহ বললে গুনাহ মাফ হয়। দ্বিতীয়ত জান্নাতে গাছ রোপণ হয় - তাসবিহ ও সুরা ইখলাস পড়লে। তৃতীয়ত মিজানে ভারী সওয়াব - সুবহানাল্লাহিল আজিম এবং আলহামদুলিল্লাহ মিজানে ভারী। চতুর্থত আল্লাহর রহমত - দরুদ পড়লে দশগুণ রহমত। পঞ্চমত শয়তান থেকে রক্ষা - বিসমিল্লাহ ও আয়াতুল কুরসি শয়তান থেকে রক্ষা করে। ষষ্ঠত রিজিক বৃদ্ধি - ইস্তেগফার করলে রিজিক বাড়ে। সপ্তমত বিপদ থেকে উত্তরণ - লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা বিপদে সাহায্য করে। অষ্টমত নিয়ামত বৃদ্ধি - আলহামদুলিল্লাহ বললে নিয়ামত বাড়ে। নবমত জান্নাত লাভ - আয়াতুল কুরসি পড়লে জান্নাতে প্রবেশ সহজ হয়। দশমত মানসিক শান্তি - এই যিকিরগুলো অন্তরে শান্তি আনে এবং দুশ্চিন্তা দূর করে। এগারোতম রাসুলের শাফায়াত - দরুদ পড়লে কিয়ামতে শাফায়াতের আশা করা যায়। এই সব উপকার কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এবং নিয়মিত আমল করলে পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়।
