শাওয়াল মাসের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আমল | কুরআন ও হাদীস
শাওয়াল মাসের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আমল যা সবাই জানা উচিত
ভূমিকা
রমজান মাস শেষ হওয়ার পর শাওয়াল মাস শুরু হয় এবং এই মাসে কিছু বিশেষ আমল রয়েছে যা প্রতিটি মুসলমানের জানা ও পালন করা উচিত। শাওয়াল মাস শুধু ঈদের আনন্দের মাস নয় বরং এটি ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। রমজানের পর অনেকে ইবাদতে শিথিলতা এনে ফেলেন কিন্তু প্রকৃত মুমিন সারা বছর আল্লাহর ইবাদত করেন। শাওয়াল মাসে কিছু নির্দিষ্ট আমল আছে যা হাদিসে উল্লেখিত এবং বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। এই আমলগুলো পালন করলে রমজানের সওয়াব বৃদ্ধি পায় এবং ইবাদতে নিয়মিততা আসে। এই লেখায় আমরা শাওয়াল মাসের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আমল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব যা প্রতিটি মুসলমানের জানা এবং আমল করা উচিত। এই আমলগুলো সহজ এবং ব্যবহারিক যা দৈনন্দিন জীবনে সহজেই প্রয়োগ করা যায়।
১. শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা
শাওয়াল মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ আমল হলো ছয়টি রোজা রাখা। হাদিসের বাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এর পরে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল সে যেন সারা বছর রোজা রাখল (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)। এর ব্যাখ্যা হলো প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ - রমজানের ৩০ দিন দশগুণে ৩০০ দিন এবং শাওয়ালের ৬ দিন দশগুণে ৬০ দিন, মোট ৩৬০ দিন বা পূর্ণ বছর। রাখার সময়: ঈদের পরের দিন থেকে শাওয়াল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় এই রোজা রাখা যায়। ঈদের দিন রোজা হারাম। একসাথে লাগাতার বা ভেঙে ভেঙে - উভয় পদ্ধতিই জায়েজ। উপকারিতা: এই রোজা রমজানের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করে এবং ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। রমজানের পর আবার রোজা রাখা প্রমাণ করে যে আমরা শুধু রমজানে নয় বরং সারা বছর আল্লাহর ইবাদত করতে চাই। সহজ পরিকল্পনা: সপ্তাহে দুই দিন করে রাখলে সহজ হয় বিশেষত সোমবার ও বৃহস্পতিবার যা সুন্নত দিন। এতে দুই সুন্নত একসাথে পাওয়া যায়।
শাওয়ালের ছয় রোজা একটি অসাধারণ সুযোগ যা প্রতিটি মুসলমানের কাজে লাগানো উচিত। এটি সহজ কিন্তু সওয়াব অনেক বেশি এবং রমজানের পর ইবাদতে অবহেলা এড়াতে সাহায্য করে।
২. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া
রমজান মাসে অনেকে নিয়মিত মসজিদে নামাজ পড়েন এবং জামাতে শরিক হন কিন্তু রমজানের পর আবার অনিয়মিত হয়ে যান। জামাতের গুরুত্ব: হাদিসে এসেছে যে জামাতে নামাজ একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব (সহিহ বুখারি: ৬১৯)। জামাতে নামাজ পড়া ওয়াজিব এবং এর অসংখ্য ফজিলত রয়েছে। ধারাবাহিকতা: শাওয়াল মাসে রমজানের অভ্যাস বজায় রাখা উচিত এবং নিয়মিত মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া উচিত। এটি প্রমাণ করে যে রমজানে আমরা যে ইবাদত করেছি তা শুধু রমজানের জন্য ছিল না বরং জীবনভর অব্যাহত রাখার জন্য। ফজর ও এশা: বিশেষভাবে ফজর এবং এশার নামাজ জামাতে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে এসেছে যে যে ব্যক্তি এশা জামাতে পড়ে সে যেন অর্ধেক রাত নামাজ পড়ল এবং ফজর জামাতে পড়লে যেন পুরো রাত নামাজ পড়ল (সহিহ মুসলিম: ৬৫৬)। সামাজিক বন্ধন: জামাতে নামাজ মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন মজবুত করে এবং ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
জামাতে নামাজ শুধু রমজানে নয় বরং সারা বছর পালন করা উচিত এবং শাওয়াল মাস থেকে এই অভ্যাস শুরু করা যায়। এটি আমাদের ঈমান মজবুত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি করে।
৩. কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখা
রমজান মাসে আমরা প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত করি কিন্তু রমজানের পর অনেকে কুরআন থেকে দূরে সরে যান। নিয়মিত তিলাওয়াত: শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখা উচিত। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করা যেমন এক পারা, অর্ধেক পারা বা কয়েক পৃষ্ঠা। কুরআনের ফজিলত: হাদিসে এসেছে যে কুরআনের প্রতিটি হরফের বিনিময়ে দশটি নেকি পাওয়া যায় (সুনানে তিরমিজি: ২৯১০)। কুরআন তিলাওয়াত হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর স্মরণে রাখে। অর্থ বুঝে পড়া: শুধু তিলাওয়াত নয় বরং অর্থ বুঝে কুরআন পড়া উচিত। বাংলা অনুবাদ সাথে পড়লে কুরআনের বাণী হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং জীবনে প্রয়োগ করা সহজ হয়। তাফসির পড়া: কুরআনের তাফসির পড়লে আয়াতের গভীর অর্থ বোঝা যায় এবং জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। পরিবারকে সাথে নিয়ে: পরিবারের সবাই একসাথে কুরআন তিলাওয়াত করলে ঘরে বরকত নাজিল হয় এবং শিশুরাও কুরআনের সাথে পরিচিত হয়।
কুরআন তিলাওয়াত মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়া উচিত এবং শাওয়াল মাস থেকে এই অভ্যাস শক্তিশালী করা যায়। কুরআন আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক এবং এটি নিয়মিত পড়া ঈমানের দাবি।
৪. দান-সদকা ও গরিবদের সাহায্য করা
রমজান মাসে দান-সদকার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মানুষ গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করে। সারা বছর দান: শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর দান-সদকা অব্যাহত রাখা উচিত। দান শুধু রমজানের জন্য নয় বরং সারা বছরের ইবাদত। হাদিসে এসেছে যে সদকা আল্লাহর গজব নিভিয়ে দেয় এবং মন্দ মৃত্যু থেকে রক্ষা করে (সুনানে তিরমিজি: ৬৬৪)। ছোট ছোট দান: প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করার অভ্যাস করা উচিত। অল্প হলেও নিয়মিত দান অনেক সওয়াব এবং এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বিভিন্ন উপায়ে: দান শুধু টাকা-পয়সা নয় বরং খাবার, কাপড়, সেবা বা যেকোনো সাহায্য। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের গরিবদের সাহায্য করা। গোপন দান: গোপনে দান করা বেশি ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে এসেছে যে সাত শ্রেণীর মানুষ আরশের নিচে ছায়া পাবে তাদের একজন হলো যে গোপনে দান করে (সহিহ বুখারি: ১৪২৩)। হাসিমুখে দেওয়া: দান হাসিমুখে এবং ভালোবাসার সাথে দেওয়া উচিত এবং খোঁটা না দেওয়া।
দান-সদকা আল্লাহর প্রিয় আমল এবং এটি সম্পদে বরকত আনে ও হৃদয়কে পবিত্র করে। শাওয়াল মাসে এই অভ্যাস বজায় রাখলে রমজানের আত্মত্যাগের চেতনা সারা বছর জীবিত থাকে।
৫. তওবা ও ইস্তিগফার করা
রমজানে আমরা প্রচুর তওবা করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই কিন্তু রমজানের পর এই অভ্যাস কমে যায়। নিয়মিত তওবা: শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর নিয়মিত তওবা করা উচিত। প্রতিদিন করা ছোটবড় পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন যে তিনি দিনে সত্তর বারের বেশি তওবা করেন (সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)। ইস্তিগফারের ফজিলত: আল্লাহ বলেন যে তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও তিনি ক্ষমাশীল (সূরা নূহ: ১০)। ইস্তিগফার করলে আল্লাহ রিজিক দেন, বৃষ্টি দেন এবং সন্তান ও সম্পদ বৃদ্ধি করেন। সাইয়িদুল ইস্তিগফার: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সাইয়িদুল ইস্তিগফার পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এটি সব ইস্তিগফারের সরদার এবং হাদিসে এর বিশেষ ফজিলত বর্ণিত আছে (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)। সকাল-সন্ধ্যা: "আস্তাগফিরুল্লাহ" ১০০ বার পড়া রাসুল (সা.) এর সুন্নত। পাপ থেকে ফিরে আসা: তওবা শুধু মুখে নয় বরং পাপ ছেড়ে দেওয়া এবং আবার না করার সংকল্প করা।
তওবা ও ইস্তিগফার মুমিনের জীবনের নিয়মিত অংশ হওয়া উচিত এবং এটি আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পাওয়ার মাধ্যম। শাওয়াল মাসে এই অভ্যাস শক্তিশালী করলে সারা বছর আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশা করা যায়।
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা
ঈদের সময় আমরা আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করি এবং সম্পর্ক মজবুত করি। সারা বছর যোগাযোগ: শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা উচিত। হাদিসে এসেছে যে যে আত্মীয়তা রক্ষা করে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক রাখেন এবং যে ছিন্ন করে আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৭)। নিয়মিত যোগাযোগ: ফোন করা, দেখা করা, সাহায্য করা - যেকোনো উপায়ে আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ রাখা। বিশেষত যারা দূরে থাকেন বা বৃদ্ধ তাদের খোঁজখবর নেওয়া। মন খারাপ থাকলেও: যদি কারো সাথে মনোমালিন্য থাকে তবুও সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করা উচিত। ক্ষমা করা এবং এগিয়ে যাওয়া ইসলামের শিক্ষা। ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান: ছোট আত্মীয়দের স্নেহ করা এবং বড়দের সম্মান করা ইসলামি আদব। উপহার বিনিময়: আত্মীয়দের মাঝে মাঝে ছোট উপহার দিলে ভালোবাসা বাড়ে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এবং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বরকতের কারণ। শাওয়াল মাস থেকে এই অভ্যাস অব্যাহত রাখলে পরিবার ও সমাজে শান্তি আসে।
৭. নিয়মিত জিকির ও দোয়া করা
রমজানে আমরা প্রচুর জিকির ও দোয়া করি কিন্তু রমজানের পর অনেকে এটি ভুলে যান। প্রতিদিনের জিকির: শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর সকাল-সন্ধ্যার জিকির নিয়মিত পড়া উচিত। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ - এই জিকিরগুলো প্রতিদিন ১০০ বার করে পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। দোয়ার গুরুত্ব: হাদিসে এসেছে যে দোয়া ইবাদতের মূল এবং মুমিনের অস্ত্র (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৪)। আল্লাহ দোয়া শুনেন এবং কবুল করেন। বিভিন্ন সময়ের দোয়া: সকাল-সন্ধ্যা, খাওয়ার আগে-পরে, ঘরে প্রবেশ-বের হওয়ার সময়, ঘুমানোর আগে - প্রতিটি কাজের জন্য ইসলামে দোয়া আছে। এগুলো নিয়মিত পড়া উচিত। মাসনুন দোয়া মুখস্থ: রাসুল (সা.) এর শেখানো দোয়াগুলো মুখস্থ করা এবং নিয়মিত পড়া। নিজের ভাষায়ও: মাসনুন দোয়ার পাশাপাশি নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে চাওয়া - এটিও দোয়া এবং আল্লাহ বোঝেন।
জিকির ও দোয়া আল্লাহর সাথে সংযোগ রাখে এবং হৃদয়কে জীবিত রাখে। শাওয়াল মাসে এই অভ্যাস অব্যাহত রাখলে সারা বছর আল্লাহর স্মরণে থাকা সহজ হয় এবং জীবনে শান্তি আসে।
উপসংহার
শাওয়াল মাস রমজানের পর ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এবং জীবনভর আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকার সুযোগ। এই মাসের বিশেষ আমলগুলো পালন করে আমরা রমজানের সওয়াব বৃদ্ধি করতে পারি এবং সারা বছর নেক আমলে অভ্যস্ত হতে পারি।
আসুন, আমরা সবাই শাওয়াল মাসের এই সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আমল পালন করি। প্রথমত, শাওয়ালের ছয় রোজা রাখি যা সারা বছরের সওয়াব দেয়। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ি বিশেষত ফজর ও এশা। তৃতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখি এবং অর্থ বুঝে পড়ি। চতুর্থত, দান-সদকা করি নিয়মিতভাবে এবং গরিবদের সাহায্য করি। পঞ্চমত, প্রতিদিন তওবা ও ইস্তিগফার করি এবং পাপ থেকে দূরে থাকি। ষষ্ঠত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করি এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। সপ্তমত, সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া নিয়মিত পড়ি। এই আমলগুলো কঠিন নয় বরং সহজ এবং দৈনন্দিন জীবনে সহজেই প্রয়োগ করা যায়। একটু সচেতন এবং নিয়মিত হলেই এগুলো অভ্যাসে পরিণত হবে। পরিবারের সবাইকে এই আমলে উৎসাহিত করুন এবং একসাথে পালন করুন। মনে রাখবেন যে ইবাদত শুধু রমজানের জন্য নয় বরং সারা জীবনের জন্য। রমজান আমাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং শাওয়াল ও বাকি মাসগুলোতে আমরা সেই প্রশিক্ষণ প্রয়োগ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই আমলগুলো নিয়মিত করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের আমল কবুল করুন। রমজানের পর ইবাদতে শিথিলতা থেকে রক্ষা করুন এবং সারা বছর তাঁর আনুগত্যে থাকার শক্তি দিন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. শাওয়াল মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল কী?
শাওয়াল মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ আমল হলো ছয়টি নফল রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং এর পরে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল সে যেন সারা বছর রোজা রাখল (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)। এর ব্যাখ্যা হলো প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ - রমজানের ৩০ দিন দশগুণে ৩০০ দিন এবং শাওয়ালের ৬ দিন দশগুণে ৬০ দিন, মোট ৩৬০ দিন বা পূর্ণ বছর। এই রোজাগুলো ঈদের পরের দিন থেকে শাওয়াল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় রাখা যায়। একসাথে লাগাতার বা ভেঙে ভেঙে - উভয় পদ্ধতিই জায়েজ। এই রোজা রমজানের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করে এবং ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। সপ্তাহে দুই দিন করে রাখলে সহজ হয় বিশেষত সোমবার ও বৃহস্পতিবার যা সুন্নত দিন এবং এতে দুই সুন্নত একসাথে পাওয়া যায়। এই রোজা সহজ কিন্তু সওয়াব অনেক বেশি এবং প্রতিটি মুসলমানের চেষ্টা করা উচিত এই ফজিলত লাভ করার।
২. রমজানের পর কীভাবে নামাজে নিয়মিত থাকা যায়?
রমজান মাসে অনেকে নিয়মিত মসজিদে জামাতে নামাজ পড়েন কিন্তু রমজানের পর অনিয়মিত হয়ে যান। এই অভ্যাস বজায় রাখতে হলে শাওয়াল মাস থেকেই সচেতন হতে হবে। প্রথমত, মনে রাখতে হবে যে জামাতে নামাজ একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব (সহিহ বুখারি: ৬১৯) এবং এটি ওয়াজিব। দ্বিতীয়ত, নিজের সাথে প্রতিশ্রুতি করতে হবে যে রমজানের ইবাদত সারা বছর অব্যাহত রাখব। তৃতীয়ত, বিশেষভাবে ফজর এবং এশার নামাজ জামাতে পড়ার চেষ্টা করতে হবে কারণ হাদিসে এর বিশেষ ফজিলত আছে (সহিহ মুসলিম: ৬৫৬)। চতুর্থত, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে একসাথে মসজিদে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে সহজ হয়। পঞ্চমত, আলার্ম সেট করা এবং নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া। ষষ্ঠত, মসজিদের কাছাকাছি থাকলে নিয়মিত যাওয়া সহজ। সপ্তমত, নামাজের ফজিলত স্মরণ করা এবং মৃত্যুর কথা মনে রাখা। জামাতে নামাজ শুধু রমজানে নয় বরং সারা বছর পালন করা মুমিনের দায়িত্ব এবং এটি আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি করে।
৩. শাওয়াল মাসে কুরআন তিলাওয়াত কীভাবে অব্যাহত রাখব?
রমজান মাসে আমরা প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত করি কিন্তু রমজানের পর অনেকে কমিয়ে দেন। শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখতে হলে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াতের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যেমন এক পারা, অর্ধেক পারা বা কয়েক পৃষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করতে হবে যেমন ফজরের পর, মাগরিবের আগে বা রাতে যখন সময় পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, কুরআনের ফজিলত মনে রাখতে হবে - প্রতিটি হরফে দশ নেকি (সুনানে তিরমিজি: ২৯১০)। চতুর্থত, শুধু তিলাওয়াত নয় বরং অর্থ বুঝে পড়লে ভালো লাগবে এবং জীবনে প্রয়োগ করা সহজ হবে। পঞ্চমত, তাফসির পড়লে গভীর জ্ঞান পাওয়া যায়। ষষ্ঠত, পরিবারের সবাই একসাথে তিলাওয়াত করলে উৎসাহ বাড়ে। সপ্তমত, মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে রিমাইন্ডার সেট করা যায়। কুরআন তিলাওয়াত মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়া উচিত কারণ এটি আল্লাহর বাণী এবং জীবনের পথপ্রদর্শক।
৪. দান-সদকা কীভাবে সারা বছর অব্যাহত রাখা যায়?
রমজান মাসে দান-সদকার পরিমাণ বেড়ে যায় কিন্তু রমজানের পর অনেকে কমিয়ে দেন। সারা বছর দান-সদকা অব্যাহত রাখতে হলে প্রথমত, মনে রাখতে হবে যে দান শুধু রমজানের নয় বরং সারা বছরের ইবাদত এবং এর ফজিলত অসীম (সুনানে তিরমিজি: ৬৬৪)। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করার অভ্যাস করতে হবে। অল্প হলেও নিয়মিত দান অনেক সওয়াব। তৃতীয়ত, বিভিন্ন উপায়ে দান করা যায় - টাকা, খাবার, কাপড়, সেবা। চতুর্থত, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের গরিবদের খোঁজ রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে সাহায্য করতে হবে। পঞ্চমত, গোপনে দান করা বেশি ফজিলতপূর্ণ (সহিহ বুখারি: ১৪২৩)। ষষ্ঠত, হাসিমুখে এবং ভালোবাসার সাথে দিতে হবে এবং খোঁটা দেওয়া যাবে না। সপ্তমত, সদকা জারিয়ার কথা চিন্তা করতে হবে যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতালে দান। দান-সদকা সম্পদে বরকত আনে এবং হৃদয়কে পবিত্র করে এবং এটি আল্লাহর প্রিয় আমল।
৫. শাওয়াল মাসে আর কোন কোন আমল করা উচিত?
শাওয়াল মাসে ছয় রোজা ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল আছে। প্রথমত, নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার করা - প্রতিদিন "আস্তাগফিরুল্লাহ" এবং সাইয়িদুল ইস্তিগফার পড়া (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬, ৬৩০৭)। দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা - নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সাহায্য করা (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৭)। তৃতীয়ত, নিয়মিত জিকির করা - সকাল-সন্ধ্যার জিকির এবং সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়া। চতুর্থত, দোয়া করা - দোয়া ইবাদতের মূল (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪৪) এবং বিভিন্ন সময়ের মাসনুন দোয়া পড়া। পঞ্চমত, ইলম অর্জন - ইসলামিক বই পড়া, হাদিস পড়া এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করা। ষষ্ঠত, ভালো চরিত্র বজায় রাখা - সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ক্ষমাশীলতা। সপ্তমত, হালাল-হারামে সচেতন থাকা এবং পাপ থেকে দূরে থাকা। এই আমলগুলো শাওয়াল মাসে এবং সারা বছর পালন করলে রমজানের ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয় বলে আশা করা যায়।
