রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতের ইবাদত | লাইলাতুল কদর


রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতের ইবাদত | লাইলাতুল কদর
রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতের ইবাদত - লাইলাতুল কদর তালাশের গাইড


রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতের ইবাদত: লাইলাতুল কদর তালাশের পথ

ভূমিকা

রমজান মাসের শেষ দশক মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় সময়। এই দশকের বিজোড় রাতগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এর মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বিজোড় রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদত করতেন। তিনি নিজে রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন (সহিহ বুখারি: ২০২৪)। হাদিসে বর্ণিত আছে যে রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ কর (সহিহ বুখারি: ২০১৭)। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখের রাতগুলো অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই লেখায় আমরা বিজোড় রাতগুলোর গুরুত্ব, এসব রাতে কী ইবাদত করা উচিত এবং কীভাবে এই সুযোগ কাজে লাগানো যায় তা বিস্তারিত আলোচনা করব।

বিজোড় রাতের গুরুত্ব এবং লাইলাতুল কদর

রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর প্রধান কারণ হলো এই রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল কদরকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলেছেন (সূরা আল-কদর: ৩)। এক হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছরের ইবাদতের চেয়েও বেশি মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে রমজানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করতেন, তারপর মাঝের দশকে এবং পরে শেষ দশকে স্থায়ীভাবে ইতিকাফ করতে শুরু করেন কারণ তাঁকে জানানো হয় যে লাইলাতুল কদর শেষ দশকে আছে (সহিহ বুখারি: ২০১৬)। বিশেষভাবে বিজোড় রাতগুলোতে এই মহিমান্বিত রাত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

লাইলাতুল কদরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এই রাতে ফেরেশতারা এবং রুহ (জিবরাইল আ.) আল্লাহর অনুমতিক্রমে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং ভোর পর্যন্ত শান্তি বিরাজ করে (সূরা আল-কদর: ৪-৫)। এই রাতে যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে (বিশ্বাস ও সওয়াবের আশায়) রাত জেগে ইবাদত করবে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় বলে আশা করা যায় (সহিহ বুখারি: ১৯১০)। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদত করা এবং লাইলাতুল কদর তালাশ করা। যে ব্যক্তি পাঁচটি বিজোড় রাতেই ইবাদত করবে সে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর পাবে কারণ এই রাত এই পাঁচটির মধ্যেই রয়েছে।

বিজোড় রাতে করণীয় ইবাদত এবং আমল

বিজোড় রাতগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করা যায় এবং যত বেশি ইবাদত করা হবে তত বেশি সওয়াব লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। প্রথমত, নফল নামাজ পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাবিহ নামাজ জামাতের সাথে পড়ার পর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতগুলোতে দীর্ঘ কিয়াম (দাঁড়িয়ে থাকা) সহকারে নামাজ পড়তেন। দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা পড়া যায়। দ্বিতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত করা। লাইলাতুল কদরে কুরআন নাজিল হয়েছিল তাই এই রাতে কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করলে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, দোয়া করা। হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে লাইলাতুল কদর পেলে কী দোয়া করবেন? রাসুল (সা.) বললেন, "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি" (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন) - তিরমিজি: ৩৫১৩।

চতুর্থত, জিকির ও তাসবিহ পড়া। "সুবহানাল্লাহ", "আলহামদুলিল্লাহ", "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", "আল্লাহু আকবার" - এসব জিকির বারবার পড়া যায়। পঞ্চমত, ইস্তিগফার করা। "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলে গুনাহ থেকে ক্ষমা চাওয়া। ষষ্ঠত, দান-সদকা করা। এই রাতে দান করলে অনেক গুণ সওয়াব পাওয়া যায় বলে আশা করা যায়। সপ্তমত, পরিবারের সবাইকে জাগানো এবং একসাথে ইবাদত করা। রাসুল (সা.) এই দশকে পরিবারকে জাগাতেন। অষ্টমত, নিজের, পরিবারের এবং উম্মতের জন্য দোয়া করা। এই রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাই সব ধরনের দুনিয়াবি ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত। মূল বিষয় হলো এই রাতগুলোকে অলসতায় নষ্ট না করে ইবাদতে কাটানো।

প্রতিটি বিজোড় রাতের বিশেষত্ব

রমজানের শেষ দশকে পাঁচটি বিজোড় রাত রয়েছে - ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখের রাত। প্রতিটি রাতেরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ২১ তারিখের রাত হলো শেষ দশকের প্রথম বিজোড় রাত এবং এ থেকে ইবাদতের ধারাবাহিকতা শুরু করা উচিত। কিছু হাদিস অনুযায়ী এই রাতেও লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২৩ তারিখের রাত দ্বিতীয় বিজোড় রাত এবং এই রাতেও পূর্ণভাবে ইবাদত করা উচিত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সহ কিছু সাহাবি এই রাতকে গুরুত্ব দিতেন। ২৫ তারিখের রাত মাঝামাঝি বিজোড় রাত এবং এ পর্যন্ত আসলে ইবাদতের উৎসাহ আরও বাড়ানো উচিত। ২৭ তারিখের রাত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ অনেক সাহাবি এবং আলেম মনে করেন এই রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। হজরত উবাই ইবনে কা'ব (রা.) কসম করে বলতেন যে লাইলাতুল কদর হলো ২৭ রমজানের রাত (সহিহ মুসলিম: ৭৬২)।

২৯ তারিখের রাত হলো শেষ বিজোড় রাত এবং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু বছর রমজান ২৯ দিনে হয় তাই এটি রমজানের শেষ রাত হতে পারে। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন শেষ সাত দিনে লাইলাতুল কদর তালাশ কর (সহিহ বুখারি: ২০১৫)। তাই ২৯ তারিখের রাতও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল কথা হলো পাঁচটি বিজোড় রাতেই সমানভাবে ইবাদত করা উচিত কারণ কোন রাতে লাইলাতুল কদর হবে তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। যে ব্যক্তি সব কয়টি রাতেই ইবাদত করবে সে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদর পাবে এবং এর ফজিলত লাভ করবে বলে আশা করা যায়। তাই প্রতিটি রাতকে লাইলাতুল কদর মনে করে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইবাদত করা উচিত।

বিজোড় রাতের জন্য প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা

বিজোড় রাতগুলোতে সর্বোচ্চ ইবাদত করার জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। প্রথমত, শারীরিক প্রস্তুতি নিতে হবে। দিনের বেলা পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া যাতে রাতে জেগে থাকা যায়। অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলা কারণ পেট ভরে খেলে ঘুম আসে এবং ইবাদতে মনোযোগ থাকে না। দ্বিতীয়ত, মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। মনে মনে সংকল্প করতে হবে যে এই রাতগুলো ইবাদতে কাটাতে হবে এবং কোনো অজুহাতে ঘুমিয়ে পড়া যাবে না। তৃতীয়ত, পরিবারকে সাথে নেওয়া। স্ত্রী, সন্তান সবাইকে এই রাতের গুরুত্ব বোঝানো এবং একসাথে ইবাদতের পরিকল্পনা করা। চতুর্থত, কাজকর্মের পরিকল্পনা করা। যারা চাকরি বা ব্যবসা করেন তারা সম্ভব হলে শেষ দশকে ছুটি নিতে পারেন বা কাজের চাপ কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। পঞ্চমত, দোয়া মুখস্থ করে নেওয়া। বিশেষ করে "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন..." দোয়াটি মুখস্থ করা এবং রাত জুড়ে বারবার পড়া।

ষষ্ঠত, ইবাদতের স্থান প্রস্তুত করা। মসজিদে বা ঘরে যেখানে ইবাদত করবেন সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা। সপ্তমত, দান-সদকার জন্য টাকা আলাদা করে রাখা যাতে এই রাতে গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা যায়। অষ্টমত, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল থেকে দূরে থাকার সংকল্প করা। এই রাতগুলো অত্যন্ত মূল্যবান তাই সময় নষ্ট করা যাবে না। নবমত, ইতিকাফ করার চেষ্টা করা। যাদের সম্ভব তারা শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফে বসতে পারেন যা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কিফায়া। দশমত, নিয়তকে শুদ্ধ করা। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা এবং কোনো লোক দেখানো বা গর্ব করার মানসিকতা না রাখা। সঠিক প্রস্তুতি নিলে বিজোড় রাতগুলো পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো সম্ভব এবং লাইলাতুল কদরের ফজিলত লাভ করা যায় বলে আশা করা যায়।

বিজোড় রাতে পরিবার ও সন্তানদের ভূমিকা

বিজোড় রাতগুলোতে পরিবারের সবাইকে সাথে নিয়ে ইবাদত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত। হাদিসে এসেছে যে রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে পরিবারকে জাগাতেন এবং নিজের লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন অর্থাৎ পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন (সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)। স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা: স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে উৎসাহিত করবেন এবং একসাথে ইবাদত করবেন। স্ত্রী যদি ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন তাহলে স্বামীর উচিত সাহায্য করা যাতে তিনিও ইবাদত করতে পারেন। সন্তানদের ভূমিকা: সন্তানরা যত ছোটই হোক না কেন তাদের এই রাতের গুরুত্ব শেখানো উচিত। বড় সন্তানদের সাথে নিয়ে নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং দোয়া করা। ছোট সন্তানদের যতটুকু সম্ভব জাগিয়ে রাখা এবং তাদের সাথে সহজ ইবাদত করা যেমন তাসবিহ পড়া, ছোট সূরা পড়া ইত্যাদি। পরিবারের বয়স্কদের ভূমিকা: বয়স্ক বাবা-মা, দাদা-দাদি যারা রাত জাগতে পারেন না তাদের জন্য সহজ ইবাদতের ব্যবস্থা করা। তাদের বসে বসে নামাজ পড়া, জিকির করা এবং দোয়া করার সুযোগ দেওয়া।

পারিবারিক ইবাদতের পরিবেশ তৈরি: ঘরে একটি ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সবাই মিলে নামাজ পড়তে পারে, কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পারে এবং একসাথে দোয়া করতে পারে। সন্তানদের শিক্ষা: এই রাতগুলো সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। তাদের লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব, ইবাদতের ফজিলত এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা শেখানো যায়। পরিবারের জন্য দোয়া: এই রাতগুলোতে পরিবারের সবার জন্য দোয়া করা - সবার হেদায়েত, সুস্থতা, বরকত এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া। পরিবার মিলে ইবাদত করলে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয় এবং সবার মধ্যে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং ঘুম এলে পালাক্রমে ইবাদত করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত অনুসরণ করে পরিবার মিলে এই রাতগুলো কাটালে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ হয় বলে আশা করা যায়।

বিজোড় রাতে যা এড়িয়ে চলা উচিত

বিজোড় রাতগুলো অত্যন্ত মূল্যবান তাই এসব রাতে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা জরুরি। প্রথমত, অলসতা এবং ঘুম। এই রাতগুলো ঘুমিয়ে কাটানো মানে অসীম ফজিলত হাতছাড়া করা। যদিও ক্লান্তি আসতে পারে তবুও চেষ্টা করা উচিত রাত জেগে ইবাদত করার। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত খাওয়া। ইফতার এবং সেহরিতে পরিমিত খাওয়া উচিত কারণ অতিরিক্ত খেলে ঘুম আসে এবং ইবাদতে অলসতা আসে। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল ব্যবহার। এই রাতগুলোতে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব ইত্যাদিতে সময় নষ্ট করা মোটেও উচিত নয়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল বন্ধ রাখা বা সাইলেন্ট মোডে রাখা উচিত। চতুর্থত, অর্থহীন কথাবার্তা এবং হাসি-ঠাট্টা। এই রাতগুলো গুরুত্বের সাথে কাটানো উচিত এবং অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা উচিত। পঞ্চমত, টিভি এবং বিনোদন। নাটক, সিনেমা বা অন্যান্য বিনোদন দেখা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।

ষষ্ঠত, দুনিয়াবি কাজকর্ম। এই রাতগুলোতে ব্যবসা, চাকরি বা অন্যান্য দুনিয়াবি কাজ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা এবং শুধু ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া। সপ্তমত, রাগ-ঝগড়া এবং মনোমালিন্য। পরিবার বা অন্যদের সাথে কোনো ঝগড়া বা রাগারাগি করা থেকে বিরত থাকা। এই রাতগুলো শান্তি ও ভালোবাসার সাথে কাটানো উচিত। অষ্টমত, পাপ কাজ। যেকোনো ধরনের পাপ থেকে বিরত থাকা এবং নিজেকে পবিত্র রাखা। নবমত, লোক দেখানো ইবাদত। ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্য করা এবং মানুষকে দেখানোর জন্য নয়। দশমত, হতাশা এবং নিরাশা। যদি কোনো রাত মিস হয়ে যায় তাহলে হতাশ না হয়ে পরবর্তী রাতে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে ইবাদত করা। মনে রাখতে হবে এই রাতগুলো বছরে একবার আসে এবং এগুলো হাতছাড়া করা মানে বিরাট ক্ষতি। তাই সতর্ক থাকা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।

উপসংহার

রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অসাধারণ এক নিয়ামত। এই রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম এবং যে ব্যক্তি এই রাতগুলো ইবাদতে কাটায় তার জীবন বদলে যেতে পারে।

আসুন, আমরা সবাই রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতগুলোকে কাজে লাগাই। ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ - এই পাঁচটি রাতে পূর্ণভাবে ইবাদত করি। আগে থেকে প্রস্তুতি নিই - শারীরিক, মানসিক এবং পরিবারকে সাথে নিয়ে। দিনের বেলা বিশ্রাম নিই যাতে রাতে জাগতে পারি। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া - সব ধরনের ইবাদত করি। বিশেষভাবে "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি" দোয়াটি বারবার পড়ি। পরিবারের সবাইকে জাগাই এবং একসাথে ইবাদত করি। সন্তানদের এই রাতের গুরুত্ব শেখাই। সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি, অর্থহীন কথাবার্তা থেকে দূরে থাকি। মনে রাখি যে এই রাতগুলো অমূল্য এবং হাতছাড়া করলে বিরাট ক্ষতি। নিয়ত শুদ্ধ রাখি এবং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিজোড় রাতগুলো ইবাদতে কাটানোর এবং লাইলাতুল কদর পাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।


প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

১. বিজোড় রাতগুলো কোনগুলো এবং কেন এগুলো গুরুত্বপূর্ণ?

রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলো হলো ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখের রাত। এই রাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ কর (সহিহ বুখারি: ২০১৭)। যেহেতু নিশ্চিতভাবে জানা যায় না কোন রাতে লাইলাতুল কদর হবে তাই সব কয়টি বিজোড় রাতে ইবাদত করলে এই মহিমান্বিত রাত পাওয়া নিশ্চিত হয়। বিশেষভাবে ২৭ তারিখের রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে অনেক সাহাবি মনে করতেন তবে অন্য রাতগুলোও সমান গুরুত্বের সাথে পালন করা উচিত। যে ব্যক্তি এই পাঁচটি রাতই ইবাদতে কাটায় সে নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদরের ফজিলত পাবে বলে আশা করা যায়।

২. বিজোড় রাতে কোন ইবাদত সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ?

বিজোড় রাতে সব ধরনের ইবাদতই ফজিলতপূর্ণ তবে কিছু বিশেষ ইবাদত রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নফল নামাজ পড়া। রাসুল (সা.) এই রাতগুলোতে দীর্ঘ কিয়ামসহ নামাজ পড়তেন। কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কারণ লাইলাতুল কদরেই কুরআন নাজিল হয়েছিল। বিশেষভাবে দোয়া করা - রাসুল (সা.) শিখিয়েছেন "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি" এই দোয়া পড়তে (তিরমিজি: ৩৫১৩)। জিকির, তাসবিহ, ইস্তিগফার করা এবং দান-সদকা করাও ফজিলতপূর্ণ। মূল কথা হলো পুরো রাত ইবাদতে কাটানো এবং বিভিন্ন ধরনের ইবাদত করা যাতে একঘেয়েমি না আসে। যে ইবাদত যার কাছে সহজ লাগে সে সেটি বেশি করতে পারে তবে সবই মিশিয়ে করা উত্তম।

৩. যদি কোনো বিজোড় রাত মিস হয়ে যায় তাহলে কী করব?

যদি কোনো বিজোড় রাত মিস হয়ে যায় তাহলে হতাশ না হয়ে পরবর্তী রাতগুলোতে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে ইবাদত করা উচিত। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং তিনি মানুষের নিয়ত ও চেষ্টা দেখেন। যদি অসুস্থতা, জরুরি কাজ বা অন্য কোনো বৈধ কারণে একটি রাত মিস হয়ে যায় তাহলে বাকি রাতগুলো পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইবাদত করা উচিত। পাঁচটি বিজোড় রাতের মধ্যে যেকোনো একটিতে লাইলাতুল কদর পাওয়া যেতে পারে তাই বাকি রাতগুলোর সুযোগ রয়েছে। তবে চেষ্টা করা উচিত যেন কোনো রাত মিস না হয় কারণ প্রতিটি রাতই মূল্যবান। আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে সব কয়টি রাত ইবাদতে কাটানো সম্ভব। যদি ভুলক্রমে ঘুমিয়ে পড়েন তাহলে রাতের বাকি অংশ এবং পরবর্তী রাতগুলোতে ইবাদত করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।

৪. মহিলারা যদি হায়েজ/নিফাসে থাকেন তাহলে কি বিজোড় রাতের ফজিলত পাবেন?

হ্যাঁ, মহিলারা হায়েজ বা নিফাস অবস্থায় থাকলেও বিজোড় রাতের ফজিলত পেতে পারেন তবে তাদের ইবাদতের পদ্ধতি ভিন্ন হবে। যেহেতু এই অবস্থায় নামাজ পড়া এবং কুরআন স্পর্শ করা জায়েজ নেই তাই তারা অন্যান্য ইবাদত করতে পারেন। জিকির করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা, ইস্তিগফার করা - এসব করা যায়। বিশেষভাবে "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন..." দোয়াটি পড়া যায়। মোবাইল বা কম্পিউটারে কুরআনের অর্থ পড়া যায় (আরবি টেক্সট স্পর্শ না করে)। ইসলামিক বই পড়া, লেকচার শোনা, দান-সদকা করা এবং অন্যদের ইবাদতে সাহায্য করা যায়। পরিবারের অন্যদের জন্য খাবার তৈরি করা, সন্তানদের দেখাশোনা করা যাতে তারা ইবাদত করতে পারে - এসবও ইবাদত হিসেবে গণ্য হতে পারে। আল্লাহ নিয়ত ও চেষ্টা দেখেন তাই আন্তরিকতার সাথে যা পারা যায় তা করলে ফজিলত পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

৫. বিজোড় রাতে কি সারারাত জাগা আবশ্যক নাকি কিছু সময় ইবাদত করলেই হবে?

সারারাত জাগা আবশ্যক নয় তবে যত বেশি সময় ইবাদত করা যায় তত বেশি ফজিলত পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতগুলোতে রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন তাই সারারাত জাগা সুন্নত এবং উত্তম। তবে যদি কারো শারীরিক অবস্থা এমন হয় যে সারারাত জাগা সম্ভব নয় তাহলে রাতের কিছু অংশ ইবাদত করলেও ফজিলত পাওয়া যাবে। বিশেষভাবে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কারণ এই সময় আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে আসেন এবং বান্দাদের ডাকেন। তাই অন্তত রাতের শেষাংশ জেগে ইবাদত করা উচিত। কেউ যদি প্রথম অংশে ঘুমিয়ে পড়েন তাহলে শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ, দোয়া এবং ইস্তিগফার করা যায়। মূল বিষয় হলো আন্তরিকতা এবং চেষ্টা। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন এবং ফজিলত দান করবেন বলে আশা করা যায়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url