ঈদুল ফিতর নামাজের নিয়ত, নিয়ম ও দোয়া | Eid Namaz Niyat Bangla | Eid Prayer Rules
ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত সহ ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাইড
ভূমিকা
ঈদুল ফিতর মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও খুশির একটি বিশেষ দিন যা রমজান মাসের রোজা শেষে উদযাপিত হয়। এই দিনে ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব এবং এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা প্রতীক। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে যা জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত ঈদের নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবিদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)। তবে অনেকে ঈদের নামাজের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ঈদের নামাজ সাধারণ নামাজের চেয়ে ভিন্ন এবং এতে অতিরিক্ত তাকবির রয়েছে। এই লেখায় আমরা হানাফি মাজহাব অনুসারে ঈদুল ফিতরের নামাজের সম্পূর্ণ নিয়ম ধাপে ধাপে শিখব যাতে আপনি সহজেই এই ফজিলতপূর্ণ ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করতে পারেন।
ঈদের নামাজের হুকুম ও গুরুত্ব
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজ ওয়াজিব এবং এটি ছেড়ে দেওয়া গুনাহের কাজ। অন্যান্য কিছু মাজহাবে এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বলা হলেও হানাফি ফিকহে এর মর্যাদা বেশি। কাদের উপর ওয়াজিব: যাদের উপর জুমার নামাজ ওয়াজিব তাদের উপর ঈদের নামাজও ওয়াজিব অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকিম (মুসাফির নয়) পুরুষদের জন্য। মহিলা, শিশু, অসুস্থ এবং মুসাফিরদের জন্য এটি ওয়াজিব নয় তবে তারা চাইলে আদায় করতে পারেন। মহিলাদের অংশগ্রহণ: হাদিসে এসেছে যে রাসুল (সা.) মহিলাদের ঈদের নামাজে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এমনকি যাদের ঋতুস্রাব চলছে তারাও ঈদগাহে যাবে তবে নামাজের স্থান এড়িয়ে চলবে (সহিহ বুখারি: ৯৮০)। ঈদের নামাজের সময়: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজের সময় শুরু হয় সূর্য উদিত হওয়ার পর যখন সূর্য এক বর্শা পরিমাণ উঁচু হয় এবং শেষ হয় জোহরের ওয়াক্তের ঠিক আগে। তবে ইশরাকের সময়ের পর পড়া উত্তম। ঈদগাহে নামাজ পড়া: ঈদের নামাজ খোলা মাঠ বা ঈদগাহে পড়া সুন্নত এবং রাসুল (সা.) সাধারণত ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)। তবে বৃষ্টি বা বিশেষ কারণে মসজিদেও পড়া যায়।
ঈদের নামাজের এই গুরুত্ব বুঝে প্রতিটি মুসলমানের উচিত এতে অংশগ্রহণ করা এবং সঠিক নিয়মে আদায় করা। এটি রমজানের রোজার পরিপূর্ণতার প্রতীক এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।
ঈদের নামাজের আগে যা করণীয়
ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে কিছু সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল রয়েছে যা হানাফি ফিকহে উল্লেখিত। গোসল করা: ঈদের দিন গোসল করা সুন্নত এবং রাসুল (সা.) ঈদের জন্য গোসল করতেন (ইবনে মাজাহ: ১৩১৫)। এটি পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতীক। মিসওয়াক করা: দাঁত পরিষ্কার করা এবং মুখের পবিত্রতা রক্ষা করা সুন্নত। সুন্দর পোশাক পরা: সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা মুস্তাহাব। রাসুল (সা.) এর ঈদের জন্য বিশেষ পোশাক ছিল (আবু দাউদ: ১০৭৮)। আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার: পুরুষদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব কারণ এটি বিশেষ দিনের শোভা বর্ধন করে। ফিতরা আদায়: ঈদের নামাজের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এটি ফজরের সময় থেকে ওয়াজিব হয় এবং ঈদের নামাজের আগে আদায় করা উত্তম (সহিহ বুখারি: ১৫০৩)। কিছু মিষ্টি খেয়ে যাওয়া: ঈদুল ফিতরের দিন নামাজে যাওয়ার আগে কিছু মিষ্টি খাওয়া সুন্নত এবং রাসুল (সা.) খেজুর খেতেন বিজোড় সংখ্যায় (সহিহ বুখারি: ৯৫৩)। এটি রোজা ভাঙার প্রতীক এবং ঈদুল আজহায় এই নিয়ম নেই।
তাকবিরে তাশরিক পড়া: ঈদগাহে যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তাকবির পড়া সুন্নত। "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।" ভিন্ন পথে যাওয়া-আসা: যে পথে ঈদগাহে যাওয়া হবে ভিন্ন পথে ফিরে আসা সুন্নত (সহিহ বুখারি: ৯৮৬)। এই প্রস্তুতিগুলো ঈদের নামাজের জন্য আধ্যাত্মিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করে এবং সুন্নতের অনুসরণ হয়।
ঈদের নামাজের নিয়ত ও পদ্ধতি
হানাফি মাজহাবে ঈদের নামাজ দুই রাকাত এবং এতে মোট ছয়টি অতিরিক্ত তাকবির রয়েছে যা বিশেষ পদ্ধতিতে দেওয়া হয়। নিয়ত করা: আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের সঙ্গে এই ইমামের পেছনে আদায় করার নিয়ত করছি -'আল্লাহু আকবার। মুখে নিয়ত উচ্চারণ জরুরি নয়। প্রথম রাকাত শুরু: ইমামের সাথে তাকবিরে তাহরিমা "আল্লাহু আকবার" বলে হাত বাঁধবেন (হাত নাভির নিচে)। এরপর সানা পড়বেন: "সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা..." তিন অতিরিক্ত তাকবির (প্রথম রাকাত): সানা পড়ার পর ইমাম তিনটি অতিরিক্ত তাকবির দেবেন। প্রতিটি তাকবিরে "আল্লাহু আকবার" বলে হাত কান পর্যন্ত উঠাবেন এবং ছেড়ে দিবেন (হাত ঝুলিয়ে রাখবেন)। তৃতীয় তাকবিরের পর হাত বাঁধবেন। হানাফি মাজহাবে প্রতিটি তাকবিরের মধ্যে "সুবহানাল্লাহ" তিনবার পরিমাণ সময় অপেক্ষা করা হয়। কিরাত: ইমাম আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা জোরে পড়বেন। হানাফি মাজহাবে যেকোনো সূরা পড়া যায় তবে সূরা আলা বা কাফ পড়া মুস্তাহাব। রুকু-সিজদা: রুকু এবং দুই সিজদা সাধারণ নামাজের মতই হবে। দ্বিতীয় রাকাত: দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ, সূরা ফাতিহা এবং অন্য সূরা পড়া হবে। তিন অতিরিক্ত তাকবির (দ্বিতীয় রাকাত): কিরাত শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে তিনটি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হবে একই নিয়মে। তৃতীয় তাকবিরের পর চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যাবেন।
তাশাহহুদ ও সালাম: রুকু-সিজদার পর বসে আত্তাহিয়াতু, দরূদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে ডানে-বামে সালাম ফিরাবেন। এভাবে হানাফি পদ্ধতিতে প্রথম রাকাতে তিন এবং দ্বিতীয় রাকাতে তিন অতিরিক্ত তাকবির সহ মোট ছয় অতিরিক্ত তাকবির হয়। এই পদ্ধতি হানাফি ফিকহের কিতাবে বিস্তারিত বর্ণিত আছে।
ঈদের খুতবা এবং এর বিধান
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের খুতবা নামাজের পরে হয় এবং এর কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। খুতবার সময়: ঈদের খুতবা নামাজের পরে দেওয়া হয় যা জুমার খুতবার বিপরীত। রাসুল (সা.) প্রথমে নামাজ পড়তেন তারপর খুতবা দিতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)। খুতবা শোনার হুকুম: হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের খুতবা শোনা সুন্নত কিন্তু ওয়াজিব নয়। তাই কেউ নামাজ শেষে চলে গেলে গুনাহ হবে না তবে থেকে শোনা উত্তম এবং বেশি সওয়াবের কাজ। খুতবার সংখ্যা: ঈদের খুতবা দুইটি হয় এবং মাঝে সংক্ষিপ্ত বিরতি নিয়ে বসা হয়। উভয় খুতবা শুরুতে তাকবির দেওয়া হয় - প্রথম খুতবায় নয়টি তাকবির এবং দ্বিতীয় খুতবায় সাতটি তাকবির। খুতবার বিষয়বস্তু: ইমাম খুতবায় সাধারণত আল্লাহর প্রশংসা, রাসুল (সা.) এর উপর দরূদ, রমজান ও রোজার ফজিলত, সদকাতুল ফিতর, হালাল-হারাম এবং সামাজিক বিষয়ে নসিহত করেন। খুতবার সময় করণীয়: খুতবা চলাকালীন চুপ থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত তবে এটি জুমার মত ওয়াজিব নয়। কথা বলা মাকরুহ কিন্তু নামাজ নষ্ট হয় না। খুতবার পর: খুতবা শেষে দোয়া করা যায় এবং একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো মুস্তাহাব।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ঈদগাহে বা খোলা মাঠে ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ নেই। তবে মসজিদে হলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া যায়। খুতবা ঈদের নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এতে দীনি ও সামাজিক উপকারী শিক্ষা থাকে তাই মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত।
ঈদের নামাজে সাধারণ ভুল এবং সমাধান
ঈদের নামাজে কিছু সাধারণ ভুল হয় যা এড়ানো উচিত এবং সঠিক নিয়ম জানা জরুরি। তাকবিরের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি: হানাফি মাজহাবে প্রতি রাকাতে তিনটি করে অতিরিক্ত তাকবির। অনেকে অন্য মাজহাবের নিয়মের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। নিজের মাজহাব অনুসরণ করা উচিত। হাত না তোলা: প্রতিটি অতিরিক্ত তাকবিরে হাত কান পর্যন্ত তোলা সুন্নত কিন্তু অনেকে এটি করেন না। সঠিক নিয়ম হলো প্রতিটি তাকবিরে হাত তোলা এবং ছেড়ে দেওয়া। তাকবিরের মধ্যে কিছু না পড়া: হানাফি মাজহাবে তাকবিরের মধ্যবর্তী সময়ে চুপ থাকা এবং "সুবহানাল্লাহ" তিনবার পরিমাণ সময় অপেক্ষা করা। অনেকে তাড়াহুড়ো করেন যা ঠিক নয়। ফিতরা না দিয়ে নামাজে যাওয়া: ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। না দিলে নামাজ হবে তবে ওয়াজিব ছুটে যাবে এবং পরে আদায় করতে হবে। খালি পেটে না খেয়ে যাওয়া: ঈদুল ফিতরে নামাজের আগে কিছু খাওয়া সুন্নত। অনেকে খালি পেটে চলে যান যা সুন্নত পরিপন্থী। দেরিতে পৌঁছানো: সময়মত ঈদগাহে পৌঁছানো উচিত যাতে নামাজ ছুটে না যায়। নামাজের আগে নফল পড়া: ঈদগাহে নামাজের আগে বা পরে নফল পড়া সুন্নত নয় বরং মাকরুহ। তবে মসজিদে হলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া যায়।
এই ভুলগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে এবং সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে ঈদের নামাজ যথাযথভাবে আদায় হবে বলে আশা করা যায়। আগে থেকে নিয়ম জেনে রাখলে নামাজের সময় কোনো সমস্যা হয় না এবং মনোযোগ বজায় রাখা সহজ হয়।
ঈদের পরের সুন্নত আমল
ঈদের নামাজ শেষ হলে কিছু সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল রয়েছে যা পালন করা উত্তম। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়: একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো সুন্নত। "ঈদ মুবারক", "তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম" (আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের আমল কবুল করুন) বলা যায়। সাহাবিরা পরস্পরকে এভাবে শুভেচ্ছা জানাতেন। আত্মীয়তা বজায় রাখা: পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করা এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখা উৎসাহিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) আত্মীয়তা রক্ষার গুরুত্ব দিয়েছেন। দান-সদকা করা: ঈদের দিন গরিব-মিসকিনদের সাহায্য করা এবং দান করা ফজিলতপূর্ণ কাজ যাতে সবাই ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। আনন্দ ও বৈধ উৎসব: ঈদ আনন্দের দিন এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানো, ভালো খাবার খাওয়া এবং বৈধ উপায়ে আনন্দ করা জায়েজ। তবে ইসলামি সীমা রক্ষা করা জরুরি। কবর জিয়ারত: কিছু এলাকায় ঈদের দিন কবর জিয়ারতের রেওয়াজ আছে। এটি জায়েজ তবে বিশেষভাবে ঈদের জন্য নির্ধারিত নয়। যেকোনো সময় কবর জিয়ারত করা যায়। মধ্যপন্থা অবলম্বন: ঈদে খরচ করা উচিত তবে অপচয় না করা এবং কৃপণতা না করা। ভারসাম্য রক্ষা করা উত্তম।
হারাম থেকে বিরত থাকা: ঈদের নামে গান-বাজনা, নাচ, বেপর্দা হওয়া বা অন্য কোনো হারাম কাজ করা যাবে না। ইসলামি সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ করা উচিত। ঈদ শুধু একদিনের উৎসব নয় বরং এটি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং নতুন করে ভালো কাজ শুরু করার সংকল্পের দিন। ঈদের পর রমজানে অর্জিত তাকওয়া ও ভালো অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।
উপসংহার
ঈদুল ফিতরের নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যা রমজানের রোজা শেষে আল্লাহর শোকর আদায়ের মাধ্যম। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এই নামাজ ওয়াজিব এবং সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের দায়িত্ব।
আসুন, আমরা সবাই ঈদুল ফিতরের নামাজ যথাযথভাবে আদায় করি। নামাজের আগে গোসল করি এবং পরিচ্ছন্ন হই। সুন্দর পোশাক পরি এবং সুগন্ধি ব্যবহার করি। সময়মত সদকাতুল ফিতর আদায় করি যাতে গরিবরা ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে। ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে কিছু মিষ্টি বা খেজুর খাই। তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাই এবং জামাতে শরিক হই। হানাফি পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতি রাকাতে তিনটি করে অতিরিক্ত তাকবির সহ নামাজ আদায় করি। প্রতিটি তাকবিরে হাত তুলি এবং সুন্নত অনুসরণ করি। খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং এর থেকে শিক্ষা নিই। নামাজ শেষে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সাথে দেখা করি এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি। দান-সদকা করি এবং গরিবদের সাহায্য করি। ঈদের আনন্দ উপভোগ করি তবে ইসলামি সীমার মধ্যে থাকি। মনে রাখি যে ঈদ শুধু একদিনের আনন্দ নয় বরং এটি আল্লাহর রহমত এবং মাগফিরাতের উসিলা। রমজানে যে ভালো আমল করেছি তা সারা বছর চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার ঈদের নামাজ এবং সকল ইবাদত কবুল করুন। আমাদের রমজানের রোজা ও আমল কবুল করুন এবং আগামী রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ঈদের নামাজে কতটি তাকবির এবং কীভাবে দিতে হয়?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজে প্রতি রাকাতে তিনটি করে অতিরিক্ত তাকবির রয়েছে। প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমা ও সানার পর তিনটি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হয়। প্রতিটি তাকবিরে "আল্লাহু আকবার" বলে হাত কান পর্যন্ত উঠাতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। তৃতীয় তাকবিরের পর হাত বেঁধে ইমাম কিরাত শুরু করবেন। দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ার পর তিনটি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হয় এবং তৃতীয় তাকবিরের পর চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যেতে হয়। তাকবিরগুলোর মধ্যে "সুবহানাল্লাহ" তিনবার পরিমাণ সময় অপেক্ষা করা হয় যাতে মুক্তাদিরা তাকবির দিতে পারে। এই পদ্ধতি হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বিস্তারিত বর্ণিত আছে এবং এভাবেই হানাফি মাজহাবের অনুসারীরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। মনে রাখার সহজ উপায়: ৩+৩ = ৬ অতিরিক্ত তাকবির।
২. ঈদের নামাজের আগে সদকাতুল ফিতর কখন আদায় করতে হয় এবং কী পরিমাণ?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সদকাতুল ফিতর ঈদের দিন ফজরের সময় থেকে ওয়াজিব হয় এবং ঈদের নামাজের আগে আদায় করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন (সহিহ বুখারি: ১৫০৩)। তবে রমজানের যেকোনো সময় এমনকি শুরু থেকেই আগাম দেওয়া জায়েজ। ফিতরার পরিমাণ হলো প্রতি ব্যক্তির পক্ষ থেকে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে অর্ধ সা গম বা এক সা খেজুর/যব বা তার বাজার মূল্য। বর্তমানে টাকার হিসাবে এটি প্রায় ৮০-১০০ টাকা বা স্থানীয় বাজার মূল্য অনুযায়ী হতে পারে। এটি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের পক্ষ থেকে - পুরুষ, মহিলা, শিশু সবার জন্য আদায় করতে হয়। ফিতরা গরিব-মিসকিনদের দেওয়া হয় যাতে তারাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে এবং এটি রোজার ত্রুটি পূরণ করে। দেরি করে দিলেও আদায় করতে হবে তবে সময়মত দেওয়া উত্তম।
৩. ঈদের নামাজের সময় কখন এবং ঈদগাহে পড়া কেন উত্তম?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের নামাজের সময় শুরু হয় সূর্য উদিত হওয়ার পর যখন সূর্য এক বর্শা পরিমাণ (প্রায় ১৫-২০ মিনিট) উঁচু হয় এবং শেষ হয় জোহরের ওয়াক্তের ঠিক আগে। তবে ইশরাকের সময়ের পর (সূর্যোদয়ের প্রায় ৪৫ মিনিট পর) থেকে পড়া উত্তম এবং সাধারণত সকাল ৮-৯টার মধ্যে পড়া হয়। ঈদগাহ বা খোলা মাঠে নামাজ পড়া সুন্নত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)। ঈদগাহে পড়ার কিছু কারণ: বেশি মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পারে, মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শিত হয়, এটি রাসুল (সা.) এর নিয়মিত আমল ছিল এবং ইসলামের প্রকাশ্য শিআর। তবে বৃষ্টি, ঝড় বা অন্য বৈধ কারণে মসজিদেও পড়া যায় এবং নামাজ সহিহ হবে। ঈদের নামাজে আজান বা ইকামত দেওয়া হয় না।
৪. ঈদের নামাজের খুতবা কি শোনা ওয়াজিব এবং না শুনলে কী হবে?
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদের খুতবা নামাজের পরে হয় এবং এটি শোনা সুন্নত কিন্তু ওয়াজিব নয়। জুমার খুতবার সাথে পার্থক্য হলো জুমার খুতবা ওয়াজিব এবং না শুনলে নামাজ হয় না কিন্তু ঈদের খুতবা সুন্নত এবং না শুনলেও নামাজ সহিহ হয়। তবে খুতবায় গুরুত্বপূর্ণ দীনি নসিহত থাকে তাই থেকে শোনা উত্তম এবং বেশি সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে নামাজ পড়তেন তারপর খুতবা দিতেন (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)। ইমাম দুটি খুতবা দেন এবং প্রথম খুতবায় নয়টি ও দ্বিতীয় খুতবায় সাতটি তাকবির দেন। খুতবায় সাধারণত রমজান ও রোজার ফজিলত, সদকাতুল ফিতর, হালাল-হারাম এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। খুতবা চলাকালীন চুপ থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত তবে কথা বললে নামাজ নষ্ট হয় না বরং মাকরুহ হয়। যদি কেউ নামাজ শেষে জরুরি কাজে চলে যায় তাহলে গুনাহ হবে না তবে থাকা উত্তম। খুতবা শেষে দোয়া করা এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।
৫. ঈদের দিন নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ আছে কি?
না, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ঈদগাহ বা খোলা মাঠে ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল নামাজ নেই এবং পড়া মাকরুহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নফল পড়েননি (সহিহ বুখারি: ৯৮৯)। ঈদের নামাজ একাই যথেষ্ট এবং এর আগে-পরে কোনো সুন্নত বা নফল নেই। তবে যদি ঈদের নামাজ মসজিদে হয় তাহলে মসজিদে প্রবেশ করে তাহিয়্যাতুল মসজিদ দুই রাকাত পড়া জায়েজ কারণ এটি মসজিদের হক। ঈদগাহে এই নফলও নেই কারণ ঈদগাহ সারা বছর নামাজের জায়গা নয়। ঈদের নামাজের পর ঘরে ফিরে চাশতের সময় হলে চাশতের নামাজ পড়া যায় যা আলাদা বিষয়। ঈদুল ফিতরের দিন নামাজে যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া সুন্নত - এটি রোজা ভাঙার প্রতীক। ঈদুল আজহায় এই নিয়ম ভিন্ন - সেখানে কুরবানির গোশত খেয়ে নামাজ পড়া সুন্নত। ঈদের নামাজের পর পরিবার-পরিজনের সাথে সময় কাটানো, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আনন্দ উপভোগ করা ঈদের সুন্নত।

