ব্যবসায়ের যাকাত নির্ণয় | সহজ হিসাব ও নিয়ম


business-zakat-calculation


ব্যবসায়ের যাকাত নির্ণয়: সহজ হিসাব ও শরয়ী নিয়ম

ভূমিকা

ব্যবসায়ের যাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা অনেক ব্যবসায়ী সঠিকভাবে জানেন না। ব্যবসায়িক সম্পদ যখন নিসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তখন তার উপর যাকাত ফরজ হয়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা যা উপার্জন কর এবং জমিন থেকে যা বের করি তার থেকে ব্যয় কর (সূরা বাকারা: ২৬৭)। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায়ের মালের যাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (আবু দাউদ: ১৫৬২)। কিন্তু ব্যবসায়ের যাকাত কীভাবে হিসাব করতে হয়, কোন সম্পদের উপর যাকাত দিতে হবে এবং কোনটার উপর নয় - এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। এই লেখায় আমরা ব্যবসায়ের যাকাত নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি, শরয়ী নিয়ম এবং বাস্তব উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে ব্যবসায়ীরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করতে পারেন।

ব্যবসায়ের যাকাত কী এবং কেন ফরজ

ব্যবসায়ের যাকাত বলতে বোঝায় ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য রাখা পণ্য ও সম্পদের উপর প্রদত্ত যাকাত। যে কোনো ব্যবসা - পাইকারি, খুচরা, আমদানি-রপ্তানি, কারখানা বা সেবামূলক ব্যবসা - সবখানে যাকাতের বিধান প্রযোজ্য। ইসলামি শরিয়তে ব্যবসায়ের মাল 'মালে তিজারাত' নামে পরিচিত। এই মাল বলতে সেই সম্পদকে বোঝায় যা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়েছে এবং মুনাফা অর্জনের নিয়তে রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ের যাকাত ফরজ হওয়ার মূল কারণ হলো এটি বৃদ্ধিশীল সম্পদ এবং ইসলাম চায় সম্পদ শুধু একজনের কাছে পুঞ্জীভূত না হয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ুক।

ব্যবসায়ের যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত কয়েকটি। প্রথমত, ব্যবসায়ী মুসলমান হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক সম্পদ নিসাব পরিমাণ হতে হবে অর্থাৎ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের সমপরিমাণ মূল্য। তৃতীয়ত, এক চান্দ্র বছর পূর্ণ হতে হবে। চতুর্থত, সম্পদ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে রাখা হতে হবে, নিজে ব্যবহারের জন্য নয়। পঞ্চমত, সম্পদ ঋণমুক্ত হতে হবে অর্থাৎ মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পর অতিরিক্ত সম্পদ থাকতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ হলে ব্যবসায়ের মোট সম্পদের উপর ২.৫% বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত দিতে হয়। ব্যবসায়ের যাকাত আদায় করা শুধু ফরজ ইবাদতই নয়, এটি ব্যবসায়ে বরকত ও সমৃদ্ধি আনে বলে আশা করা যায়।

ব্যবসায়ের যাকাত হিসাবের পদ্ধতি

ব্যবসায়ের যাকাত হিসাব করার জন্য প্রথমে বছরের একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করতে হবে - যেমন রমজান মাসের শেষ দিন বা হিজরি নববর্ষের প্রথম দিন। সেই নির্দিষ্ট তারিখে ব্যবসায়ের মোট সম্পদের হিসাব করতে হবে। প্রথম ধাপ: সম্পদ যোগ করুন - হাতে নগদ টাকা, ব্যাংকে জমা টাকা, বিক্রয়যোগ্য মালামাল (stock/inventory), বাকিতে বিক্রয় করা পণ্যের প্রাপ্য টাকা (receivables), অন্যকে ঋণ দেওয়া টাকা যা ফেরত পাওয়ার আশা আছে - এসব যোগ করুন। দ্বিতীয় ধাপ: দায় বাদ দিন - ব্যবসায়িক ঋণ, কর্মচারীদের বেতন, সরবরাহকারীদের প্রদেয় টাকা - এসব বাদ দিন। তৃতীয় ধাপ: মোট সম্পদের ২.৫% হিসাব করুন

হিসাবের সূত্র: (মোট সম্পদ - মোট দায়) × ২.৫% = যাকাতের পরিমাণ। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যবসায়ীর হাতে নগদ ২ লাখ টাকা, স্টক ৮ লাখ টাকা, প্রাপ্য ৩ লাখ টাকা এবং প্রদেয় ৫ লাখ টাকা। হিসাব: (২+৮+৩-৫) = ৮ লাখ টাকা। যাকাত = ৮ লাখ × ২.৫% = ২০ হাজার টাকা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্টক মূল্যায়ন করতে হবে বর্তমান বাজার মূল্যে, ক্রয়মূল্যে নয়। যদি কোনো পণ্যের ক্রয়মূল্য ১০০ টাকা এবং বর্তমান বাজার মূল্য ৮০ টাকা হয় তাহলে ৮০ টাকা ধরতে হবে। অর্থাৎ কত টাকায় এখন বিক্রি করা যাবে সেই মূল্যে হিসাব করা উত্তম। ব্যবসায়ের স্থায়ী সম্পদ যেমন দোকানের ভবন, যন্ত্রপাতি, ডেলিভারি গাড়ি ইত্যাদির উপর যাকাত নেই, শুধু বিক্রয়যোগ্য পণ্যের উপর যাকাত দিতে হবে।

যে সম্পদের উপর যাকাত আছে এবং নেই

ব্যবসায়ে অনেক ধরনের সম্পদ থাকে। সব সম্পদের উপর যাকাত নেই, শুধু নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের উপর যাকাত ফরজ। যে সম্পদের উপর যাকাত আছে: ১. বিক্রয়ের জন্য রাখা পণ্য (মালামাল/স্টক), ২. হাতে নগদ টাকা, ৩. ব্যাংকে জমাকৃত টাকা, ৪. বাকিতে বিক্রয়কৃত পণ্যের প্রাপ্য টাকা যা আদায়যোগ্য, ৫. অন্যকে দেওয়া ঋণ যা ফেরত পাওয়া যাবে, ৬. কাঁচামাল যা প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করা হবে, ৭. অর্ধ-প্রস্তুত পণ্য যা শেষ করে বিক্রি করা হবে। এসব সম্পদের মোট বর্তমান বাজার মূল্যের উপর যাকাত হিসাব করতে হবে।

যে সম্পদের উপর যাকাত নেই: ১. ব্যবসায়ের স্থায়ী সম্পদ - দোকান/কারখানার ভবন, জমি, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, গাড়ি ইত্যাদি যা বিক্রয়ের জন্য নয় বরং ব্যবহারের জন্য রাখা। ২. অফিসের সরঞ্জাম ও ফিক্সচার। ৩. যে ঋণ ফেরত পাওয়ার কোনো আশা নেই। ৪. অগ্রিম পরিশোধিত ভাড়া বা খরচ। ৫. ব্যবসায়িক ট্রেডমার্ক বা গুডউইল। এই পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি কারণ ভুল হিসাব করলে যাকাত কম বা বেশি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কাপড়ের দোকানে যে কাপড় বিক্রির জন্য আছে তার উপর যাকাত হবে কিন্তু দোকানের আলমারি, ক্যাশ কাউন্টার বা এসির উপর যাকাত হবে না। কারখানার ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও তৈরি পণ্যের উপর যাকাত হবে কিন্তু মেশিনারির উপর হবে না।

বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ে যাকাত

বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ের যাকাত হিসাবে কিছু পার্থক্য আছে। খুচরা ব্যবসা: দোকানে যত পণ্য আছে সবের বাজার মূল্য + নগদ টাকা - প্রদেয় বিল = মোট সম্পদ। এর ২.৫% যাকাত। পাইকারি ব্যবসা: গুদামের সব মালামালের মূল্য + নগদ + প্রাপ্য - প্রদেয় = মোট সম্পদ। উৎপাদন ব্যবসা/কারখানা: কাঁচামাল + অর্ধ-প্রস্তুত পণ্য + তৈরি পণ্য + নগদ + প্রাপ্য - প্রদেয়। মেশিনারির মূল্য যোগ হবে না। সেবামূলক ব্যবসা (হোটেল, ট্রান্সপোর্ট ইত্যাদি): বছর শেষে হাতে যে নগদ টাকা জমা হয়েছে + প্রাপ্য - প্রদেয়। আসবাবপত্র বা গাড়ির উপর যাকাত হবে না।

রিয়েল এস্টেট ব্যবসা: যে জমি/ফ্ল্যাট বিক্রির জন্য কেনা তার বর্তমান বাজার মূল্যের উপর যাকাত হবে। কিন্তু যে ভবন ভাড়া দেওয়ার জন্য কেনা তার মূল্যের উপর যাকাত হবে না, শুধু ভাড়া থেকে আয়কৃত টাকার উপর যাকাত হবে। শেয়ার ব্যবসা: যে শেয়ার কিনে দীর্ঘমেয়াদে রাখা (বিনিয়োগ) তার লভ্যাংশের উপর যাকাত এবং যে শেয়ার কিনে বিক্রি করা হয় (ট্রেডিং) তার সম্পূর্ণ মূল্যের উপর যাকাত। অনলাইন ব্যবসা: স্টকের মূল্য + পেমেন্ট গেটওয়েতে জমা টাকা + ব্যাংকে টাকা - সরবরাহকারীদের প্রদেয়। প্রতিটি ব্যবসায়ের ধরন অনুযায়ী হিসাবে সামান্য পার্থক্য হলেও মূল নীতি একই - বিক্রয়যোগ্য সম্পদ + নগদ - দায় = যাকাতযোগ্য সম্পদ।

business-zakat-calculation

ব্যবসায়ের যাকাতে সাধারণ ভুল

ব্যবসায়ীরা প্রায়ই কিছু সাধারণ ভুল করেন যাকাত হিসাবে। প্রথম ভুল: স্থায়ী সম্পদের উপর যাকাত দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে দ্বিধা। মনে রাখবেন, ব্যবহারের জন্য কেনা সম্পদের উপর যাকাত নেই। দ্বিতীয় ভুল: ক্রয়মূল্যে স্টক মূল্যায়ন করা। সঠিক হলো বর্তমান বাজার মূল্যে হিসাব করা। তৃতীয় ভুল: শুধু মুনাফার উপর যাকাত দেওয়া। আসলে মূলধন ও মুনাফা মিলিয়ে মোট সম্পদের উপর যাকাত। চতুর্থ ভুল: ব্যবসায়িক ঋণ বাদ না দিয়ে হিসাব করা। প্রদেয় টাকা অবশ্যই বাদ দিতে হবে। পঞ্চম ভুল: প্রতি লেনদেনে বা মাসিক যাকাত দেওয়া। সঠিক নিয়ম হলো বছরে একবার নির্দিষ্ট তারিখে হিসাব করে যাকাত দেওয়া।

ষষ্ঠ ভুল: যাকাত না দিয়ে ব্যবসায়ে পুনঃবিনিয়োগ করা। যাকাত ফরজ এবং তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। সপ্তম ভুল: যাকাতের টাকা ব্যবসায় খরচ বা কর্মচারী বেতনে ব্যবহার করা। যাকাত শুধুমাত্র নির্ধারিত খাতে দিতে হবে। অষ্টম ভুল: পার্টনারশিপ ব্যবসায় শুধু নিজের অংশের যাকাত না দিয়ে পুরো ব্যবসার যাকাত এক জায়গায় দেওয়া। প্রতি পার্টনার নিজ নিজ অংশের যাকাত আলাদাভাবে দেবেন। নবম ভুল: হিসাব না রেখে আন্দাজে যাকাত দেওয়া। সঠিক হিসাব রাখা এবং বছরের নির্দিষ্ট দিনে যাকাত হিসাব করা জরুরি। এসব ভুল এড়িয়ে সঠিকভাবে যাকাত আদায় করলে ব্যবসায়ে বরকত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় বলে আশা করা যায়।

বাস্তব উদাহরণ ও টিপস

একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যাক। জনাব করিম একটি ইলেকট্রনিক্স দোকানের মালিক। ১ রমজান ১৪৪৫ হিজরি তারিখে তার হিসাব: দোকানে বিক্রয়যোগ্য পণ্য (বর্তমান বাজার মূল্য) = ৮ লাখ টাকা, হাতে নগদ = ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা = ২ লাখ টাকা, কাস্টমারদের কাছে প্রাপ্য = ১ লাখ টাকা, সরবরাহকারীদের প্রদেয় = ৩ লাখ টাকা। মোট সম্পদ = ৮+০.৫+২+১-৩ = ৮.৫ লাখ টাকা। যাকাত = ৮.৫ লাখ × ২.৫% = ২১,২৫০ টাকা। উল্লেখ্য, তার দোকানের ভবন ৫০ লাখ টাকা মূল্যের কিন্তু তা স্থায়ী সম্পদ তাই হিসাবে আসেনি।

যাকাত হিসাবের কিছু টিপস: ১. বছরের শুরুতে একটি ডায়েরিতে তারিখ লিখে রাখুন। ২. মাসিক ব্যবসায়ের হিসাব রাখুন যাতে বছর শেষে সহজে যাকাত হিসাব করা যায়। ৩. একটি এক্সেল শিট বানান যেখানে সম্পদ ও দায়ের তালিকা রাখবেন। ৪. স্টক মূল্যায়নের জন্য বাজার দর জেনে নিন। ৫. সন্দেহ হলে আলেম বা ইসলামিক ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ৬. যাকাতের টাকা আলাদা হিসাবে রাখুন এবং তাড়াতাড়ি বিতরণ করুন। ৭. যাকাত আদায়ের রসিদ রাখুন। ৮. পার্টনারশিপ হলে প্রতি পার্টনার নিজ নিজ হিসাব করুন। ৯. প্রতি বছর একই পদ্ধতিতে হিসাব করুন। ১০. যাকাত দেওয়ার পর দোয়া করুন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। ব্যবসায়ের যাকাত সঠিকভাবে আদায় করা আল্লাহর হুকুম পালনের পাশাপাশি সমাজের দরিদ্রদের সাহায্য করার একটি উত্তম মাধ্যম।

উপসংহার

ব্যবসায়ের যাকাত নির্ণয় কঠিন নয় যদি সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি জানা থাকে। মূল বিষয় হলো বিক্রয়যোগ্য সম্পদ চিহ্নিত করা, বর্তমান মূল্যে মূল্যায়ন করা এবং দায় বাদ দিয়ে ২.৫% হিসাব করা। ব্যবসায়ের যাকাত আদায় করা শুধু ফরজ দায়িত্বই নয়, এটি ব্যবসায়ে বরকত ও সমৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

আসুন, আমরা সবাই ব্যবসায়ের যাকাত সঠিকভাবে হিসাব করে আদায় করি। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করি এবং সেই দিন হিসাব করি। একটি খাতায় বা এক্সেলে সম্পদ ও দায়ের তালিকা তৈরি করি। স্থায়ী ও চলমান সম্পদের পার্থক্য বুঝে হিসাব করি। সন্দেহ হলে জ্ঞানী ব্যক্তির পরামর্শ নিই। যাকাতের টাকা সময়মত গরিব-মিসকিনদের কাছে পৌঁছে দিই। মনে রাখি যাকাত আমাদের সম্পদ কমায় না বরং বাড়ায় এবং পবিত্র করে। ব্যবসায়িক সাফল্যের সাথে সাথে আল্লাহর হুকুম পালন করে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে যাকাত আদায় করার এবং হালাল উপার্জন করার তৌফিক দান করুন। আমীন।


FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. ব্যবসায়ের স্থায়ী সম্পদ যেমন দোকানের ভবন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির উপর কি যাকাত দিতে হয়?

না, ব্যবসায়ের স্থায়ী সম্পদের উপর যাকাত দিতে হয় না। যেসব সম্পদ ব্যবহারের জন্য কেনা হয়েছে এবং বিক্রয়ের জন্য নয়, তার উপর যাকাত ফরজ নয়। যেমন দোকানের ভবন, কারখানার মেশিনারি, অফিসের আসবাবপত্র, ডেলিভারি গাড়ি, কম্পিউটার ইত্যাদি। এগুলো ব্যবসায় ব্যবহার করা হয় কিন্তু বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রাখা নয়। শুধুমাত্র যেসব পণ্য বিক্রয়ের জন্য কেনা এবং মজুদ রাখা হয়েছে তার উপরই যাকাত দিতে হবে। তবে এই স্থায়ী সম্পদ যদি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কেনা হয় (যেমন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ে জমি বিক্রির জন্য কিনলে) তাহলে তার উপর যাকাত আসবে।

২. কাঁচামাল এবং অর্ধ-প্রস্তুত পণ্যের উপর কি যাকাত দিতে হবে?

হ্যাঁ, ব্যবসায়ের কাঁচামাল এবং অর্ধ-প্রস্তুত পণ্যের উপর যাকাত দিতে হবে। কারণ এগুলো শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রয় করা হবে, তাই এগুলো বিক্রয়যোগ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, একটি পোশাক তৈরির কারখানায় কাপড় (কাঁচামাল), কাটা কিন্তু সেলাই হয়নি এমন পোশাক (অর্ধ-প্রস্তুত) এবং সম্পূর্ণ তৈরি পোশাক (প্রস্তুত পণ্য) - তিনটির উপরই যাকাত দিতে হবে। হিসাব করার সময় যাকাতের দিন এসব পণ্যের বর্তমান বাজার মূল্য ধরতে হবে। কাঁচামালের ক্ষেত্রে সেদিন কত টাকায় বাজার থেকে কিনতে হবে এবং প্রস্তুত পণ্যের ক্ষেত্রে কত টাকায় বিক্রি করা যাবে সেই মূল্যে হিসাব করা উচিত। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত মেশিন বা যন্ত্রপাতির উপর যাকাত নেই কারণ সেগুলো স্থায়ী সম্পদ।

৩. বছরের মাঝখানে ব্যবসায়ে নতুন পুঁজি যোগ হলে বা মূলধন কমে গেলে যাকাত কীভাবে হিসাব করব?

বছরের মাঝখানে মূলধন বাড়লে বা কমলে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। প্রথম পদ্ধতি (সহজ): বছর শেষে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার উপর যাকাত দিন। এটি সহজ এবং অধিকাংশ আলেমদের মত অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয় পদ্ধতি (সতর্কতামূলক): নতুন যোগ হওয়া সম্পদের জন্য আলাদা হিসাব রাখুন এবং সেই সম্পদের এক বছর পূর্ণ হলে তার যাকাত দিন। তবে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর জন্য প্রথম পদ্ধতি অনুসরণ করা সুবিধাজনক। যেমন আপনার ব্যবসা শুরু ১ মহররম এবং ৫ রমজান নতুন ৫ লাখ টাকা পুঁজি যোগ করলেন। পরের ১ মহররম সম্পূর্ণ মূলধনের (পুরাতন+নতুন) উপর যাকাত হিসাব করবেন। এতে হিসাব সহজ হয় এবং গরিবদের উপকার বেশি হয়।

৪. প্রাপ্য টাকা (যা কাস্টমাররা বাকি দিয়েছে) কি যাকাতের হিসাবে আসবে?

হ্যাঁ, ব্যবসায়িক প্রাপ্য টাকা যা আদায়যোগ্য তা যাকাতের হিসাবে আসবে। যদি আপনি পণ্য বিক্রি করেছেন এবং ক্রেতা বাকিতে নিয়েছে এবং সে পরিশোধ করবে বলে আশা করা যায়, তাহলে সেই টাকার উপর যাকাত দিতে হবে। তবে যদি এমন ঋণ থাকে যা ফেরত পাওয়ার কোনো আশা নেই বা খুবই কম (যেমন ক্রেতা দেউলিয়া হয়ে গেছে বা পালিয়ে গেছে) তাহলে সেই টাকার উপর যাকাত দিতে হবে না। কিছু আলেমের মতে, প্রাপ্য টাকার উপর যাকাত দেওয়া ঐচ্ছিক যতক্ষণ না তা হাতে পাওয়া যায়, কিন্তু সতর্কতা ও অধিকাংশ আলেমদের মত অনুসরণ করে প্রাপ্য টাকার উপর যাকাত দেওয়া উত্তম। এতে যাকাত আদায়ে কোনো ত্রুটি থাকে না এবং আল্লাহর হুকুম পূর্ণভাবে পালন হয়।

৫. পার্টনারশিপ ব্যবসায়ে যাকাত কীভাবে হিসাব করব এবং কে দেবে?

পার্টনারশিপ ব্যবসায়ে প্রতিটি পার্টনার তার নিজের অংশের যাকাত আলাদাভাবে হিসাব করে আদায় করবে। প্রথমে মোট ব্যবসায়ের সম্পদ ও দায় হিসাব করুন। তারপর প্রতিটি পার্টনারের শেয়ার অনুযায়ী ভাগ করুন। উদাহরণ: তিন পার্টনারের ব্যবসা যেখানে ক, খ, গ এর শেয়ার যথাক্রমে ৫০%, ৩০%, ২০%। মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ ১০ লাখ টাকা। তাহলে ক এর অংশ ৫ লাখ, খ এর ৩ লাখ, গ এর ২ লাখ। ক দেবে ৫ লাখের ২.৫% = ১২,৫০০ টাকা। খ দেবে ৩ লাখের ২.৫% = ৭,৫০০ টাকা। গ দেবে ২ লাখের ২.৫% = ৫,০০০ টাকা। প্রতি পার্টনার নিজ নিজ যাকাত নিজের পছন্দের খাতে দিতে পারবে। অথবা সবাই একসাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি নির্দিষ্ট খাতে দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে হিসাব করা এবং যাকাত আদায় নিশ্চিত করা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url