ইসলামে হালাল খাবার | কী খাওয়া যাবে, কী খাওয়া যাবেনা?
ইসলামে হালাল খাবার: কী খাওয়া যায়, কী নয় | সম্পূর্ণ গাইড
ভূমিকা
খাদ্য মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ এবং ইসলাম এই বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন যে তিনি আমাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেছেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেছেন (সূরা আরাফ: ১৫৭)। হালাল খাবার শুধু শরীরের জন্য নয় বরং আত্মার জন্যও উপকারী এবং এটি আমাদের ইবাদত কবুল হওয়ার একটি শর্ত। হারাম খাবার থেকে বিরত থাকা ঈমানের দাবি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। অনেক মুসলমান জানেন না যে কোন খাবার হালাল এবং কোনটি হারাম বিশেষত মাংস, মাছ, শাকসবজি এবং ফলমূলের ক্ষেত্রে। এই লেখায় আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে হালাল খাবারের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরব যাতে প্রতিটি মুসলমান সচেতনভাবে হালাল খাবার গ্রহণ করতে পারেন এবং হারাম থেকে বিরত থাকতে পারেন। এই জ্ঞান দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় বলে আশা করা যায়।
হালাল ও হারামের মূলনীতি
ইসলামে হালাল ও হারামের কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে যা বুঝলে অনেক বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। মূল নীতি হালাল: ইসলামের মূল নীতি হলো সবকিছু হালাল যতক্ষণ না স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ বলেন তিনি পৃথিবীর সবকিছু আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা বাকারা: ২৯)। পবিত্রতা: হালাল খাবার পবিত্র এবং উপকারী হতে হবে। অপবিত্র বা ক্ষতিকর বস্তু হারাম। স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা: কুরআন ও হাদিসে যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা হারাম এবং বাকি সব হালাল। সন্দেহজনক এড়ানো: হাদিসে এসেছে যে হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট এবং এই দুইয়ের মাঝে সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে যা এড়িয়ে চলা উচিত (সহিহ বুখারি: ৫২)। উৎপাদন পদ্ধতি: খাবার নিজে হালাল হলেও যদি হারাম পদ্ধতিতে উৎপাদিত বা প্রাপ্ত হয় তাহলে তা হারাম হয়ে যায়। যেমন চুরি করা খাবার। নিয়ত ও উদ্দেশ্য: খাবার গ্রহণের নিয়ত পবিত্র হতে হবে এবং আল্লাহর ইবাদতের শক্তি পাওয়ার জন্য হওয়া উচিত।
এই মূলনীতিগুলো মনে রাখলে হালাল-হারাম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা যায়।
হালাল মাংস: কোন প্রাণীর মাংস খাওয়া যায়
ইসলামে মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং সব প্রাণীর মাংস হালাল নয়। হালাল পশু: গরু, ছাগল, ভেড়া, উট, হরিণ এবং এ ধরনের চতুষ্পদ তৃণভোজী প্রাণীর মাংস হালাল। তবে শর্ত হলো সেগুলো ইসলামি পদ্ধতিতে জবাই করতে হবে। হালাল পাখি: মুরগি, হাঁস, কবুতর, টার্কি, কোয়েল এবং অধিকাংশ গৃহপালিত পাখির মাংস হালাল। শিকারি পাখি যেমন ঈগল, শকুন ইত্যাদি হারাম। জবাইয়ের শর্ত: হালাল প্রাণীকে অবশ্যই আল্লাহর নাম নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার শিরা কেটে জবাই করতে হবে এবং রক্ত বের হতে দিতে হবে (সূরা মায়িদা: ৩)। হারাম মাংস: শূকর, কুকুর, বিড়াল, গাধা, খচ্চর এবং দাঁত দিয়ে শিকার করে এমন হিংস্র প্রাণী হারাম (সহিহ মুসলিম: ১৯৩৩)। মৃত প্রাণী: প্রাকৃতিকভাবে মৃত প্রাণী (যা জবাই করা হয়নি) হারাম। রক্ত: প্রবাহিত রক্ত হারাম তাই জবাই করা প্রাণীর রক্ত বের করে দিতে হয়।
মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো মেনে চললে হালাল খাবার নিশ্চিত করা যায় এবং আল্লাহর বিধান পালন হয়।
হালাল মাছ ও সামুদ্রিক খাবার
মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান কিছুটা সহজ তবে কিছু মতভেদও রয়েছে। সকল মাছ হালাল: অধিকাংশ আলেমের মতে সকল প্রকার মাছ হালাল। কুরআনে বলা হয়েছে যে সমুদ্রের শিকার এবং খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে (সূরা মায়িদা: ৯৬)। রুই, কাতলা, ইলিশ, চিংড়ি - সব ধরনের মাছ হালাল। জবাই প্রয়োজন নেই: মাছের ক্ষেত্রে জবাই করার প্রয়োজন নেই। পানি থেকে উঠিয়ে মৃত মাছও হালাল কারণ এটি সামুদ্রিক প্রাণী। চিংড়ি ও কাঁকড়া: অধিকাংশ আলেমের মতে চিংড়ি, কাঁকড়া এবং এ ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী হালাল। তবে হানাফি মাজহাবে মাছ ছাড়া অন্য সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে মতভেদ আছে। কুমির ও কচ্ছপ: স্থলচর হলে হারাম এবং সামুদ্রিক হলে মতভেদ আছে তাই এড়িয়ে চলাই উত্তম। বিষাক্ত মাছ: যে মাছ খেলে ক্ষতি হয় বা বিষাক্ত তা এড়ানো উচিত কারণ নিজের ক্ষতি করা হারাম।
মাছ ও সামুদ্রিক খাবার সাধারণত হালাল তবে সন্দেহজনক বিষয় এড়িয়ে চলা এবং নিজের মাজহাবের বিধান অনুসরণ করা উচিত।
সকল শাকসবজি ও ফলমূল কি হালাল?
শাকসবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান অত্যন্ত সহজ এবং উদার। মূল নীতি: সকল প্রকার শাকসবজি এবং ফলমূল হালাল। আল্লাহ বলেন তিনি পৃথিবীতে যা আছে সব আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা বাকারা: ২৯)। কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই: কুরআন বা হাদিসে কোনো শাকসবজি বা ফলমূল হারাম ঘোষণা করা হয়নি। তাই আলু, টমেটো, লাউ, পালংশাক, আম, কলা, আপেল - সব হালাল। নেশাজাতীয় পদার্থ: যে ফল বা উদ্ভিদ নেশা সৃষ্টি করে তা হারাম। যেমন আফিম, গাঁজা, মারিজুয়ানা ইত্যাদি কারণ সকল প্রকার নেশা হারাম (সহিহ মুসলিম: ২০০৩)। বিষাক্ত উদ্ভিদ: যে উদ্ভিদ খেলে মৃত্যু বা মারাত্মক ক্ষতি হয় তা খাওয়া হারাম কারণ নিজেকে ধ্বংস করা নিষিদ্ধ। পেঁয়াজ ও রসুন: পেঁয়াজ, রসুন সম্পূর্ণ হালাল তবে মসজিদে যাওয়ার আগে খাওয়া মাকরুহ কারণ দুর্গন্ধ হয় (সহিহ বুখারি: ৮৫৫)। জিএমও খাবার: জেনেটিক্যালি মডিফাইড খাবার যদি ক্ষতিকর না হয় এবং হারাম কিছু মিশানো না থাকে তাহলে হালাল।
শাকসবজি ও ফলমূল নিয়ে তেমন জটিলতা নেই এবং স্বাভাবিক সব খাবারই হালাল। নেশা ও বিষাক্ত বস্তু এড়িয়ে চললেই যথেষ্ট।
হারাম খাদ্য তালিকা: যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
কুরআন ও হাদিসে কিছু খাদ্য স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। শূকরের মাংস: শূকর এবং এর সবকিছু সম্পূর্ণ হারাম (সূরা বাকারা: ১৭৩)। শূকরের চর্বি, হাড় বা যেকোনো অংশ এবং শূকর থেকে তৈরি যেকোনো পণ্য হারাম। মৃত প্রাণী: যে প্রাণী জবাই ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে মারা গেছে তা হারাম (সূরা মায়িদা: ৩)। দুর্ঘটনায় মৃত, রোগে মৃত বা বৃদ্ধ বয়সে মৃত - সব হারাম। রক্ত: প্রবাহিত রক্ত হারাম (সূরা আনআম: ১৪৫)। তাই জবাই করা প্রাণীর রক্ত বের করে ফেলতে হয়। যকৃত ও প্লীহার রক্ত ব্যতিক্রম কারণ হাদিসে এদের হালাল বলা হয়েছে। মদ ও নেশাজাতীয়: সকল প্রকার মদ এবং নেশা সৃষ্টিকারী পানীয় ও পদার্থ হারাম (সূরা মায়িদা: ৯০)। বিয়ার, ওয়াইন, ড্রাগস সব নিষিদ্ধ। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই: যে প্রাণী আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা হয়েছে তা হারাম (সূরা বাকারা: ১৭৩)। হিংস্র প্রাণী: দাঁত দিয়ে শিকার করে এমন প্রাণী যেমন বাঘ, সিংহ, কুকুর, নেকড়ে হারাম (সহিহ মুসলিম: ১৯৩৩)। শিকারি পাখি: নখর দিয়ে শিকার করে এমন পাখি যেমন ঈগল, শকুন, চিল হারাম।
এই হারাম খাদ্যগুলো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা ঈমানের দাবি এবং আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ পালন। এগুলো খাওয়া কবিরা গুনাহ।
হালাল খাদ্য নিশ্চিত করার উপায়
আধুনিক যুগে হালাল খাদ্য নিশ্চিত করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং তবে সচেতন থাকলে সম্ভব। উপাদান পরীক্ষা: প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে উপাদান তালিকা পড়ুন। অনেক সময় শূকরের চর্বি (লার্ড), জেলাটিন বা অন্যান্য হারাম উপাদান থাকে। হালাল সার্টিফিকেট: যেসব পণ্যে হালাল সার্টিফিকেট আছে সেগুলো কেনা নিরাপদ। অবশ্য সার্টিফিকেট দেওয়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বস্ত কিনা যাচাই করুন। জবাইয়ের পদ্ধতি: মাংস কেনার সময় নিশ্চিত হোন যে ইসলামি পদ্ধতিতে জবাই করা হয়েছে। মুসলিম কসাই থেকে কিনলে নিরাপদ। রেস্তোরাঁ ও খাবার: বাইরে খাওয়ার সময় হালাল রেস্তোরাঁ বেছে নিন। সন্দেহ থাকলে জিজ্ঞেস করুন বা এড়িয়ে যান। প্রক্রিয়াজাত খাবার: অনেক প্রক্রিয়াজাত খাবারে হারাম উপাদান মেশানো থাকে যেমন কিছু চকলেট, বিস্কুট, আইসক্রিমে। সতর্ক থাকুন। ভিনদেশে: অমুসলিম দেশে থাকলে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। মুসলিম দোকান ও হালাল স্টোর খুঁজে নিন। সন্দেহজনক এড়ানো: হালাল-হারাম নিয়ে সন্দেহ থাকলে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম (সহিহ বুখারি: ৫২)।
হালাল খাদ্য নিশ্চিত করতে কিছু পরিশ্রম লাগলেও এটি আমাদের দায়িত্ব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই চেষ্টা করা উচিত।
উপসংহার
হালাল খাবার খাওয়া শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য নয় বরং আত্মিক পবিত্রতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অপরিহার্য। কুরআন ও হাদিসে হালাল-হারামের স্পষ্ট বিধান রয়েছে এবং এগুলো মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
আসুন, আমরা সবাই হালাল খাবার সম্পর্কে সচেতন হই এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করি। মনে রাখি যে মাংসের ক্ষেত্রে গরু, ছাগল, ভেড়া, মুরগি, হাঁস হালাল কিন্তু শূকর, কুকুর, হিংস্র প্রাণী হারাম। ইসলামি পদ্ধতিতে জবাই করা আবশ্যক এবং আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করতে হয়। সকল মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার সাধারণত হালাল এবং জবাই করার প্রয়োজন নেই। সকল শাকসবজি ও ফলমূল হালাল শুধু নেশাজাতীয় ও বিষাক্ত বস্তু ছাড়া। শূকরের মাংস, মৃত প্রাণী, রক্ত, মদ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা প্রাণী সম্পূর্ণ হারাম। প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে উপাদান তালিকা পড়ি এবং হালাল সার্টিফিকেট দেখি। মুসলিম কসাই থেকে মাংস কিনি এবং হালাল রেস্তোরাঁয় খাই। সন্দেহজনক খাবার এড়িয়ে চলি কারণ হাদিসে এর নির্দেশ আছে। পরিবারকে হালাল-হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দিই এবং শিশুদের ছোট থেকে সচেতন করি। মনে রাখি যে হালাল খাবার আমাদের ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত এবং হারাম খাবার দোয়া কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হালাল খাবার খাওয়ার তৌফিক দান করুন এবং হারাম থেকে বিরত রাখুন। আমাদের উপার্জন ও খাদ্য পবিত্র করুন এবং আমাদের ইবাদত কবুল করুন। আমীন।
হালাল খাবার নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. কোন কোন মাংস হালাল এবং কোনটি হারাম?
হালাল মাংসের মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল, ভেড়া, উট, হরিণ এবং এ ধরনের তৃণভোজী চতুষ্পদ প্রাণী। পাখির মধ্যে মুরগি, হাঁস, কবুতর, টার্কি, কোয়েল হালাল। তবে শর্ত হলো এগুলো ইসলামি পদ্ধতিতে জবাই করতে হবে অর্থাৎ আল্লাহর নাম নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার শিরা কেটে রক্ত বের করতে হবে (সূরা মায়িদা: ৩)। হারাম মাংসের মধ্যে রয়েছে শূকর (সূরা বাকারা: ১৭৩), কুকুর, বিড়াল, গাধা, খচ্চর এবং দাঁত দিয়ে শিকার করে এমন হিংস্র প্রাণী যেমন বাঘ, সিংহ, নেকড়ে (সহিহ মুসলিম: ১৯৩৩)। শিকারি পাখি যেমন ঈগল, শকুন, চিল যারা নখর দিয়ে শিকার করে তারাও হারাম। প্রাকৃতিকভাবে মৃত প্রাণী (যা জবাই করা হয়নি) হারাম এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা প্রাণীও হারাম। জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম না নিলেও হারাম হয়ে যায়। মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে এবং হালাল নিশ্চিত করতে হবে।
২. সকল মাছ কি হালাল এবং জবাই করা লাগে কি?
অধিকাংশ আলেমের মতে সকল প্রকার মাছ হালাল। কুরআনে বলা হয়েছে যে সমুদ্রের শিকার এবং খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে (সূরা মায়িদা: ৯৬)। রুই, কাতলা, ইলিশ, পাঙাশ, চিংড়ি - সব ধরনের মাছ হালাল। মাছের ক্ষেত্রে জবাই করার প্রয়োজন নেই। পানি থেকে উঠিয়ে যে মাছ মারা যায় তাও হালাল কারণ এটি সামুদ্রিক প্রাণী এবং এর জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে। চিংড়ি, কাঁকড়া এবং এ ধরনের সামুদ্রিক প্রাণীও অধিকাংশ আলেমের মতে হালাল। তবে হানাফি মাজহাবে মাছ ছাড়া অন্য সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে কিছু মতভেদ আছে তাই নিজের মাজহাব অনুসরণ করা উচিত। ব্যাঙ খাওয়া মাকরুহ বা অপছন্দনীয় কারণ হাদিসে ব্যাঙ মারতে নিষেধ করা হয়েছে (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৬৯)। বিষাক্ত মাছ বা যে মাছ খেলে ক্ষতি হয় তা এড়ানো উচিত। মাছ ও সামুদ্রিক খাবার সাধারণত হালাল এবং সহজলভ্য প্রোটিন উৎস।
৩. শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে কোনো হারাম আছে কি?
সকল প্রকার শাকসবজি এবং ফলমূল মূলত হালাল। আল্লাহ বলেন তিনি পৃথিবীতে যা আছে সব আমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন (সূরা বাকারা: ২৯)। কুরআন বা হাদিসে কোনো শাকসবজি বা ফল হারাম ঘোষণা করা হয়নি। তাই আলু, টমেটো, বেগুন, লাউ, পালংশাক, মুলা, গাজর, আম, কলা, আপেল, আঙ্গুর - সব হালাল। তবে যে ফল বা উদ্ভিদ নেশা সৃষ্টি করে তা হারাম। যেমন আফিম, গাঁজা, মারিজুয়ানা ইত্যাদি কারণ সকল প্রকার নেশা ইসলামে হারাম (সহিহ মুসলিম: ২০০৩)। বিষাক্ত উদ্ভিদ যা খেলে মৃত্যু বা মারাত্মক ক্ষতি হয় তাও খাওয়া হারাম কারণ নিজেকে ধ্বংস করা নিষিদ্ধ। পেঁয়াজ ও রসুন সম্পূর্ণ হালাল তবে মসজিদে যাওয়ার আগে খাওয়া মাকরুহ কারণ দুর্গন্ধ হয় যা অন্যদের কষ্ট দেয় (সহিহ বুখারি: ৮৫৫)। জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএমও) খাবার যদি ক্ষতিকর না হয় এবং হারাম কিছু মিশানো না থাকে তাহলে হালাল। শাকসবজি ও ফলমূল নিয়ে তেমন জটিলতা নেই এবং স্বাভাবিক সব খাবারই হালাল।
৪. হালাল খাবার কীভাবে নিশ্চিত করা যায় বিশেষত প্যাকেটজাত খাবারে?
আধুনিক যুগে হালাল খাবার নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। প্রথমত, প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে উপাদান তালিকা (ingredients list) ভালোভাবে পড়ুন। অনেক সময় শূকরের চর্বি (lard, pork fat), জেলাটিন (শূকর বা গরু থেকে তৈরি হতে পারে), ওয়াইন, অ্যালকোহল বা অন্যান্য হারাম উপাদান লুকিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, যেসব পণ্যে হালাল সার্টিফিকেট আছে সেগুলো কেনা নিরাপদ তবে সার্টিফিকেট দেওয়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বস্ত কিনা যাচাই করুন। তৃতীয়ত, মাংস কেনার সময় নিশ্চিত হোন যে ইসলামি পদ্ধতিতে জবাই করা হয়েছে এবং মুসলিম কসাই থেকে কিনলে নিরাপদ। চতুর্থত, বাইরে খাওয়ার সময় হালাল রেস্তোরাঁ বেছে নিন এবং সন্দেহ থাকলে জিজ্ঞেস করুন। পঞ্চমত, অনেক প্রক্রিয়াজাত খাবারে হারাম উপাদান মেশানো থাকে যেমন কিছু চকলেট, বিস্কুট, আইসক্রিম, চিপসে তাই সতর্ক থাকুন। ষষ্ঠত, E-কোড বা E-নম্বর (E120, E441 ইত্যাদি) দেখলে গুগল করে জেনে নিন এগুলো কী থেকে তৈরি। সপ্তমত, হালাল-হারাম নিয়ে সন্দেহ থাকলে এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম (সহিহ বুখারি: ৫২)।
৫. শূকরের মাংস কেন হারাম এবং এটি কতটা গুরুতর?
শূকরের মাংস ইসলামে সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং এটি আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ। কুরআনে চার জায়গায় শূকর হারাম ঘোষণা করা হয়েছে (সূরা বাকারা: ১৭৩, সূরা মায়িদা: ৩, সূরা আনআম: ১৪৫, সূরা নাহল: ১১৫)। শূকরের মাংস, চর্বি, হাড় - সবকিছুই হারাম এবং শূকর থেকে তৈরি যেকোনো পণ্যও নিষিদ্ধ। কেন হারাম এ বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন এটি অপবিত্র (রিজস)। বৈজ্ঞানিকভাবেও দেখা গেছে শূকরের মাংসে অনেক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও প্যারাসাইট থাকে যদিও এটি হারাম হওয়ার মূল কারণ নয় বরং আল্লাহর নির্দেশই যথেষ্ট। শূকরের মাংস খাওয়া কবিরা গুনাহ এবং এটি এড়িয়ে চলা আবশ্যক। তবে চরম প্রয়োজনে যেমন মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে এবং অন্য কোনো খাবার না পাওয়া গেলে শুধুমাত্র প্রাণ বাঁচানোর জন্য ন্যূনতম পরিমাণ খাওয়ার অনুমতি আছে (সূরা বাকারা: ১৭৩)। অনেক প্যাকেটজাত খাবারে শূকরের উপাদান লুকিয়ে থাকে তাই সচেতন থাকা জরুরি এবং উপাদান তালিকা পড়ে কিনতে হবে।
