অজুর ফরজ কয়টি ও অজু ভাঙার কারণ সমূহ

 

ojur-foroj-koyti-oju-vangar-karon

অজুর ফরজ কয়টি ও অজু ভাঙার কারণ

কুরআন ও হাদিসের আলোকে সহজ ও পূর্ণ আলোচনা

ভূমিকা

ইসলামে নামাজ আদায়ের জন্য অজু একটি মৌলিক শর্ত। অজু ছাড়া নামাজ শুদ্ধভাবে আদায় হয় না—এটি মুসলমানদের কাছে সুপরিচিত বিষয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, অনেকেই অজু করলেও অজুর ফরজ কয়টি, কোন কাজের কারণে অজু ভেঙে যায় বা সন্দেহ হলে কী করণীয়—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না। ফলে অজান্তেই ইবাদতে ভুল থেকে যায়।

এই লেখায় আবেগী বা কঠিন ভাষা ব্যবহার না করে, বরং কুরআন ও সহিহ হাদীসের দিকনির্দেশনার আলোকে সহজভাবে আলোচনা করা হবে—অজুর ফরজ কী, অজু ভাঙার কারণ কী কী এবং দৈনন্দিন জীবনে আমরা কীভাবে সঠিকভাবে অজু বজায় রাখতে পারি।


কেন অজুর ফরজ জানা জরুরি

অজুর ফরজ জানা জরুরি, কারণ অজুর কোনো ফরজ বাদ পড়লে অজু শুদ্ধ হয় না। আর অজু শুদ্ধ না হলে সে অজু দিয়ে আদায় করা নামাজও গ্রহণযোগ্য হয় না।

সুন্নত বা নফল কোনো আমল বাদ পড়লে অজু সহিহ থাকে, কিন্তু ফরজ বাদ পড়লে অজুই সম্পন্ন হয় না। এজন্য সঠিক ইবাদতের জন্য অজুর ফরজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


অজুর ফরজ কয়টি?

কুরআনের নির্দেশনা থেকে অজুর চারটি ফরজ নির্ধারিত হয়েছে। কুরআনে নামাজের প্রস্তুতি হিসেবে মুখমণ্ডল, হাত, মাথা ও পা পরিষ্কার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—যার ভিত্তিতেই অজুর ফরজ নির্ধারিত হয়।

এই চারটি ফরজ ঠিকভাবে আদায় হলেই অজু শুদ্ধ হয়।


অজুর চারটি ফরজ কী কী?

১. সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ধোয়া

মুখমণ্ডল বলতে কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনি পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অন্য কানের লতি পর্যন্ত অংশ বোঝায়। এই পুরো অংশ একবার ভালোভাবে ধোয়া ফরজ।

অনেক সময় দাড়ির নিচে পানি না পৌঁছানো বা কপালের কিছু অংশ শুকনো থেকে যায়—এগুলো সাধারণ ভুলের অন্তর্ভুক্ত।


২. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া

দুই হাত কবজি নয়, বরং কনুইসহ ধোয়া ফরজ। কনুই বাদ দিয়ে ধুলে ফরজ আদায় হয় না।

অজু করার সময় তাড়াহুড়ার কারণে অনেকেই কনুই ঠিকভাবে ভেজান না—এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।


৩. মাথা মাসেহ করা

ভেজা হাত দিয়ে মাথার অন্তত এক-চতুর্থাংশ মাসেহ করা ফরজ। সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা সুন্নত হলেও ফরজ হলো নির্দিষ্ট অংশে মাসেহ করা।

শুধু ভেজা হাত ছুঁইয়ে নেওয়া যথেষ্ট নয়; বাস্তব মাসেহ হওয়া প্রয়োজন।


৪. দুই পা টাখনুসহ ধোয়া

পায়ের টাখনুসহ পুরো পা ধোয়া ফরজ। টাখনু বাদ গেলে অজু শুদ্ধ হয় না।

বিশেষ করে গোড়ালি ও আঙুলের ফাঁকে পানি না পৌঁছানো একটি সাধারণ ভুল।


অজু ভাঙার প্রধান কারণসমূহ

অজু করার পর কিছু নির্দিষ্ট কাজ বা অবস্থার কারণে অজু ভেঙে যেতে পারে। তখন নতুন করে অজু করা প্রয়োজন হয়।

১. পেশাব, পায়খানা বা পায়ুপথ দিয়ে বাতাস বের হওয়া

এ বিষয়ে সকল আলেম একমত—এগুলোর যেকোনো একটি ঘটলে অজু ভেঙে যায়।


২. গভীর ঘুম

যে ঘুমে মানুষের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সে ঘুমে অজু ভেঙে যায়। তবে বসে হালকা তন্দ্রা দিলে সাধারণভাবে অজু ভাঙে না।


৩. অজ্ঞান, বেহুঁশ বা মাতাল হওয়া

এ অবস্থায় মানুষের সচেতনতা থাকে না, তাই অজু ভেঙে যায়।


৪. শরীর থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়া

অনেক আলেমের মতে, যদি রক্ত বা পুঁজ প্রবাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে অজু ভেঙে যেতে পারে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।


৫. মুখভর্তি বমি

মুখভর্তি বমি হলে অনেক আলেমের মতে অজু ভেঙে যায়। তবে সামান্য বমিতে অজু ভাঙে না—এমন মতও পাওয়া যায়।


সন্দেহ হলে অজু ভাঙবে কি না?

শুধু সন্দেহের কারণে অজু ভাঙে না। যদি কেউ নিশ্চিত না হন যে তার অজু ভেঙেছে কি না, তাহলে আগের অজুই বহাল থাকবে।

ইসলামের একটি মূলনীতি হলো—নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না। তাই অকারণে বারবার অজু করা জরুরি নয়।


নারী–পুরুষের অজু সংক্রান্ত কিছু মাসআলা

  • স্বামী–স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক হলে উভয়ের ওপর গোসল ফরজ হয়

  • শুধু স্পর্শ করলে অজু ভাঙবে কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে

  • হায়েজ ও নেফাস অবস্থায় নারীদের নামাজ সহিহ নয়; পবিত্র হওয়ার পর গোসল ফরজ হয়

এক্ষেত্রে নিরাপদ আমল হলো—সন্দেহ হলে নতুন করে অজু করে নেওয়া।


অজু ভাঙলে কখন নতুন অজু করা জরুরি

অজু ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন অজু করা ফরজ নয়। তবে নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, তাওয়াফ বা সিজদায়ে তিলাওয়াতের আগে অবশ্যই অজু করতে হবে।


বাস্তব উদাহরণ দিয়ে সহজ বোঝাপড়া

  • কেউ গভীর ঘুমে পড়ে গেলে তার অজু ভেঙে যাবে

  • হাতে সামান্য কাটা দাগ থেকে অল্প রক্ত বের হলে সাধারণভাবে অজু ভাঙে না

  • স্বামী–স্ত্রী হাত ধরলে সাধারণত অজু ভাঙে না, তবে শারীরিক সম্পর্ক হলে গোসল ফরজ হয়


উপসংহার

অজু হলো নামাজের চাবিকাঠি। অজুর ফরজ ও অজু ভাঙার কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে আমাদের ইবাদত আরও শুদ্ধ ও সুন্দর হয়। সঠিক জ্ঞান ছাড়া ইবাদত করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত অজু সংক্রান্ত মৌলিক মাসআলা ভালোভাবে জানা এবং তা অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে অজু করা ও শুদ্ধ নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।


অজু সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন: অজুর ফরজ কয়টি?
উত্তর: অজুর ফরজ মোট চারটি।

প্রশ্ন: সন্দেহ হলে অজু ভাঙবে কি?
উত্তর: না, শুধু সন্দেহের কারণে অজু ভাঙে না।

প্রশ্ন: ঘুমালে কি অজু ভেঙে যায়?
উত্তর: গভীর ঘুমে অজু ভেঙে যায়, হালকা তন্দ্রায় ভাঙে না।

প্রশ্ন: রক্ত বের হলে কি অজু ভাঙে?
উত্তর: অল্প রক্তে মতভেদ আছে, তবে বেশি রক্ত প্রবাহিত হলে অজু ভেঙে যায়।


আরো পড়ুন:

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url