রবিউল আউয়াল মাস কেন গুরুত্বপূর্ণ? আমল ও ফজিলত
রবিউল আউয়াল মাস কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই মাসের আমল ও ফজিলত
ভূমিকা
ইসলামি বছরের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারণ এই মাসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জন্ম হয়েছিল। এই মাসটি আমাদের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নবায়নের একটি বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। তবে রবিউল আউয়াল মাসকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রীতি প্রচলিত আছে এবং কিছু বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে। এই লেখায় আমরা রবিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব, এই মাসে করণীয় আমল এবং এর ফজিলত সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব যাতে প্রতিটি মুসলমান এই মাসটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন।
রবিউল আউয়াল মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
রবিউল আউয়াল মাস ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। রাসুলুল্লাহর জন্ম: ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যদিও সঠিক তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে - কেউ ১২ রবিউল আউয়াল আবার কেউ ৯ রবিউল আউয়াল উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহর ওফাত: এই একই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন যা এই মাসকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) সোমবার দিন ইন্তেকাল করেন (সহিহ বুখারি: ৪৪৪৮)। রহমতের নবী: আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.) কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। হিজরতের স্মৃতি: এই মাসের সাথে হিজরতের কিছু ঘটনাও জড়িত কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসেই মদিনায় পৌঁছেছিলেন বলে কিছু বর্ণনায় এসেছে। নবুওয়াতের সূচনা: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সাথে এই মাসের সম্পর্ক রয়েছে। স্মরণের মাস: এই মাস আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনী স্মরণ করার এবং তাঁর থেকে শিক্ষা নেওয়ার একটি সুযোগ এনে দেয়।
রবিউল আউয়াল মাসের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্য আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ্য এনে দেয়।
রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঈমানের শর্ত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, পিতামাতা এবং সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় হই (সহিহ বুখারি: ১৫, সহিহ মুসলিম: ৪৪)। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন বলুন যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, উপার্জিত সম্পদ... তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের চেয়ে বেশি প্রিয় হয় তাহলে অপেক্ষা করো (সূরা তাওবা: ২৪)। দরুদ পাঠের গুরুত্ব: রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো তাঁর উপর দরুদ পাঠ করা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে মুমিনদের রাসুলের উপর দরুদ পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আহযাব: ৫৬)। সুন্নত অনুসরণ: প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর সুন্নত অনুসরণের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন বলুন তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন (সূরা আলে ইমরান: ৩১)। সীরাত অধ্যয়ন: রাসুলুল্লাহর জীবনী অধ্যয়ন করলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।
রবিউল আউয়াল মাসে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নবায়নের চেষ্টা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
দরুদ শরীফ পাঠের ফজিলত।
রবিউল আউয়াল মাসে বিশেষভাবে দরুদ শরীফ পাঠের গুরুত্ব অনেক বেশি। কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তায়ালা বলেন নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন, হে মুমিনগণ তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করো (সূরা আহযাব: ৫৬)। দশগুণ রহমত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)। নিকটতম ব্যক্তি: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে সেই ব্যক্তি থাকবে যে আমার উপর বেশি দরুদ পাঠ করেছে (সুনানে তিরমিজি: ৪৮৪)। গুনাহ মাফ ও দুশ্চিন্তা দূর: দরুদ পাঠ করলে গুনাহ মাফ হয় এবং দুশ্চিন্তা দূর হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে (মুসনাদে আহমাদ: ২১৬৪১)। সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণ দরুদ: সংক্ষিপ্ত দরুদ যেমন "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" থেকে শুরু করে দরুদে ইব্রাহিমের মতো পূর্ণাঙ্গ দরুদ পাঠ করা যায়। নিয়মিত অভ্যাস: শুধু রবিউল আউয়াল মাসে নয় বরং সারা বছর নিয়মিত দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, তবে এই মাসে বিশেষভাবে এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া যায়।
দরুদ শরীফ নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহর রহমত, গুনাহ মাফ এবং রাসুলের নৈকট্য লাভের আশা করা যায়।
সীরাতুন্নবী অধ্যয়নের গুরুত্ব।
রবিউল আউয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনী বা সীরাত অধ্যয়ন করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। আদর্শ অনুসরণ: আল্লাহ তায়ালা বলেন তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (সূরা আহযাব: ২১)। রাসুলুল্লাহর জীবনী জানা ছাড়া তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা সম্ভব নয়। জীবনের প্রতিটি দিক: সীরাত অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা রাসুলুল্লাহর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন এবং নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পর্কে জানতে পারি। চরিত্রের উৎকর্ষতা: আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহর চরিত্র সম্পর্কে বলেন নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সূরা কালাম: ৪)। সীরাত অধ্যয়ন করলে আমরা তাঁর চরিত্র থেকে শিক্ষা নিতে পারি। সন্তানদের শেখানো: এই মাসে পরিবারে বসে সন্তানদের রাসুলুল্লাহর জীবনী সহজ ভাষায় বলা যায় যা তাদের ঈমান মজবুত করে। সংগঠিত আলোচনা: কোনো কোনো এলাকায় এই মাসে সীরাত মাহফিল বা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় যেখানে রাসুলুল্লাহর জীবনী নিয়ে আলোচনা হয়। বই ও লেকচার: নির্ভরযোগ্য সীরাতের বই পড়া বা আলেমদের লেকচার শোনা যায়।
সীরাতুন্নবী অধ্যয়ন করলে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং জীবনে তাঁর আদর্শ অনুসরণের প্রেরণা পাওয়া যায়।
নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত।
রবিউল আউয়াল মাসে সাধারণ নফল ইবাদতগুলো নিয়মিত করার প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া যায়। সোম-বৃহস্পতিবারের রোজা: এই মাসে অন্যান্য মাসের মতোই সোম ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখা যায় যা রাসুলুল্লাহর সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন সোম ও বৃহস্পতিবার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয় তাই আমি চাই আমার আমল রোজা অবস্থায় পেশ করা হোক (সুনানে তিরমিজি: ৭৪৭)। আইয়ামে বিদের রোজা: প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা যায় যা রবিউল আউয়াল মাসেও প্রযোজ্য। কুরআন তিলাওয়াত: এই মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা। দান-সদকা: সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করা এবং গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা যা রাসুলুল্লাহর সুন্নত ছিল। ইস্তেগফার ও তওবা: নিয়মিত ইস্তেগফার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নফল নামাজ: তাহাজ্জুদ, দুহা এর মতো নফল নামাজ নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করা।
এই সাধারণ ইবাদতগুলো সারা বছরই করা যায় তবে রবিউল আউয়াল মাসে বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে করলে বাড়তি বরকত লাভের আশা করা যায়।
রবিউল আউয়াল মাসকে ঘিরে প্রচলিত রীতি ও এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি।
রবিউল আউয়াল মাসে বিশেষত ১২ তারিখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রীতি প্রচলিত আছে যা নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মিলাদুন্নবী উদযাপন: অনেক মুসলিম দেশে ও সম্প্রদায়ে রাসুলুল্লাহর জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন করা হয় যেমন সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি। সমর্থনকারীদের মত: যারা এই আয়োজনের পক্ষে তারা মনে করেন এটি রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম এবং তাঁর জীবনী স্মরণ ও প্রচারের একটি উপলক্ষ্য। বিরত থাকার মত: অন্যদিকে কিছু আলেম মনে করেন যেহেতু রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে বা সাহাবিরা এই ধরনের নির্দিষ্ট দিনে সংগঠিত অনুষ্ঠান করেননি তাই এটি থেকে বিরত থাকা উচিত এবং প্রকৃত সুন্নত হলো সারা বছর তাঁকে স্মরণ করা ও ভালোবাসা। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত: এই বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে ঐকমত্য নেই তাই একজন মুসলমান তার নিজের এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেমদের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মূল বিষয়ে ঐকমত্য: তবে সব আলেমই একমত যে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, দরুদ পাঠ এবং তাঁর সুন্নত অনুসরণ সব সময়ই ফজিলতপূর্ণ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে।
এই বিষয়ে যেহেতু মতভেদ রয়েছে তাই একজন মুসলমানের উচিত নিজ নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা নেওয়া।
উপসংহার।
রবিউল আউয়াল মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নবায়নের একটি বিশেষ সুযোগ। এই মাসে দরুদ পাঠ, সীরাত অধ্যয়ন এবং সাধারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও রাসুলুল্লাহর শাফায়াত লাভের আশা করা যায়।
আসুন আমরা রবিউল আউয়াল মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাই। নিয়মিত দরুদ শরীফ পাঠ করি এবং রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করি। সীরাতুন্নবী অধ্যয়ন করি এবং তাঁর জীবনী থেকে শিক্ষা নিই। পরিবারের সন্তানদের রাসুলুল্লাহর জীবনী সহজ ভাষায় বলি যাতে তাদের ঈমান মজবুত হয়। সোম-বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখার চেষ্টা করি। কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকা বেশি বেশি করি। নিয়মিত ইস্তেগফার করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। রাসুলুল্লাহর সুন্নত অনুসরণের চেষ্টা করি এবং তাঁর চরিত্র থেকে শিক্ষা নিই। কোনো আয়োজন করলে শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে করি এবং অপচয় ও শিরক থেকে বিরত থাকি। এই বিষয়ে মতভেদ থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমদের পরামর্শ নিই এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল থাকি। শুধু এই মাসেই নয় বরং সারা বছর রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নত অনুসরণ বজায় রাখি। মনে রাখি যে প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর দেখানো পথে চলার মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা দান করুন এবং তাঁর সুন্নত অনুসরণের তৌফিক দিন। আমাদের কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহর শাফায়াত নসিব করুন। আমীন।
FAQ - প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন।
১. রবিউল আউয়াল মাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রবিউল আউয়াল মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারণ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী এই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন যদিও সঠিক তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। একই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকালও করেন যা এই মাসকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.) কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। এই মাসের সাথে রাসুলুল্লাহর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে যা আমাদের তাঁর জীবনী স্মরণ করার এবং তাঁর থেকে শিক্ষা নেওয়ার একটি সুযোগ এনে দেয়। এই মাস আমাদের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নবায়নের একটি বিশেষ উপলক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে মূল কথা হলো রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নত অনুসরণ শুধু এই মাসেই নয় বরং সারা বছর অব্যাহত রাখা উচিত। এই মাসটি আমাদের জন্য একটি বিশেষ স্মারক হিসেবে কাজ করে যা আমাদের রাসুলুল্লাহর জীবনী ও শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হতে সাহায্য করে।
২. রবিউল আউয়াল মাসে কী কী আমল করা উচিত?
রবিউল আউয়াল মাসে বেশ কিছু ফজিলতপূর্ণ আমল করা যায়। প্রথমত নিয়মিত দরুদ শরীফ পাঠ করা যা রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং আল্লাহ কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আহযাব: ৫৬)। দ্বিতীয়ত সীরাতুন্নবী বা রাসুলুল্লাহর জীবনী অধ্যয়ন করা যাতে তাঁর আদর্শ সম্পর্কে জানা যায় এবং তা অনুসরণ করা যায়। তৃতীয়ত সোম ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখা যা রাসুলুল্লাহর সুন্নত (সুনানে তিরমিজি: ৭৪৭)। চতুর্থত আইয়ামে বিদের রোজা অর্থাৎ চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে নফল রোজা রাখা। পঞ্চমত বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা। ষষ্ঠত সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করা এবং গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা। সপ্তমত নিয়মিত ইস্তেগফার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। অষ্টমত পরিবারে সন্তানদের রাসুলুল্লাহর জীবনী সহজ ভাষায় শেখানো। এই আমলগুলো সারা বছরই করা যায় তবে রবিউল আউয়াল মাসে বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে করলে বাড়তি ফজিলত লাভের আশা করা যায়।
৩. দরুদ শরীফ পাঠের ফজিলত কী?
দরুদ শরীফ পাঠের ফজিলত অত্যন্ত ব্যাপক এবং কুরআন-হাদিসে এর গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন এবং মুমিনদেরও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাতে বলেছেন (সূরা আহযাব: ৫৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে কেউ তাঁর উপর একবার দরুদ পাঠ করে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন (সহিহ মুসলিম: ৩৮৪)। কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহর সবচেয়ে নিকটে সেই ব্যক্তি থাকবে যে তাঁর উপর বেশি দরুদ পাঠ করেছে (সুনানে তিরমিজি: ৪৮৪)। দরুদ পাঠ করলে গুনাহ মাফ হয় এবং দুশ্চিন্তা দূর হয় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে (মুসনাদে আহমাদ: ২১৬৪১)। সংক্ষিপ্ত দরুদ যেমন "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম" থেকে শুরু করে দরুদে ইব্রাহিমের মতো পূর্ণাঙ্গ দরুদ পাঠ করা যায়। জুমার দিন বিশেষভাবে বেশি দরুদ পাঠ করা উৎসাহিত করা হয়েছে। শুধু রবিউল আউয়াল মাসে নয় বরং সারা বছর নিয়মিত দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত এবং এতে আল্লাহর রহমত ও রাসুলের নৈকট্য লাভের আশা করা যায়।
৪. মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি কী?
মিলাদুন্নবী বা রাসুলুল্লাহর জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং এই বিষয়ে ঐকমত্য নেই। যারা এই আয়োজনের পক্ষে তারা মনে করেন এটি রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম এবং তাঁর জীবনী স্মরণ ও প্রচারের একটি উপলক্ষ্য যেমন সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে। অন্যদিকে কিছু আলেম মনে করেন যেহেতু রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে বা সাহাবিরা এই ধরনের নির্দিষ্ট দিনে সংগঠিত অনুষ্ঠান করেননি তাই এটি থেকে বিরত থাকা উচিত এবং প্রকৃত সুন্নত হলো সারা বছর তাঁকে স্মরণ করা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা। এই বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে বিভিন্ন মত থাকায় একজন মুসলমানের উচিত তার নিজের এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেমদের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তবে সব আলেমই একমত যে রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, দরুদ পাঠ এবং তাঁর সুন্নত অনুসরণ সব সময়ই ফজিলতপূর্ণ এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। কোনো আয়োজন করলে তাতে অপ্রয়োজনীয় অপচয়, জাঁকজমক এবং শিরকের সম্ভাবনা এড়িয়ে চলা এবং শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. রবিউল আউয়াল মাসে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত?
রবিউল আউয়াল মাসে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত কোনো আয়োজন করলে তাতে অপ্রয়োজনীয় অপচয় এবং জাঁকজমক এড়িয়ে চলা উচিত। দ্বিতীয়ত রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা তাঁর কাছে সরাসরি সাহায্য চাওয়ার মতো কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ ইসলামে শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা ফাতিহা: ৫)। তৃতীয়ত রাসুলুল্লাহর জীবনী নিয়ে অপ্রমাণিত বা দুর্বল বর্ণনা প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং নির্ভরযোগ্য সীরাতের বই থেকে সঠিক তথ্য জানা উচিত। চতুর্থত এই বিষয়ে মতভেদ থাকলেও একে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, কটূক্তি বা অহেতুক বিতর্ক এড়িয়ে চলা উচিত এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। পঞ্চমত যেকোনো আমলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং রাসুলুল্লাহর সুন্নত অনুসরণ, শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়। ষষ্ঠত শুধু এই মাসেই ভালো আমল করে বাকি বছর অবহেলা করা উচিত নয় বরং সারা বছর রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও সুন্নত অনুসরণ বজায় রাখা উচিত। এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে রবিউল আউয়াল মাসের ইবাদত শরিয়তসম্মত ও বরকতময় হবে বলে আশা করা যায়।
