রাসূল ﷺ কেন শা‘বান মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন? | সহিহ হাদীসের আলোকে
রাসূল ﷺ কেন এই মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন? | কুরআন ও হাদীসের আলোকে
Category: Islamic Knowledge
Published: 20 January 2026
ভূমিকা
ইসলামী বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শা‘বান—রমজানের ঠিক আগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। অনেক মুসলমানই প্রশ্ন করেন,
রাসূলুল্লাহ ﷺ কেন এই মাসে অন্য মাসের তুলনায় বেশি নফল রোজা রাখতেন?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সহিহ হাদীস, আমলের ফজিলত এবং রমজানের প্রস্তুতির গভীর শিক্ষার মধ্যে।
এই লেখায় আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে জানবো—
✔️ শা‘বান মাসের গুরুত্ব
✔️ রাসূল ﷺ–এর রোজা রাখার কারণ
✔️ আমাদের জন্য কী শিক্ষা আছে
শা‘বান মাসের পরিচয় ও গুরুত্ব
শা‘বান শব্দের অর্থ হলো—বিভক্ত হওয়া বা ছড়িয়ে পড়া।
এই মাসেই আল্লাহর রহমত ও বান্দার আমল উর্ধ্বাকাশে উপস্থাপিত হয় বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
রমজানের পূর্ববর্তী হওয়ায় এটি প্রস্তুতির মাস হিসেবেও পরিচিত।
রাসূল ﷺ শা‘বান মাসে বেশি রোজা রাখতেন — সহিহ হাদীস
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন—
“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শা‘বান মাসের মতো আর কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।”
📚 (সহিহ বুখারি: ১৯৬৯, সহিহ মুসলিম: ১১৫৬)
অন্য হাদীসে এসেছে—
“তিনি শা‘বান মাস প্রায় পুরোটা রোজা রাখতেন।”
📚 (বুখারি ও মুসলিম)
এটি প্রমাণ করে, শা‘বান মাসে নফল রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রাসূল ﷺ কেন শা‘বান মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন?
১️. এই মাসে আমল আল্লাহর কাছে উঠানো হয়
উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন—
আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শা‘বান মাসে এত রোজা রাখেন কেন?
তিনি বললেন—
“এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী একটি মাস, মানুষ যেটা অবহেলা করে। এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে উঠানো হয়, আর আমি চাই আমার আমল রোজা অবস্থায় উঠানো হোক।”
📚 (সুনানে নাসাঈ: ২৩৫৭ – সহিহ)
এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্পষ্ট কারণ।
২️. রমজানের জন্য আত্মিক প্রস্তুতি
শা‘বান হলো রমজানের প্র্যাকটিস মাস।
✔️ নফল রোজা
✔️ কুরআন তিলাওয়াত
✔️ নফসের নিয়ন্ত্রণ
রাসূল ﷺ আমাদের শেখালেন—রমজানে হঠাৎ নয়, বরং ধাপে ধাপে প্রস্তুতি নেওয়াই উত্তম।
৩️. শা‘বান মাস মানুষের কাছে অবহেলিত
রাসূল ﷺ নিজেই বলেছেন—
“এটি এমন একটি মাস যাকে মানুষ অবহেলা করে।” (নাসাঈ)
অবহেলিত সময়ে ইবাদত করার ফজিলত অনেক বেশি।
৪️. উম্মতের জন্য সুন্নাতের শিক্ষা
রাসূল ﷺ–এর আমল আমাদের জন্য রোডম্যাপ।
তিনি দেখিয়ে দিলেন—
রমজানের আগেই নিজেকে শুদ্ধ ও প্রস্তুত করা কতটা জরুরি।
কুরআনের আলোকে নফল ইবাদতের গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই নেক আমল গুনাহ মুছে দেয়।”
📚 (সূরা হুদ: ১১৪)
নফল রোজা এমন একটি ইবাদত—
✔️ গুনাহ মাফ করে
✔️ তাকওয়া বৃদ্ধি করে
✔️ রমজানের জন্য হৃদয় প্রস্তুত করে
আমাদের জন্য করণীয় কী?
শা‘বান মাসে আমাদের উচিত—
✔️ নিয়মিত নফল রোজা রাখা (ক্ষমতা অনুযায়ী)
✔️ বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
✔️ কুরআন পড়ার অভ্যাস তৈরি করা
✔️ রমজানের পরিকল্পনা করা
তবে শা‘বানের শেষ ১–২ দিন রোজা রাখা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে—যদি তা রমজানের নিয়তে হয়। (সহিহ মুসলিম)
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
শা‘বান মাসে কিছু প্রচলিত আমল আছে যেগুলোর সহিহ দলিল নেই।
তাই ইবাদতে বিদআত পরিহার করে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করাই নিরাপদ।
উপসংহার
শা‘বান মাস আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসে—রমজানের আগে নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই মাসে বেশি নফল রোজা রেখে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, অবহেলিত সময়েও ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া কতটা মূল্যবান। সহিহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি, এই মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হয়, আর প্রিয় নবী ﷺ চাইতেন তাঁর আমল রোজা অবস্থায় উঠুক।
আজ আমাদের জন্য এই সুন্নাতের শিক্ষা হলো—শুধু রমজানের অপেক্ষা না করে আগেই আত্মশুদ্ধি শুরু করা, নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। যদি আমরা শা‘বান মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে ইনশাআল্লাহ রমজান হবে আরও অর্থবহ, বরকতময় এবং কবুলিয়তের মাস।
